লাহোরের বাদশাহী মসজিদ। ছবি: Fassifarooq, উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাজধানী লাহোর (Lahore) দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত। রাভি নদীর তীরের এই প্রাচীন শহরে মুঘল আমলের জাঁকালো স্থাপত্য, প্রাচীরঘেরা পুরান শহরের সরু গলি, সুফি দরগাহ আর জগদ্বিখ্যাত খাবার একসাথে মিলেছে। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত লাহোর দুর্গ ও শালিমার বাগান, বিশাল বাদশাহী মসজিদ, ওয়াজির খান মসজিদের রঙিন টালির কাজ কিংবা ওয়াঘা সীমান্তের পতাকা নামানোর অনুষ্ঠান — সব মিলিয়ে লাহোর ইতিহাসপ্রেমী ও খাদ্যরসিক দুই ধরনের ভ্রমণকারীর জন্যই আদর্শ। এই গাইডে ভিসা, যাতায়াত, দর্শনীয় স্থান, থাকা-খাওয়া থেকে শুরু করে ৩ দিনের ট্যুর প্ল্যান পর্যন্ত লাহোর ভ্রমণের প্রয়োজনীয় সব তথ্য এক জায়গায় পাবেন।
লাহোরকে নিয়ে পাকিস্তানে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে — “যে লাহোর দেখেনি, সে জন্মায়ইনি।” মুঘল সম্রাট আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান ও আওরঙ্গজেবের হাতে গড়ে ওঠা এই শহরের প্রতিটি কোণে ইতিহাস কথা বলে। ঢাকার পুরান শহরের মতোই লাহোরের ওয়ালড সিটির গলিতে হাঁটলে মনে হয় সময় থমকে আছে। ভাষা ও খাবারে আলাদা হলেও আতিথেয়তা, মসজিদ-দরগাহের পরিবেশ আর বাজারের কোলাহল বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের কাছে অনেকটাই চেনা লাগবে। যারা পাহাড়ের বদলে ইতিহাস, স্থাপত্য আর খাবারের টানে ঘুরতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য লাহোর পাকিস্তানের সেরা গন্তব্য। চাইলে লাহোর ঘুরে উত্তরের হুনজা ভ্যালি বা স্কার্দুর দিকেও যাত্রা করা যায়।
বাংলাদেশি নাগরিকরা পাকিস্তান সরকারের অফিসিয়াল অনলাইন পোর্টাল visa.nadra.gov.pk থেকে ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন করতে পারেন। পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী অনলাইন ট্যুরিস্ট ভিসা প্রসেস হতে সাধারণত ৭–১০ কর্মদিবস লাগে, তাই ফ্লাইটের অন্তত এক মাস আগে আবেদন করা ভালো। ভিসা ফি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ঘোষণা এসেছে, তাই আবেদনের সময় পোর্টালে দেখানো ফি-টাই চূড়ান্ত ধরে নিন।
পাকিস্তানের ই-ভিসা প্রক্রিয়া, কারেন্সি, সিম কার্ড এবং সাধারণ ভ্রমণ টিপস নিয়ে আমাদের বিস্তারিত গাইড পড়ুন: [পাকিস্তান ট্রাভেল গাইড — বাংলাদেশিদের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি]
