নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি
শীতের আরামদায়ক সময়
- বাইরে হাঁটার জন্য তুলনামূলক আরামদায়ক
- বৃষ্টির ঝামেলা সাধারণত কম
- সকালের কুয়াশায় যাতায়াতের সময় বাড়তে পারে
বিষাদ-সিন্ধুর লেখককে আরও একটু ভালোভাবে জানতে চাইলে রাজবাড়ীর মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্রে (Mir Mosharraf Hossain Memorial Museum) ঘুরে আসুন। লেখকের সমাধি, সংগ্রহশালা আর পাঠাগার ঘুরে দেখতে দেখতে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে দিতে পারবেন। বই পড়তে ভালোবাসলে পাঠাগারের জন্য একটু বাড়তি সময় রাখুন।
মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্রটি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের পদমদী গ্রামে। বাংলা একাডেমি এটি পরিচালনা করে। মনে রাখবেন, কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়ার জন্মভিটা আর রাজবাড়ীর এই স্মৃতিকেন্দ্র আলাদা জায়গা। গাড়ি ঠিক করার সময় পদমদী, বালিয়াকান্দি ঠিকানাটি স্পষ্ট করে বলুন।
| অবস্থান | পদমদী, নবাবপুর ইউনিয়ন, বালিয়াকান্দি, রাজবাড়ী |
| জায়গার ধরন | সাহিত্যিকের স্মৃতিকেন্দ্র, সংগ্রহশালা ও সমাধি প্রাঙ্গণ |
| পরিচালনা | বাংলা একাডেমি |
| খোলার সময় | সকাল ৯টা ৩০–বিকেল ৫টা |
| সাপ্তাহিক বন্ধ | বৃহস্পতিবার |
| ভেতরে সময় রাখুন | প্রায় ১–২ ঘণ্টা |
| প্রবেশমূল্য | স্মৃতিকেন্দ্রে প্রবেশের জন্য কোনো টিকেটের প্রয়োজন হয় না, দর্শনার্থীদের জন্য এখানে প্রবেশ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। |
এখানে মীর মশাররফ হোসেন, তাঁর স্ত্রী বিবি কুলসুম এবং পরিবারের আরও দুই সদস্যের সমাধি রয়েছে। লেখকের আবক্ষ ভাস্কর্যও দেখতে পাবেন। এটি স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জায়গা, তাই নিরিবিলি পরিবেশ বজায় রেখে ঘুরুন।
সংগ্রহশালায় লেখকের ছবি, উক্তি ও সাহিত্যবিষয়ক উপকরণ দেখুন। এরপর গ্রন্থাগারে কিছুক্ষণ বসতে পারেন। বাংলা একাডেমির বই বিক্রয়কেন্দ্রে পছন্দের বইও খুঁজে দেখতে পারেন। ভেতরে ছবি তুলতে চাইলে দায়িত্বে থাকা কর্মীদের অনুমতি নিন।
মীর মশাররফ হোসেন ১৮৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও আত্মজীবনী লিখেছেন। রত্নাবতী, জমিদার দর্পণ এবং বিষাদ-সিন্ধু তাঁর পরিচিত রচনার মধ্যে পড়ে।
জীবনের শেষ সময় তিনি পদমদীতে কাটান। মৃত্যুর পর এখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। যাওয়ার আগে বিষাদ-সিন্ধু বা জমিদার দর্পণ সম্পর্কে অল্প পড়ে নিন। তাহলে সংগ্রহশালার বিষয়গুলো আরও সহজে বুঝতে পারবেন।
স্মৃতিকেন্দ্রটি নির্মাণের পেছনেও একটা ইতিহাস আছে। লেখকের মৃত্যুর পর দীর্ঘ দিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তাঁর সমাধি প্রায় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘কথামালা’-য় এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রচারের পর সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় লেখকের স্মৃতি রক্ষায় উদ্যোগ নেয়। ১৯৯৯ সালের জুলাইয়ে পদমদীতে তাঁর সমাধিকে কেন্দ্র করে প্রায় ৮৪ শতাংশ জমিতে স্মৃতিকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু হয়; ২০০১ সালের ১৯ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্মৃতিকেন্দ্রটি ২০০৫ সালের ২০ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া উদ্বোধন করেন। এরপর থেকে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্বে আছে বাংলা একাডেমি। কমপ্লেক্সে সংগ্রহশালা ও গ্রন্থাগারের পাশাপাশি ১০০ আসনের সভাকক্ষ, অভ্যর্থনা কক্ষ, ভিআইপি রুম ও গেস্ট রুমের ব্যবস্থা রয়েছে।
