ওয়েইনিয়া ঝরনা, নংস্টইন, পশ্চিম খাসি পাহাড়, মেঘালয়। ছবি: Gitartha.bordoloi, উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
মেঘালয়ের পশ্চিম খাসি পাহাড় (West Khasi Hills) জেলার সদর দপ্তর নংস্টইন (Nongstoin) শিলং থেকে প্রায় ৯৩ কিলোমিটার পশ্চিমে পাহাড়ঘেরা এক শান্ত শহর। চেরাপুঞ্জি বা ডাউকির ভিড় থেকে দূরে এখানে আছে প্রায় হাজার ফুট উঁচু ওয়েইনিয়া ঝরনা, মেঘালয়ের সবচেয়ে বড় নদী-দ্বীপ নংখনুম, গভীর গিরিখাতে ঝাঁপিয়ে পড়া লাংশিয়াং ঝরনা আর জেলার সর্বোচ্চ চূড়া মাওথাদ্রাইশান। এই গাইডে ভিসা, বাংলাদেশ থেকে যাতায়াত, দর্শনীয় স্থান, কখন যাবেন, কোথায় থাকবেন, কী খাবেন আর ট্যুর প্ল্যানসহ নংস্টইন ভ্রমণের প্রয়োজনীয় সব তথ্য এক জায়গায় পাবেন।
মেঘালয়ের জনপ্রিয় পথগুলো যাঁরা আগেই ঘুরে ফেলেছেন, তাঁদের জন্য নংস্টইন অফবিট গন্তব্য। পর্যটকের ভিড় কম, কিন্তু প্রকৃতি একেবারে বুনো: কিনশি (Kynshi) নদী এখানে দুই ভাগ হয়ে তৈরি করেছে বিশাল নংখনুম দ্বীপ, তার মুখেই গর্জন করে ওয়েইনিয়া ঝরনা। শিলং থেকে নংস্টইন যাওয়ার পথটাও সুন্দর, পাইন বন আর ঢেউ খেলানো পাহাড়ের ভেতর দিয়ে জাতীয় মহাসড়ক ১০৬ চলে গেছে। পথেই পড়ে মাওথাদ্রাইশান চূড়া আর একটু ঘুরে কিল্লাং রক।
| অবস্থান | নংস্টইন, পশ্চিম খাসি পাহাড় জেলা, মেঘালয়, ভারত |
| শিলং থেকে দূরত্ব | প্রায় ৯৩ কিলোমিটার (NH-106), গাড়িতে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা |
| প্রধান আকর্ষণ | ওয়েইনিয়া ঝরনা, নংখনুম নদী-দ্বীপ, লাংশিয়াং ঝরনা, মাওথাদ্রাইশান চূড়া, কিল্লাং রক |
| নিকটতম বিমানবন্দর | গুয়াহাটি (প্রায় ১৫৩ কিলোমিটার) ও শিলং (উমরোই) |
| বাংলাদেশ থেকে প্রবেশপথ | তামাবিল–ডাউকি স্থলবন্দর |
| সেরা সময় | অক্টোবর থেকে এপ্রিল; ঝরনার পূর্ণ রূপ দেখতে বর্ষার শেষ দিক |
প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর ২৮ জুন ২০২৬ থেকে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের টুরিস্ট ভিসার আবেদন আবার চালু হয়েছে। আবেদন জমা দেওয়া যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনার ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে (IVAC)। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে অনলাইন আবেদন শেষ করলে সিস্টেম নিজেই অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় দিয়ে দেয়, নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে হয়।
সড়কপথে মেঘালয় যেতে চাইলে আবেদনের সময় প্রবেশপথ হিসেবে ডাউকি (Dawki, সড়কপথ) উল্লেখ করুন, যাতে ভিসায় বন্দরটি লেখা থাকে। ভিসায় তামাবিল–ডাউকি বন্দর লেখা না থাকলে ওই পথে ভারতে ঢুকতে সমস্যা হতে পারে। মেঘালয় ভ্রমণে বিদেশিদের জন্য আলাদা কোনো পারমিট লাগে না। ভিসার সর্বশেষ নিয়ম আর ফি জানতে আবেদনের আগে IVAC-এর ওয়েবসাইট দেখে নিন।
ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন বা বিমানে প্রথমে সিলেট যান। সিলেট শহর থেকে তামাবিল স্থলবন্দর প্রায় ৫৫ কিলোমিটার, গাড়ি বা বাসে যাওয়া যায়। তামাবিলে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন ও ভ্রমণ কর পরিশোধ শেষে হেঁটে ভারতের ডাউকি অংশে গিয়ে ভারতীয় ইমিগ্রেশন সারতে হয়। বন্দর দিনের বেলায় খোলা থাকে, তাই সকাল সকাল পৌঁছানো ভালো। ডাউকি থেকে শিলং প্রায় ৮৪ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ, শেয়ার্ড বা রিজার্ভ ট্যাক্সিতে যেতে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে। সীমান্ত পেরিয়ে একই দিনে নংস্টইন পৌঁছানো কঠিন, তাই প্রথম রাতটা শিলংয়ে থাকাই ভালো।
