গোপালগঞ্জ জেলার নিভৃত পল্লীতে লুকিয়ে আছে বাংলার এক গৌরবময় অতীতের নীরব সাক্ষী — উলপুর জমিদার বাড়ি। সবুজে ঘেরা গ্রামের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা জীর্ণ কিন্তু দাপুটে এই প্রাচীন স্থাপনাটি আজও ইতিহাসপ্রেমী, স্থাপত্যানুরাগী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষদের কাছে এক অনন্য গন্তব্য। শত বছরের আভিজাত্য, শাসন, সংস্কৃতি এবং পতনের গল্প বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি।
উলপুর জমিদার বাড়ি বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার ১২নং উলপুর ইউনিয়নের মধ্যপাড়ায় অবস্থিত। গোপালগঞ্জ জেলা সদর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে গোপালগঞ্জ-টাকেরহাট মহাসড়কের কাছে এর অবস্থান। আনুমানিক ১৯০০ শতকের গোড়ায় জমিদার প্রীতীশচন্দ্র বসু রায় চৌধুরী প্রায় ২০০ একর জমি জুড়ে এই বিশাল জমিদারি এস্টেট গড়ে তোলেন। একসময় এই গ্রামজুড়ে ছিল ৩৬০ থেকে ৩৬৫টি সুরম্য অট্টালিকা, যা এই স্থানটিকে বাংলার অন্যতম বৃহৎ ও সমৃদ্ধ জমিদারি কেন্দ্রে পরিণত করেছিল।
উলপুর জমিদার বাড়ির ইতিহাস কেবল একটি স্থাপনার ইতিহাস নয়, এটি একটি শক্তিশালী পরিবারের হাজার বছরের উত্থান-পতনের কাহিনি। ইতিহাস অনুযায়ী, একাদশ শতাব্দীতে দশরথ বসু নামক এক ব্যক্তি এই অঞ্চলে আসেন এবং এই বংশের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তীতে ষোড়শ শতাব্দীতে মুঘল আমলে তাঁরই বংশধর রঘুনন্দন বসু রায় চৌধুরী উলপুর বা শাহপুর পরগনার জমিদারি ও জায়গির লাভ করেন। মূলত বসু রায় চৌধুরী পরিবারই উলপুর গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এটিকে তাঁদের জমিদারির মূল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জমিদার প্রীতীশচন্দ্র বসু রায় চৌধুরী ব্রিটিশ শাসনামলে একজন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী হিসেবে বিপুল প্রতিপত্তি অর্জন করেন এবং প্রায় ২০০ একর জমির ওপর বর্তমানে যে বিশাল জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়, তা নির্মাণ করেন। এই পরিবার ‘একশ ঘর শরিক’ নামে পরিচিত ছিল, অর্থাৎ তাঁরা ছিলেন একটি বিশাল যৌথ অভিজাত পরিবার — যেখানে প্রায় একশটি পরিবারের সমন্বয়ে গড়া এক অনন্য সামাজিক কাঠামো বিদ্যমান ছিল।
উলপুরের জমিদারদের প্রতাপ ও প্রতিপত্তি ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তাঁদের ছিল নিজস্ব স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ও বিচারব্যবস্থা, এমনকি জমিদার বাড়ির ভেতরে একটি নিজস্ব জেলখানাও ছিল। কথিত আছে, সেই যুগে সাধারণ মানুষদের জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় জুতা খুলে এবং ছাতা বন্ধ করে হাঁটতে হতো — জমিদারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এটি ছিল তখনকার অলিখিত নিয়ম। এই একটি ঘটনাই বলে দেয়, তৎকালীন সমাজে এই জমিদার পরিবারের কর্তৃত্ব কতটা গভীর ছিল।
উলপুর জমিদার বাড়ি কোনো একক প্রাসাদ নয়, এটি ছিল একটি সম্পূর্ণ জমিদারি নগরী। তৎকালীন ব্রিটিশ আমলের ইট, চুন, সুরকি ও লোহার রডের সমন্বয়ে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন কারুকাজে এখানকার প্রতিটি দালান নির্মিত হয়েছিল। সারাটি গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে ছিল প্রায় ৩৬৫টি সুরম্য জমিদারি ভবন। বিশাল এই এস্টেটের মধ্যে ছিল —
বেশ কিছু ভবনের বাইরের দেয়ালে শ্বেতপাথরে খোদাই করা “দিনেশ ধাম” বা “দীন ধাম” লেখা এখনও দেখতে পাওয়া যায়, যা তৎকালীন স্থাপত্যের ব্যক্তিগত পরিচয়ের একটি অনন্য নিদর্শন।
উলপুর জমিদার বাড়ির ধর্মীয় ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো উলপুর সর্বজনীন শ্রী শ্রী কালী মাতা মন্দির। ধারণা করা হয়, এই মন্দিরটির বয়স প্রায় ৫০০ বছর। ষোড়শ শতাব্দীতে তৎকালীন জমিদার রঘুনন্দন বসু রায় চৌধুরী এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মন্দিরের দেয়ালগুলো ছিল রঙিন কাচ ও সিরামিকের টুকরো দিয়ে সুসজ্জিত, যা জমিদারদের অসাধারণ শৈল্পিক রুচির পরিচয় বহন করে।
২০২২ সালে বসু রায় চৌধুরী পরিবারের বর্তমান বংশধর মৃণালকান্তি রায় চৌধুরী প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে অত্যন্ত কারুকার্যময় আধুনিক স্থাপত্যে মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন। বর্তমান মন্দির চত্বরে মূল কালী মন্দিরের পাশাপাশি রয়েছে শিব ও দুর্গা দেবীর মন্দির এবং একটি সুপ্রাচীন শান-বাঁধানো পুকুরঘাট। স্থানীয় ভক্তদের বিশ্বাস, এই মন্দিরের দেবী অত্যন্ত “জাগ্রত” এবং ভক্তিভরে করা মানত কখনোই বিফলে যায় না। প্রতি বছর কার্তিক মাসের দীপান্বিতা শ্যামাপূজা এবং শারদীয় দুর্গোৎসবে এখানে বিশাল মেলার আয়োজন হয়, যেখানে দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত এসে ভিড় জমান।
