বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলায় অবস্থিত কাওয়াদিঘি হাওর (Kawadinghi Haor) এক অনবদ্য প্রাকৃতিক জলভূমি যা কাউয়াদীঘি হাওর নামেও পরিচিত। হাকালুকি বা টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো জাতীয়ভাবে তেমন পরিচিত না হলেও, এই হাওরের শান্ত নির্জনতা, হিজল-করচের বন এবং বিশেষত “অন্তেহরি জলের গ্রাম” পর্যটকদের মুগ্ধ করে রাখে। বছরের ৬ থেকে ৮ মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকা এই হাওরটি ২০১৮ সালে জেলা প্রশাসন কর্তৃক আনুষ্ঠানিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষিত হয়। এখানকার প্রচলিত প্রবাদ —
“বর্ষায় নাও, হেমন্তে পাও” — এই একটি লাইনেই হাওরের জীবনযাত্রার সারাংশ লুকিয়ে আছে।
কাওয়াদিঘি হাওরের পশ্চিম প্রান্তে ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত অন্তেহরি গ্রাম এই হাওরের প্রধান আকর্ষণ। বর্ষায় গ্রামের চারপাশ পানিতে তলিয়ে গেলে মনে হয় বাড়িঘরগুলো জলের উপর ভাসছে — একটি যেন স্বপ্নের “ভাসমান গ্রাম”। তখন গ্রামের ভেতরে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে নৌকা।
হাওরের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা হিজল, করচ ও তমাল গাছের সারি এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করে। বর্ষায় পানিতে অর্ধেক ডুবে থাকা এই গাছগুলো হাওরের সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই গাছগুলো গ্রামবাসীদের ঘরবাড়িকে মৌসুমী ঢেউ থেকে রক্ষাও করে।
বর্ষাকালে হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে ফুটে থাকে অগণিত সাদা ও লাল শাপলা, শালুক এবং নানা জলজ উদ্ভিদ। এই দৃশ্য দেখলে মনে হবে যেন কোনো চিত্রশিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির ভেতরে ঢুকে পড়েছেন।
শীত মৌসুমে হাওরটি পরিণত হয় দেশি-বিদেশি পরিযায়ী পাখির স্বর্গরাজ্যে। বক, শালিক, পানকৌড়ি, শীতের হাঁস সহ অনেক প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে হাওর মুখর থাকে। প্রকৃতিপ্রেমী ও পাখি পর্যবেক্ষকদের জন্য এটি এক অনন্য সুযোগ।
অন্তেহরি বাজারের ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করে হাওর ভ্রমণ করুন।
| ভ্রমণের ধরন | সময় | আনুমানিক ভাড়া |
|---|---|---|
| ছোট ডিঙি নৌকা | ২–৩ ঘণ্টা | ৩০০–৫০০ টাকা |
| বড় নৌকা (দলগত) | ২–৪ ঘণ্টা | ৫০০–১০০০ টাকা |
নৌকায় ওঠার আগে মাঝির সাথে দরদাম করে নিন। ছুটির দিনে ভাড়া বেশি হতে পারে।
হাওর এলাকার মানুষের সরল জীবনযাপন দেখার সুযোগও এখানে পাবেন। জেলেদের জাল ফেলা, নৌকায় করে মাছ ধরার দৃশ্য এবং হাওরের তাজা রুই, কাতলা, বোয়াল মাছ — সবকিছু মিলিয়ে এটি এক অনন্য গ্রামীণ অভিজ্ঞতা।
| মৌসুম | সময়কাল | বিশেষত্ব |
|---|---|---|
| বর্ষাকাল | জুলাই – অক্টোবর | চারদিকে থইথই পানি, জলের গ্রাম, নৌকায় ভ্রমণ, শাপলা-শালুকের সৌন্দর্য |
| শরৎ-হেমন্তকাল | অক্টোবর – নভেম্বর | পানি কমতে শুরু করে, স্বচ্ছ আকাশ, মনোরম আবহাওয়া |
| শীতকাল | নভেম্বর – ফেব্রুয়ারি | সবুজ প্রান্তর, পরিযায়ী পাখি, হাঁটাপথে গ্রাম ভ্রমণ |
| গ্রীষ্মকাল | মার্চ – জুন | তুলনামূলক কম আকর্ষণীয়, তবে প্রাক-বর্ষার প্রস্তুতি দেখা যায় |
পরামর্শ: জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে গেলে হাওরের আসল রূপ উপভোগ করতে পারবেন। বাসে যেতে চাইলে ঢাকার সায়দাবাদ, ফকিরাপুল বা মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি মৌলভীবাজারগামী এসি (AC) ও নন-এসি (Non-AC) বাসে যাতায়াত করা যায়। শ্যামলী, হানিফ, ইউনিক এবং এনা পরিবহন এ রুটের জনপ্রিয় বাস সার্ভিস। যাত্রাপথ অতিক্রম করতে সাধারণত ৫–৬ ঘণ্টা সময় লাগে। নন-এসি বাসের ভাড়া প্রায় ৩৫০–৫০০ টাকা এবং এসি বাসের ভাড়া ৬০০–১,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
