শহরের কোলাহল থেকে দূরে, প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে একটি রঙিন দিনের খোঁজে যারা থাকেন, তাদের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেলার সাবদি গ্রাম (Sabdi) এক দারুণ গন্তব্য। ঢাকা থেকে দিনে গিয়ে দিনে ঘুরে আসার মতো আকর্ষণীয় এই স্থানটি প্রকৃতিপ্রেমী এবং ফটোগ্রাফারদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য।
ফুলের সমারোহ
সাবদি গ্রামের মূল আকর্ষণ হলো এর ফুল চাষ। শীতকালে, বিশেষ করে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে, এখানকার ফসলের ক্ষেতগুলো হলুদ সরিষা ফুলে ভরে ওঠে, যা দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন কেউ হলুদ রঙের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। এরপর আসে ফেব্রুয়ারি মাস, যখন সাবদি তার আসল রূপে ধরা দেয়। এই সময়ে গোলাপ, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, জারবেরা, কসমস, ডেইজি জিপসি, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা—সহ বিভিন্ন ধরনের ফুলের চাষ করা হয়। সমগ্র গ্রাম তখন বাহারি ফুলের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। ফুল চাষকে ঘিরে চলে গ্রামের চাষীদের ব্যস্ততা। দিগন্তজোড়া ফুলের রাজ্য থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্যের অপূর্ব সৌন্দর্য ভ্রমণকারীদের মুগ্ধ করে তোলে।
সাবদির আশেপাশে যা যা দেখবেন
- প্রেমতলা: একটি শান্ত ও মনোরম স্থান, যেখানে প্রকৃতির মাঝে কিছুটা সময় কাটানো যায়।
- কদম রসুল দরগা: একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থান, যা স্থানীয়দের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
- সিরাজ শাহর মাজার কমপ্লেক্স: আরেকটি ধর্মীয় স্থান, যা স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ।
- সোনাকান্দা দুর্গ: নারায়ণগঞ্জের একটি ঐতিহাসিক দুর্গ, যা মুঘল আমলের স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করে।
- লক্ষ্মণবন্দে নদীর পাড়: এখানে নদীর শীতল হাওয়ায় শরীর জুড়িয়ে নেওয়া যায়। চাইলে নৌকায় চড়ে চারপাশ ঘুরে দেখতে পারবেন এবং নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।
সাবদি গ্রাম যাওয়ার উপায়
সাবদি যাওয়ার জন্য প্রথমে গুলিস্থানের বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেইট কিংবা বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের সামনে থেকে উৎসব, শীতল, বন্ধন বা বিআরটিসির এসি/নন-এসি বাসে নারায়ণগঞ্জের চাষারা অথবা বন্দরের ২ নাম্বার ঘাটের কাছে চলে আসুন। চাষারা নামলে রিকশা বা অন্য পরিবহণে লঞ্চ ঘাটে আসতে হবে। লঞ্চ ঘাটে এসে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় নদী পার হয়ে অটো/ইজিবাইক রিজার্ভ নিয়ে সহজেই ফুলের গ্রাম সাবদি সহ আশেপাশের অন্য সকল দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে পারবেন।
যদি নিজস্ব পরিবহণ বা প্রাইভেট কারে চড়ে সাবদি যেতে চান, তবে কাঁচপুর ব্রিজ অতিক্রম করে মদনপুর হয়ে বন্দর সদর রোড ধরে ৮ কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই সাবদি গ্রামে পৌঁছে যাবেন।
একদিনের ট্যুর প্ল্যান
Time needed: 8 hours
সকাল ১০টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ পৌঁছান। নদী পার হয়ে নিজের ইচ্ছে মতো একে একে সাবদি গ্রামের সকল দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখে ফেলুন। এরপর আপনার সর্বশেষ অবস্থান থেকে দুপুর ২টা থেকে ৩টার মধ্যে নদী পাড়ে চলে আসুন। বিখ্যাত মাওরা হোটেলে গরু ভুনা আর কচু শাক দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিন। খাওয়া দাওয়া সেরে বিকেল বেলা কাটিয়ে দিতে পারেন নদী পাড়ের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে। আর অবশ্যই বোস কেবিনের কাটলেট খেতে ভুলবেন না।
- সকাল ১০টার মধ্যে
নারায়ণগঞ্জ পৌঁছান।
- সকাল ১০:৩০ – দুপুর ১:৩০
নদী পার হয়ে সাবদি গ্রামে প্রবেশ করুন এবং একে একে সমস্ত দর্শনীয় স্থান (ফুলের ক্ষেত, প্রেমতলা, কদম রসুল দরগা, সিরাজ শাহর মাজার কমপ্লেক্স, সোনাকান্দা দুর্গ) ঘুরে নিন। ফুলের ছবি তুলুন এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করুন।
- দুপুর ২:০০ – ৩:০০
নদী পাড়ে ফিরে আসুন।
- দুপুর ৩:০০ – ৪:০০
মাওরা হোটেলে বিখ্যাত গরুর ভুনা আর কচু শাক দিয়ে ভাত খেয়ে নিন।
- বিকাল ৪:০০ – ৫:৩০
নদীর পাড়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করুন, চাইলে নৌকা ভ্রমণও করতে পারেন।
- সন্ধ্যা ৬:০০
ফেরার পথে বোস কেবিনের কাটলেট অবশ্যই খেয়ে দেখুন।
কোথায় খাবেন
- বৌয়া: প্রতি শুক্রবার সকালে বৌয়া নামের আঞ্চলিক ভাত পাওয়া যায়, যা বিভিন্ন ভর্তার সাথে খুবই সুস্বাদু।
- মাওরা হোটেল: গরুর ভুনা ও কচু শাক দিয়ে খাবার খেতে পারেন। তাদের খাবার বেশ জনপ্রিয়।
- সুরভি হোটেল: বিভিন্ন ধরনের ভর্তা-ভাজি পাওয়া যায়, যা বাঙালি খাবারের স্বাদ নিতে দারুণ।
- বোস কেবিন: তাদের কাটলেট না খেলে সাবদি ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এটি একটি স্থানীয় জনপ্রিয় খাবার।
সতর্কতা
- ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করলেও চাষীদের কোনো ক্ষতি করবেন না। ফুল ছিঁড়ে বা ক্ষেতের ক্ষতি করে তাদের জীবিকার ওপর আঘাত হানবেন না।
- নিজের বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলবেন না। পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন এবং নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলুন।
- স্থানীয়দের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখুন এবং ভদ্র ব্যবহার করুন। তাদের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন।
সকলের প্রতি অনুরোধ, এই বর্ষায় এডভেঞ্চার এর নেশায় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকবেন। মনে রাখবেন, জীবন একটাই, আর একটা দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। তাই আমাদের সবার ভ্রমণ নিরাপদ হোক এটাই হোক আমাদের সকলের চাওয়া।