বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত গণভবন — একসময় যা ছিল ক্ষমতার সর্বোচ্চ দুর্গ, আজ তা পরিণত হয়েছে একটি জাতির আত্মত্যাগ ও সাহসের জীবন্ত স্মারকে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে যে ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, তার স্মৃতি চিরকাল ধরে রাখতে এই গণভবনেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর (July Mass Uprising Memorial Museum)।
২০২৪ সালের জুলাই মাসের শুরুতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট সরকারি চাকরিতে বিতর্কিত কোটা পদ্ধতি পুনর্বহাল করলে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিতে রাস্তায় নামেন। শান্তিপূর্ণ এই প্রতিবাদ দ্রুতই পাল্টে যায় যখন সরকারের দমন-পীড়ন নামিয়ে আনা হয়।
জুলাই ১৫ তারিখ থেকে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। পুলিশ, র্যাব এবং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সশস্ত্র আক্রমণে বহু শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান। জাতিসংঘের প্রাথমিক তদন্তে প্রায় ৬৫০ জনের মৃত্যুর তথ্য মিলেছে, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে এই সংখ্যা ৮৫২ থেকে ১,৪০০-এরও বেশি। আহত হন ২০,০০০-এরও অধিক মানুষ।
এই আন্দোলনে অনেক তরুণ প্রাণ ঝরে গেছে, যারা আজ জাতির বুকে অমর হয়ে আছেন:
সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ, সামরিক বাহিনী মোতায়েন — সব দমনমূলক পদক্ষেপ ব্যর্থ করে দিয়ে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট — এই “৩৬ দিন” বাংলাদেশের ইতিহাসে “৩৬শে জুলাই” হিসেবে অমর হয়ে আছে। ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান, এভাবে তাঁর ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
গণঅভ্যুত্থানের পরপরই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস গণভবনকে ঐতিহাসিক স্মারকে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেন। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর, অভ্যুত্থানের ঠিক দুই বছর পূর্ণ হওয়ার দিনটিকে বেছে নেওয়া হয় উদ্বোধনের জন্য।
৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর-এর উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “এই জাদুঘর হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু। নতুন বাংলাদেশের পথচলা এখান থেকেই শুরু হবে।”
প্রবেশপথের শহীদ স্মারক: জাদুঘরে প্রবেশের মুখেই সবুজ প্রান্তরে নির্মিত শ্বেতমর্মর স্মৃতিস্তম্ভ, যেখানে খোদাই করা আছে শহীদদের নাম। ভেতরে রয়েছে ২,৫০০-এরও বেশি প্রতীকী সমাধি, যা গণঅভ্যুত্থানের শহীদ, গুম হওয়া ব্যক্তি, শাপলা চত্বরের নিহত এবং বিডিআর হত্যাকাণ্ডের শিকারদের সম্মানে নির্মিত।
বহিরাঙ্গন ভাস্কর্য ও ইনস্টলেশন: গণভবনের মাঠজুড়ে ছড়িয়ে আছে নানা প্রতীকী ভাস্কর্য:
গ্রাউন্ড ফ্লোর – স্বৈরাচারের দলিল: ভূতলে রয়েছে বিগত ১৫-১৬ বছরের শাসনামলে সংঘটিত রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের দলিল — বিরোধী দলের ওপর হামলার রেকর্ড, গুমের ঘটনা, আয়নাঘর (গোপন বন্দিশিবির) সংক্রান্ত তথ্য। এখানে একটি বিশেষ “লাল টেলিফোন” ইনস্টলেশন রয়েছে, যেখানে দর্শনার্থীরা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রেকর্ড করা বার্তা ও কথোপকথন শুনতে পান।
দ্বিতীয় তলা – জুলাইয়ের স্মৃতিকক্ষ: দ্বিতীয় তলাটি সম্পূর্ণভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিতে নিবেদিত। সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশটি হলো শেখ হাসিনার সাবেক শয়নকক্ষ, যেখানে তাঁর বিছানাটি এখন শহীদদের নামাঙ্কিত একটি চাদরে আবৃত।
শহীদদের ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন:
ডিজিটাল ও ইমার্সিভ প্রদর্শনী:
প্রতিবাদী শিল্পকর্ম ও গ্রাফিতি: জাদুঘরের দেয়ালে দেয়ালে সংরক্ষিত আছে আন্দোলনের সময়কার স্লোগান ও স্ট্রিট আর্ট, পত্রিকার কাটিং, অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং এবং হাসিনার পলায়নের মুহূর্তের সংরক্ষিত দৃশ্য।
| সময়সূচী | দিন | সময় | বিশেষ নোট |
|---|---|---|---|
| মর্নিং স্লট | শনি–বুধবার ও শুক্রবার | সকাল ১১:০০ — দুপুর ১:০০ | প্রতি স্লটে সর্বোচ্চ ৩০০ জন |
| মিড-ডে স্লট | শনি–বুধবার ও শুক্রবার | দুপুর ১:০০ — বিকেল ৩:০০ | প্রতি স্লটে সর্বোচ্চ ৩০০ জন |
| ইভিনিং স্লট | শনি–বুধবার ও শুক্রবার | বিকেল ৪:০০ — সন্ধ্যা ৬:০০ | প্রতি স্লটে সর্বোচ্চ ৩০০ জন |
| শুক্রবার বিশেষ সময় | শুক্রবার | দুপুর ২:০০ — সন্ধ্যা ৬:০০ | জুমার নামাজের কারণে দেরিতে শুরু |
| সাপ্তাহিক ছুটি | বৃহস্পতিবার | বন্ধ | সরকারি ছুটির দিনেও জাদুঘর বন্ধ থাকে |
| টিকেটের ধরন | বয়স/পরিচয় | মূল্য | বিশেষ নোট |
|---|---|---|---|
| বাংলাদেশি প্রাপ্তবয়স্ক | ১৩ বছর বা তার বেশি | ৫০ টাকা | অনলাইনে আগাম বুকিং বাধ্যতামূলক |
| শিশু | ৩–১২ বছর | ২৫ টাকা | ৩ বছরের কম বয়সীদের প্রবেশ বিনামূল্যে |
| সার্কভুক্ত দেশের নাগরিক | ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ সার্ক দেশ | ৫০০ টাকা | পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্র প্রয়োজন |
| বিদেশি দর্শনার্থী | সার্কবহির্ভূত বিদেশি নাগরিক | ২,০০০ টাকা | পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্র প্রয়োজন |
জাদুঘরের অনলাইন টিকেট সংগ্রহ করতে July 36-এর অফিসিয়াল টিকেট পোর্টাল ব্যবহার করুন।
এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য তিনটি:
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর কেবল একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র নয়। এটি একটি জাতির বিবেকের দলিল। রিয়া গপের মতো ছয় বছরের শিশু থেকে শুরু করে আবু সাঈদের মতো তরুণ — তাঁদের রক্তে লেখা যে ইতিহাস, তা এই জাদুঘরের প্রতিটি কোণে জীবন্ত হয়ে আছে। গণভবনের দেয়ালগুলো এখন আর ক্ষমতার দম্ভের সাক্ষী নয় — তারা হয়ে উঠেছে সাহস, ত্যাগ এবং মানুষের অপরাজেয় স্পিরিটের প্রতীক।
Leave a Comment