বান্দরবান

তারপি সাইতার

তারপি সাইতার (Tarpi Saitar) বান্দরবানের রুমা–থানচি সার্কিটের গহীন পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত একটি বুনো ও অত্যন্ত দুর্গম ঝর্ণা। এটি তিনাপ সাইতার থেকে আলাদা। স্থানীয়ভাবে “সাইতার” বলতে ঝর্ণা বোঝায়। তারপি সাইতারের কাছাকাছি তারতে সাইতার নামে আরেকটি ঝর্ণা রয়েছে; অভিজ্ঞ ট্রেকাররা সাধারণত দীর্ঘ সার্কিট ট্রেকের অংশ হিসেবেই দুই জায়গা দেখেন। তারপি সাইতার রুমা–থানচি সার্কিটের গহীন, দুর্গম ও মূলত অফ-ট্রেইল ঝর্ণা। সাধারণ দর্শনীয় স্থানের মতো এখানে গিয়ে ঘুরে আসা যায় না—এটি অভিজ্ঞ ট্রেকারদের বহুদিনের এডভেঞ্চার রুট।

এক নজরে

বিষয়তথ্য
অবস্থানরুমা–থানচি সার্কিটের গভীর পাহাড়ি অঞ্চল; সুংসাংপাড়া, থিংদৌলতে পাড়া ও আশপাশের ঝিরিপথের দিক।
কাছের আকর্ষণত্লাবং/ডাবল ফলস, তারতে সাইতার, লুং ফের ভা সাইতার—তবে সবগুলোর জন্যে আলাদা করে অনুমোদন নিতে হবে।
কঠিনতাখুবই কঠিন, খাড়া ওঠানামা, পিচ্ছিল ঝিরিপথ, ভেজা বোল্ডার ও সরু পাহাড়ি ট্রেইল।
সময়পূর্ণ সার্কিট ধরলে সাধারণত অন্তত ৫–৬ দিন, সঙ্গে আবহাওয়া-বাফার।
উপযুক্ত কার জন্যবহুদিনের পাহাড়ি ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা, ভালো ফিটনেস ও ঝুঁকিপূর্ণ ট্রেইলে চলার অভ্যাস আছে—এমন দলের জন্য।

তারপি সাইতার যাওয়ার রুট

ট্রেকাররা যে রুটে তারপি সাইতার যেয়ে থাকেন, তার একটি কমন রুট হলো:

বান্দরবান শহর → রুমা বাজার → বগালেক → কেওক্রাডং → পাসিংপাড়া → সুংসাংপাড়া → ত্লাবং/ডাবল ফলস → তারপি সাইতার → তারতে সাইতার → থিংদৌলতে পাড়া

এখানে যাওয়ার প্রচলিত পথ হলো বান্দরবান শহর থেকে রুমা বাজার, তারপর বগালেক, কেওক্রাডং, পাসিংপাড়া ও সুংসাংপাড়া হয়ে ভেতরের ঝিরিপথে নামা। এরপর ত্লাবং বা ডাবল ফলসের দিক পেরিয়ে তারপি সাইতারের রুটে যেতে হয়। অনেকে তারপি ও তারতে সাইতার দেখে থিংদৌলতে পাড়ার দিকে এগিয়ে যান। পুরো রুমা–থানচি সার্কিট ধরলে সাধারণত ৫–৬ দিন সময় রাখা ভালো; দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করলে ক্লান্তি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।

রুমা বাজার থেকে সাধারণত স্থানীয় নিবন্ধিত গাইড নিতে হয়। চেকপোস্টে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, মোবাইল নম্বর ও দলের তথ্য দিতে হতে পারে, তাই সবার মূল NID এবং কয়েক কপি ফটোকপি সঙ্গে রাখা উচিত। পাড়াগুলোতে থাকার ব্যবস্থা সাধারণত মৌলিক হোমস্টে-ধরনের; আরামদায়ক হোটেল, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ভালো নেটওয়ার্ক বা পছন্দমতো খাবার আশা না করাই ভালো। গাইডকে আগে জানালে স্থানীয় পরিবারগুলো সাধারণত ভাত, ডাল, ডিম, সবজি বা পাহাড়ি মুরগির খাবারের ব্যবস্থা করে দেয়।

ব্যাগ হালকা রাখবেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দেবেন না। ভালো গ্রিপের ট্রেকিং জুতা বা স্যান্ডেল, রেইনকোট, ড্রাই ব্যাগ, হেডল্যাম্প, পর্যাপ্ত পানি, ওআরএস, শুকনো খাবার, ব্যক্তিগত ওষুধ, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, মশা ও জোঁক প্রতিরোধক এবং পাওয়ার ব্যাংক নেওয়া দরকার। ঝিরিপথে চলার জন্য অতিরিক্ত মোজা ও দ্রুত শুকায় এমন পোশাক বেশ কাজে আসে।

অনুমতি

তারপি সাইতার ট্রেকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনুমতি। রুমা ও থানচির কিছু নির্দিষ্ট পর্যটন করিডর পর্যায়ক্রমে খোলা হলেও, তারপি সাইতারের মতো গভীর অফ-ট্রেইল এলাকায় প্রবেশাধিকার সব সময় থাকে না। কেওক্রাডং বা সুংসাংপাড়া পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি থাকলেই তারপি সাইতার পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি মিলবে—এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। রওনা হওয়ার আগে বান্দরবান জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ নোটিশ, রুমা বা থানচির চেকপোস্ট এবং নিবন্ধিত স্থানীয় গাইডের মাধ্যমে একই দিনের পরিস্থিতি যাচাই করা জরুরি।

তারপি সাইতার ট্রেকে কারা যাবেন?