রিজার্ভ ক্যাব: শিলং থেকে জাতীয় মহাসড়ক ১০৬ ধরে মাইরাং হয়ে নংস্টইন প্রায় ৯৩ কিলোমিটার, গাড়িতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে। আশপাশের ঝরনা আর দ্বীপ ঘুরতে চাইলে পুরো দিনের জন্য গাড়ি ভাড়া করাই সুবিধাজনক, কারণ নংস্টইনের পর রাস্তাগুলো সরু আর গণপরিবহন প্রায় নেই।
শেয়ার্ড সুমো: খরচ কমাতে চাইলে শিলং থেকে নংস্টইনগামী শেয়ার্ড সুমো বা ট্যাক্সিতে যেতে পারেন, প্রতিদিন চলে। সকাল সকাল রওনা দিন, কারণ বিকেলের পর গাড়ি কমে যায়। নংস্টইন পৌঁছে আশপাশের জায়গা ঘুরতে স্থানীয় গাড়ি ভাড়া করতে হবে।
বাংলাদেশিদের জন্য সেরা সময়: অক্টোবর থেকে নভেম্বর — ঝরনায় তখনো পানি থাকে, আবার রাস্তা শুকনো আর আকাশ পরিষ্কার।
নংস্টইন থেকে নংখনুম রোড ধরে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে কিনশি নদীর ওপর প্রায় হাজার ফুট উঁচু থেকে নেমে আসা এই ঝরনা নংস্টইনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। মেঘালয় পর্যটন বিভাগের মতে বর্ষা ও তার পরের মাসগুলোতে এর গর্জন অনেক দূর থেকে শোনা যায়। পেছনে দুই-খিলানের সেতু আর ঝরনার পাশে দর্শনার্থীদের জন্য তৈরি পথ ও দেখার প্ল্যাটফর্ম আছে।
নংস্টইন থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে কিনশি নদী ফানলিয়াং ও নামলিয়াং নামে দুই ধারায় ভাগ হয়ে প্রায় ২০–২৫ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপ তৈরি করেছে, যা মেঘালয়ের সবচেয়ে বড় নদী-দ্বীপ। নদী ভাগ হওয়ার মুখে বালুর চর, ঘাসের মাঠ আর ঝুলন্ত সেতু আছে; নৌকা ভ্রমণ, মাছ ধরা আর ক্যাম্পিং করা যায়। শেষের রাস্তা পাথুরে ও ভাঙাচোরা, তাই অল্প দূরত্বেও প্রায় এক ঘণ্টা লাগতে পারে।
নংস্টইন থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে সাংরিয়াং গ্রামের কাছে কিনশি নদীর দুই ধারা আবার মিলে গভীর গিরিখাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। একে মেঘালয়ের অন্যতম উঁচু ঝরনা বলা হয়, তবে উচ্চতা নিয়ে সূত্রগুলো একমত নয়। মাওপোন গ্রামের দিক থেকে সবচেয়ে ভালো দেখা যায়; গিরিখাতে নামার পথ খাড়া ও পিচ্ছিল, তাই স্থানীয় গাইড নিন।
প্রায় ১,৯২৪ মিটার উঁচু এই চূড়া পূর্ব-পশ্চিম খাসি পাহাড়ের সর্বোচ্চ বিন্দু, অবস্থান মাইরাং ও নংস্টইনের প্রায় মাঝামাঝি, শিলং–নংস্টইন সড়কের পাশে। চূড়ায় উঠলে চারপাশের পাহাড়সারি আর উপত্যকার বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়, সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময় বিশেষ সুন্দর।
মাইরাং থেকে প্রায় ১০–১২ কিলোমিটার দূরে লাল গ্রানাইটের বিশাল গম্বুজাকৃতি পাথর, চূড়ার উচ্চতা প্রায় ১,৭৭৪ মিটার। গাড়ি পাথরের গোড়া পর্যন্ত যায়, তারপর অল্প চড়াই বেয়ে চূড়ায় উঠতে হয়। খাসি লোককথায় কিল্লাংকে এক মেজাজি দেবতা হিসেবে কল্পনা করা হয়। শিলং থেকে নংস্টইন যাওয়া-আসার পথে মাইরাং হয়ে ঘুরে নেওয়া যায়।
