নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি
শীতের আরামদায়ক সময়
- কাঁচা পথ শুকনো থাকে, হাঁটা সহজ
- গরম ও বৃষ্টির ঝামেলা কম
- সকালের কুয়াশায় যাতায়াতের সময় বাড়তে পারে
জমিদারি-আমলের স্থাপত্য আর নদীতীরের নিরিবিলি পরিবেশ পছন্দ করলে গোপালগঞ্জের ভাটিয়াপাড়ায় জমিদার গিরীশ চন্দ্র সেনের বাড়ি ঘুরে আসুন। মধুমতী নদীর তীরে সাদা রঙের এই ঐতিহাসিক বাড়িটি দেখতে দেখতে পুকুরপাড়ে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে দিতে পারবেন।
বাড়িটি গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার ভাটিয়াপাড়ায়, মধুমতী নদীর তীরে। এটি কোনো জাদুঘর বা সরকারি দর্শনীয় স্থান নয়—জমিদারি-আমলের এস্টেটটি এখন ব্যক্তিগত বাসভবন; কাশিয়ানী এম.এ খালেক ডিগ্রি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষের বাড়ি হিসেবে পরিচিত। তাই শিষ্টাচার মেনে বাইরে থেকে দেখুন, ভেতরে যেতে চাইলে বাসিন্দাদের অনুমতি নিন।
| অবস্থান | ভাটিয়াপাড়া, কাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ (মধুমতী নদীর তীরে) |
| জায়গার ধরন | জমিদার বাড়ি ও ঐতিহাসিক নিদর্শন |
| বর্তমান অবস্থা | ব্যক্তিগত বাসভবন—এম.এ খালেক ডিগ্রি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষের বাড়ি |
| যাওয়ার উপযুক্ত সময় | দিনের আলোতে, সকাল থেকে বিকেল |
| ঘুরতে সময় রাখুন | প্রায় ৩০ মিনিট–১ ঘণ্টা |
| প্রবেশমূল্য | কোনো টিকিট লাগে না; ব্যক্তিগত সম্পত্তি হওয়ায় শিষ্টাচার মেনে বাইরে থেকে দেখুন |
ইংরেজি ‘U’ প্যাটার্নের দক্ষিণমুখী বাড়িটির মধ্যঅংশ দ্বিতল, আর দুই পাশে একতলা ভবন। দোতলার অংশে দুটি কক্ষ ও দুটি বারান্দা আছে। তিন দিক প্রাচীরবেষ্টিত সাদা ভবনটির পেছনে ফলের গাছে ঘেরা অংশটি চোখে পড়বে। বাড়ির সামনের বিশাল শান-বাঁধানো পুকুরটি জমিদার নাকি এলাকার মানুষের কথা ভেবেই খনন করেছিলেন—আজও সেটি ভাটিয়াপাড়ার প্রাণ।
মূল ভবনের বাম পাশে ছিল একতলা মন্দির, আর ডান পাশে ছনের ছাউনির কাচারিঘর; পেছনের তিন কক্ষের ভবনটি রন্ধনশালা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এসবের বেশিরভাগই এখন বদলে গেছে, তবে এস্টেটের বিন্যাস দেখলেই জমিদারি-আমলের ছাপ অনুমান করা যায়। আশেপাশে মধুমতীর তীর, ভাটিয়াপাড়া বাজার আর এম.এ খালেক কলেজ ক্যাম্পাসও ঘুরে দেখতে পারেন।
ভাটিয়াপাড়া মধুমতী তীরের ঐতিহাসিক জনপদ। মধুমতী থেকে উৎপত্তি চন্দনা-বারাশিয়া নামের শীর্ণকায় নদীর পূর্ব পাড় ধরে উত্তরে প্রায় এক কিলোমিটার কাঁচা পথ গেছে কাশিয়ানীর পুরনো রেল স্টেশন পর্যন্ত—লোকমুখে শোনা যায়, জমিদার গিরীশ চন্দ্র সেনের পদধূলিতে ধন্য ছিল এই পথ। জমিদার ঠিক কত সালে বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি; তবে তৎকালে নয়নাভিরাম এই সাদা ভবনটি এলাকার সবার নজর কাড়ত।
জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর এস্টেটের ভাগ্য পাল্টেছে। কোথাও মূল কাঠামো টিকে আছে, কোথাও পরিচিতি বদলে গেছে—কাশিয়ানী এম.এ খালেক সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের পাশের প্রাক্তন অধ্যক্ষের বাড়িটিই এখন জমিদার গিরীশ চন্দ্র সেনের বাড়ির ভিটা হিসেবে চেনা যায়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক অংশ ভাঙনের মুখে, তাই ইতিহাসের সাক্ষ্য মনে করে সাবধানে, শ্রদ্ধার সঙ্গে ঘুরুন।
ঢাকার গুলিস্তান, ধোলাইপাড় বা সায়েদাবাদ থেকে পদ্মা সেতু–ভাঙ্গা হয়ে গোপালগঞ্জগামী বাস ছাড়ে। টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস, দোলা, ইমাদ, এনা, কমফোর্ট লাইন ও মধুমতি পরিবহনের বাস কাশিয়ানী দিয়ে গোপালগঞ্জ যায়—ভাটিয়াপাড়ার জন্য কাশিয়ানীতেই নেমে যাওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক। সময় লাগে প্রায় ৩–৪ ঘণ্টা; নন-এসি ভাড়া ৪৫০–৭৫০ টাকা, এসি নিলে ৫৫০–১,২০০ টাকার দিকে। খুলনা বা পিরোজপুরগামী বাসেও কাশিয়ানীতে নামতে পারবেন। ভাড়া মাঝে মাঝে বদলায়, টিকিট কাটার আগে হালের দাম জেনে নিন।
ট্রেনেও যাওয়া যায়—পদ্মা সেতুর রেলপথে ভাঙ্গা হয়ে এখন সরাসরি কাশিয়ানী ও গোপালগঞ্জ স্টেশন। রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে আর জাহানাবাদ এক্সপ্রেস রাত ৮টায় ঢাকা ছাড়ে; অভিযাত্রী কমিউটার বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে সন্ধ্যায় কাশিয়ানী পৌঁছায়। ফেরার জন্য সকালে জাহানাবাদ (কাশিয়ানী ৭টা ৪৪) আর বিকেলে রূপসী বাংলা (কাশিয়ানী ৫টা ১১) ধরতে পারবেন। কিছু ট্রেনের সাপ্তাহিক বন্ধ আছে—যাওয়ার আগে ‘রেল শেভা’ অ্যাপে সময় মিলিয়ে আগেই টিকিট কেটে নিন। কাশিয়ানী স্টেশন থেকে জমিদার বাড়ি খুবই কাছে।
| আসনের শ্রেণি | ঢাকা–কাশিয়ানী ট্রেনের ভাড়া (ভ্যাটসহ) |
| শোভন চেয়ার | ৩০৫ টাকা |
| স্নিগ্ধা | ৫৮১ টাকা |
| এসি সিট | ৬৯৬ টাকা |
| এসি বার্থ | ১,০৪৭ টাকা |
গোপালগঞ্জ শহরের পুলিশ লাইন বা ঘোনাপাড়া থেকে ব্যাটারিচালিত অটোভ্যান, নসিমন বা লোকাল বাসে ভাটিয়াপাড়া যান। কাশিয়ানীতে নামলে সিএনজি বা অটোতেই সরাসরি পৌঁছে যাবেন। ভাটিয়াপাড়া থেকে নদীর পূর্ব পাড় ধরে এক কিলোমিটার উত্তরে কাঁচা রাস্তায় পূর্বে গেলেই ডান পাশে বিশাল পুকুর আর বাম পাশে জমিদার বাড়িটি চোখে পড়বে।
গাড়ি ঠিক করার সময় শেয়ার না রিজার্ভ, কোথায় নামাবে, অপেক্ষা করবে কি না এবং ফেরার ভাড়া কত—একসঙ্গে জেনে নিন। একই দিনে ফিরতে চাইলে সকালেই ঢাকা থেকে বের হোন এবং ফেরার শেষ বাস বা ট্রেনের সময় আগে থেকে জেনে রাখুন।
ঢাকা থেকে দিনের শুরুতেই বের হোন। পদ্মা সেতু হয়ে যাওয়া বাসে কাশিয়ানীতে নামা সবচেয়ে সহজ; ট্রেনে আসলে সকালের ট্রেন ধরুন। নেমেই ভাটিয়াপাড়ার গাড়ি ও ফেরার ব্যবস্থা ঠিক করুন।
বাজার থেকে নদীর পূর্ব পাড়ের রাস্তা ধরে উত্তরে যান। ডান পাশে বিশাল পুকুর দেখা গেলেই বুঝবেন বাড়ি কাছে; বাম পাশের সাদা ভবনটিই জমিদার গিরীশ চন্দ্র সেনের বাড়ি।
ভবনের স্থাপত্য বাইরে থেকে দেখুন, শান-বাঁধানো পুকুরপাড়ে হাঁটুন, চাইলে এম.এ খালেক কলেজ ক্যাম্পাস ও মধুমতীর তীর ঘুরে দেখুন। ব্যক্তিগত বাসভবনে অনুমতি ছাড়া ঢুকবেন না।