স্মৃতিকেন্দ্র সকাল ৯টা ৩০ থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। গ্রন্থাগার ও বই বিক্রয়কেন্দ্র খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা ৩০ পর্যন্ত। দূর থেকে রওনা দেওয়ার আগে ফোনে দিনের সময়সূচি, ছুটি ও প্রবেশের নিয়ম জেনে নিন।
যোগাযোগ: ০১৭৪২-৬৬৭২৫৫ ও ০১৭৭১-০৩৮২২১
ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে রাজবাড়ীগামী বাস ছেড়ে যায়। বাসে রাজবাড়ী নেমে সেখান থেকে পদমদীর গাড়ি নিন। টিকিট কাটার সময় যাওয়া–আসার ভাড়া ও ফেরার শেষ বাসের সময় জেনে রাখুন। একই দিনে ফিরতে চাইলে সকালেই ঢাকা থেকে বের হোন।
এই রুটে রাজবাড়ী পরিবহন, এমএম পরিবহন, সাউদিয়া, সৌহার্দ্য, সূবর্ণ এবং জামান এন্টারপ্রাইজের বাস চলাচল করে—সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাস পাবেন। বেশিরভাগ বাস মানিকগঞ্জ হয়ে পাটুরিয়া–দৌলতদিয়া ফেরি পার হয়ে গোয়ালন্দ ঘেঁষে রাজবাড়ী যায়; ফেরিঘাটে ভিড় থাকলে সময় বেশি লাগে। কিছু বাস পদ্মা সেতু পেরিয়েও আসে। নন-এসি বাসের ভাড়া সাধারণত ৩৫০–৫৫০ টাকা, আর এসি চেয়ার কোচ নিলে ৭০০–৮৫০ টাকার দিকে পড়ে। জ্বালানির দাম অনুযায়ী ভাড়া মাঝে মাঝে বদলায়, তাই কাউন্টারে টিকিট কাটার আগে হালের ভাড়া জেনে নিন।
ট্রেনেও রাজবাড়ী আসা যায়। পদ্মা সেতুর রেলপথে ভাঙ্গা–ফরিদপুর হয়ে ঢাকার কমলাপুর থেকে রাজবাড়ী পর্যন্ত আন্তঃনগর ট্রেন চলে; সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। সুন্দরবন এক্সপ্রেস (৭২৬) সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে, মধুমতি এক্সপ্রেস (৭৫৫) বিকেল ৩টায় এবং বেনাপোল এক্সপ্রেস রাত সাড়ে ১১টার দিকে কমলাপুর ছাড়ে। এক দিনের ট্যুরে সকালের ট্রেনে গিয়ে সন্ধ্যায় রাজবাড়ী থেকে ছাড়া বেনাপোল এক্সপ্রেসে (রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা) ফিরতে পারবেন। সাপ্তাহিক বন্ধের দিন ট্রেনভেদে ভিন্ন, তাই যাওয়ার আগে বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইট বা ‘রেল শেভা’ অ্যাপে সময় দেখে আগেই টিকিট কেটে নিন। রাজবাড়ী স্টেশন থেকে নেমে পদমদীর গাড়ি ঠিক করতে হবে।
| আসনের শ্রেণি | ঢাকা–রাজবাড়ী ট্রেনের ভাড়া (ভ্যাটসহ) |
| শোভন চেয়ার | ৩৪০ টাকা |
| ফার্স্ট সিট | ৫২৪ টাকা |
| স্নিগ্ধা | ৬৫৬ টাকা |
| এসি সিট | ৭৮২ টাকা |
নিজের গাড়িতে গেলে চালককে পদমদীর পূর্ণ ঠিকানা দিন। রাস্তার অবস্থা ও আপনার অবস্থান অনুযায়ী রুট ঠিক করুন। যাওয়া–আসার জন্য যথেষ্ট সময় রাখুন, বিশেষ করে একই দিনে ঢাকায় ফিরতে চাইলে।
রাজবাড়ী শহর থেকে অটো বা ইজিবাইকে বহরপুর বাজার হয়ে পদমদী যান। বালিয়াকান্দি উপজেলা শহর থেকে গেলে আনন্দবাজার হয়ে স্মৃতিকেন্দ্রে পৌঁছাবেন। গাড়ি নেওয়ার সময় চালককে মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্রের নাম ও পদমদীর ঠিকানা বলুন।
গাড়ি ঠিক করার সময় শেয়ার না রিজার্ভ, কোথায় নামাবে, অপেক্ষা করবে কি না এবং ফেরার ভাড়া কত—একসঙ্গে জেনে নিন। শুধু যাওয়ার গাড়ি ঠিক করে ফিরতি ব্যবস্থাটি বাদ দেবেন না।
রাজবাড়ী শহর থেকে এক দিনে ঘুরে আসতে এই প্ল্যানটি রাখতে পারেন। বাসের সময় ও নিজের সুবিধা অনুযায়ী যাতায়াতের সময় মিলিয়ে নিন।
নিজের শুরুর জায়গা থেকে রাজবাড়ী যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। ঢাকা থেকে গেলে দিনের শুরুতেই বের হওয়ার প্ল্যান রাখুন। পৌঁছে পদমদীর ঠিকানা দেখিয়ে অটো বা ইজিবাইকের ভাড়া ও ফেরার ব্যবস্থা ঠিক করুন।
