ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা, অবিরাম যানজট আর ইট-কংক্রিটের শহর থেকে কিছুক্ষণের জন্য পালিয়ে যেতে কার না ইচ্ছে করে? শহুরে ক্লান্তি কাটিয়ে একটু নিঃশ্বাস নিতে চাইলে নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল এলাকার বাগদীতে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ন্যাচার স্টাডি পার্ক (Bangladesh Nature Study Park) হতে পারে আদর্শ ঠিকানা। প্রায় ৬০ বিঘা, অর্থাৎ ৮০ হাজার বর্গমিটারের বেশি জমি জুড়ে বিস্তৃত এই পার্কটি মূলত একটি পরিবেশবান্ধব ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র। গেট পেরোলেই চোখে পড়ে ঘন গাছপালা, রঙিন ফুলের বাগান, বিশাল এক লেক আর শান্ত পরিবেশ, যা মনকে সহজেই প্রশান্ত করে তোলে।
ঢাকা থেকে পার্কের দূরত্ব প্রায় ৪৫ কিলোমিটার, আর গাজীপুর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার। এই কাছাকাছি অবস্থানের কারণে একদিনের ভ্রমণের জন্য এটি পরিবার, বন্ধুদের দল, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী কিংবা কর্পোরেট টিমের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
ঢাকা থেকে ট্রেন কিংবা বাস, দুই উপায়েই ঘোড়াশালে যাওয়া যায়। নিজের সুবিধামতো যেকোনো পথ বেছে নিতে পারেন:
চালককে পার্কের ঠিকানা বলতে হবে: ময়েজউদ্দিন রোড, বাগদী, ঘোড়াশাল, পলাশ, নরসিংদী।
পার্কের ভেতরে পা রাখতেই সবার আগে মন কাড়ে চারদিকের সবুজ। বড় বড় গাছের ছায়ায় ঢাকা হাঁটার পথ, খোলা মাঠ, নানা রঙের ফুলের বাগান আর জায়গায় জায়গায় জলের ফোয়ারা মিলিয়ে পুরো পরিবেশটি যেন একটি ছবির মতো। ইট-কংক্রিটের শহরে যেখানে একটুখানি সবুজও খুঁজে পাওয়া কঠিন, সেখানে এমন বিস্তীর্ণ প্রান্তর চোখে স্বস্তি এনে দেয়। নানা প্রজাতির গাছপালা ও পাখির দেখা মেলে বলে জানা যায়, তাই পাখি-প্রেমী ও প্রকৃতি-প্রেমীদের জন্যও এটি বেশ উপযোগী। ক্যামেরা হাতে ধীরে ধীরে হাঁটলে প্রতিটি কোণেই যেন নতুন একটি ফ্রেম ধরা দেয়।
এই পার্কের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে এর বিশাল প্রাকৃতিক লেক। লেকের ওপর তৈরি ভাসমান সেতু (ফ্লোটিং ব্রিজ) দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে। পানির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সেতু পার হয়ে লেকের মাঝখানে থাকা একটি ছোট দ্বীপে পৌঁছানো যায়। দুপাশে জলের বিস্তার আর দূরে সবুজ গাছের সারি, সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা কমই মেলে। সকালের নরম রোদ কিংবা বিকেলের সোনালি আলোয় দৃশ্যটি আরও সুন্দর হয়ে ওঠে।
যাঁরা জলে সময় কাটাতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য আছে প্যাডেল বোট ও কায়াকিংয়ের সুযোগ। ৩০ মিনিটের প্যাডেল বোট ভাড়া প্রায় ৫০ টাকা বলে জানা গেছে। শিশুদের নিয়ে বোটে উঠলে অভিভাবকদের বাড়তি সতর্ক থাকা জরুরি। লেকে মাছ ধরার ব্যবস্থা থাকার কথাও উল্লেখ আছে, তাই এ বিষয়ে আগে থেকে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে নেওয়া ভালো।
পুরো পার্কটি একসঙ্গে দেখতে চাইলে উঠে পড়ুন পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে। উঁচু থেকে তাকালে লেক, দ্বীপ আর চারপাশের সবুজ গাছপালার বিস্তৃত দৃশ্য চোখের সামনে খুলে যায়। ফটোগ্রাফার ও পাখি-প্রেমীদের জন্য এটি বিশেষ আকর্ষণ।