প্রায় ১৪ বছর পর ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু করেছে। ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই রুটে সপ্তাহে দুটি ফ্লাইট (বৃহস্পতি ও শনিবার) চলছে এবং যাত্রায় প্রায় ৪ ঘণ্টা লাগে। তবে ঢাকা থেকে লাহোরে এখনো কোনো সরাসরি ফ্লাইট নেই। করাচি পৌঁছে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে লাহোরের আল্লামা ইকবাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাওয়া যায়, অথবা পাকিস্তান রেলওয়ের দূরপাল্লার ট্রেনে করাচি থেকে লাহোর যাওয়া যায় — তবে ট্রেনযাত্রা বেশ দীর্ঘ।
দুবাই, দোহা, শারজাহ, জেদ্দা বা আবুধাবি হয়ে বিভিন্ন এয়ারলাইনের কানেক্টিং ফ্লাইটে সরাসরি লাহোরে নামা যায়। এতে করাচিতে আলাদা অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট লাগে না, তবে ট্রানজিটসহ মোট সময় বেশি লাগতে পারে। ভাড়া মৌসুম ও বুকিংয়ের সময়ভেদে অনেক ওঠানামা করে, তাই কয়েকটি রুট তুলনা করে অন্তত ৪–৬ সপ্তাহ আগে টিকিট কাটুন।
বাংলাদেশিদের জন্য সেরা সময়: অক্টোবর অথবা ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মার্চ — আবহাওয়া আরামদায়ক এবং ধোঁয়াশার ঝামেলা কম।
১৬৭৩ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে নির্মিত লাল বেলেপাথরের এই মসজিদ লাহোরের প্রতীক। বিশাল উঠান, সাদা মার্বেলের তিনটি গম্বুজ আর চার কোণের উঁচু মিনার মিলিয়ে এটি উপমহাদেশের অন্যতম বড় মসজিদ। প্রবেশে টিকিট লাগে না; জুতা খুলে ঢুকতে হয় এবং নারীদের মাথা ঢেকে রাখতে হয়। সূর্যাস্তের সময় মসজিদের দৃশ্য সবচেয়ে সুন্দর।
বাদশাহী মসজিদের ঠিক উল্টো পাশে, হাজুরি বাগের ওপারে এই দুর্গ। মুঘল সম্রাটদের হাতে বারবার সম্প্রসারিত দুর্গের ভেতরে শিশ মহল (আয়নার প্রাসাদ), দিওয়ান-ই-আম, নওলাখা প্যাভিলিয়ন আর বিখ্যাত পিকচার ওয়াল দেখার মতো। শালিমার বাগানের সাথে এটি ১৯৮১ সাল থেকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য। ওয়ালড সিটি অব লাহোর অথরিটির (WCLA) ওয়েবসাইট অনুযায়ী বিদেশিদের টিকিট PKR ১,০০০; দুর্গ খোলা থাকে সকাল ৮টা থেকে সূর্যাস্তের আধা ঘণ্টা আগ পর্যন্ত। ভালোভাবে দেখতে অন্তত ২–৩ ঘণ্টা রাখুন।
সম্রাট শাহজাহানের আমলে ১৬৩০-এর দশকে নির্মিত এই মসজিদ তার রঙিন টালি (কাশি-কারি) ও ফ্রেস্কোর কাজের জন্য বিখ্যাত। পুরান শহরের দিল্লি গেটের কাছে অবস্থিত মসজিদটিকে অনেকেই লাহোরের সবচেয়ে সুন্দর মসজিদ বলেন। পাশের শাহি হাম্মামও (মুঘল আমলের গোসলখানা) ঘুরে দেখতে পারেন।
একসময় প্রাচীর ও ১৩টি ফটকে ঘেরা পুরান লাহোরের ভেতরে আছে সরু গলি, পুরনো হাভেলি, মসলার বাজার আর অসংখ্য খাবারের দোকান। দিল্লি গেট থেকে শাহি গুজারগাহ ধরে হেঁটে ওয়াজির খান মসজিদ হয়ে দুর্গ পর্যন্ত যাওয়া জনপ্রিয় রুট। WCLA পরিচালিত গাইডেড ট্যুরেও পুরান শহর ঘোরা যায়।
