উত্তরবঙ্গের শস্যশ্যামলা দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলায়, ঘন সবুজ গ্রামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো সবুজ রঙের মসজিদ — মেহরাবিয়া জামে মসজিদ। এর পাশেই একসময় ছিল প্রভাবশালী জমিদার মেহেরাব আলী চৌধুরীর বিশাল প্রাসাদ। মসজিদটির উঁচু মিনার, অনন্য স্থাপত্য আর চারপাশের শান্ত গ্রামীণ পরিবেশ মিলিয়ে মেহরাবিয়া জমিদার বাড়ি (Mehrabia Zamindar Bari) আজ দিনাজপুরের ইতিহাসপ্রেমী ভ্রমণকারীদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ।
মেহরাবিয়া জমিদার বাড়ি ও মসজিদ দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে বিরল উপজেলার ৩ নম্বর ধামইর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে অবস্থিত। গোবিন্দপুর গ্রামটি স্থানীয়ভাবে ‘মেহেরবাগ’ নামেও পরিচিত, যা মূলত এই জমিদারির নামেই রাখা। দিনাজপুরের অনেক ঐতিহাসিক স্থান পর্যটকদের কাছে পরিচিত হলেও মেহরাবিয়া জমিদার বাড়ি এখনও অনেকটা অনাবিষ্কৃত রত্নের মতোই রয়ে গেছে।
মেহরাবিয়া জমিদার বাড়ি যে বিরল উপজেলায় অবস্থিত, সেটি নিজেই ইতিহাসে সমৃদ্ধ। ১৯১৫ সালে থানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বিরল ১৯৮৪ সালে উপজেলায় রূপান্তরিত হয়। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এই উপজেলা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ মাত্র ২৫ জন বাঙালি ইপিআর সদস্য ৩০ জন পাকিস্তানি সৈন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে দিনাজপুর কুঠিবাড়ি দখল করেন এবং পরে বিরলে এসে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মূলত এখান থেকেই দিনাজপুর অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়।
মেহরাবিয়া জমিদার বাড়ির ইতিহাস মূলত এর প্রতিষ্ঠাতা মেহেরাব আলী চৌধুরীর জীবন ও চরিত্রের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ব্রিটিশ শাসনামলে গোবিন্দপুরে গড়ে ওঠা এই জমিদারির কর্তা ছিলেন সে যুগের হিসেবে একজন ব্যতিক্রমী মানুষ।
প্রচুর ধন-সম্পদ ও জমিদারিসুলভ আভিজাত্যের অধিকারী হয়েও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর জীবনের মানুষ। তৎকালীন কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসে ডুবে থাকা সমাজের অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন তিনি। বেশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও ছিলেন চরম যুক্তিবাদী ও রুচিশীল। প্রজাদের প্রতি তাঁর ন্যায্য আচরণ এবং দানশীলতার কারণে তিনি ইতিহাসে একটি আলাদা মর্যাদার জায়গা অধিকার করে আছেন। তাঁর এই প্রগতিশীল চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর নির্মিত স্থাপনাগুলোতেও।
১৮৮০ সালে জমিদার মেহেরাব আলী চৌধুরী তাঁর পারিবারিক গোরস্তানের পাশে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তাঁর নামানুসারেই মসজিদের নামকরণ হয় ‘মেহরাবিয়া জামে মসজিদ’, যা স্থানীয়ভাবে ‘মেহেরবাগ জামে মসজিদ’ নামেও পরিচিত। বর্তমানে মসজিদটির বয়স প্রায় ১৪৫ বছরেরও বেশি এবং এটি দিনাজপুর অঞ্চলের ইসলামি স্থাপত্যের একটি অনন্য নিদর্শন।
মেহরাবিয়া জামে মসজিদ তার স্থাপত্যের কারণে দিনাজপুরের অন্যান্য মসজিদ থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা। এর নির্মাণশৈলীতে প্রাচীন বাংলার মুসলিম ঐতিহ্য ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রীতির এক চমৎকার সংমিশ্রণ ঘটেছে।
নির্মাণ উপকরণ মসজিদটি নির্মিত হয়েছে সে আমলের প্রাচীন লাল ইট এবং চুন-সুরকির মজবুত গাঁথুনিতে। দেড় শতাব্দী পরেও এই নির্মাণ-উপকরণের দৃঢ়তা আজও অটুট, যা সেই যুগের দক্ষ কারিগরদের শিল্পনৈপুণ্যের প্রমাণ।
