বান্দরবান, রাঙ্গামাটি বা চট্টগ্রামের পাহাড়ে ট্রেকিং বা হাইকিংয়ের পরিকল্পনা করছেন? তাহলে যাত্রার আগে একটি গোছানো পাহাড় ভ্রমণের প্যাকিং লিস্ট তৈরি করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। পাহাড়ি ট্রেইল খাড়া ও পিচ্ছিল, আবহাওয়া হঠাৎ বদলে যায়। অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ, নেটওয়ার্ক বা দোকানপাট সহজে মেলে না। তাই শহরে যে জিনিসকে সামান্য মনে হয়, পাহাড়ে সেটাই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে দরকারি। এই লেখায় ধাপে ধাপে জানব পরিচয়পত্র, পোশাক, জুতা, ওষুধ, গ্যাজেট, খাবার ও টাকার প্রস্তুতি। বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রামের ট্রেকিংয়ে আলাদা কী মাথায় রাখবেন, তাও থাকছে। শেষে পাবেন একটি সহজ চেকলিস্ট।
পাহাড় ভ্রমণে ব্যাগ গোছানোর মূল কথা হলো “যা দরকার, শুধু তা-ই”। ভারী ব্যাগ নিয়ে খাড়া পথে ওঠা যেমন কষ্টের, তেমনি জরুরি জিনিস ভুলে গেলে পুরো ভ্রমণের আনন্দ মাটি হতে পারে। চলুন শুরু করা যাক।
পার্বত্য এলাকায় যাতায়াতের পথে বিভিন্ন চেকপোস্টে পরিচয় দেখাতে বা তথ্য দিতে হতে পারে। তাই জাতীয় পরিচয়পত্র (শিক্ষার্থী হলে জন্মনিবন্ধন বা স্টুডেন্ট আইডি) মূল কপি সঙ্গে রাখুন, সঙ্গে কয়েকটি ফটোকপি। ফোনেও একটি ছবি তুলে রাখতে পারেন, তবে শুধু ফোনের ওপর ভরসা করবেন না। বিদেশি পর্যটক হলে পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্রের বিষয়ে আগেই খোঁজ নিন।
দলবদ্ধ ভ্রমণে সবার নাম, বয়স, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বরের একটি তালিকা কাগজে লিখে রাখুন। অনেক সময় গাইড বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এই তথ্য চাইতে পারে। পরিবারের একজন সদস্যকে আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনা, থাকার জায়গা ও ফেরার সম্ভাব্য তারিখ জানিয়ে রাখুন।
পাহাড়ি এলাকায় নিরাপত্তা বা আবহাওয়ার কারণে মাঝে মাঝে কিছু জায়গায় যাতায়াতে বিধিনিষেধ থাকতে পারে। রওনা দেওয়ার আগে স্থানীয় সংবাদ, পরিচিত ট্যুর অপারেটর বা রিসোর্টের সঙ্গে কথা বলে সর্বশেষ অবস্থা জেনে নিন। থাকার জায়গা, বিশেষ করে ছুটির মৌসুমে, আগে থেকে বুকিং দিয়ে রাখা ভালো।
শীতকালে পাহাড়ের দিন আরামদায়ক হলেও রাত আর ভোর বেশ ঠান্ডা হয়। তাই একটি হালকা জ্যাকেট বা সোয়েটার, মাফলার বা টুপি সঙ্গে নিন। গরমের সময় ঢিলেঢালা সুতির জামা সবচেয়ে আরামদায়ক, ঘাম শুকায় তাড়াতাড়ি। বর্ষায় পাহাড় সবচেয়ে সবুজ ও সুন্দর, কিন্তু বৃষ্টি যেকোনো সময় নামতে পারে, তাই রেইনকোট বা পঞ্চো এবং দ্রুত শুকায় এমন কাপড় রাখুন।
একটি মোটা পোশাকের চেয়ে কয়েকটি পাতলা স্তর বেশি কার্যকর। ভোরে ঠান্ডায় সব স্তর পরে নিন, দুপুরে রোদ চড়লে একটি একটি করে খুলে ফেলুন। এতে ব্যাগও হালকা থাকে, আর হঠাৎ আবহাওয়া বদলালেও মানিয়ে নেওয়া সহজ হয়। ট্রেকিংয়ের জন্য জিন্সের বদলে হালকা ট্রাউজার বা ট্র্যাক প্যান্ট ভালো, কারণ জিন্স ভিজলে ভারী হয়ে যায় এবং শুকাতে দেরি হয়।