প্রবেশের পর দায়িত্বে থাকা কর্মীর কাছে সংগ্রহশালা ও গ্রন্থাগারে যাওয়ার নিয়ম জেনে নিন। কোনো কক্ষ বন্ধ থাকলে বা অনুষ্ঠান চললে তাঁদের নির্দেশ অনুযায়ী ঘুরুন।
সমাধি প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা জানান। তারপর প্রদর্শনী দেখুন এবং সময় থাকলে পাঠাগারে বসুন। তাড়াহুড়া এড়াতে ঘোরার জন্য এক–দুই ঘণ্টা হাতে রাখুন। বই কিনতে চাইলে বিক্রয়কেন্দ্রেও দেখতে পারেন।
ঘোরা শেষে স্থানীয়ভাবে খাবারের ব্যবস্থা করুন। আগে ঠিক করা গাড়িতে রাজবাড়ী ফিরুন এবং বাস বা অন্য ফিরতি যাত্রার জন্য বাড়তি সময় রাখুন। এক দিনে অনেক দূরের জায়গা যোগ না করাই আরামদায়ক।
পদমদী ভ্রমণ
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এখানে ঘুরতে আরাম লাগবে। এ সময় গরম ও বৃষ্টির ঝামেলা কম থাকে, তাই প্রাঙ্গণে সময় নিয়ে হাঁটতে পারবেন।
নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি
মার্চ–মে
জুন–অক্টোবর
১৩ নভেম্বর লেখকের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এখানে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চাইলে আগে ফোন করে আয়োজনের সময় জেনে নিন।
খাবারের বিরতি রাজবাড়ী শহর বা পথের সুবিধাজনক কোনো বাজারে রাখুন। সঙ্গে পানি ও হালকা স্ন্যাকস নিন। রাত থাকতে চাইলে নিজের বাজেট অনুযায়ী রাজবাড়ী শহরে হোটেল ঠিক করে রাখুন। স্মৃতিকেন্দ্রের গেস্ট হাউজে থাকতে চাইলে আগে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে অনুমতি নিয়ে নিন। দল নিয়ে গেলে গ্রন্থাগার ব্যবহার বা কোনো আয়োজনের কথাও আগে জানিয়ে রাখুন।
রাত থাকতে চাইলে রাজবাড়ী শহরে বাজেটভেদে বেশ কিছু হোটেল আছে। পরিচিত কয়েকটির নাম, ধরন ও যোগাযোগের নম্বর দেওয়া হলো (ভাড়া মৌসুমভেদে বদলাতে পারে, যাওয়ার আগে ফোনে জেনে নিন):
খাওয়ার ক্ষেত্রে রাজবাড়ীর কিছু পরিচিত নাম ও বিখ্যাত আইটেম জেনে রাখুন:
আরামদায়ক জুতা পরুন, পড়ার জায়গায় শব্দ কম রাখুন এবং প্রদর্শনীর কোনো জিনিসে হাত দেওয়ার আগে অনুমতি নিন। শিশু সঙ্গে থাকলে সমাধি ও সংগ্রহশালার পরিবেশ সম্পর্কে আগে বুঝিয়ে বলুন। আবর্জনা নির্ধারিত জায়গায় ফেলুন।
রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের পদমদী গ্রামে।
সকাল ৯টা ৩০ থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক বন্ধ।
না, নিয়মিত সময়সূচিতে শুক্র ও শনিবার খোলা থাকে; সাপ্তাহিক বন্ধ বৃহস্পতিবার। বিশেষ ছুটির দিনে যাওয়ার আগে ফোন করে নিন।
রাজবাড়ীর পদমদীতে অবস্থিত মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্রে প্রবেশের জন্য কোনো টিকেটের প্রয়োজন হয় না, দর্শনার্থীদের জন্য এখানে প্রবেশ সম্পূর্ণ ফ্রি।
স্থানীয় অটো বা ইজিবাইক ঠিক করে পদমদী যেতে পারেন। বহরপুর হয়ে সরাসরি রুট অথবা বালিয়াকান্দি–আনন্দবাজার হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা স্থানীয়ভাবে মিলিয়ে নিন।
সমাধি প্রাঙ্গণ, লেখকের ভাস্কর্য, সংগ্রহশালা, গ্রন্থাগার ও বই বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কক্ষ খোলা আছে কি না কর্মীদের জিজ্ঞেস করুন।
ভেতরে ঘোরার জন্য এক–দুই ঘণ্টা রাখুন। বই পড়া বা প্রদর্শনী মন দিয়ে দেখলে আরও সময় লাগতে পারে। রাজবাড়ী থেকে যাওয়া–আসার সময় আলাদা রাখবেন।
গেস্ট রুমে সাধারণ হোটেলের মতো চাইলেই থাকা যায়, এমন নয়। থাকার অনুমতি আগে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কনফার্ম করুন।
Leave a Comment