কপিতাল পাহাড় সামিট (Kopital) বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্গম চুড়াগুলোর একটি — যেখানে পৌঁছাতে লাগে দিনের পর দিন হাঁটা, পাড়ার মানুষের আন্তরিকতা, আর প্রশাসনের সবুজ সংকেত। কিন্তু যে মুহূর্তে গলা-সমান ঘাসের শেষ ঝোপটা সরিয়ে আপনি সেই সমতল চূড়ায় পা রাখবেন, আর দেখবেন পায়ের নিচে মেঘ জমে আছে — বাঁশঝাড়ের ভ্যাপসা গরম, জোঁকের কামড় আর হাঁটুর ব্যথা সব হিসাব মিলে যাবে।
বান্দরবানের পলিতাই রেঞ্জে, থাইক্ষ্যং পাড়ার একেবারে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এই পাহাড়টির উচ্চতা প্রায় ৩,০৭৯–৩,০৯৪ ফুট — বাংলাদেশের উচ্চতম পাহাড়ের তালিকায় ৯ম বা ১০ম স্থানে। কিন্তু কপিতালকে আলাদা করেছে উচ্চতা নয়, তার আশ্চর্য সমতল চূড়া। আর সেই সমতলই তাকে দিয়েছে নামটা: একসময় ভারতের মিজোরামের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এই দুর্গম, লুকিয়ে থাকার জন্য নিখুঁত মালভূমিটাকে নিজেদের বেসক্যাম্প — তাদের ভাষায় “ক্যাপিটাল” — হিসেবে ব্যবহার করত। দলটি বহু আগে সরে গেছে, নামটা রয়ে গেছে। স্থানীয় উচ্চারণে সেটাই হয়েছে “কপিতাল”।
সুংসাং পাড়ার জুমের কিনারে দাঁড়ালে সামনে সারি সারি সবুজ ঢেউ — একটার পর একটা পাহাড় দিগন্তে মিশে গেছে। কিন্তু সব শিখরের মধ্যে একটাই আকৃতি চোখ আটকে দেয়। মনে হয় কেউ যেন বিশাল একটা ছুরি দিয়ে চূড়াটার মাথা সমান করে কেটে দিয়েছে। ধারালো কোনো শৃঙ্গ নয়, চূড়ো নয় — নিটোল, চ্যাপ্টা একটা টেবিল, আকাশের গায়ে বসানো। ওটাই কপিতাল।
কপিতাল কোনো পর্যটন স্পট নয়। এখানে চান্দের গাড়ি পৌঁছায় না, রিসোর্ট নেই, নেটওয়ার্ক নেই। এখানে পৌঁছাতে হয় পায়ে হেঁটে, দিনের পর দিন। আর ট্রেইলটাই এই যাত্রার আসল পুরস্কার — শুরুতেই আনারসের জুম, তারপর ঘন বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে নিরন্তর চড়াই, পাতার আড়ালে ওঁত পেতে থাকা টাইগার জোঁক, আর সামিটের ঠিক আগে গলা-সমান উঁচু ঘাসের সমুদ্র, যার ভেতর দিয়ে পথ কাটতে কাটতে এগোতে হয়। বাকলাই ঝর্ণা থেকে তিন ঘণ্টা হেঁটে থাইক্ষ্যং পাড়ার Y জংশন, সেখান থেকে এক ঘণ্টার প্রায় খাড়া চড়াই — তারপরই হঠাৎ খুলে যায় সেই সমতল চূড়া, আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা মেঘের সমুদ্র।
কপিতালের গা বেয়েই নেমে যায় ত্লাবং (ডাবল ফলস) আর জাদিপাই ঝর্ণার পথ। তাই যাঁরা একবার এই দিকে ঢোকেন, তাঁরা শুধু একটা চূড়া নয় — বান্দরবানের সবচেয়ে বন্য, সবচেয়ে অস্পৃশ্য কোণটাই দেখে ফেলেন।
এক নজরে কপিতাল
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নাম | কপিতাল / ক্যাপিটাল পাহাড় |