পাহাড়ে ঠিক জুতা মানেই অর্ধেক ভ্রমণ সফল। ঝরনা বা ট্রেইলে হাঁটতে ভালো গ্রিপের ট্রেকিং জুতা বা স্ট্র্যাপওয়ালা স্যান্ডেল নিন। এগুলো পিচ্ছিল পাথরেও পা ধরে রাখে। নতুন জুতা কিনলে ভ্রমণের আগে কয়েকদিন পরে অভ্যস্ত হয়ে নিন, নইলে ফোস্কা পড়তে পারে। অতিরিক্ত এক জোড়া মোজা এবং রিসোর্টে পরার জন্য হালকা স্যান্ডেল রাখাও ভালো।
উঁচু জায়গায় রোদ বেশ কড়া মনে হয়। সানস্ক্রিন, সানগ্লাস আর একটি টুপি বা ক্যাপ সঙ্গে রাখুন। মোবাইল, টাকা ও কাগজপত্র ভেজা থেকে বাঁচাতে কয়েকটি জিপলক ব্যাগ বা ওয়াটারপ্রুফ পাউচ নিন। ব্যাগের জন্য রেইন কাভার থাকলে বর্ষায় অনেক ঝামেলা কমে যায়।
দুর্গম ট্রেইলে ফার্মেসি সবসময় হাতের কাছে থাকে না। তাই একটি ছোট ফার্স্ট এইড কিট তৈরি করুন। এতে রাখুন ব্যান্ডেজ, তুলা, অ্যান্টিসেপটিক ও খাবার স্যালাইন। সঙ্গে সাধারণ ব্যথা, জ্বর ও পেটের সমস্যার প্রাথমিক ওষুধ নিন। কোন ওষুধ নেবেন সে বিষয়ে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি রাস্তা বেশ আঁকাবাঁকা। ট্রেইলের শুরুতে পৌঁছাতেই অনেকের বমিভাব হয়। যাদের এই সমস্যা আছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ সঙ্গে রাখুন এবং যাত্রার আগে ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন। যারা নিয়মিত ওষুধ খান, তারা প্রয়োজনের চেয়ে কয়েক দিনের বেশি ওষুধ নিন।
পাহাড়ি বনাঞ্চলে মশার উপদ্রব থাকতে পারে। তাই মশা-নিরোধক ক্রিম বা স্প্রে রাখুন, সন্ধ্যায় লম্বা হাতার পোশাক পরুন। বর্ষায় ট্রেইলে জোঁক দেখা যায়; লম্বা মোজা পরা এবং সঙ্গে একটু লবণ রাখা কাজে আসে।
অচেনা ট্রেইলে একা না গিয়ে অভিজ্ঞ স্থানীয় গাইড নিন। অন্ধকার হওয়ার আগেই ফেরার চেষ্টা করুন, আর পিচ্ছিল খাদের কিনারায় ছবি তোলার ঝুঁকি নেবেন না। ঝরনা বা নদীতে নামার আগে গাইডের কাছে পানির গভীরতা ও স্রোত জেনে নিন।
ট্রেকিং রুটের পাহাড়ি পাড়া বা ক্যাম্পে বিদ্যুৎ সীমিত থাকে। কোথাও সৌর বিদ্যুৎই ভরসা। তাই একটি ভালো পাওয়ার ব্যাংক নিন এবং সুযোগ পেলেই চার্জ দিয়ে রাখুন। রাতে চলাফেরার জন্য টর্চ বা হেডল্যাম্প খুব কাজের, সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যাটারি রাখুন। একাধিক ডিভাইস থাকলে মাল্টিপ্লাগ নেওয়া যেতে পারে।
দুর্গম এলাকায় সব মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্ক সমানভাবে পাওয়া যায় না। দলের সদস্যরা ভিন্ন ভিন্ন অপারেটরের সিম রাখলে যোগাযোগ সহজ হয়। প্রয়োজনীয় নম্বর, বুকিংয়ের তথ্য ও অফলাইন ম্যাপ আগেই ফোনে ডাউনলোড করে রাখুন।
শহরের বাইরে এটিএম বা মোবাইল ব্যাংকিং সবসময় পাওয়া যায় না। নেটওয়ার্কের কারণে লেনদেন আটকেও যেতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় নগদ টাকা সঙ্গে রাখুন। টাকা ভাগ করে ব্যাগের আলাদা জায়গায় রাখুন। ছোট নোট রাখলে স্থানীয় দোকান বা যানবাহনে ভাড়া দিতে সুবিধা হয়।
ট্রেইলে বা দীর্ঘ যাত্রায় পথে খাবারের দোকান না-ও মিলতে পারে। একটি রিফিলযোগ্য পানির বোতল এবং বিস্কুট, বাদাম, খেজুর বা চকলেটের মতো শুকনো খাবার সঙ্গে রাখুন। পানি বিশুদ্ধ কিনা নিশ্চিত না হলে ফোটানো বা বোতলজাত পানি পান করুন।