তারপি সাইতার ট্রেক সাধারণ পর্যটকদের জন্য নয়। পথে খাড়া পাহাড়ি ঢাল, সরু মাংকি ট্রেইল, পিচ্ছিল পাথর, অন্ধকার ঝিরিপথ এবং বর্ষায় হঠাৎ বেড়ে যাওয়া পানির স্রোত থাকতে পারে। কিছু জায়গায় দীর্ঘ সময় ধরে নিচে নামতে হয়, আবার ঝর্ণা দেখে উঁচু পাড়ায় ফিরতে কঠিন চড়াই পার হতে হয়। তাই আগে পাহাড়ি ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা, ভালো হাঁটার সক্ষমতা এবং দলগত শৃঙ্খলা থাকা দরকার।

ভ্রমণের সেরা সময়

সময়ঝর্ণার অবস্থাট্রেইলের ঝুঁকি
জুন–সেপ্টেম্বরপানির প্রবাহ সবচেয়ে শক্তিশালীখুব বেশি—ঢল, জোঁক, ভূমিধস, পিচ্ছিল পাথর
অক্টোবর–নভেম্বরপানি ভালো থাকে, বর্ষা তুলনামূলক কমেতুলনামূলক ভালো সময়, তবু পূর্বাভাস জরুরি
ডিসেম্বর–ফেব্রুয়ারিপথ শুষ্ক ও তুলনামূলক নিরাপদঝর্ণার পানি কম থাকতে পারে
আনুমানিক খরচ

খরচ দলের সদস্যসংখ্যা, অনুমোদিত রুট, গাড়ি, গাইড, হোমস্টে এবং ট্রেকের দৈর্ঘ্যের ওপর নির্ভর করে। তাই পুরোনো অনলাইন বাজেটের ওপর ভরসা না করে গাইডের কাছ থেকে বর্তমান খরচ জেনে নেওয়া ভালো। পরিকল্পিত খরচের বাইরে অন্তত ৩০ শতাংশ অতিরিক্ত জরুরি বাজেট রাখুন—আবহাওয়া খারাপ হলে এক রাত বেশি থাকা বা রুট পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।

নিরাপত্তার নিয়ম
  • ভারী বৃষ্টি শুরু হলে বা উজানে মেঘ/বজ্রপাত হলে ঝিরিপথে নামবেন না।
  • পানি হঠাৎ ঘোলা, ঠান্ডা বা দ্রুত বাড়তে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে উঁচু জায়গায় সরে যান।
  • ঝর্ণার নিচে সাঁতার, লাফ বা পাথর বেয়ে ওঠা করবেন না।
  • দল থেকে বিচ্ছিন্ন হবেন না।
  • অন্ধকারে ট্রেক করবেন না।
  • পাহাড়ি ঝিরির পানি অপরিশোধিত অবস্থায় খাবেন না।
  • স্থানীয় মানুষের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।
  • হোমস্টের খাবার, থাকার নিয়ম ও সাংস্কৃতিক সীমারেখাকে সম্মান করুন।
  • সব আবর্জনা সঙ্গে করে নিচে নিয়ে আসুন।
সবচেয়ে জরুরি তিনটি বিষয়
  • প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া তারপি সাইতারের পথে যাবেন না।
  • নিবন্ধিত ও অভিজ্ঞ স্থানীয় গাইড ছাড়া অফ-ট্রেইলে প্রবেশ করবেন না।
  • ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল বা ভূমিধসের পূর্বাভাস থাকলে ট্রেক বাতিল করুন।

জরুরি পরিস্থিতিতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগের চেষ্টা করুন, তবে গহীন এলাকায় নেটওয়ার্ক না-ও থাকতে পারে। তাই যাত্রার আগে পরিবারের একজনকে সম্পূর্ণ রুট, গাইডের নাম ও সম্ভাব্য ফেরার সময় জানিয়ে রাখুন।

সবশেষে, তারপি সাইতারকে শুধু সুন্দর ঝর্ণার গন্তব্য নয়, বরং একটি উচ্চঝুঁকির পাহাড়ি অভিযান হিসেবে ভাবা উচিত। অনুমতি, আবহাওয়া, গাইড ও দলের সক্ষমতা—এই চারটি বিষয় ঠিক থাকলেই কেবল যাত্রা করা উচিত। প্লাস্টিক বা খাবারের প্যাকেট পাহাড়ে ফেলে আসবেন না, স্থানীয় মানুষের ছবি তোলার আগে অনুমতি নেবেন এবং গাইড বা নিরাপত্তা বাহিনীর নির্দেশকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে মানবেন।

Leave a Comment
Share