চীন পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার দেশ। দেশটির হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে অসংখ্য উৎসব জড়িয়ে রয়েছে। এসব উৎসবের মধ্যে সবচেয়ে বর্ণিল ও আকর্ষণীয় একটি হলো লণ্ঠন উৎসব (Chinese Lantern Festival), যা চীনা ভাষায় ইউয়ানশিয়াও উৎসব (Yuanxiao Festival) নামে পরিচিত। চীনা নববর্ষ উদ্যাপনের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত এই উৎসব আলো, আনন্দ, পারিবারিক মিলন এবং নতুন আশার প্রতীক।
লণ্ঠন উৎসব কবে পালিত হয়?
চীনা চন্দ্রপঞ্জিকা অনুযায়ী প্রথম মাসের পঞ্চদশ দিনে লণ্ঠন উৎসব পালিত হয়। এই দিনে বছরের প্রথম পূর্ণিমা দেখা যায়। সাধারণত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী উৎসবটি জানুয়ারি অথবা ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয়।
চীনা নববর্ষ শুরু হওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। লণ্ঠন উৎসবের মধ্য দিয়েই দীর্ঘ চীনা নববর্ষ উদ্যাপনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
উৎসবের ইতিহাস
লণ্ঠন উৎসবের ইতিহাস প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো। ধারণা করা হয়, চীনের হান রাজবংশের সময় থেকে এই উৎসব পালনের প্রচলন শুরু হয়।
উৎসবটির উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন গল্প ও কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। একটি ধারণা অনুযায়ী, প্রাচীন চীনে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বছরের প্রথম পূর্ণিমায় মন্দিরে প্রদীপ জ্বালাতেন। পরবর্তীকালে সম্রাটও সাধারণ মানুষকে একই দিনে লণ্ঠন জ্বালানোর নির্দেশ দেন। ধীরে ধীরে ধর্মীয় এই প্রথা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ নেয়।
আরেকটি জনপ্রিয় কিংবদন্তি অনুসারে, স্বর্গের দেবতাদের ক্রোধ থেকে একটি শহরকে রক্ষা করার জন্য সেখানকার মানুষ সর্বত্র লাল লণ্ঠন জ্বালিয়েছিল। দূর থেকে পুরো শহরটি আগুনে পুড়ছে বলে মনে হওয়ায় দেবতারা আর শহরটি ধ্বংস করেননি। সেই ঘটনা স্মরণ করেই প্রতিবছর লাল লণ্ঠন জ্বালানোর প্রথা শুরু হয় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন।
রঙিন লণ্ঠনের মনোমুগ্ধকর আয়োজন
লণ্ঠন উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হলো বিভিন্ন আকৃতি, রং ও নকশার লণ্ঠন। উৎসবের দিন বাড়িঘর, রাস্তা, পার্ক, মন্দির, বিপণিবিতান এবং জনসমাগমস্থল হাজারো আলোকিত লণ্ঠনে সাজানো হয়।
প্রথাগতভাবে লণ্ঠনগুলো লাল রঙের হয়ে থাকে। চীনা সংস্কৃতিতে লাল রং সৌভাগ্য, আনন্দ, সমৃদ্ধি ও অশুভ শক্তি থেকে সুরক্ষার প্রতীক। তবে আধুনিক সময়ে লাল ছাড়াও নীল, হলুদ, সবুজ, সোনালি ও বিভিন্ন রঙের লণ্ঠন দেখা যায়।
লণ্ঠনগুলো কখনো গোলাকার, কখনো ফুল, মাছ, ড্রাগন, পাখি কিংবা বিভিন্ন প্রাণীর আকৃতিতে তৈরি করা হয়। শিশুদের জন্য কার্টুন চরিত্র, রূপকথার প্রাণী এবং খেলনার আদলে তৈরি লণ্ঠনও বেশ জনপ্রিয়। অনেক স্থানে বিশাল আকৃতির আলোকসজ্জা ও যান্ত্রিক লণ্ঠন প্রদর্শিত হয়, যা দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।
লণ্ঠনের ধাঁধা
লণ্ঠন উৎসবের একটি জনপ্রিয় ঐতিহ্য হলো লণ্ঠনের ধাঁধা সমাধান করা। চীনা ভাষায় এই প্রথাকে বলা হয় “ছাই দেং মি”।
উৎসবের সময় লণ্ঠনের গায়ে বা নিচে কাগজে লেখা বিভিন্ন ধাঁধা ঝুলিয়ে রাখা হয়। এসব ধাঁধার বিষয় হতে পারে চীনা ইতিহাস, সাহিত্য, কবিতা, প্রবাদ, প্রাণী, ফুল, দৈনন্দিন জীবন অথবা কোনো চীনা অক্ষরের অর্থ।
যে ব্যক্তি সঠিক উত্তর দিতে পারেন, তিনি অনেক সময় ছোট উপহার বা পুরস্কার পান। এই আয়োজন শুধু বিনোদন নয়, মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি ও সৃজনশীলতা যাচাইয়েরও একটি আনন্দদায়ক উপায়।
ইউয়ানশিয়াও বা মিষ্টি চালের বল
লণ্ঠন উৎসবের বিশেষ খাবার হলো ইউয়ানশিয়াও বা তাংইউয়ান। এটি আঠালো চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি ছোট গোলাকার এক ধরনের মিষ্টি খাবার।
এর ভেতরে সাধারণত তিল, চিনাবাদাম, মিষ্টি শিম, চিনি অথবা বাদামের পুর দেওয়া হয়। কখনো এগুলো পানিতে সিদ্ধ করে পরিবেশন করা হয়, আবার কখনো স্যুপের সঙ্গে খাওয়া হয়।
এই গোলাকার খাবারের বিশেষ প্রতীকী অর্থ রয়েছে। এর আকৃতি পূর্ণিমার চাঁদের মতো গোল এবং এটি পরিবারের পূর্ণতা, মিলন, ঐক্য ও সুখের প্রতীক। তাই উৎসবের দিনে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসে ইউয়ানশিয়াও বা তাংইউয়ান খেয়ে পারিবারিক বন্ধন উদ্যাপন করেন।
