বান্দরবান

পালংখিয়াং ঝর্ণা

পালংখিয়াং (Palong Khiyang) (স্থানীয় উচ্চারণে পালংখিয়ং/Palongkhyang) বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার গহীন অরণ্যে অবস্থিত একটি বহুস্তরবিশিষ্ট বুনো ঝর্ণা। মাতামুহুরী নদীর উপনদী তৈন খালের উজানে, মুরুং-ত্রিপুরা-মারমা অধ্যুষিত দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এর অবস্থান। বাংলাদেশের কঠিনতম ট্রেইলগুলোর একটি — যার কারণে এখানে বছরে খুব অল্প সংখ্যক ট্রেকার পৌঁছাতে পারেন।

এই ট্রেইলের বিশেষত্ব হলো, ঝর্ণা নিজে যেমন আকর্ষণীয়, তৈন খাল ধরে দীর্ঘ হাঁটাপথটাও ততটাই — দুই পাশে গভীর বন, লতা-গুল্ম, ছোট ছোট ঝিরি আর পাহাড়ের চূড়ায় ছনের ছাউনির পাড়া।

পালংখিয়াং ট্রেইল রুট

ঢাকা → আলীকদম
  • সরাসরি বাস: সায়েদাবাদ/ফকিরাপুল থেকে হানিফ, শ্যামলী বা ইউনিক-এর আলীকদমগামী নন-এসি বাস। রাত ৯-১০টার মধ্যে ছাড়ে, সকালে পৌঁছায়। ভাড়া আনুমানিক ১,১০০-১,৩০০ টাকা।
  • ভায়া চকরিয়া: কক্সবাজারগামী যেকোনো বাসে চকরিয়া নেমে, সেখান থেকে লোকাল বাস/জিপে আলীকদম (১-১.৫ ঘণ্টা)। এসি বাসে যেতে চাইলে এটাই ভালো অপশন।
  • চট্টগ্রাম থেকে: বহদ্দারহাট থেকে চকরিয়া/আলীকদমের বাস।
আলীকদম → ট্রেকিং শুরুর পয়েন্ট

আলীকদম থেকে অটো/সিএনজিতে পানবাজার হয়ে আমতলী ঘাট। পানবাজারেই পুরো ট্রিপের বাজার সারতে হবে — চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, তেল, লবণ, ডিম, শুকনো খাবার। এর পরে আর কোনো ভালো বাজার নেই।

আমতলী ঘাট থেকে তৈন খাল ধরে ট্রলার/নৌকায় দোছড়ি বাজার — সময় প্রায় ২ ঘণ্টা, জনপ্রতি ৩৫০-৪০০ টাকা (রিজার্ভ করলে নৌকাপ্রতি হিসাব)। শুকনো মৌসুমে খালে পানি কম থাকলে নৌকা কম দূর যায়, তখন হাঁটার অংশ বেড়ে যায়।

বিকল্প রুট: আলীকদম-থানচি সড়কের ১৩ কিলো পয়েন্ট পর্যন্ত চাঁদের গাড়ি (রিজার্ভ ~২,৫০০-৩,৫০০ টাকা), সেখান থেকে নেমে দোছড়ির দিকে ট্রেক।

মূল ট্রেক

দোছড়ি বাজার → থানকোয়াইন ঝর্ণা → হাজরাম পাড়া → পালংখিয়াং

  • দোছড়ি থেকে তৈন খালের পাথুরে বুক ধরে হাঁটা। প্রায় দেড় ঘণ্টায় থানকোয়াইন ঝর্ণা (থানকুয়াইন/থাংকুয়াইন নামেও পরিচিত) — এটি নিজেই দেখার মতো।
  • থানকোয়াইন থেকে হাজরাম পাড়া পর্যন্ত খাড়া চড়াই, ১-১.৫ ঘণ্টা। এখানেই রাতে থাকার ব্যবস্থা।
  • হাজরাম পাড়া থেকে গভীর জঙ্গল ও উতরাই পেরিয়ে আরও ৩-৪ ঘণ্টা ট্রেক করে পালংখিয়াং। তিনটি ঝর্নার মিলিত শব্দ শুনতে পাবেন পৌঁছানোর আগেই।

হাজরাম পাড়া পার হলে মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ চলে যায়। পরিবারকে জানানোর কল হাজরাম পাড়ার চূড়া থেকেই সেরে নিন।

সম্ভাব্য ট্যুর প্ল্যান

Time needed: 4 days

৩ দিন, ৪ রাতের সম্ভাব্য প্ল্যান দেয়া হলো। নিজেদের সুবিধা মতো প্ল্যান সাজিয়ে নেন এখন।

  1. রাত ০

    ঢাকা থেকে রাতের বাসে রওনা

  2. দিন ১

    সকালে আলীকদম → গাইড সংগ্রহ, থানা ও আর্মি ক্যাম্পে অনুমতি → পানবাজারে বাজার → আমতলী ঘাট → ট্রলারে দোছড়ি → ট্রেক করে থাংকুয়াইন → হাজরাম পাড়ায় রাত

  3. দিন ২

    ভোরে (৬টার মধ্যে) রওনা → পালংখিয়াং → ঝর্ণায় ২-৩ ঘণ্টা → ফিরে হাজরাম পাড়া বা কাছাকাছি পাড়ায় রাত