উদ্ভিদ-প্রেমীদের মন ভরাবে অর্কিড হাউস ও ক্যাকটাসের সংগ্রহ। নানা প্রজাতির ক্যাকটাস, অর্কিড ও ইনডোর গাছের সমাহার এই অংশটিকে আলাদা করে তোলে। কিছু তথ্যমতে এখান থেকে ইনডোর গাছের চারাও কেনা যায়, যা ঘরে ফেরার সময় স্মৃতি হিসেবে সঙ্গে নিতে পারেন।
শিশুদের নিয়ে গেলে কিডস জোনই হবে তাদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। স্লাইড, স্প্রিং হর্সসহ নানা রকম রাইডে সাজানো এই খোলা খেলার জায়গায় শিশুরা ইচ্ছেমতো ছুটোছুটি করতে পারে। সবচেয়ে সুবিধার দিক হলো, এখানকার বেশিরভাগ রাইডই প্রবেশ টিকিটের সঙ্গে বিনা খরচে উপভোগ করা যায়, যা পরিবারগুলোর জন্য বড় স্বস্তি।
এ ছাড়া পার্কে একটি ছোট মিনি চিড়িয়াখানা ও হরিণের ঘর থাকার কথাও জানা যায়। তবে বর্তমানে কোন কোন প্রাণী রয়েছে, তা নিশ্চিত হতে যাওয়ার আগে ফোনে জেনে নেওয়াই ভালো।
যাঁরা শুধু হালকা ঘোরাঘুরি নয়, বরং আরও একটু বেশি সময় প্রকৃতির মাঝে কাটাতে চান, তাঁদের জন্য আছে ইকো-ফ্রেন্ডলি কন্টেইনার কটেজ ও কাঁচের দেয়ালে ঘেরা গ্লাস রুম। কাঁচের ভেতর বসে চারপাশের সবুজ দেখার অনুভূতিই আলাদা। তবে এসব কটেজ মূলত পারিবারিক ও কর্পোরেট গ্রুপ বুকিংয়ের জন্য, দিনের বিশ্রাম ও দলীয় আয়োজনের জন্য উপযোগী। ব্যক্তিগতভাবে রুম ভাড়া পাওয়া যায় না বলে জানা গেছে। তাই কটেজের প্রাপ্যতা, প্যাকেজ ও খরচ সম্পর্কে পরিকল্পনার আগে সরাসরি পার্ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
পার্কের খরচের একটি মোটামুটি হিসাব:
পার্কটি সপ্তাহের সাত দিনই খোলা থাকে। সাধারণত সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে, তবে সর্বশেষ প্রবেশের সময় সন্ধ্যা ৬টা। পুরো দিনটা উপভোগ করতে চাইলে সকাল সকাল পৌঁছে যাওয়াই ভালো। কিছু তথ্যে খোলার সময় সামান্য ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাই রওনা দেওয়ার আগে একবার যাচাই করে নেওয়া উত্তম।
দিনের ভ্রমণ, কটেজ বুকিং, পিকনিক কিংবা কর্পোরেট ইভেন্টের আয়োজন করতে চাইলে আগে থেকে পার্ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন:
পার্কের ভেতরেই রয়েছে লোটাস ক্যাফে অ্যান্ড কিচেন, যা একটি কন্টেইনার-ভিত্তিক রেস্টুরেন্ট। নাশতা, খাবার আর কফি-চা, ক্লান্ত দুপুরে বা ঘোরাঘুরির বিরতিতে এখানে বসে বিশ্রাম নেওয়া যায়। তবে একটি নিয়ম আগে থেকেই মাথায় রাখতে হবে: পার্কের ভেতরে বাইরের খাবার নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ। পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে এই নিয়ম কঠোরভাবে প্রযোজ্য, তাই খাবারের পরিকল্পনা আগে থেকে ঠিক করে নেওয়া উচিত।
অক্টোবরে শরতের শেষে হেমন্তের আমেজ শুরু হয়। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আবহাওয়া সাধারণত সবচেয়ে আরামদায়ক থাকে, তখন হাঁটাহাঁটি আর নৌবিহার উপভোগ করা সহজ হয়। বর্ষাকালে গাছপালা আরও সতেজ ও সবুজ হয়ে ওঠে, তবে বৃষ্টির জন্য প্রস্তুতি রাখতে হবে। যাত্রার আগে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলে ভ্রমণ আরও আনন্দের হবে:
ঢাকার এত কাছে থেকেও বাংলাদেশ ন্যাচার স্টাডি পার্ক যেন এক টুকরো নিরিবিলি সবুজ। লেকের ওপর ভাসমান সেতুর হাঁটা, নৌকায় ভেসে বেড়ানো, শিশুদের হাসিখুশি ছুটোছুটি আর কাঁচের কটেজ থেকে সবুজ দেখার মুহূর্ত, সব মিলিয়ে এটি এমন এক গন্তব্য, যেখানে গেলে শহুরে ক্লান্তি অনেকটাই হালকা হয়ে যায়। পরিবার, বন্ধুদল, শিক্ষার্থী কিংবা অফিসের টিম, যে কেউ একটি পরিকল্পিত ও প্রশান্ত দিন কাটাতে চাইলে এই পার্ক হতে পারে আপনার পরবর্তী গন্তব্য।
Leave a Comment