ড্রাগন ও সিংহ নৃত্য
লণ্ঠন উৎসবে ড্রাগন নৃত্য ও সিংহ নৃত্যের আয়োজন করা হয়। চীনা সংস্কৃতিতে ড্রাগন শক্তি, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক। অন্যদিকে সিংহ নৃত্য অশুভ শক্তি দূর করে সুখ ও সাফল্য নিয়ে আসে বলে বিশ্বাস করা হয়।
ড্রাগন নৃত্যের সময় কয়েকজন শিল্পী একটি দীর্ঘ রঙিন ড্রাগনের কাঠামো বহন করেন। ঢোল, করতাল ও বাদ্যযন্ত্রের তালে তাঁরা ড্রাগনটিকে আঁকাবাঁকা পথে নাচান। রাতের আলোতে এই নৃত্য অত্যন্ত চমকপ্রদ দৃশ্য তৈরি করে।
সিংহ নৃত্যে সাধারণত দুইজন শিল্পী একটি সিংহের পোশাক পরে বিভিন্ন কসরত প্রদর্শন করেন। অনেক ক্ষেত্রে উঁচু মঞ্চ, খুঁটি বা টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে নৃত্য পরিবেশন করা হয়।
আতশবাজি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
উৎসবের রাতে বিভিন্ন অঞ্চলে আতশবাজি, আলোক প্রদর্শনী, লোকসংগীত, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, নাটক ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। কোথাও কোথাও স্টিল্টে হাঁটা, নৌকা নৃত্য এবং লোকজ কসরতের মতো প্রাচীন পরিবেশনাও দেখা যায়।
তবে নিরাপত্তা ও পরিবেশদূষণের কারণে বর্তমানে চীনের অনেক বড় শহরে আতশবাজি ব্যবহারের ওপর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর পরিবর্তে আধুনিক লেজার শো, ড্রোন প্রদর্শনী এবং ডিজিটাল আলোকসজ্জার ব্যবহার বাড়ছে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
লণ্ঠন উৎসব শুধু আনন্দ ও বিনোদনের অনুষ্ঠান নয়। এটি চীনা জনগণের পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।
উৎসবের সময় পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হন, একসঙ্গে খাবার খান এবং আলোকসজ্জা দেখতে বের হন। বন্ধু, প্রতিবেশী ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে পুরো সমাজে আনন্দ ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ তৈরি হয়।
লণ্ঠনের আলো অন্ধকার দূর করে নতুন ভবিষ্যতের আশা প্রকাশ করে। পূর্ণিমার চাঁদ এবং গোলাকার ইউয়ানশিয়াও পরিবারের ঐক্য ও পরিপূর্ণতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
আধুনিক যুগে লণ্ঠন উৎসব
বর্তমানে লণ্ঠন উৎসব শুধু চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত চীনা জনগোষ্ঠীও উৎসবটি পালন করেন। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের লণ্ঠন প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়।
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে লণ্ঠন উৎসব আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। অনেক লণ্ঠনে এলইডি আলো, অ্যানিমেশন, শব্দ, সেন্সর এবং যান্ত্রিক নড়াচড়ার ব্যবস্থা থাকে। কোনো কোনো প্রদর্শনীতে চীনের ইতিহাস, লোককথা ও বিখ্যাত স্থাপনাকে বিশাল আলোকিত ভাস্কর্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
তবে আধুনিকতার মধ্যেও উৎসবের মূল উদ্দেশ্য একই রয়েছে। সেটি হলো পরিবার ও সমাজের মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, আনন্দ এবং ঐক্যের বন্ধন শক্তিশালী করা।
স্থান:
সমগ্র চীনজুড়ে উদযাপিত হয়। বিশেষভাবে বিখ্যাত আয়োজন দেখা যায়:
- জিগং, সিচুয়ান (বিশ্ববিখ্যাত লণ্ঠন প্রদর্শনী)
- বেইজিং
- সাংহাই (Yuyuan Garden Lantern Festival)
- নানজিং
- শিয়ান
- চেংদু
চীনের ঐতিহ্যবাহী লণ্ঠন উৎসব ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্প ও পারিবারিক মূল্যবোধের এক অনন্য সমন্বয়। রঙিন লণ্ঠন, পূর্ণিমার চাঁদ, মিষ্টি ইউয়ানশিয়াও, ধাঁধা, ড্রাগন নৃত্য এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন উৎসবটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
হাজার বছরের পুরোনো হলেও লণ্ঠন উৎসব আজও চীনা সমাজে সমানভাবে জনপ্রিয়। এটি মানুষকে অতীতের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য আলো, শান্তি, সমৃদ্ধি ও নতুন আশার বার্তা দেয়। তাই লণ্ঠন উৎসব শুধু একটি চীনা উৎসব নয়, বরং আলো ও মানবিক ঐক্যের এক বিশ্বজনীন উদ্যাপন।
সকলের প্রতি অনুরোধ, এই বর্ষায় এডভেঞ্চার এর নেশায় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকবেন। মনে রাখবেন, জীবন একটাই, আর একটা দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। তাই আমাদের সবার ভ্রমণ নিরাপদ হোক এটাই হোক আমাদের সকলের চাওয়া।