ভাটিয়াপাড়া বাজারে মাছের হোটেলে দুপুরের খাবার শেষে প্রভাতের রসগোল্লা চেখে নিন। তারপর আগে ঠিক করা গাড়িতে কাশিয়ানী ফিরে বাস বা ট্রেন ধরুন।
ভাটিয়াপাড়া বাজারে সময় কাটাতে চাইলে মধুমতীর ঘাটে একবার যান—নৌকা-ট্রলারের আনাগোনা আর নদীতীরের জীবন দেখতে ভালো লাগবে। বাজারের মিষ্টির দোকানগুলোতেও থামুন; শত বছরের ঐতিহ্যের স্বাদ এখানেই লুকিয়ে আছে।
ভাটিয়াপাড়া ভ্রমণ
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এখানে ঘুরতে সবচেয়ে আরাম লাগবে। তবে বর্ষায় মধুমতী ভরে থাকলে নদীতীরের সৌন্দর্য অন্যরকম—শুধু কাঁচা পথের কাদার জন্য প্রস্তুত থাকুন।
নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি
মার্চ–মে
জুন–অক্টোবর
খাবারের বিরতি ভাটিয়াপাড়া বাজারেই রাখুন—মধুমতীর তাজা মাছের হোটেল এখানকার প্রাণ। রাত থাকতে চাইলে গোপালগঞ্জ শহরের হোটেল সবচেয়ে সুবিধাজনক; অনুমতি নিলে কাশিয়ানীর ডাক বাংলোতেও থাকা যায়। আগস্ট ও মার্চে টুঙ্গিপাড়া-কেন্দ্রিক বড় অনুষ্ঠানের সময় হোটেল ভরে যায়, তখন গেলে আগে বুকিং দিন।
থাকার জন্য পরিচিত কয়েকটি জায়গার নাম, ধরন ও যোগাযোগের নম্বর দেওয়া হলো (ভাড়া বদলাতে পারে, যাওয়ার আগে ফোনে জেনে নিন):
খাওয়ার ক্ষেত্রে ভাটিয়াপাড়া ও গোপালগঞ্জের কিছু পরিচিত নাম ও বিখ্যাত আইটেম জেনে রাখুন:
আরামদায়ক জুতা পরুন—কাঁচা পথে হাঁটতে হবে। ব্যক্তিগত বাসভবনে শব্দ কম রাখুন, কিছু সরানো বা ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন। পুকুরপাড়ে সাবধানে হাঁটুন, শিশুদের চোখে রাখুন। আবর্জনা নির্ধারিত জায়গায় ফেলুন—ঐতিহাসিক এলাকাটি যেন পরিষ্কার থাকে।
গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার ভাটিয়াপাড়ায়, মধুমতী নদীর তীরে। ভাটিয়াপাড়া বাজার থেকে নদীর পূর্ব পাড়ে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে।
এটি এখন ব্যক্তিগত বাসভবন—এম.এ খালেক ডিগ্রি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষের বাড়ি। বাইরে থেকে দেখুন; ভেতরে যেতে বা ছবি তুলতে চাইলে বাসিন্দাদের অনুমতি নিন।
না, কোনো টিকিট লাগে না। সরকারি দর্শনীয় স্থান না হওয়ায় গাইড বা টয়লেটের মতো সুবিধাও এখানে নেই।
গুলিস্তান বা সায়েদাবাদ থেকে পদ্মা সেতু হয়ে বাসে কাশিয়ানী বা গোপালগঞ্জ নেমে অটো-সিএনজিতে ভাটিয়াপাড়া যান। ট্রেনে এলে কাশিয়ানী স্টেশনে নামুন—জমিদার বাড়ি স্টেশনের কাছেই।
বাড়ি, পুকুরপাড় ও আশপাশের জন্য ৩০ মিনিট–১ ঘণ্টা; ভাটিয়াপাড়া বাজার ও মধুমতীর তীর মিলিয়ে আধা দিন।
মিলন হোটেলে মধুমতীর তাজা মাছের ঝোল-ভর্তা; প্রভাত মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ছোট রসগোল্লা; ভাই ভাইয়ের গুড়ের সন্দেশ ও দই।
গোপালগঞ্জ শহরের হোটেল রানা, রিফাত, সোহাগ বা জিমি; অনুমতি নিলে কাশিয়ানী ডাক বাংলো। একদিনের ট্যুরেও আরামে ঘুরে আসা যায়।
শীতে (নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি) ঘুরতে সবচেয়ে আরাম; বর্ষায় মধুমতী ভরা থাকলে সৌন্দর্য বাড়ে, তবে কাঁচা পথের কাদার কথা মাথায় রাখুন।
Leave a Comment