গম্বুজ ও মিনার মসজিদের মূল ছাদে রয়েছে চারটি বড় আকারের গম্বুজ। এর বাইরে মসজিদের বাইরের দেয়াল ও পিলারে ছোট-বড় মিলিয়ে আরও ১৫টি সুউচ্চ মিনার বা টারেট রয়েছে। এই অসংখ্য মিনারের উপস্থিতি মসজিদটিকে দূর থেকেও অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন করে তোলে।
বাইরের রঙ ও অলঙ্করণ সবুজ রঙের মনোমুগ্ধকর অবয়ব মসজিদটিকে চারপাশের সবুজ প্রকৃতির সাথে একাত্ম করে তুলেছে। মসজিদের ভেতরে ও বাইরের দেয়ালে রয়েছে সূক্ষ্ম লতাপাতার নকশা এবং জ্যামিতিক মোটিফ, যা ব্রিটিশ আমলের ইসলামি স্থাপত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বহন করে।
পারিবারিক গোরস্তান মসজিদ সংলগ্ন স্থানে রয়েছে জমিদার মেহেরাব আলী চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সমাধি। শান্ত গ্রামীণ পরিবেশে এই গোরস্তানটি মসজিদের সামগ্রিক ঐতিহাসিক পরিবেশকে আরও গভীর করে তোলে।
জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকে মেহরাবিয়া জমিদার বাড়ির মূল আবাসিক ভবন ও প্রাসাদ কালের গ্রাসে অনেকটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে মেহরাবিয়া জামে মসজিদটি স্থানীয় মানুষের নিয়মিত ব্যবহার ও যত্নের কারণে আজও সুন্দরভাবে টিকে আছে এবং এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় হয়। মসজিদটি এখন এলাকার সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মেহরাবিয়া জমিদার বাড়িতে পৌঁছাতে মূলত তিনটি ধাপে যাত্রা করতে হয়।
প্রথম ধাপ: ঢাকা থেকে দিনাজপুর
ঢাকার গাবতলী, কল্যাণপুর, মহাখালী বা উত্তরা থেকে নাবিল পরিবহন, শ্যামলী এনআর ট্রাভেলস, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, সোনারতরী পরিবহন বা আরামদায়ক স্লিপার কোচের জন্য আরাফাত পরিবহনের বাসে উঠুন। নন-এসি ভাড়া ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা, এসি ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা এবং সময় লাগে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা। ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে একতা এক্সপ্রেস (৭০৫), দ্রুতযান এক্সপ্রেস (৭৫৭) বা পঞ্চগড় এক্সপ্রেস (৭৯৩) ধরুন। শোভন চেয়ার ৪৬৫ থেকে ৫০০ টাকা, স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা। বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইট বা Rail Sheba অ্যাপে অগ্রিম টিকিট কাটুন।
দ্বিতীয় ধাপ: দিনাজপুর থেকে বিরল উপজেলা
দিনাজপুর শহরের বালুয়াডাঙ্গা স্ট্যান্ড বা বাহাদুর বাজার মোড় থেকে ইজিবাইক, অটোরিকশা বা সিএনজিতে বিরল উপজেলা সদরে যান। দূরত্ব ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার, সময় লাগে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট, জনপ্রতি ভাড়া ২০ থেকে ৩০ টাকা।
তৃতীয় ধাপ: বিরল থেকে গোবিন্দপুর (মেহেরবাগ)
বিরল উপজেলা সদর থেকে স্থানীয় অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত ভ্যান বা সিএনজিতে ধামইর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে যান। দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। চালককে “মেহরাবিয়া মসজিদ” বা “মেহেরবাগ জমিদার বাড়ি” বললেই চিনতে পারবেন।
মেহরাবিয়া জমিদার বাড়ির পাশাপাশি দিনাজপুর ও বিরল উপজেলায় আরও অনেক চমৎকার স্থান রয়েছে, যেগুলো একই ট্রিপে ঘুরে আসা যায়।
রুদ্রপুর মেটি স্কুল (দীপশিখা মেটি স্কুল)
বিরল উপজেলার মঙ্গলপুর ইউনিয়নের রুদ্রপুর গ্রামে অবস্থিত এই স্কুলটি বিশ্বের অন্যতম অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন। মাটি, বাঁশ, খড় ও কাঠ দিয়ে তৈরি এই পরিবেশবান্ধব স্কুল ভবনটি জার্মান স্থপতি আনা হেরিঙ্গারের ডিজাইনে নির্মিত এবং এটি আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার জিতেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে স্থাপত্যপ্রেমী পর্যটকরা এই স্কুল দেখতে আসেন।
