ডেভিড স্কট ট্রেইল, পূর্ব খাসি পাহাড়, মেঘালয়। ছবি: Wann Majaw, উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
মেঘালয়ের পূর্ব খাসি পাহাড় জেলায় মাওফ্লাং (Mawphlang) থেকে লাড মাওফ্লাং (Lad Mawphlang) পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার লম্বা ডেভিড স্কট ট্রেইল (David Scott Trail) উত্তর-পূর্ব ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঐতিহাসিক ট্রেকিং পথগুলোর একটি। ব্রিটিশ আমলে আসামের সমতল থেকে সিলেট পর্যন্ত চলাচলের জন্য তৈরি পুরোনো ঘোড়ার পথের এই অংশটি এখন পাইন বন, ঘাসে ঢাকা উপত্যকা, পাহাড়ি নদী, ঝুলন্ত সেতু আর ছোট খাসি গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে গেছে। এই গাইডে ভিসা, বাংলাদেশ থেকে যাতায়াত, ট্রেইলের প্রতিটি অংশ, কখন যাবেন, কোথায় থাকবেন, কী খাবেন আর একদিনের ট্যুর প্ল্যানসহ ডেভিড স্কট ট্রেইল ভ্রমণের প্রয়োজনীয় সব তথ্য এক জায়গায় পাবেন।
একটানা পাহাড়ে চড়ার কষ্ট ছাড়াই মেঘালয়ের গ্রামীণ প্রকৃতি কাছ থেকে দেখার জন্য ডেভিড স্কট ট্রেইল আদর্শ। পথের বেশিরভাগ অংশ পুরোনো পাথর বিছানো রাস্তা, মাঝে মাঝে নামা-ওঠা আছে। একদিনেই পুরো পথ হাঁটা যায়, পথে পড়ে প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো সমাধি, পাথরের আর্চ সেতু, ঝুলন্ত সেতু আর স্বচ্ছ পানির পাহাড়ি নদী। শিলং থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে হওয়ায় মেঘালয় ভ্রমণের সাথে সহজেই একটা দিন এর জন্য রাখা যায়।
| অবস্থান | মাওফ্লাং–লাড মাওফ্লাং, পূর্ব খাসি পাহাড়, মেঘালয় |
| দৈর্ঘ্য | প্রায় ১৬ কিলোমিটার (একমুখী) |
| সময় | সাধারণত ৪–৬ ঘণ্টা |
| কাঠিন্য | সহজ থেকে মাঝারি |
| উচ্চতা | প্রায় ১,৫৩৬–১,৮২৯ মিটার |
| শিলং থেকে দূরত্ব | মাওফ্লাং প্রায় ২৫ কিলোমিটার |
| সেরা সময় | অক্টোবর থেকে এপ্রিল |
প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর ২৮ জুন ২০২৬ থেকে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের টুরিস্ট ভিসার আবেদন আবার চালু হয়েছে। আবেদন জমা দেওয়া যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনার ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে (IVAC)। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে অনলাইন আবেদন শেষ করলে সিস্টেম নিজেই অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় দিয়ে দেয়, নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে হয়।