| অবস্থান | রুমা উপজেলা, বান্দরবান (থানচি সীমানা ঘেঁষা) |
| রেঞ্জ | পলিতাই রেঞ্জ |
| উচ্চতা | প্রায় ৩,০৭৯–৩,০৯৪ ফুট (≈ ৯৪০ মিটার) |
| র্যাঙ্কিং | বাংলাদেশের ৯ম/১০ম সর্বোচ্চ পাহাড় |
| নিকটতম পাড়া | থাইক্ষ্যং পাড়া |
| বিশেষত্ব | সম্পূর্ণ সমতল, টেবিল-আকৃতির চূড়া |
| নামের উৎস | মিজো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাবেক বেসক্যাম্প — “ক্যাপিটাল” |
| ধরন | হার্ডকোর ট্রেকিং সামিট, সাধারণ পর্যটন স্পট নয় |
| কঠিন্যের মাত্রা | কঠিন (অভিজ্ঞ ট্রেকারদের জন্য) |
| সেরা সময় | নভেম্বর – ফেব্রুয়ারি |
নামের পেছনের গল্প
কপিতালের চূড়া অদ্ভুতভাবে সমতল — অনেকটা টেবিলের পাটাতনের মতো। ভূগোলের ভাষায় এটি টেবিল-টপ মাউন্টেন, আর এই বৈশিষ্ট্যই তাকে বান্দরবানের বাকি সব চূড়া থেকে আলাদা করেছে।
সমতল চূড়ার একটা সামরিক মূল্যও আছে — চারদিকে বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়, অথচ নিচ থেকে কী ঘটছে তা বোঝা যায় না। তাঁবু গাড়া যায়, দল রাখা যায়, নজরদারি চালানো যায়। ঠিক এই কারণেই ভারতের মিজোরাম থেকে আসা একটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এই দুর্গম মালভূমিটিকে বেছে নিয়েছিল নিজেদের ঘাঁটি হিসেবে। স্বাধীন মিজোরামের স্বপ্ন নিয়ে তারা এই চূড়াকেই তাদের বেসক্যাম্প — “ক্যাপিটাল” — হিসেবে ব্যবহার করত। দলটি পরে অন্যত্র সরে যায়, কিন্তু নামটা পাহাড়ের সঙ্গে জুড়ে থাকে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মুখে মুখে উচ্চারণ বদলে সেটাই দাঁড়ায় “কপিতাল”।
সামিটের শেষ ধাপ
| ধাপ | সময় | ধরন |
|---|---|---|
| বাকলাই ঝর্ণা → থাইক্ষ্যং পাড়া Y জংশন | ≈ ৩ ঘণ্টা | মাঝারি–কঠিন ট্রেক |
| Y জংশন → কপিতাল সামিট | ≈ ১ ঘণ্টা | প্রায় খাড়া চড়াই |
| মোট | ≈ ৪ ঘণ্টা | — |
ট্রেইলে যা যা পাবেন
| পর্যায় | বর্ণনা |
|---|---|
| শুরু | আনারসের জুম |
| মধ্যভাগ | ঘন বাঁশঝাড়, নিরন্তর উঁচু পথ |
| সতর্কতা | টাইগার জোঁক |
| সামিটের আগে | গলা-সমান উঁচু ঘাস |
| চূড়ায় | সমতল মালভূমি, ৩৬০° ভিউ, মেঘের সমুদ্র |
সেরা ভিউপয়েন্ট
সুংসাং পাড়ার জুম — এখান থেকে কপিতালের টেবিল-আকৃতি সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায়। ছবি তোলার জন্য আদর্শ, আর একটা বাড়তি সুবিধাও আছে: আগস্ট ২০২৬-এর প্রশাসনিক বিজ্ঞপ্তিতে কেওক্রাডং → সুংসাংপাড়া অংশটি উন্মুক্ত ঘোষিত। অর্থাৎ সামিটে ওঠার অনুমতি না মিললেও কপিতালকে দেখে আসা যায়।
একই ট্রিপে যা কভার হয়
ত্লাবং (ডাবল ফলস) • জাদিপাই ঝর্ণা • বাকলাই ঝর্ণা • কেওক্রাডং • সুংসাং পাড়া
কখন যাবেন