বান্দরবানের অনেক ট্রেইল ঝিরিপথ, পাথুরে ঢাল ও নদীপথের সঙ্গে জড়িত। কপিতাল বা কির্সতং সামিটের মতো রুটে কয়েক দিন হাঁটতে হতে পারে। তাই ভালো গ্রিপের জুতা, দ্রুত শুকায় এমন কাপড় আর ওয়াটারপ্রুফ পাউচ জরুরি। ব্যাকপ্যাক হালকা রাখুন, কারণ খাড়া পথে প্রতিটি কেজি ভারী মনে হয়। দূরের এলাকায় যেতে স্থানীয় গাইড ও প্রয়োজনীয় অনুমতির বিষয়ে আগেই খোঁজ নিন। নিয়মকানুন সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে।
রাঙ্গামাটিতে পাহাড়ের পাশাপাশি হ্রদ ও নৌপথ ভ্রমণের বড় অংশ। অনেক ট্রেইলে পৌঁছাতে নৌকায় যেতে হতে পারে। তাই মোবাইল, টাকা ও কাগজপত্র ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগে রাখুন। রোদ থেকে বাঁচতে টুপি ও সানস্ক্রিন সঙ্গে নিন। দুর্গম এলাকায় যাওয়ার আগে স্থানীয় প্রশাসন বা অভিজ্ঞ গাইডের কাছ থেকে সর্বশেষ নিয়ম ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি জেনে নিন।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই এলাকায় অনেক জনপ্রিয় ঝরনা ট্রেইল ও পাহাড়ি পথ আছে। শহর থেকে কাছে হওয়ায় অনেকে দিনে গিয়ে দিনেই ফেরেন। তবে ছোট ট্রেইলেও ঝিরিপথের পাথর বেশ পিচ্ছিল। তাই গ্রিপওয়ালা জুতা, অতিরিক্ত মোজা, পানি ও শুকনো খাবার নিন। বর্ষায় ঝরনায় পানির স্রোত হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। ট্রেইলে নামার আগে স্থানীয় গাইডের পরামর্শ নিন এবং অন্ধকারের আগেই ফিরুন।
পাহাড় শুধু আমাদের বেড়ানোর জায়গা নয়, অনেক মানুষের ঘরবাড়ি। প্লাস্টিক বা ময়লা যেখানে-সেখানে ফেলবেন না; একটি ময়লার ব্যাগ সঙ্গে রাখুন এবং ফেরার সময় তা নিয়েই ফিরুন। স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রীতিনীতিকে সম্মান করুন, কারও ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন, আর উচ্চস্বরে গান-বাজনা করে পরিবেশ নষ্ট করবেন না।
যাত্রার আগের রাতে নিচের তালিকা মিলিয়ে নিন:
চাকাওয়ালা স্যুটকেসের চেয়ে আরামদায়ক স্ট্র্যাপওয়ালা ব্যাকপ্যাক বেশি সুবিধাজনক, কারণ পাহাড়ি পথে চাকা চালানো কঠিন। ব্যাগ যেন কাঁধে ভার ঠিকমতো ভাগ করে নেয় এবং যতটা সম্ভব হালকা থাকে।
দিনে হাঁটার সময় হালকা কাপড় যথেষ্ট হয়। কিন্তু রাত ও ভোরে পাহাড়ে বেশ ঠান্ডা পড়ে। তাই একটি জ্যাকেট বা সোয়েটার, মাফলার ও অতিরিক্ত মোজা নিন। লেয়ার করে পরা যায় এমন কাপড় সবচেয়ে ভালো।
বর্ষায় ঝরনা আর সবুজ পাহাড় সবচেয়ে সুন্দর থাকে, তবে পথ পিচ্ছিল হয় এবং কোথাও পাহাড়ধসের ঝুঁকি থাকতে পারে। গেলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে, অভিজ্ঞ গাইড নিয়ে এবং রেইনকোট ও ভালো জুতা সঙ্গে নিয়ে যান।
শহর ও জনপ্রিয় জায়গায় সাধারণত পাওয়া যায়, কিন্তু দুর্গম এলাকায় নেটওয়ার্ক দুর্বল বা অনুপস্থিত থাকতে পারে। তাই দলের মধ্যে ভিন্ন অপারেটরের সিম রাখা এবং জরুরি তথ্য আগে থেকে সংরক্ষণ করা ভালো।
একটি ভালোভাবে সাজানো পাহাড় ভ্রমণের প্যাকিং লিস্ট আপনার যাত্রাকে করে তুলবে নিশ্চিন্ত, নিরাপদ আর আনন্দময়। কাগজপত্র, মৌসুম বুঝে পোশাক, ঠিক জুতা, ফার্স্ট এইড কিট, চার্জের ব্যবস্থা আর নগদ টাকা গুছিয়ে নিন। তাহলে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি বা চট্টগ্রামের ট্রেইল আপনাকে শুধু সুন্দর স্মৃতিই উপহার দেবে। আর প্রকৃতিকে যেমন পেয়েছেন, তেমনই রেখে আসুন। তাহলে ব্যাগ গুছিয়ে ফেলুন, পাহাড় অপেক্ষা করছে!
Leave a Comment