সড়কপথে মেঘালয় যেতে চাইলে আবেদনের সময় প্রবেশপথ হিসেবে ডাউকি (Dawki, সড়কপথ) উল্লেখ করুন, যাতে ভিসায় বন্দরটি লেখা থাকে। ভিসায় তামাবিল–ডাউকি বন্দর লেখা না থাকলে ওই পথে ভারতে ঢুকতে সমস্যা হতে পারে। মেঘালয় ভ্রমণে বিদেশিদের জন্য আলাদা কোনো পারমিট লাগে না। ভিসার সর্বশেষ নিয়ম আর ফি জানতে আবেদনের আগে IVAC-এর ওয়েবসাইট দেখে নিন।
মেঘালয়ের অন্যান্য জায়গা মিলিয়ে পুরো ভ্রমণ সাজাতে পড়ুন: [মেঘালয় ট্যুর প্ল্যান এবং খরচপাতি]
ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন বা বিমানে প্রথমে সিলেট যান। সিলেট শহর থেকে তামাবিল স্থলবন্দর প্রায় ৫৫ কিলোমিটার, গাড়ি বা বাসে যাওয়া যায়। তামাবিলে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন ও ভ্রমণ কর পরিশোধ শেষে হেঁটে ভারতের ডাউকি অংশে গিয়ে ভারতীয় ইমিগ্রেশন সারতে হয়। বন্দর দিনের বেলায় খোলা থাকে, তাই সকাল সকাল পৌঁছানো ভালো। ডাউকি থেকে শিলং প্রায় ৮৪ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ, শেয়ার্ড বা রিজার্ভ ট্যাক্সিতে যেতে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে।
রিজার্ভ ক্যাব: সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায় হলো শিলং থেকে একটি ট্যাক্সি ভাড়া করা, যা সকালে মাওফ্লাংয়ে নামিয়ে দেবে আর ট্রেক শেষে লাড মাওফ্লাং থেকে তুলে নেবে। ট্রেইলের শুরু আর শেষ আলাদা জায়গায়, তাই আগে থেকেই চালকের সাথে ফেরার সময় ঠিক করে নিন। মাওফ্লাং শিলং থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার, গাড়িতে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা লাগে।
শেয়ার্ড সুমো: খরচ কমাতে চাইলে শিলংয়ের বড়বাজার এলাকা থেকে মাওফ্লাংগামী শেয়ার্ড ট্যাক্সি বা সুমোতে যেতে পারেন। তবে এগুলোর সময়সূচি নির্দিষ্ট নয়, আর বিকেলে লাড মাওফ্লাং থেকে ফেরার গাড়ি পাওয়া অনিশ্চিত হতে পারে।
রিজার্ভ গাড়ি ঠিক করার সময় চালককে পরিষ্কার করে ইংরেজিতে বলে দিন:
Drop at Mawphlang trailhead; pickup at Lad Mawphlang after the David Scott Trail.
বাংলাদেশিদের জন্য সেরা সময়: অক্টোবর থেকে এপ্রিল — শুকনো পথ, ঠান্ডা আবহাওয়া আর পরিষ্কার আকাশে পুরো ট্রেইল নিরাপদে হাঁটা যায়।
ট্রেক শুরু হয় মাওফ্লাং গ্রামের প্রবেশপথে, যেখানে টিকিট কাউন্টার আর ট্রেইলের সাইনবোর্ড আছে। এখানে টিকিট কেটে ও গাইড ঠিক করে হাঁটা শুরু করুন। কাছেই কা কর কা শোনমাই নামের একটি জায়গা আছে।
মাওসাহেপ এলাকায় পথের পাশে কাটা পাথরের বেদির ওপর ১৮৪৩ সালের একটি ছোট্ট স্মৃতিফলক আছে, তাতে “To a Child Fondly Called Camilla” কথাগুলো লেখা। কোনো পারিবারিক নাম বা মৃত্যুর কারণ লেখা নেই। ধারণা করা হয়, এই পথে যাতায়াতের সময় কোনো ইংরেজ পরিবার তাদের শিশুকন্যাকে এখানে সমাহিত করেছিল।