| সময় | মূল্যায়ন |
|---|---|
| নভেম্বর – ফেব্রুয়ারি | সর্বোত্তম। শুকনো ট্রেইল, পরিষ্কার আকাশ, জোঁক কম, মেঘের সমুদ্র |
| মার্চ – মে | চলনসই, তবে প্রচণ্ড গরম ও ঝিরিতে পানির সংকট |
| জুন – সেপ্টেম্বর | এড়িয়ে চলুন। ফ্ল্যাশ ফ্লাড, জোঁকের উপদ্রব চরমে, পিচ্ছিল খাড়া ঢাল, সাঙ্গু উত্তাল |
| অক্টোবর | বৃষ্টি কমতে থাকে, ঝর্ণা তখনো প্রাণবন্ত, তবে জোঁক আছে |
সামিটের ঠিক আগের গলা-সমান ঘাসের অংশটা বর্ষায় ভয়ঙ্কর — ভেজা ঘাসে পা হড়কায়, আর দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্য। শীতেই এই ধাপটা সবচেয়ে নিরাপদ ও সবচেয়ে সুন্দর।
কপিতাল সামিটের রুট: দুই দিক থেকে যাওয়া যায়
রুট ১ — রুমা হয়ে
ঢাকা/চট্টগ্রাম → বান্দরবান সদর → রুমা বাজার → বগালেক → কেওক্রাডং → পাসিং পাড়া → সুংসাং পাড়া → থাইক্ষ্যং পাড়া → কপিতাল
- বান্দরবান থেকে রুমা বাজার: বাস বা চান্দের গাড়ি, ২–৩ ঘণ্টা। পথে রিজুক ঝর্ণা।
- রুমা বাজারে গাইড নেওয়া ও থানায় রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক
- বগালেক পর্যন্ত চান্দের গাড়ি (৪x৪) যায়
- কেওক্রাডং পর্যন্ত এখন সড়ক প্রায় চূড়া অবধি পৌঁছেছে, তবে হেঁটে যাওয়ার ট্রেইলই সুন্দর (৪–৬ ঘণ্টা)
- পাসিং পাড়া–সুংসাং পাড়ার পর থেকেই শুরু আসল দুর্গম অংশ — এখান থেকেই জাদিপাই ও ত্লাবং ঝর্ণার পথ নেমে যায় কপিতালের গা বেয়ে
রুট ২ — থানচি হয়ে
বান্দরবান সদর → থানচি → বাকলাই পাড়া → বাকলাই ঝর্ণা → থাইক্ষ্যং পাড়া Y জংশন → কপিতাল সামিট
- থানচি বাজারে গাইড ও রেজিস্ট্রেশন
- বাকলাই পাড়া পর্যন্ত দীর্ঘ ট্রেক, কিছু অংশে সাঙ্গুতে নৌকা
- পথে বাকলাই ঝর্ণা — প্রায় ৩৮০ ফুট, দেশের উচ্চতম ঝর্ণাগুলোর একটি
- বাকলাই ঝর্ণা থেকে ৩ ঘণ্টা হেঁটে থাইক্ষ্যং পাড়া Y জংশন
- Y জংশন থেকে ১ ঘণ্টার প্রায় খাড়া চড়াই — এটাই শেষ ও কঠিনতম ধাপ
সবচেয়ে ভালো: থানচি–রুমা সার্কিট
অভিজ্ঞ ট্রেকাররা সাধারণত এক দিক দিয়ে ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বের হন। এতে একই পথ দুবার হাঁটতে হয় না, আর একবারেই কভার হয় — কপিতাল সামিট, বাকলাই ঝর্ণা, ত্লাবং (ডাবল ফলস), জাদিপাই ঝর্ণা, কেওক্রাডং ও বগালেক।
ট্রেইলের চরিত্র: ধাপে ধাপে
- আনারসের জুম — ট্রেইলের শুরুতেই ঢালু জমিতে সারি সারি আনারসের ঝোপ। মৌসুমে পাড়ার মানুষ কেটে খেতে দেন। এখানেই পথটা প্রতারক — সহজ মনে হয়, কিন্তু চড়াই শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে।
- খাড়া চড়াই — জুম পেরোতেই পথ উঠতে শুরু করে এবং আর নামে না। মাটির পথ, শিকড়ে পা আটকায়, বৃষ্টির পর পিচ্ছিল।
