কির্সতং (Kirs Taung) বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলায়, চিম্বুক রেঞ্জের মধ্যে অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ২,৯৮৯ ফুট (প্রায় ৯১১ মিটার), যা চিম্বুক রেঞ্জের সর্বোচ্চ চূড়া। পাশেই রয়েছে রুংরাং তং (Rungrang Taung) — যা কির্সতং থেকে প্রায় ৩০০ ফুট নিচু।
কির্সতং নামটি আদতে মারমা শব্দ যা এসেছে ‘কির্স’ ও ‘তং’ এর যৌথ মিলন থেকে। কির্স একটি বিলুপ্ত প্রায় পাখির নাম। এই পাখিগুলো কির্সতং এর চূড়াতেই দেখা যায়। আর ‘তং’ অর্থ হচ্ছে পাহাড়। ক্রিসতং এর সামিট থেকে তিন্দু এর পরিষ্কার ভিউ পাওয়া যায় যদিও সামিটের চারপাশে ঘন গাছপালার কারণে খুব ভাল ওয়াইড ভিউ পাও্য়া যায় না।
চিম্বুক রেঞ্জের সর্বোচ্চ চূড়া হিসেবে পরিচিত এই পাহাড়টি একসময় শত শত মাদারগাছের সংরক্ষিত বন ছিল। এই বনে বিভিন্ন প্রজাতীর বিলুপ্তপ্রায় পশু-পাখি ও প্রাণী বসবাস করে। মায়াবী এই কির্সতং এর জংগলের বেশীর ভাগ জায়গাতেই সূর্যের আলো পৌছায় না। যেখানে মেঘের সঙ্গে রোদের লুকোচুরি খেলা চলে। বিশাল বিশাল গাছের ছাউনী দিয়ে ঘেরা বনটি এখনও বেশ বুনো রয়েছে। বনের ভেতর দিয়ে হাটতে হাটতে বেশ কিছু পাখির ডাক শোনা যায়, যেগুলো এখন বিলুপ্ত প্রায়। ক্রিসতং চূড়া থেকে বহুদূরের উঁচু পাহাড়ের চূড়াগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়।
ট্রেক গাইড / এক নজরে
ট্রেকের সংক্ষিপ্ত তথ্য
কির্সতং
- বেইসক্যাম্প
- খেমচং পাড়া
- উচ্চতা
- ২৯৮৯ফুট
- ব্যাপ্তিকাল
- ৪দিন
- কাঠিন্য
- সহজ
সহজকঠিন
- সেরা সময়
- নভেম্বর – ফেব্রুয়ারি
- জানু — সেরা সময়
- ফেব — সেরা সময়
- মার্চ
- এপ্রি
- মে
- জুন
- জুল
- আগ
- সেপ্টে
- অক্টো
- নভে — সেরা সময়
- ডিসে — সেরা সময়
- অঞ্চল
- আলীকদম
- ট্রেকের ধরন
- টি-হাউজ
- উপযুক্ত
- ১৬+ বছর
- অভিজ্ঞতা
- দরকার
বাংলাদেশের শীর্ষ পর্বত তালিকায় কির্সতং
| ক্রম | পাহাড়ের নাম | উচ্চতা (ফুট) | অবস্থান |
|---|---|---|---|
| ১ | সাকা হাফং | ৩,৪৫১ | থানচি, বান্দরবান |
| ৫ | কেওক্রাডং | ৩,২৩৫ | রুমা, বান্দরবান |
| ১০ | কির্সতং | ২,৯৮৯ | আলীকদম, বান্দরবান |
| ১১ | তাজিংডং (বিজয়) | ২,৮৭১ | সাইচল রেঞ্জ |
| ১২ | রুংরাং | ~২,৭০০ | আলীকদম, বান্দরবান |
কেন কির্সতং এত বিশেষ?