সমাধি পেরিয়ে পথ ধীরে ধীরে পাইন বন আর ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে উপত্যকার দিকে নামতে থাকে। পুরোনো পাথর বিছানো রাস্তা অনেক জায়গায় শ্যাওলায় ঢাকা, তাই বিশেষ করে ভেজা দিনে সাবধানে পা ফেলুন। পথে বিশ্রাম নেওয়ার জায়গাও পাবেন।
ওয়েইদুং এলাকায় নদীর ওপর ঝুলন্ত সেতুটি ট্রেইলের অন্যতম আকর্ষণ, দুই দিকেই চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে আকস্মিক বন্যায় পুরোনো সেতুটি ভেসে যাওয়ার পর নতুন সেতুটি তৈরি করা হয়। নিচের স্বচ্ছ পানির নদীতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারেন।
সেতু পার হয়ে ওয়াহথাম উপত্যকার নিচু অংশ, যা পুরো ট্রেইলের সবচেয়ে নিচু জায়গা। এরপর পথ যায় ছোট্ট খাসি গ্রাম লাইতসোহমার দিকে, যা ট্রেইলের প্রায় মাঝামাঝি। এখানে থেমে দুপুরের খাবার খাওয়া আর গ্রামের জীবন দেখা যায়।
লাইতসোহমা থেকে মালভূমির ওপর দিয়ে প্রায় ৩ কিলোমিটার হেঁটে মাওনগুইডব্রিউ এলাকায় পৌঁছাবেন পুরোনো পাথরের আর্চ সেতুতে। আশপাশে বড় বড় প্রাকৃতিক পাথর, ছোট জলাশয় আর ঝরনা দেখা যায়, ছবি তোলার জন্য এটি চমৎকার জায়গা।
আর্চ সেতু থেকে পথ আরও প্রায় ২ কিলোমিটার নেমে নদীর কাছে যায়, তারপর সিঁড়ি বেয়ে খানিকটা উঠে সোহরা মেইন রোডের লাড মাওফ্লাংয়ে শেষ হয়। এখান থেকে শিলং বা সোহরার গাড়ি ধরতে হয়, তাই আগে থেকে গাড়ি ঠিক করে রাখুন।
ট্রেইলহেডের কাছেই খাসিদের পবিত্র বন মাওফ্লাং সেক্রেড গ্রোভ। মেঘালয় পর্যটন বিভাগের মতে বনটি ৮০০ বছরেরও বেশি পুরোনো, ভেতরে আছে প্রাচীন গাছ, ঔষধি গাছ আর পাথরের মনোলিথ। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী এই বন থেকে কিছুই বাইরে নেওয়া যায় না। গাইডের সাথে ঢুকতে হয়; ট্রেকের আগের দিন বা সকালে এটি ঘুরে নিতে পারেন।
ডেভিড স্কট ছিলেন উত্তর-পূর্ব সীমান্তে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন প্রশাসক। ১৮২০-এর দশকের শেষ দিকে তাঁর উদ্যোগে আসামের সমতল থেকে খাসি পাহাড় পেরিয়ে সিলেট পর্যন্ত একটি পথ তৈরি করা হয়, যাতে সমতলের গরম এড়িয়ে কম দূরত্বে যাতায়াত করা যায়। একসময় প্রায় ১৩০ কিলোমিটার লম্বা এই পথে ঘোড়া ও মালবাহী চলাচল হতো। আজকের ডেভিড স্কট ট্রেইল সেই পুরোনো পথের টিকে থাকা প্রায় ১৬ কিলোমিটার অংশ, যা এখন মেঘালয়ের অন্যতম জনপ্রিয় হাইকিং পথ।
বেশিরভাগ পর্যটক শিলংয়ে থেকে দিনে দিনে ট্রেক করে ফেরেন। শহরে সব বাজেটের হোটেল, গেস্টহাউস আর হোমস্টে পাওয়া যায়, আর ট্রেকের জন্য গাড়ি ঠিক করাও সহজ।
সকাল সকাল ট্রেক শুরু করতে বা সেক্রেড গ্রোভ ধীরেসুস্থে দেখতে চাইলে মাওফ্লাংয়ে থাকা যায়। এখানে থাকার বিকল্প সীমিত, মূলত ছোট হোমস্টে, তাই আগে থেকে বুক করে নিন।