- বাঁশঝাড় — ঘন বাঁশের ভেতর দিয়ে সুড়ঙ্গের মতো পথ। ছায়া মেলে, কিন্তু বাতাস চলে না — ভ্যাপসা গরম। বাঁশের কাটা গোড়া ধারালো, পা ফেলার সময় সাবধান।
- টাইগার জোঁকের এলাকা — বাঁশঝাড় ও ভেজা ঝিরির আশপাশে এই ডোরাকাটা জোঁক পাতায় ওঁত পেতে থাকে। পায়ের গোড়ালি ও মোজার ফাঁক দিয়ে ঢোকে, কামড় বুঝতে পারা যায় না।
- গলা-সমান ঘাস — সামিটের ঠিক আগে বিশাল একটা ঘাসের সমুদ্র, উচ্চতা মানুষের গলা পর্যন্ত। সামনের মানুষটাকেও দেখা যায় না, পথ কাটতে কাটতে এগোতে হয়। গাইড ছাড়া এই অংশে দিক হারানো খুবই সহজ।
- সামিট — ঘাস শেষ হতেই হঠাৎ খুলে যায় সমতল মালভূমি। ৩৬০ ডিগ্রি খোলা দৃশ্য, নিচে মেঘের স্তর, দূরে মিয়ানমারের দিকে সারি সারি নীল পাহাড়।
টাইগার জোঁক সামলাবেন যেভাবে
- লম্বা প্যান্ট মোজার ভেতরে ঢুকিয়ে নিন, ওপরে গেইটার বা কাপড় বেঁধে দিন
- সঙ্গে লবণের পুঁটলি রাখুন — জোঁকের গায়ে ছিটিয়ে দিলে ছেড়ে দেয়
- কখনো টেনে ছিঁড়বেন না — মুখ ভেতরে থেকে গিয়ে ইনফেকশন হয়
- প্রতি বিরতিতে পা ও গোড়ালি চেক করুন
- কামড়ের পর রক্ত বেশ কিছুক্ষণ ঝরবে, স্বাভাবিক। অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে ধুয়ে ব্যান্ডেজ দিন
- জুতো-মোজায় তামাক পাতা ভেজানো পানি বা সরিষার তেল লাগিয়ে নিলে উপদ্রব কমে
ট্যুর প্ল্যান (৬ দিন / ৫ রাত — থানচি–রুমা সার্কিট)
Time needed: 6 days
আবহাওয়া, চেকপোস্টের সিদ্ধান্ত ও দলের ফিটনেস অনুযায়ী অন্তত এক দিনের বাফার রাখুন।
- দিন ০
ঢাকা থেকে রাতের বাসে বান্দরবান রওনা
- দিন ১:
বান্দরবান → থানচি। গাইড চূড়ান্ত, থানা ও চেকপোস্টে রেজিস্ট্রেশন। সাঙ্গুতে নৌকা, তারপর ট্রেক শুরু। রাত পথের পাড়ায়।
- দিন ২
বাকলাই পাড়ার দিকে দীর্ঘ ট্রেক। বিকেলে বাকলাই ঝর্ণা। রাত বাকলাই পাড়ায়।
- দিন ৩
বাকলাই ঝর্ণা → ৩ ঘণ্টা → থাইক্ষ্যং পাড়া Y জংশন। পাড়ায় ব্যাগ রেখে ১ ঘণ্টার খাড়া চড়াই — কপিতাল সামিট। ঘাসের সমুদ্র পেরিয়ে চূড়ায়। বিকেলের আলোয় ফেরা। রাত থাইক্ষ্যং পাড়ায়। সামিটে সূর্যোদয় চাইলে দিন ৩-এ পাড়ায় থেকে দিন ৪-এর ভোর ৪টায় উঠুন — মেঘের সমুদ্র তখনই সেরা।
- দিন ৪
থাইক্ষ্যং পাড়া → সুংসাং পাড়া। জুম থেকে পেছনে ফিরে কপিতালের টেবিল-আকৃতি দেখুন। পথে ত্লাবং (ডাবল ফলস)। রাত পাসিং বা সুংসাং পাড়ায়।
- দিন ৫
জাদিপাই ঝর্ণা → কেওক্রাডং → বগালেক (ট্রেক বা চান্দের গাড়ি)। রাত বগালেকে।
- দিন ৬
বগালেক → রুমা বাজার → বান্দরবান সদর → রাতের বাসে ঢাকা।
অনুমতি ও কাগজপত্র
পার্বত্য চট্টগ্রামে একা ট্রেকিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- নিবন্ধিত স্থানীয় গাইড — রুমা বাজার বা থানচি বাজার ট্যুরিস্ট গাইড সমিতি থেকে নিতে হবে