কির্সতং-এর বন শুধু একটি জঙ্গল নয় — এটি একটি জীবন্ত রহস্যলোক।
- এখানে রয়েছে শত শত বছরের পুরনো সুবিশাল মাদারগাছ, যাদের ডালপালা এতটাই ঘন যে ভেতরে সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে না।
- বনটি একসময় সংরক্ষিত বন (Reserved Forest) হিসেবে পরিচিত ছিল, ফলে এখানে প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান প্রায় অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
- মেঘ আর পাহাড়ের লুকোচুরি এই বনকে দেয় এক অদ্ভুত রহস্যময় আবহ — মনে হয় যেন কোনো অন্য পৃথিবীতে ঢুকে গেছেন।
- চূড়া থেকে পরিষ্কার আবহাওয়ায় তিন্দু ও দূরের পাহাড়চূড়া দেখা যায়।
এই গহীন অরণ্যে যেসব প্রাণী দেখতে পাওয়া যায়:
- কির্স পাখি (বিলুপ্তপ্রায়, মাঝেমধ্যে দেখা মিলতে পারে)
- ধনেশ পাখি (Hornbill) — ঘন বনে এদের ডাক শোনা যায়
- বন্য শূকর (Wild Boar)
- ভালুক (Wild Bear) — পথে মাঝেমধ্যে চিহ্ন মেলে
- বিভিন্ন দুর্লভ পাখি ও পতঙ্গ প্রজাতি
কির্সতং সামিটের সেরা সময়
| মৌসুম | সময়কাল | অবস্থা |
|---|---|---|
| সেরা সময় | নভেম্বর – ফেব্রুয়ারি | শীতকালে পথ শুকনো, আবহাওয়া সুন্দর, মেঘের সমুদ্র দেখার সুযোগ |
| সতর্কতা | মার্চ – মে | গরমে কষ্টকর, তবে যাওয়া সম্ভব |
| বিপজ্জনক | জুন – অক্টোবর | বর্ষায় পথ অত্যন্ত পিচ্ছিল, ঝিরিতে বান আসে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি |
২০২৩ সালের আগস্টে একজন অভিজ্ঞ ট্যুর গাইড কির্সতং-সংলগ্ন সাইঙপ্রা ছড়ায় পিছলে পড়ে মারা যান। বর্ষায় এই পথে কখনোই ট্রেকিং এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।
কির্সতং সামিট / যাওয়ার উপায়
ঢাকা থেকে আলীকদম যেতে হবে প্রথমে। আলীকদমের সরাসরি বাসের ভাড়া ৮৫০ টাকা। সরাসরি আলীকদমের বাস না পেলে কক্সবাজারের যেকোনো বাসে উঠে চকোরিয়া নামতে হবে। সেখান থেকে আলীকদম। আলীকদম এসে পানবাজার থেকে গাইড ঠিক করতে হবে। গাইডের খরচ খুব বেশি না। দরদাম করে নিতে হবে যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট ফি নেই। সেখান থেকে বাইক বা চান্দের গাড়ি তে করে ১৩ কিলো যেতে হবে। বাইকে জনপ্রতি ২০০ আর চান্দের গাড়ি ২৫০০-৩০০০ টাকা। ১৩ কিলো নেমে দুসরী বাজার যাবেন। সেখান থেকে ট্রেকিং করে মেনকিউ পাড়া যেতে হবে। সেখান থেকে মেনিয়াংক পাড়া। রাতে মেনিয়াংক পাড়ায় থাকতে হবে। যদি পানবাজার থেকে গাইড না পাওয়া যায় তাহলে নিজেরাই মেনিয়াংক পাড়ায় আসতে হবে।