ট্রেক শেষ হয় সোহরা যাওয়ার রাস্তায়, তাই পরদিন চেরাপুঞ্জির ঝরনা ও গুহা দেখার পরিকল্পনা থাকলে ট্রেকের পর সোহরায় গিয়ে থাকতে পারেন। ভাড়া মৌসুম ও মানভেদে বদলায়; চেক-ইনের সময় পাসপোর্ট ও ভিসার কপি লাগবে।
খাসি রান্নায় শূকরের মাংস বেশি ব্যবহৃত হয়, তাই হালাল খাবার চাইলে শিলংয়ের পুলিশবাজার এলাকার রেস্তোরাঁগুলো বেছে নিন। ট্রেইলে খাবারের দোকান প্রায় নেই, তাই শুকনো খাবার ও পানি সাথে নিন এবং ময়লা নিজের সাথে ফেরত আনুন।
সময় দরকার: 1 day
শিলং থেকে একদিনে মাওফ্লাং থেকে লাড মাওফ্লাং পর্যন্ত পুরো ডেভিড স্কট ট্রেইল হেঁটে শেষ করতে এই প্ল্যানটি অনুসরণ করতে পারেন।
শিলং থেকে রওনা
নাস্তা সেরে শিলং থেকে রিজার্ভ গাড়িতে মাওফ্লাংয়ের দিকে রওনা দিন।
মাওফ্লাং ট্রেইলহেডে পৌঁছানো
ট্রেইলহেডের টিকিট কাউন্টারে পৌঁছে যান।
গাইড, রেজিস্ট্রেশন ও প্রস্তুতি
গাইডের সাথে দেখা করুন, রেজিস্ট্রেশন সারুন, আর পানি ও জিনিসপত্র ঠিক আছে কিনা দেখে নিন।
ট্রেক শুরু
ক্যামিলার সমাধি পেরিয়ে বনের পথ ধরে নামতে শুরু করুন। সকাল ৯টার পরে ট্রেক শুরু না করাই ভালো।
নদীর ধারে হালকা দুপুরের খাবার
ঝুলন্ত সেতু ও নদীর কাছে থেমে সাথে আনা হালকা খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিন।
লাড মাওফ্লাংয়ে পৌঁছানো
আর্চ সেতু পেরিয়ে শেষ অংশ হেঁটে লাড মাওফ্লাংয়ের প্রস্থানপথে পৌঁছান।
শিলং ফেরা বা সোহরা যাত্রা
আগে ঠিক করা গাড়িতে শিলং ফিরে যান, অথবা সোহরা (চেরাপুঞ্জি) চলে যান।
ট্রেকের আগের দিন গাইডকে হোয়াটসঅ্যাপে এমন একটা ছোট ইংরেজি বার্তা পাঠাতে পারেন:
Hello, I am planning to walk the David Scott Trail tomorrow. Could you please tell me the current trail condition, whether a registered guide is available, the total guide and entry charges, the recommended start time, and the pickup point at Lad Mawphlang? Thank you.
মাওফ্লাং থেকে লাড মাওফ্লাং পর্যন্ত ট্রেইলটি প্রায় ১৬ কিলোমিটার লম্বা, একমুখী পথ।
সাধারণত ৪–৬ ঘণ্টা লাগে, তবে বিরতি ও ছবি তোলার সময় ধরে পুরো দিন হাতে রাখুন।
ট্রেইলটি সহজ থেকে মাঝারি মানের। নামা-ওঠা আছে, তবে সাধারণ ফিটনেসের মানুষ সহজেই শেষ করতে পারেন। বর্ষায় পথ পিচ্ছিল থাকে।
সিলেট হয়ে তামাবিল–ডাউকি স্থলবন্দর দিয়ে শিলং, সেখান থেকে গাড়িতে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের মাওফ্লাং। ভিসায় ডাউকি বন্দর উল্লেখ থাকতে হবে।
মেঘালয় পর্যটন বিভাগ স্থানীয় গাইড নেওয়ার পরামর্শ দেয়। মাওফ্লাং ট্রেইলহেডে বা পর্যটন বিভাগের মাধ্যমে গাইড পাওয়া যায়; বিভাগের তালিকা অনুযায়ী ১০ জন পর্যন্ত দলের জন্য খরচ ₹১,৫০০।
অক্টোবর থেকে এপ্রিল। বর্ষায় (জুন–সেপ্টেম্বর) নদী ফুলে ওঠে আর পথ পিচ্ছিল হয়ে যায়।
Leave a Comment