ট্রেনে যেতে চাইলে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে পারাবত এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস অথবা কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনে শ্রীমঙ্গল বা কুলাউড়া রেলস্টেশনে নামা যায়। এরপর সেখান থেকে বাস বা সিএনজি অটোরিকশায় মৌলভীবাজার শহরে পৌঁছানো যায়। ট্রেনে যাত্রা করতে সাধারণত ৪–৫ ঘণ্টা সময় লাগে।
বিমানে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ৪৫ মিনিটের ফ্লাইটে পৌঁছানো যায়। এরপর বিমানবন্দর থেকে গাড়ি বা বাসে প্রায় ১.৫–২ ঘণ্টার মধ্যে মৌলভীবাজার শহরে পৌঁছানো সম্ভব।
মৌলভীবাজার শহর থেকে কাওয়াদিঘি হাওরের অন্তেহরি গ্রামের দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। শহরের চাঁদনীঘাট ব্রিজ সংলগ্ন জগতপুর স্ট্যান্ড থেকে সিএনজি অটোরিকশায় সরাসরি অন্তেহরি বাজারে যাওয়া যায়। এ পথে জনপ্রতি ভাড়া সাধারণত ৩০–৩৫ টাকা। এছাড়া সুবিধামতো সময়ে ঘোরাঘুরি করতে চাইলে রিজার্ভ সিএনজি বা অন্য গাড়ি ভাড়া নেওয়াও ভালো বিকল্প। রিজার্ভ গাড়ির ভাড়া সাধারণত আলোচনা সাপেক্ষে নির্ধারণ করা হয়।
হাওরের একদম কাছে আবাসিক সুবিধা নেই, তাই মৌলভীবাজার শহর বা শ্রীমঙ্গলে থেকে দিনে দিনে হাওর ঘুরে আসাটাই সবচেয়ে ভালো।
| হোটেল/রিসোর্ট | বিশেষত্ব |
|---|---|
| Grand Sultan Tea Resort & Golf ⭐⭐⭐⭐⭐ | সর্বোচ্চ বিলাসবহুল, সুইমিংপুল, গলফ কোর্স, স্পা |
| DuSai Resort & Spa ⭐⭐⭐⭐⭐ | মৌলভীবাজার-শ্রীমঙ্গল রোডে, বাংলাদেশের সেরা বুটিক রিসোর্ট |
| Novem Eco Resort ⭐⭐⭐⭐ | প্রকৃতিঘেঁষা ইকো রিসোর্ট, শান্ত পরিবেশ |
| Balishira Resort ⭐⭐⭐ | ছিমছাম, পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় |
| Lemon Garden Resort ⭐⭐⭐ | লাউয়াছড়ার কাছে, লেবু বাগানের মাঝে |
| Tea Heaven Resort ⭐⭐⭐ | বাজেট-বান্ধব, সুইমিংপুলসহ |
কাওয়াদিঘি হাওর এলাকায় বড় কোনো রেস্টুরেন্ট নেই, তাই ভ্রমণ শেষে মৌলভীবাজার শহরে ফিরে খাবার খাওয়াই সবচেয়ে সুবিধাজনক। তবে অন্তেহরি বাজারে কয়েকটি ছোট চায়ের দোকান ও স্থানীয় খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে হালকা নাস্তা বা সাধারণ খাবার পাওয়া যায়। চাইলে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আগে থেকেই কথা বলে তাদের বাড়িতে খাবারের ব্যবস্থা করতে পারেন, যা আপনাকে এলাকার আতিথেয়তা ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেবে। এছাড়া হাওরের তাজা দেশীয় মাছ, যেমন রুই, কাতলা, বোয়াল ও শোলের স্বাদ অবশ্যই নেওয়া উচিত। এসব মাছের স্বাদ অত্যন্ত সুস্বাদু এবং স্থানীয় রান্নার বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে।
একই ট্রিপে আরও কিছু জায়গা ঘুরে নিতে পারেন:
| স্থান | দূরত্ব | বিশেষত্ব |
|---|---|---|
| হাকালুকি হাওর | ৩০–৪০ কিমি | বাংলাদেশের বৃহত্তম হাওর |
| লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান | ৩৫ কিমি (শ্রীমঙ্গল) | বিরল উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী |
| মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত | ৫০ কিমি | বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ঝর্ণা |
| চা-বাগান, শ্রীমঙ্গল | ৩০ কিমি | বিশ্বখ্যাত চা রাজধানী |
| মনিপুরী পল্লী | ২০ কিমি | অনন্য সংস্কৃতি ও হস্তশিল্প |
| খরচের খাত | আনুমানিক পরিমাণ |
|---|---|
| ঢাকা → মৌলভীবাজার (বাস/ট্রেন) | ৩৫০–১০০০ টাকা |
| মৌলভীবাজার → অন্তেহরি (সিএনজি) | ৩০–৩৫ টাকা (জনপ্রতি) |
| নৌকা ভাড়া (ভাগাভাগি) | ৮০–২০০ টাকা |
| খাবার | ৩০০–৬০০ টাকা |
| থাকা (বাজেট হোটেল) | ৫০০–১৫০০ টাকা |
| মোট (১ রাত/২ দিন) | ~১,৫০০–৪,০০০ টাকা |
কাওয়াদিঘি হাওর বা কাউয়াদীঘি হাওর কোনো গ্ল্যামারাস পর্যটনস্থল নয় — এটি বাংলাদেশের অকৃত্রিম প্রকৃতি ও সরল মানুষের জীবনের সাথে একাত্ম হওয়ার জায়গা। বর্ষার নীল জলে নৌকায় ভেসে হিজল বনের মাঝে হারিয়ে যাওয়া, কিংবা শীতের সকালে পরিযায়ী পাখির ডাকে জেগে ওঠা — এই অভিজ্ঞতা শহুরে ব্যস্ততা থেকে আপনাকে দেবে এক মনোরম মুক্তি।
Leave a Comment