মেনিয়াংক পাড়া থেকে দেড় ঘন্টা হাঁটলেই রুংরাং তং। আর তারপরেই খেমচং পাড়া। খেমচং পাড়া পার হয়ে কির্সতং সামিট করে চলে যেতে হবে মঙ্গলপাড়া। সেখান থেকে ১৩ কিলো। এরপর আবার আলীকদম হয়ে ঢাকা।
ধাপে ধাপে রুট গাইড
ধাপ ১: ঢাকা থেকে আলীকদম
সরাসরি বাস:
- হানিফ, শ্যামলী বা অন্য পরিবহনে ঢাকা থেকে সরাসরি আলীকদম যাওয়া যায়
- নন-এসি ভাড়া: ৮৫০–৯০০ টাকা
বিকল্প পথ:
- যেকোনো কক্সবাজারগামী বাসে চকরিয়া নেমে, সেখান থেকে লোকাল বাস বা চান্দের গাড়িতে আলীকদম
ধাপ ২: আলীকদমে পৌঁছে করণীয়
- আলীকদমের পানবাজার থেকে লোকাল গাইড নিন (গাইড ছাড়া যাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ)
- গাইড ফি নিয়ে আলোচনা করুন (কোনো নির্দিষ্ট রেট নেই)
- চেকপোস্টে রিপোর্ট করুন (বিস্তারিত নিচে)
- মোটরবাইক (জনপ্রতি ≈ ২০০ টাকা) অথবা চান্দের গাড়ি (≈ ২,৫০০–৩,০০০ টাকা) ভাড়া করুন “১৩ কিলো” পয়েন্টে যেতে
ধাপ ৩: ট্রেকিং রুট
আলীকদম → ১৩ কিলো পয়েন্ট → দুসরি বাজার → মেনকিউ পাড়া → মেনিয়াং পাড়া (রাত্রিযাপন) → রুংরাং তং → খেমচং পাড়া → কির্সতং চূড়া → মংগল পাড়া → ১৩ কিলো → আলীকদম
কোন দিন কেমন ট্রেকিং করতে হবে?
| দিন | রুট | আনুমানিক সময় |
|---|---|---|
| দিন ১ | আলীকদম → মেনিয়াং পাড়া | ৫–৬ ঘণ্টা ট্রেকিং |
| দিন ২ | মেনিয়াং পাড়া → রুংরাং → কির্সতং | ৬–৮ ঘণ্টা |
| দিন ৩ | কির্সতং → মংগল পাড়া → আলীকদম | ৪–৫ ঘণ্টা |
থাকার ও খাবারের ব্যবস্থা
এই ট্রেকে কোনো হোটেল বা রেস্তোরাঁ নেই। সম্পূর্ণ আদিবাসী পাড়ানির্ভর জীবনযাপন। রাতে আদীবাসী পাড়াতেই থাকা যাবে। এর জন্য পাড়ার কারবারীর সাথে প্রথমেই কথা বলে নিতে হবে। সাধারণত প্রতিটা পাড়ার কারবারীর বাড়িতেই অতিথীদের থাকার ব্যবস্থা হয়।
| বিষয় | বিস্তারিত |
|---|---|
| থাকা | বাঁশ ও কাঠের মাচাং ঘরে (মেনিয়াং পাড়া বা খেমচং পাড়া) |
| খাবার | জুমের চাল, পাহাড়ি মুরগি, পাহাড়ি সবজি — আদিবাসী পরিবার রান্না করে দেন |
| ট্রেইলে খাবার | শূন্য! ট্রেইলে কোনো দোকান নেই — শুকনো খাবার (খেজুর, বাদাম, বিস্কুট, চকলেট) সাথে নিন |
আর্মি পারমিশন: কীভাবে নেবেন?