- পরিচয়পত্রের ফটোকপি — এনআইডি/জন্মনিবন্ধন/পাসপোর্ট, জনপ্রতি অন্তত ৬–৮ কপি (প্রতিটি চেকপোস্টে জমা দিতে হয়)
- থানায় রেজিস্ট্রেশন — সম্পূর্ণ রুট ও ইমার্জেন্সি কন্টাক্ট জমা
- সেনা/বিজিবি চেকপোস্টে অনুমোদন — গাইড সহায়তা করবেন, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাঁদের
- অনুমোদিত জোনের বাইরে যাওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ
বিদেশি পর্যটকদের জন্য: বান্দরবান পৌঁছানোর আগেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বিশেষ CHT পারমিট নিতে হবে। নিবন্ধিত ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে আগেই কাগজপত্র করিয়ে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
আনুমানিক খরচের হিসাব (২০২৬)
| খাত | পরিমাণ |
|---|---|
| গাইড ফি | ৮০০–১,০০০ টাকা/দিন (গভীর জঙ্গল বিশেষজ্ঞ ১,৫০০ পর্যন্ত) |
| গাইডের খাওয়া–থাকা | অতিরিক্ত ৩০০–৫০০ টাকা/দিন (পর্যটকের দায়িত্ব) |
| পোর্টার | ৭০০–১,০০০ টাকা/দিন (দীর্ঘ ট্রেকে প্রবলভাবে সুপারিশযোগ্য) |
| চান্দের গাড়ি | ৭,০০০–৮,০০০ টাকা (১০–১২ জনের দল, রুমা–বগালেক রাউন্ড ট্রিপ) |
| সাঙ্গুতে নৌকা | ৪,০০০–৬,০০০ টাকা (দলভিত্তিক, থানচি রুটে) |
| পাড়ায় থাকা | ২০০–৪০০ টাকা/জন/রাত |
| খাবার | ১৫০–২৫০ টাকা/বেলা |
| মোট (৬ দিন, ১০ জনের দল) | আনুমানিক ৮,০০০–১২,০০০ টাকা/জন |
একজন গাইড সাধারণত ১০–১৪ জনের দল পরিচালনার অনুমতি পান — দল বড় হলে জনপ্রতি খরচ কমে। সব টাকা নগদে নিয়ে যেতে হবে, বান্দরবান সদর ছাড়ার পর ATM বা মোবাইল ব্যাংকিং নেই।
থাকা ও খাওয়া
গভীর পাহাড়ে হোটেল-রিসোর্ট নেই। থাকতে হবে আদিবাসী পাড়ার ঘরে বা কমিউনিটি কটেজে — বাঁশের মাচাংঘরে গণশয়ন, সাধারণ বিছানা ও কম্বল, বাইরে টয়লেট, বিদ্যুৎ থাকলে সৌরচালিত সীমিত আলো।
খাবার পাড়ার পরিবারই রান্না করে দেন — ভাত, ডাল, ডিম, স্থানীয় সবজি, আগে বলে রাখলে দেশি মুরগি। গাইডকে আগের সন্ধ্যায় জানিয়ে রাখলে ব্যবস্থা ভালো হয়। খাদ্য অ্যালার্জি বা নিরামিষ প্রয়োজন থাকলে যাত্রার আগেই জানিয়ে দিন।
যা সঙ্গে নেবেন
অপরিহার্য
- ভালো গ্রিপের ট্রেকিং শু (স্যান্ডেল একেবারেই নয়) + ৩–৪ জোড়া মোজা
- ৪০–৫০ লিটার ব্যাকপ্যাক + রেইন কভার
- হেডল্যাম্প/টর্চ ও অতিরিক্ত ব্যাটারি
- পাওয়ার ব্যাংক (২–৩টি)
- পর্যাপ্ত নগদ টাকা
- পরিচয়পত্রের ফটোকপি (৬–৮ সেট)
- ট্রেকিং পোল বা শক্ত লাঠি — খাড়া চড়াই ও নামার সময় হাঁটু বাঁচায়
জোঁক ও পোকা
- লবণের পুঁটলি, তামাক পাতা
- লম্বা ফুলপ্যান্ট, গেইটার
- মশা ও পোকা নিরোধক