উলপুর জমিদার বাড়ির সাথে জড়িয়ে আছে বিশ্বমানের এক মহান শিল্পীর নাম। শর্বরী রায় চৌধুরী — উপমহাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যশিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৯৩৩ সালের ২১ জানুয়ারি এই উলপুর জমিদার পরিবারেই তাঁর জন্ম। দেশভাগের পর তিনি কলকাতায় চলে যান এবং কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট থেকে স্বর্ণপদকসহ ভাস্কর্যবিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে ইতালির ফ্লোরেন্সে যান এবং আলবার্তো গিয়াকোমেত্তি ও হেনরি মুরের মতো বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের সান্নিধ্য লাভ করেন।
শর্বরী রায় চৌধুরীর ভাস্কর্যগুলো প্রাচ্যের বাস্তববাদ ও পাশ্চাত্যের বিমূর্ততার এক অপূর্ব মিলন। ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খান, সিদ্ধেশ্বরী দেবী ও ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁয়ের মতো মহান সঙ্গীতজ্ঞদের ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য নির্মাণ করে তিনি অমরত্ব লাভ করেন। শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীর কলাভবনে দীর্ঘ সময় অধ্যাপনার পর ২০১২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। উলপুরের মাটিতেই লুকিয়ে আছে এই মহান শিল্পীর শিকড়।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বসু রায় চৌধুরী পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ভারতের কলকাতায় পাড়ি জমান এবং তার পর থেকেই জমিদার বাড়িটি ক্রমে জনশূন্য হতে থাকে। বিশাল এই সম্পত্তি চলে যায় সরকারের খাস খতিয়ানে। কালের বিবর্তনে নদীভাঙন, অযত্ন ও অবৈধ দখলদারির কারণে একসময়ের ৩৬৫টি দালানের মধ্যে বেশিরভাগই আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে টিকে থাকা আটটি দোতলা দালানসহ বেশ কয়েকটি ভবন নিম্নলিখিত কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে —
বর্তমানে এটি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের (গোপালগঞ্জ ইউনিট) আওতাভুক্ত। তবে যথাযথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জে পৌঁছানো এখন অনেক সহজ ও দ্রুত। মাত্র আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।
গোপালগঞ্জ শহরের কুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে লোকাল বাস, ইজিবাইক বা সিএনজি অটোরিকশায় করে উলপুর বাসস্ট্যান্ড বা উলপুর ব্রিজে নামতে হবে। মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিটের পথ। উলপুর ব্রিজ পার হলেই হাতের দুই পাশে ঐতিহাসিক ভবনগুলো চোখে পড়তে শুরু করবে।
যেহেতু জমিদার বাড়ির স্থাপনাগুলো কোনো একক সীমানাপ্রাচীরের মধ্যে আবদ্ধ নয়, বরং পুরো গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে আছে, তাই উলপুর বাজার থেকে একটি রিকশা বা ইজিবাইক ঘণ্টাভিত্তিক ভাড়া করে নিলে সুবিধা হবে। স্থানীয় চালককে “জমিদার বাড়ি” দেখাতে বললেই তিনি চেনা পথে নিয়ে যাবেন।
উলপুর জমিদার বাড়ি সারা বছরই পরিদর্শন করা যায়, তবে সবচেয়ে আদর্শ সময় হলো নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস। শীতের মৌসুমে আবহাওয়া শীতল ও আরামদায়ক থাকে, পায়ে হেঁটে বা রিকশায় ঘুরে দেখার জন্য এটি সেরা সময়। বর্ষাকালে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এলাকার কিছু রাস্তা কাদাময় হয়ে পড়ে। তবে যদি কালী মন্দিরের বার্ষিক উৎসব দেখতে চান, তাহলে কার্তিক মাসের শ্যামাপূজার সময় আসুন — তখন মেলার উৎসবমুখর পরিবেশে ভ্রমণ অভিজ্ঞতা অন্যরকম মাত্রা পাবে।
উলপুর ভ্রমণের সাথে গোপালগঞ্জের আশেপাশের এই জায়গাগুলো একই সফরে ঘুরে নিতে পারেন —
উলপুর জমিদার বাড়ি ভ্রমণের আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখলে অভিজ্ঞতা অনেক সুন্দর হবে —
উলপুর জমিদার বাড়ি বাংলাদেশের অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ষোড়শ শতাব্দীর মুঘল যুগ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল পর্যন্ত বাংলার ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী এই ভূমি। এখানকার স্থাপত্য, মন্দির ও জমিদারি কাঠামো কেবল একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো বাংলার জমিদারি সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু অযত্ন, অবহেলা ও দখলদারিত্বের কারণে এই অমূল্য ঐতিহ্য প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এই স্থানটিকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে আগামী প্রজন্মের জন্য রক্ষা করা।
ভ্রমণপিপাসু বন্ধুরা — গোপালগঞ্জ গেলে অবশ্যই উলপুর জমিদার বাড়ি দেখতে ভুলবেন না। এই জীর্ণ প্রাসাদের প্রতিটি ইটের ফাঁকে লুকিয়ে আছে বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস, যা আপনাকে এক অনন্য অতীতের মুখোমুখি করবে।
Leave a Comment