প্রবারণা পূর্ণিমা ও ফানুস উৎসব

প্রবারণা পূর্ণিমা ও ফানুস উৎসব

০
জন
ধরন ইভেন্ট
পড়ার সময় ৪ মিনিটস
তারিখ রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬
অবস্থা আসন্ন
আয়োজনস্থল সমগ্র বাংলাদেশ

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক অনন্য দেশ। এ দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব শুধু নিজ নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সবার অংশগ্রহণে তা পরিণত হয় আনন্দ, সৌহার্দ্য ও মানবিক মিলনের উৎসবে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রবারণা পূর্ণিমা (Pavarana Purnima), যা সাধারণ মানুষের কাছে ফানুস উৎসব নামেও বিশেষভাবে পরিচিত।

প্রবারণা পূর্ণিমা ও ফানুস উৎসব কবে অনুষ্ঠিত হবে?

২০২৬ সালে বাংলাদেশে প্রবারণা পূর্ণিমা পালিত হবে—

তারিখ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, সোমবার
বাংলা তিথি: আশ্বিনী পূর্ণিমা
ছুটির ধরন: বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য ঐচ্ছিক ছুটি।

ঢাকার স্থানীয় সময় অনুযায়ী আশ্বিনী পূর্ণিমার তিথি ২৫ অক্টোবর দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে শুরু হয়ে ২৬ অক্টোবর সকাল ১০টা ১১ মিনিট পর্যন্ত থাকার হিসাব পাওয়া গেছে। তবে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও ফানুস ওড়ানোর সময় স্থানীয় বৌদ্ধবিহার ও আয়োজক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।

প্রবারণা পূর্ণিমা ও ফানুস উৎসব কোথায় অনুষ্ঠিত হয়?

প্রবারণা পূর্ণিমা সারা দেশের বৌদ্ধবিহার, প্যাগোডা এবং বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকায় পালিত হয়। তবে সবচেয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজন দেখা যায়—

  • বান্দরবান: পুরোনো রাজবাড়ী মাঠ, কেন্দ্রীয় বৌদ্ধবিহার এবং মারমা অধ্যুষিত এলাকাগুলো
  • রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি: স্থানীয় বৌদ্ধবিহার ও পাহাড়ি জনপদ
  • কক্সবাজারের রামু ও উখিয়া: ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধবিহারগুলো
  • ঢাকা: ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার এবং মেরুল বাড্ডাসহ বিভিন্ন বৌদ্ধবিহার
  • কুয়াকাটা ও পটুয়াখালী: রাখাইন সম্প্রদায়ের পল্লি ও বৌদ্ধমন্দির
  • চট্টগ্রাম: নন্দনকাননসহ বিভিন্ন বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকা

বান্দরবানে মারমা সম্প্রদায়ের কাছে এই উৎসব “ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে” নামে পরিচিত। সেখানে প্রদীপ প্রজ্বালন, মঙ্গল রথযাত্রা, বুদ্ধমূর্তি স্নান, পঞ্চশীল গ্রহণ এবং ফানুস ওড়ানোর মাধ্যমে উৎসবটি উদ্‌যাপিত হয়।

কখন অনুষ্ঠান শুরু হয়?

স্থান ও আয়োজকভেদে সময়সূচি আলাদা হলেও সাধারণত দিনের আয়োজন এমন হয়ে থাকে—

ভোর থেকে সকাল: বুদ্ধপূজা, পঞ্চশীল গ্রহণ, প্রার্থনা ও ধর্মীয় দেশনা
সকাল থেকে দুপুর: ভিক্ষুসংঘকে আহার প্রদান, দান এবং ধর্মীয় আলোচনা
বিকেল: শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মঙ্গল রথযাত্রা
সন্ধ্যা থেকে রাত: প্রদীপ প্রজ্বালন, সমবেত প্রার্থনা এবং রঙিন ফানুস ওড়ানো

২০২৬ সালের প্রতিটি স্থানের চূড়ান্ত সময়সূচি সংশ্লিষ্ট বৌদ্ধবিহার ও স্থানীয় আয়োজক কমিটি উৎসবের কাছাকাছি সময়ে প্রকাশ করবে।

প্রবারণা পূর্ণিমার ধর্মীয় তাৎপর্য

‘প্রবারণা’ শব্দের অর্থ হলো আহ্বান, আত্মসমালোচনা এবং ভুল সংশোধনের সুযোগ গ্রহণ করা। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস বর্ষাবাস পালন করেন। এই সময়ে তাঁরা নির্দিষ্ট বৌদ্ধবিহারে অবস্থান করে ধর্মচর্চা, ধ্যান ও আত্মশুদ্ধিতে মনোনিবেশ করেন।

তিন মাসের বর্ষাবাস শেষ হওয়ার দিনই পালিত হয় প্রবারণা পূর্ণিমা। এদিন ভিক্ষুরা একে অপরের কাছে নিজেদের ভুলত্রুটি তুলে ধরার আহ্বান জানান এবং সংশোধনের মাধ্যমে আরও শুদ্ধ ও সংযমী জীবনযাপনের অঙ্গীকার করেন। তাই এই উৎসব শুধু আনন্দের নয়; এটি ক্ষমা, আত্মশুদ্ধি, সত্য গ্রহণ এবং অশুভকে পরিহার করার শিক্ষা দেয়।

ফানুস ওড়ানোর ঐতিহ্য

প্রবারণা পূর্ণিমার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো রঙিন ফানুস ওড়ানো। বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুযায়ী, রাজপুত্র সিদ্ধার্থ সংসারত্যাগের পর নিজের চুল কেটে আকাশের দিকে নিক্ষেপ করেছিলেন। সেই স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে আকাশের উদ্দেশে আলোকিত ফানুস ওড়ানো হয়। ফানুসের আলো অন্ধকার দূর করে সত্য, জ্ঞান, শান্তি ও মানবতার পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শত শত আলোকিত ফানুস যখন পাহাড়, নদী কিংবা নগরের আকাশে ভেসে ওঠে, তখন সৃষ্টি হয় অপূর্ব এক দৃশ্য। বান্দরবান, রাঙামাটি, রামু ও কুয়াকাটায় এই দৃশ্য বিশেষভাবে মনোমুগ্ধকর। কুয়াকাটায় রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষও সন্ধ্যায় ফানুস উড়িয়ে উৎসবটি পালন করেন।

সম্প্রীতি ও মানবতার বার্তা

প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উৎসব হলেও এর মূল শিক্ষা সর্বজনীন। নিজের ভুল স্বীকার করা, অন্যকে ক্ষমা করা, হিংসা ও বিদ্বেষ পরিহার করা এবং সত্য ও সুন্দরকে গ্রহণ করাই এ উৎসবের প্রধান বার্তা।

পূর্ণিমার আলো ও আকাশে ভেসে যাওয়া অসংখ্য ফানুস যেন মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—অন্ধকার যত গভীরই হোক, একটি ছোট আলোও নতুন পথের সন্ধান দিতে পারে। তাই প্রবারণা পূর্ণিমা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি শান্তি, সম্প্রীতি, আত্মশুদ্ধি এবং মানবিকতার এক অনন্য আলোকোৎসব।

গন্তব্য

ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার (বৌদ্ধ মন্দির) ~ বাসাবো, Basabo Buddho Mondir Road, ঢাকা, বাংলাদেশ

পথ ও দিকনির্দেশ দেখতে ম্যাপ খুলুন।

গুগল ম্যাপে দেখুন

ADAR BEPARI / TRAVEL WEAR

ভ্রমণের গল্প থাকুক পোশাকেও।

সব টি-শার্ট দেখুন