পালংখিয়াং (Palong Khiyang) (স্থানীয় উচ্চারণে পালংখিয়ং/Palongkhyang) বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার গহীন অরণ্যে অবস্থিত একটি বহুস্তরবিশিষ্ট বুনো ঝর্ণা। মাতামুহুরী নদীর উপনদী তৈন খালের উজানে, মুরুং-ত্রিপুরা-মারমা অধ্যুষিত দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এর অবস্থান। বাংলাদেশের কঠিনতম ট্রেইলগুলোর একটি — যার কারণে এখানে বছরে খুব অল্প সংখ্যক ট্রেকার পৌঁছাতে পারেন।
এই ট্রেইলের বিশেষত্ব হলো, ঝর্ণা নিজে যেমন আকর্ষণীয়, তৈন খাল ধরে দীর্ঘ হাঁটাপথটাও ততটাই — দুই পাশে গভীর বন, লতা-গুল্ম, ছোট ছোট ঝিরি আর পাহাড়ের চূড়ায় ছনের ছাউনির পাড়া।
পালংখিয়াং ট্রেইল রুট
ঢাকা → আলীকদম
সরাসরি বাস: সায়েদাবাদ/ফকিরাপুল থেকে হানিফ, শ্যামলী বা ইউনিক-এর আলীকদমগামী নন-এসি বাস। রাত ৯-১০টার মধ্যে ছাড়ে, সকালে পৌঁছায়। ভাড়া আনুমানিক ১,১০০-১,৩০০ টাকা।
চট্টগ্রাম থেকে: বহদ্দারহাট থেকে চকরিয়া/আলীকদমের বাস।
আলীকদম → ট্রেকিং শুরুর পয়েন্ট
আলীকদম থেকে অটো/সিএনজিতে পানবাজার হয়ে আমতলী ঘাট। পানবাজারেই পুরো ট্রিপের বাজার সারতে হবে — চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, তেল, লবণ, ডিম, শুকনো খাবার। এর পরে আর কোনো ভালো বাজার নেই।
আমতলী ঘাট থেকে তৈন খাল ধরে ট্রলার/নৌকায় দোছড়ি বাজার — সময় প্রায় ২ ঘণ্টা, জনপ্রতি ৩৫০-৪০০ টাকা (রিজার্ভ করলে নৌকাপ্রতি হিসাব)। শুকনো মৌসুমে খালে পানি কম থাকলে নৌকা কম দূর যায়, তখন হাঁটার অংশ বেড়ে যায়।
বিকল্প রুট: আলীকদম-থানচি সড়কের ১৩ কিলো পয়েন্ট পর্যন্ত চাঁদের গাড়ি (রিজার্ভ ~২,৫০০-৩,৫০০ টাকা), সেখান থেকে নেমে দোছড়ির দিকে ট্রেক।
দুই দিনে এই ট্রেইল করার চেষ্টা করবেন না — অন্ধকারে জঙ্গলে আটকে পড়ার ঝুঁকি খুব বেশি।
থাকা ও খাওয়া
আশপাশে কোনো হোটেল-রিসোর্ট-রেস্টুরেন্ট নেই।
থাকা: হাজরাম পাড়া বা আশপাশের পাড়ার কারবারির অনুমতি নিয়ে জুমঘরে/আদিবাসীদের ঘরে। জনপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা।
খাওয়া: পাড়ার মানুষ বা গাইডই রান্না করে দেন, রান্নার জন্য আলাদা কিছু টাকা দিতে হয়। পাড়ায় দেশি মুরগি কিনতে পাবেন — আকার অনুযায়ী ৬০০-১,৬০০ টাকা।
পানি: ঝিরির পানি পানযোগ্য হলেও পিউরিফাইং ট্যাবলেট বা ফিল্টার বোতল সঙ্গে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
আলীকদমে থাকতে হলে: ডিসি রেস্ট হাউস, দ্য দামতুয়া ইন, বা স্থানীয় কয়েকটি সাধারণ বোর্ডিং আছে।
খরচের আনুমানিক হিসাব (৮-১০ জনের গ্রুপ, জনপ্রতি)
খাত
আনুমানিক খরচ
ঢাকা-আলীকদম-ঢাকা বাস
২,২০০-২,৬০০
ট্রলার (যাওয়া-আসা)
৭০০-৮০০
গাইড ফি (৩ দিন, ভাগ করে)
৫০০-৭০০
গাইড অফিস/এন্ট্রি ফি
৫০-১০০
থাকা (২ রাত)
৪০০-৬০০
খাওয়া ও বাজার
১,২০০-২,০০০
স্থানীয় যাতায়াত ও বাফার
৫০০
মোট
৫,৫০০-৭,৫০০
গাইড ফি সাধারণত দিনপ্রতি ১,৫০০-২,০০০ টাকা (গ্রুপের জন্য, মাথাপিছু নয়), এবং গাইডের খাওয়া-থাকার খরচ গ্রুপকেই বহন করতে হয় — এটি বাজেটে ধরতে ভুলবেন না। গ্রুপ ছোট হলে জনপ্রতি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
পালংখিয়াং ভ্রমণের সেরা সময়
অক্টোবর-নভেম্বর: সবচেয়ে আদর্শ। ঝর্ণায় ভালো পানি, খালের পানি নেমে এসেছে, আকাশ পরিষ্কার।
জুলাই-সেপ্টেম্বর: ঝর্ণা সবচেয়ে প্রমত্ত, কিন্তু তৈন খালে ঢল, পাহাড়ধস ও জোঁকের উপদ্রব — অনভিজ্ঞদের জন্য বিপজ্জনক এবং এ সময়েই প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা আসে।
ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি: ট্রেক সহজ, কিন্তু ঝর্ণায় পানি কমে যায়।
মার্চ-মে: পানি প্রায় শুকিয়ে যায়, গরমও প্রচণ্ড। এড়িয়ে চলুন।
প্যাকিং লিস্ট
অপরিহার্য: ভালো গ্রিপের প্লাস্টিক/জেলি জুতা (পাথুরে ঝিরির জন্য — স্নিকার্স কাজ করবে না), হেড টর্চ + এক্সট্রা ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক, ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ কভার ও ড্রাই স্যাক, দ্রুত শুকায় এমন ফুল-স্লিভ পোশাক
অন্যান্য: ট্রেকিং পোল/লাঠি, দিয়াশলাই ওয়াটারপ্রুফ কন্টেইনারে, গ্লুকোজ ও শুকনো খাবার, রশি, স্লিপিং ব্যাগ বা চাদর
সতর্কতা
ফিটনেস: এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে কঠিন ট্রেইলগুলোর একটি — দিনে ৭-৯ ঘণ্টা টানা হাঁটা, খাড়া চড়াই-উতরাই। হার্টের সমস্যা, তীব্র হাঁপানি বা হাঁটুর সমস্যা থাকলে যাবেন না।
একা যাবেন না। গ্রুপে যান, গাইডের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মানুন।
ঝর্ণায় ঝাঁপ দেবেন না। পাথরের গভীরতা ও অবস্থান অজানা, নিচে গর্ত থাকতে পারে।
আদিবাসী সংস্কৃতির প্রতি সম্মান: পাড়ায় ঢোকার আগে অনুমতি নিন, মানুষের ছবি তোলার আগে জিজ্ঞেস করুন, তাদের ঘরের ভেতরে বিনা অনুমতিতে ঢুকবেন না।
Leave No Trace: প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল — সব ফেরত নিয়ে আসুন। এই ট্রেইলে কোনো ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট নেই।
Leave a Comment