বিরল স্থলবন্দর
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এই স্থলবন্দরটি দেখার একটি আলাদা অভিজ্ঞতা। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের ব্যস্ত কার্যক্রম কাছ থেকে দেখার সুযোগ এখানেই পাওয়া যায়।
দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মন্দিরটি বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর টেরাকোটা শিল্পকর্মের নিদর্শন। ১৭৫২ সালে নির্মিত এই তিনতলা মন্দিরের দেয়ালে দেয়ালে রয়েছে রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণের দৃশ্য খোদাই করা অসাধারণ পোড়ামাটির ফলক।
রামসাগর দিঘি ও জাতীয় উদ্যান
মানুষের হাতে খনন করা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দিঘি এটি। দিঘির চারপাশে সবুজ প্রকৃতি ও পিকনিক স্পটসহ রামসাগর একটি পরিপূর্ণ পরিবার-বান্ধব গন্তব্য।
শহরের কাছেই অবস্থিত এই ঐতিহাসিক রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ দিনাজপুরের মহারাজাদের গৌরবময় অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়।
কান্তজিউ মন্দিরের কাছেই ঢেপা নদীর তীরে ১৭৯৩ সালে নির্মিত এই মোগল আমলের তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি স্থাপত্যপ্রেমীদের জন্য অবশ্যদর্শনীয়।
গোর-এ-শহীদ বড় ময়দান
দিনাজপুরের কেন্দ্রে অবস্থিত এই ময়দানটি এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ঈদগাহ। এর দৃষ্টিনন্দন মিনার ও বিশাল খোলা মাঠ যেকোনো দর্শনার্থীর মন কাড়বে।
দিনাজপুর শহরে বিভিন্ন বাজেটের হোটেল রয়েছে। শহরের প্রধান সড়কে হোটেল ডায়মন্ড, হোটেল নবীন, হোটেল আল রশিদ ইন্টারন্যাশনালসহ বেশ কিছু মানসম্মত হোটেল পাওয়া যায়। নন-এসি রুম ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং এসি রুম ১,২০০ থেকে ২,৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। কান্তজিউ মন্দির ও রামসাগর এলাকায়ও কিছু পর্যটনবান্ধব আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে।
দিনাজপুরে গেলে এখানকার কাটারিভোগ চালের ভাত অবশ্যই খেতে হবে — এই সুগন্ধি চালের ভাত সারা দেশে বিখ্যাত। মৌসুম থাকলে (মে-জুন) দিনাজপুরের বেদানা লিচু খাওয়ার সুযোগ মিস করবেন না, কারণ এই লিচুর স্বাদ দেশের মধ্যে সেরা বলে বিবেচিত। এ ছাড়া স্থানীয় মিষ্টান্ন ও মাঠা (দই থেকে তৈরি পানীয়)ও চেখে দেখুন।
অক্টোবর থেকে মার্চ মাস দিনাজপুর ভ্রমণের সেরা সময়। শীতের মনোরম আবহাওয়ায় ঐতিহাসিক স্থাপনা ঘুরে দেখা, ফটোগ্রাফি করা এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা সবচেয়ে আরামদায়ক। এপ্রিল থেকে মে মাসে লিচু মৌসুমে গেলে অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া যায়।
মেহরাবিয়া মসজিদটি সক্রিয় হওয়ায় নামাজের সময় বাদে ভিতরে প্রবেশ করুন এবং পোশাক পরিমিত রাখুন। গোবিন্দপুর গ্রামে পৌঁছানোর পর স্থানীয় মানুষরা অত্যন্ত সহায়ক, প্রয়োজনে তাদের কাছ থেকে মসজিদ ও জমিদার বাড়ির ইতিহাস সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পারবেন।
মেহরাবিয়া জমিদার বাড়ি হয়তো দিনাজপুরের সবচেয়ে বিখ্যাত পর্যটন স্থান নয়, কিন্তু এখানে এলে অনুভব করা যায় এক অন্যরকম প্রশান্তি। সবুজ রঙের প্রাচীন মসজিদ, পাশের নীরব গোরস্তান, বিস্তৃত সবুজ মাঠ আর শান্ত গ্রামীণ পরিবেশ — সব মিলিয়ে এটি সেই ভ্রমণকারীদের জন্য আদর্শ, যারা কোলাহল থেকে দূরে ইতিহাসের নিঃশব্দ ছোঁয়া খোঁজেন।
Leave a Comment