কির্সতং যেতে হলে সেনাবাহিনীর চেকপোস্টে রিপোর্ট করা বাধ্যতামূলক। নিচে বিস্তারিত প্রক্রিয়া দেওয়া হলো:
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
- দলের প্রতিটি সদস্যের অরিজিনাল NID কার্ড (সাথে ৩–৪ কপি ফটোকপি)
- সদস্যদের নাম, বয়স, পেশা, রক্তের গ্রুপ, মোবাইল নম্বর ও ইমার্জেন্সি কন্টাক্ট নম্বরের তালিকা
সময়সীমা
- চেকপোস্ট সকাল ১০টার আগে পার হতে হবে
- বহু-দিনের ট্রেকের জন্য গাইড আগে থেকেই ক্যাম্পে সব তথ্য জানিয়ে রাখবেন
আলীকদম ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় মাঝেমধ্যে নিরাপত্তা কারণে গহীন পাহাড়ে প্রবেশে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। যাওয়ার অন্তত ৭ দিন আগে আপনার গাইডের সাথে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি যাচাই করুন।
গাইড
কির্সতং যেতে চাইলে গাইড নেয়া বাধ্যতামূলক।
- গাইড ফারুক – 01869001454
- রাজু – 01890609437
- মানিক – 01826614935
সতর্কতা এবং প্রস্তুতি
পাহাড়ি রাস্তায় হাটলে, শরীর থেকে অনেক পানি বেরিয়ে যায়। আর সব সময় কাছাকাছি পানির সোর্স নাও থাকরে পারে। তাই পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি সাথে রাখতে হবে। সাথে স্যালাইন, গ্লুকোজ থাকলে ভাল। অতি দূর্গম এরিয়া, তাই খাবার সোর্স কম। আপনি চাইলেই দোকান থেকে খাবার কিনে খেতে পারবেন না, সেই অপশন নেই এখানে। তাই পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবার সাথে করে নিয়ে যাওয়া ভাল। ম্যালেরিয়া প্রবণ এরিয়া, তাই ম্যালেরিয়া এর প্রতিষেধক নিয়ে যেতে হবে। অফ রোডে ট্রেকিং করতে হবে। সেক্ষেত্রে লোকাল গাইড নিয়ে নিতে হবে। পাহাড়ী ট্রেইল ধরে হাটা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই একটি ট্রেকিং স্টিক বেশ কাজের জিনিস। রাতে ট্রেক এর জন্য একটি হ্যাডল্যাম্প আদর্শ।
কী কী নেবেন: প্রস্তুতি তালিকা
অপরিহার্য
- ভালো গ্রিপের ট্রেকিং জুতো
- ট্রেকিং পোল বা শক্ত বাঁশের লাঠি
- হেডল্যাম্প + অতিরিক্ত ব্যাটারি
- পর্যাপ্ত পানি (অন্তত ২–৩ লিটার সাথে রাখুন)
- ওরাল স্যালাইন ও গ্লুকোজ
- ফার্স্ট এইড কিট
স্বাস্থ্য সুরক্ষা
- ম্যালেরিয়া প্রতিরোধক ওষুধ (এলাকাটি ম্যালেরিয়া-প্রবণ)
- ওডোমস বা মশা তাড়ানোর ক্রিম
- লবণ বা গুল (জোঁক তাড়াতে)
- রেইনকোট বা পনচো
আনুমানিক খরচ
| খাত | টাকা (আনুমানিক) |
|---|---|
| ঢাকা–আলীকদম বাস (যাওয়া-আসা) | ১,৭০০–১,৮০০ |
| গাইড ফি (৩ দিন) | ২,৫০০–৩,৫০০ |
| চান্দের গাড়ি বা বাইক (শেয়ার) | ৫০০–৮০০ |
| থাকা-খাওয়া (পাড়ায়) | ৮০০–১,২০০ |
| শুকনো খাবার ও পানীয় | ৫০০–৮০০ |
| মোট (জনপ্রতি আনুমানিক) | ৬,০০০–৮,০০০ |
ট্র্যাভেল এজেন্সির মাধ্যমে গেলে জনপ্রতি ৬,০০০–৮,০০০ টাকায় সম্পূর্ণ ৩-৪ দিনের প্যাকেজ (যাতায়াত, গাইড, থাকা-খাওয়া সহ) পাওয়া যায়।
আমাদের সবার ভ্রমণ নিরাপদ হোক, এটাই হোক আমাদের সকলের চাওয়া।