১৬৪১–৪২ সালে সম্রাট শাহজাহান এই মুঘল বাগান তৈরি করেন। তিন ধাপে সাজানো বাগানে শত শত ফোয়ারা, জলাধার আর মার্বেলের প্যাভিলিয়ন আছে। শহরের কেন্দ্র থেকে কিছুটা পূর্বে, গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের পাশে অবস্থিত।
১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ যে মাঠে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল, সেই ইকবাল পার্কে (সাবেক মিন্টো পার্ক) এই স্মৃতিস্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে। বাদশাহী মসজিদ থেকে হাঁটা দূরত্বে; সন্ধ্যায় আলোকসজ্জায় সুন্দর দেখায়।
লাহোর শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্বে পাকিস্তান–ভারত সীমান্তে প্রতিদিন সূর্যাস্তের আগে পতাকা নামানোর অনুষ্ঠান হয়। শীতকালে সাধারণত বিকেল ৪টা–সাড়ে ৪টায় এবং গ্রীষ্মে ৫টা–সাড়ে ৫টার দিকে শুরু হয়ে প্রায় ৪৫ মিনিট চলে। প্রবেশ ফ্রি; বিদেশিদের মূল পাসপোর্ট সাথে নিতে হয় এবং আলাদা বিদেশি গ্যালারিতে বসার ব্যবস্থা থাকে। ছুটির দিনে ১.৫–২ ঘণ্টা আগে পৌঁছান। সময় মাঝে মাঝে বদলায়, তাই আগের দিন হোটেল থেকে জেনে নিন।
একাদশ শতকের সুফি সাধক আলি হুজভেরি (দাতা গঞ্জ বখশ)-এর মাজার, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় ও জনপ্রিয় দরগাহ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এখানে বিশেষ ভিড় হয়। ভেতরে নিরাপত্তা তল্লাশি হয়; ব্যাগ কম রাখুন।
মল রোডে অবস্থিত লাহোর মিউজিয়ামে গান্ধার যুগের বিখ্যাত “উপবাসী বুদ্ধ” মূর্তিসহ মুঘল ও শিখ আমলের নানা নিদর্শন আছে। মিউজিয়ামের সামনেই ঐতিহাসিক জমজমা কামান। কাছেই উপমহাদেশের প্রাচীনতম বাজারগুলোর একটি আনারকলি বাজার — পোশাক, জুতা আর স্ট্রিট ফুডের জন্য জনপ্রিয়।
রাভি নদীর ওপারে শাহদারা বাগে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সমাধি। মার্বেল ও পিয়েত্রা দুরা কারুকাজ এবং চার কোণের মিনার মিলিয়ে এটি মুঘল সমাধি-স্থাপত্যের সুন্দর নিদর্শন। কাছেই নূরজাহানের সমাধিও আছে।
শহরের ভেতরে চলাচলের জন্য Careem, Uber, inDrive-এর মতো রাইড অ্যাপ সবচেয়ে সুবিধাজনক — ভাড়া আগেই দেখা যায় এবং দরদামের ঝামেলা থাকে না। এছাড়া লাহোর মেট্রোবাস ও অরেঞ্জ লাইন মেট্রো ট্রেন শহরের প্রধান সড়কগুলো কভার করে। অটোরিকশা ও চিংচি (মোটরসাইকেল রিকশা) সহজলভ্য, তবে ওঠার আগে ভাড়া ঠিক করে নিন। ওয়ালড সিটির ভেতরে হেঁটে ঘোরাই সবচেয়ে উপভোগ্য।
শহরের আধুনিক ও ব্যস্ত এলাকা। ভালো মানের হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও শপিং মল এখানে বেশি। প্রথমবার যাওয়া পর্যটক ও পরিবারের জন্য সুবিধাজনক।
লাহোর মিউজিয়াম, আনারকলি ও পুরান শহরের কাছাকাছি থাকতে চাইলে মল রোড এলাকা ভালো। এখানে পুরনো ঐতিহ্যবাহী থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক চেইনের হোটেল আছে।