নংস্টইনের আশপাশের এই ভিউপয়েন্ট থেকে গভীর গিরিখাত, নদী আর স্তরে স্তরে সাজানো পাহাড় দেখা যায়। বর্ষায় কুয়াশা জমে দৃশ্যটা আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। পথ আর অবস্থান নিয়ে স্থানীয় চালকের সাথে আগে কথা বলে নিন।
ঝরনা আর দ্বীপ ধীরেসুস্থে দেখতে চাইলে নংস্টইনেই থাকুন। জেলা সদর হলেও এখানে থাকার বিকল্প সীমিত, মূলত সাধারণ মানের হোটেল, গেস্টহাউস আর সরকারি পর্যটন আবাস। ভিড়ের মৌসুমে আগে থেকে বুক করে নিন।
যাঁরা একদিনে ঘুরে আসতে চান তাঁরা শিলংয়ে থাকতে পারেন। শহরে সব বাজেটের হোটেল, গেস্টহাউস আর হোমস্টে আছে, গাড়ি ঠিক করাও সহজ। তবে নংখনুম আর লাংশিয়াং একসাথে দেখতে চাইলে একদিনে ফেরা কষ্টকর।
দ্বীপে কোনো স্থায়ী বসতি বা হোটেল নেই। অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করলে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় নদীর ধারে তাঁবুতে রাত কাটানো যায়; নিজের সরঞ্জাম নিন বা নংস্টইন থেকে স্থানীয়দের সাথে ব্যবস্থা করুন। ভাড়া মৌসুম ও মানভেদে বদলায়; হোটেলে চেক-ইনের সময় পাসপোর্ট ও ভিসার কপি লাগবে।
খাসি রান্নায় শূকরের মাংস বেশি ব্যবহৃত হয়, তাই হালাল খাবার চাইলে আগে জিজ্ঞেস করে নিন; নংস্টইনে অল্টারনেটিভ খুম কম, তাই শিলংয়ের পুলিশবাজার থেকে শুকনো খাবার সাথে নিতে পারেন। ঝরনা ও দ্বীপের দিকে দোকান প্রায় নেই, পানি আর নাস্তা সাথে রাখুন।
সময় দরকার: 2 days
শিলং থেকে দুই দিনে নংস্টইন ও আশপাশের ঝরনা, দ্বীপ আর পাহাড় ঘুরে দেখতে এই প্ল্যানটি অনুসরণ করতে পারেন।
শিলং থেকে রওনা
সকাল ৭টার মধ্যে নাস্তা সেরে রিজার্ভ গাড়িতে NH-106 ধরে নংস্টইনের দিকে রওনা দিন।
কিল্লাং রক ও মাওথাদ্রাইশান
মাইরাং হয়ে কিল্লাং রকে উঠুন, তারপর পথে মাওথাদ্রাইশান চূড়ার ভিউ দেখে দুপুরে নংস্টইন পৌঁছান।
নংস্টইনে চেক-ইন
হোটেলে উঠে বিশ্রাম নিন, শহরের বাজার ঘুরুন আর পরদিনের গাড়ি ও গাইড ঠিক করুন।
ওয়েইনিয়া ঝরনা ও নংখনুম দ্বীপ
খুব সকালে বেরিয়ে ওয়েইনিয়া ঝরনা দেখুন, তারপর সেতু পার হয়ে নংখনুম দ্বীপের বালুচরে সময় কাটান।
লাংশিয়াং ঝরনা
সাংরিয়াং হয়ে মাওপোনের দিক থেকে লাংশিয়াং ঝরনা দেখুন; গিরিখাতে নামতে চাইলে স্থানীয় গাইড নিন।
শিলং ফেরা
অন্ধকার নামার আগে পাহাড়ি পথ পেরোতে বিকেলের শুরুতেই শিলংয়ের পথে রওনা দিন।
শিলংয়ের কাছে আরেকটি দিন হাতে থাকলে হাঁটতে পারেন ডেভিড স্কট ট্রেইল। মেঘালয়ের অন্যান্য জায়গা মিলিয়ে পুরো ভ্রমণ সাজাতে পড়ুন: [মেঘালয় ট্যুর প্ল্যান এবং খরচপাতি]
জাতীয় মহাসড়ক ১০৬ ধরে প্রায় ৯৩ কিলোমিটার, গাড়িতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে।
সিলেট হয়ে তামাবিল–ডাউকি স্থলবন্দর দিয়ে শিলং, সেখান থেকে রিজার্ভ গাড়ি বা শেয়ার্ড সুমোতে নংস্টইন। ভিসায় ডাউকি বন্দর উল্লেখ থাকতে হবে।
ওয়েইনিয়া ঝরনা, নংখনুম নদী-দ্বীপ, লাংশিয়াং ঝরনা, মাওথাদ্রাইশান চূড়া আর কিল্লাং রক।
মেঘালয় পর্যটন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী নংখনুম রোড ধরে প্রায় ১৭ কিলোমিটার।
শিলং থেকে একদিনে ওয়েইনিয়া ঝরনা ও নংখনুম দ্বীপ দেখে ফেরা সম্ভব, তবে খুব তাড়াহুড়ো হয়। লাংশিয়াং ও কিল্লাং রকসহ দেখতে অন্তত এক রাত নংস্টইনে থাকুন।
অক্টোবর থেকে এপ্রিল। ঝরনার পূর্ণ রূপ দেখতে অক্টোবর-নভেম্বর সবচেয়ে ভালো; বর্ষায় রাস্তা খারাপ ও পিচ্ছিল থাকে।
Leave a Comment