  4. দিন ৩

    হাজরাম পাড়া → দোছড়ি → ট্রলারে আমতলী → আলীকদম → রাতের বাসে ঢাকা

দুই দিনে এই ট্রেইল করার চেষ্টা করবেন না — অন্ধকারে জঙ্গলে আটকে পড়ার ঝুঁকি খুব বেশি।

থাকা ও খাওয়া

আশপাশে কোনো হোটেল-রিসোর্ট-রেস্টুরেন্ট নেই।

  • থাকা: হাজরাম পাড়া বা আশপাশের পাড়ার কারবারির অনুমতি নিয়ে জুমঘরে/আদিবাসীদের ঘরে। জনপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা।
  • খাওয়া: পাড়ার মানুষ বা গাইডই রান্না করে দেন, রান্নার জন্য আলাদা কিছু টাকা দিতে হয়। পাড়ায় দেশি মুরগি কিনতে পাবেন — আকার অনুযায়ী ৬০০-১,৬০০ টাকা।
  • পানি: ঝিরির পানি পানযোগ্য হলেও পিউরিফাইং ট্যাবলেট বা ফিল্টার বোতল সঙ্গে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
  • আলীকদমে থাকতে হলে: ডিসি রেস্ট হাউস, দ্য দামতুয়া ইন, বা স্থানীয় কয়েকটি সাধারণ বোর্ডিং আছে।

খরচের আনুমানিক হিসাব (৮-১০ জনের গ্রুপ, জনপ্রতি)

খাতআনুমানিক খরচ
ঢাকা-আলীকদম-ঢাকা বাস২,২০০-২,৬০০
ট্রলার (যাওয়া-আসা)৭০০-৮০০
গাইড ফি (৩ দিন, ভাগ করে)৫০০-৭০০
গাইড অফিস/এন্ট্রি ফি৫০-১০০
থাকা (২ রাত)৪০০-৬০০
খাওয়া ও বাজার১,২০০-২,০০০
স্থানীয় যাতায়াত ও বাফার৫০০
মোট৫,৫০০-৭,৫০০

গাইড ফি সাধারণত দিনপ্রতি ১,৫০০-২,০০০ টাকা (গ্রুপের জন্য, মাথাপিছু নয়), এবং গাইডের খাওয়া-থাকার খরচ গ্রুপকেই বহন করতে হয় — এটি বাজেটে ধরতে ভুলবেন না। গ্রুপ ছোট হলে জনপ্রতি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

পালংখিয়াং ভ্রমণের সেরা সময়

  • অক্টোবর-নভেম্বর: সবচেয়ে আদর্শ। ঝর্ণায় ভালো পানি, খালের পানি নেমে এসেছে, আকাশ পরিষ্কার।
  • জুলাই-সেপ্টেম্বর: ঝর্ণা সবচেয়ে প্রমত্ত, কিন্তু তৈন খালে ঢল, পাহাড়ধস ও জোঁকের উপদ্রব — অনভিজ্ঞদের জন্য বিপজ্জনক এবং এ সময়েই প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা আসে।
  • ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি: ট্রেক সহজ, কিন্তু ঝর্ণায় পানি কমে যায়।
  • মার্চ-মে: পানি প্রায় শুকিয়ে যায়, গরমও প্রচণ্ড। এড়িয়ে চলুন।
প্যাকিং লিস্ট
  1. অপরিহার্য: ভালো গ্রিপের প্লাস্টিক/জেলি জুতা (পাথুরে ঝিরির জন্য — স্নিকার্স কাজ করবে না), হেড টর্চ + এক্সট্রা ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক, ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ কভার ও ড্রাই স্যাক, দ্রুত শুকায় এমন ফুল-স্লিভ পোশাক
  2. মেডিকেল: ফার্স্ট এইড কিট, ওরস্যালাইন, প্যারাসিটামল, অ্যান্টি-হিস্টামিন, পেটের ওষুধ, ব্যান্ডেজ, অ্যান্টিসেপ্টিক, পেইন স্প্রে, ব্যক্তিগত ওষুধ
  3. জোঁকের জন্য: লবণ (আলাদা পলিব্যাগে), ওডোমস, লেগ গার্ড/লম্বা মোজা
  4. অন্যান্য: ট্রেকিং পোল/লাঠি, দিয়াশলাই ওয়াটারপ্রুফ কন্টেইনারে, গ্লুকোজ ও শুকনো খাবার, রশি, স্লিপিং ব্যাগ বা চাদর
সতর্কতা
  • ফিটনেস: এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে কঠিন ট্রেইলগুলোর একটি — দিনে ৭-৯ ঘণ্টা টানা হাঁটা, খাড়া চড়াই-উতরাই। হার্টের সমস্যা, তীব্র হাঁপানি বা হাঁটুর সমস্যা থাকলে যাবেন না।
  • একা যাবেন না। গ্রুপে যান, গাইডের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মানুন।
  • ঝর্ণায় ঝাঁপ দেবেন না। পাথরের গভীরতা ও অবস্থান অজানা, নিচে গর্ত থাকতে পারে।
  • আদিবাসী সংস্কৃতির প্রতি সম্মান: পাড়ায় ঢোকার আগে অনুমতি নিন, মানুষের ছবি তোলার আগে জিজ্ঞেস করুন, তাদের ঘরের ভেতরে বিনা অনুমতিতে ঢুকবেন না।
  • Leave No Trace: প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল — সব ফেরত নিয়ে আসুন। এই ট্রেইলে কোনো ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট নেই।
Leave a Comment
Share