বাদশাহী মসজিদ ও ফোর্ট রোড ফুড স্ট্রিটের কাছে কিছু বুটিক হোটেল ও গেস্টহাউস আছে, যেখান থেকে হেঁটেই পুরান শহর ঘোরা যায়। বাজেট ভ্রমণকারীদের জন্য উপযুক্ত, তবে সুবিধা তুলনামূলক কম।
হোটেলের ভাড়া মৌসুম ও মানভেদে অনেক বদলায়, তাই Booking.com বা Agoda-র মতো সাইটে রিভিউ দেখে আগে থেকে বুক করুন। বিদেশি অতিথি হিসেবে চেক-ইনের সময় পাসপোর্ট ও ভিসার কপি লাগবে।
খাওয়ার জন্য বাদশাহী মসজিদের পাশের ফোর্ট রোড ফুড স্ট্রিট সবচেয়ে জনপ্রিয় — এখানকার অনেক রেস্তোরাঁর ছাদ থেকে আলোকিত মসজিদ দেখা যায়। এছাড়া গোয়ালমান্ডি, লক্ষ্মী চক ও এম এম আলম রোডেও প্রচুর খাবারের দোকান আছে।
৩ দিনের সম্ভাব্য লাহোর ট্যুর প্ল্যান
সকালে লাহোর দুর্গ ও বাদশাহী মসজিদ, পাশে মিনার-ই-পাকিস্তান ও ইকবাল পার্ক। সন্ধ্যায় ফোর্ট রোড ফুড স্ট্রিটে রাতের খাবার।
সকালে দিল্লি গেট দিয়ে ওয়ালড সিটিতে ঢুকে ওয়াজির খান মসজিদ ও শাহি হাম্মাম। দুপুরে দাতা দরবার, বিকেলে ওয়াঘা সীমান্তের পতাকা নামানোর অনুষ্ঠান।
সকালে শালিমার বাগান, দুপুরে লাহোর মিউজিয়াম ও জমজমা কামান, বিকেলে আনারকলি বাজারে কেনাকাটা। সময় থাকলে শাহদারায় জাহাঙ্গীরের সমাধি।
না। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে বিমান বাংলাদেশ ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালাচ্ছে (সপ্তাহে দুটি)। করাচি থেকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বা ট্রেনে লাহোর যেতে হয়, অথবা দুবাই-দোহার মতো ট্রানজিট রুটে সরাসরি লাহোরে নামা যায়।
পাকিস্তান সরকারের অফিসিয়াল পোর্টাল visa.nadra.gov.pk-এ অনলাইনে ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন করা যায়। প্রসেসিংয়ে সাধারণত ৭–১০ কর্মদিবস লাগে; ফি আবেদনের সময় পোর্টালে দেখে নিন।
প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে ন্যূনতম ৩ দিন দরকার। খাবার ও পুরান শহর আরাম করে উপভোগ করতে চাইলে ৪–৫ দিন রাখুন।
ওয়ালড সিটি অব লাহোর অথরিটির ওয়েবসাইট অনুযায়ী বিদেশিদের জন্য PKR ১,০০০। সকাল ৮টা থেকে সূর্যাস্তের আধা ঘণ্টা আগ পর্যন্ত খোলা থাকে। বাদশাহী মসজিদে প্রবেশ ফ্রি।
প্রবেশ ফ্রি, তবে বিদেশিদের মূল পাসপোর্ট সাথে নিতে হয়। শীতকালে বিকেল ৪টা–সাড়ে ৪টা, গ্রীষ্মে ৫টা–সাড়ে ৫টার দিকে শুরু হয়; ১–২ ঘণ্টা আগে পৌঁছানো ভালো।
অক্টোবর এবং ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মার্চ। গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরম আর নভেম্বর–জানুয়ারিতে ধোঁয়াশা থাকতে পারে।
নিহারি, পায়া, হালুয়া-পুরি, লাহোরি চারগা, কড়াই, সিখ কাবাব ও মালাই লস্যি। ফোর্ট রোড ফুড স্ট্রিট ও গোয়ালমান্ডি খাবারের জন্য বিখ্যাত।
Leave a Comment