স্বাস্থ্য
- ফার্স্ট এইড কিট, ব্যান্ডেজ, অ্যান্টিসেপটিক, পেইনকিলার, মাসল রিলাক্সেন্ট স্প্রে
- ওরস্যালাইন, গ্লুকোজ, শুকনো খাবার (খেজুর, বাদাম, চকলেট)
- পানি পিউরিফাইং ট্যাবলেট বা ফিল্টার বোতল (২ লিটার ধারণক্ষমতা)
অন্যান্য
- হালকা জ্যাকেট — সমতল চূড়ায় রাতে ও ভোরে বেশ ঠান্ডা
- দ্রুত শুকানো কাপড়, গামছা
- প্লাস্টিক ব্যাগ — ভেজা কাপড় এবং নিজের সব আবর্জনা ফেরত আনার জন্য
নিরাপত্তা ও সৌজন্য
নিরাপত্তা
- অনুমতি ছাড়া এক পা-ও এগোবেন না; চেকপোস্টের নির্দেশ চূড়ান্ত
- সন্ধ্যার পর ট্রেকিং সম্পূর্ণ বন্ধ — বিশেষ করে ঘাসের অংশে
- দল ভেঙে আলাদা হবেন না; গাইডের সামনে-পেছনে থাকুন
- আগেই ফিটনেস প্রস্তুতি নিন — দিনে ৮–১০ ঘণ্টা হাঁটার সক্ষমতা লাগবে। যাত্রার অন্তত এক মাস আগে থেকে হাঁটা বা সিঁড়ি চর্চা শুরু করুন
- নেটওয়ার্ক থাকবে না — পরিবারকে রুট ও ফেরার তারিখ লিখে দিয়ে যান
- উচ্চ রক্তচাপ, হাঁটুর সমস্যা বা হৃদরোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
- ঝর্ণায় নামার সময় শ্যাওলা ধরা পাথরে অতিরিক্ত সতর্ক থাকুন
সাংস্কৃতিক সৌজন্য
- পাড়ার মানুষের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন
- শালীন পোশাক পরুন
- পাড়ার ভেতরে মদ্যপান বা উচ্চ শব্দে গান বাজানো থেকে বিরত থাকুন
- দরদাম নিয়ে অতিরিক্ত কষাকষি করবেন না — এটাই তাঁদের জীবিকা
- সব প্লাস্টিক ও আবর্জনা ফেরত নিয়ে আসুন
- ধর্মীয় স্থান ও কিয়াং-এ জুতা খুলে প্রবেশ করুন
একই ট্যুরে যা যা রাখতে পারেন
| স্থান | বিশেষত্ব |
|---|---|
| ত্লাবং / ডাবল ফলস | বান্দরবানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বন্য ঝর্ণা, কপিতালের গা বেয়ে পথ |
| জাদিপাই ঝর্ণা | “ঝর্ণার রানি”, রংধনু দেখা যায় সকালের রোদে |
| বাকলাই ঝর্ণা | ≈৩৮০ ফুট, দেশের উচ্চতম ঝর্ণাগুলোর একটি |
| কেওক্রাডং | দেশের অন্যতম প্রসিদ্ধ চূড়া, এখন সড়কে পৌঁছানো যায় |
| বগালেক | পাহাড়চূড়ার রহস্যময় হ্রদ |
| সুংসাং পাড়া | কপিতাল দেখার সেরা ভিউপয়েন্ট |
| রিজুক ঝর্ণা | সাঙ্গু নদীর তীরে, রুমা যাওয়ার পথেই |
সবচেয়ে জরুরি পরামর্শ: রওনা দেওয়ার আগে অবশ্যই রুমা বা থানচি গাইড সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করে নির্দিষ্ট রুটের বর্তমান অনুমতির অবস্থা নিশ্চিত করুন।
সকলের প্রতি অনুরোধ, এই বর্ষায় এডভেঞ্চার এর নেশায় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকবেন। মনে রাখবেন, জীবন একটাই, আর একটা দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। তাই আমাদের সবার ভ্রমণ নিরাপদ হোক এটাই হোক আমাদের সকলের চাওয়া।