dublar-char-sundarban-02
dublar-char-sundarban

দুবলার চর

জন
Type পোস্ট
Reading Time ৫ মিনিটস

দুবলার চর বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের দক্ষিণে, কটকার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং হিরণ পয়েন্টের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি দ্বীপ যা চর নামে হিন্দুধর্মের পূণ্যস্নান, রাসমেলা এবং হরিণের জন্য বহুল পরিচিত। কুঙ্গা ও মরা পশুর নদের মাঝে এটি একটি বিচ্ছিন্ন চর।

দুবলার চর মূলত জেলে গ্রাম। মাছ ধরার সঙ্গে চলে শুঁটকি শোকানোর কাজ। বর্ষা মৌসুমের ইলিশ শিকারের পর বহু জেলে চার মাসের জন্য সুদূর কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ, বাগেরহাট, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা থেকে ডেরা বেঁধে সাময়িক বসতি গড়ে সেখানে। মেহেরআলীর খাল, আলোরকোল, মাঝেরচর, অফিসকেল্লা, নারিকেলবাড়িয়া, মানিকখালী, ছাফরাখালী ও শ্যালারচর ইত্যাদি এলাকায় জেলে পল্লী স্থাপিত হয়। এই চার মাস তারা মাছকে শুঁটকি বানাতে ব্যস্ত থাকেন। এখান থেকে আহরিত শুঁটকি চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জের পাইকারী বাজারে মজুদ ও বিক্রয় করা হয়। সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের সদর দপ্তর বাগেরহাট থেকে মাছ সংগ্রহের পূর্বানুমতিসাপেক্ষে বহরদার ও জেলেরা দুবলার চরে প্রবেশ করে থাকেন। দুবলার চর থেকে সরকার নিয়মিত হারে রাজস্ব পেয়ে থাকে। প্রতি বছর বিএলসি বা বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট, ডিএফসি বা ডেইলি ফুয়েল (জ্বালানি কাঠ) কন্‌যাম্পশন ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় বন বিভাগকে রাজস্ব প্রদান করে মৎস্য ব্যবসায়ীগণ সুন্দরবনে ঢোকার অনুমতি পান, এছাড়া আহরিত শুঁটকি মাছ পরিমাপ করে নিয়ে ফিরে আসার সময় মাছভেদে প্রদান করেন নির্ধারিত রাজস্ব।

প্রতি বছর কার্ত্তিক মাসে (খ্রিস্টীয় নভেম্বর) হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের রাসমেলা এবং পূণ্যস্নানের জন্যও দ্বীপটি বিখ্যাত। যদিও বলা হয়ে থাকে, ২০০ বছর ধরে এ রাসমেলা হয়ে চলেছে , তবে জানা যায়, ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে হরিচাঁদ ঠাকুরের এক বনবাসী ভক্ত, নাম হরিভজন, এই মেলা চালু করেন। প্রতিবছর অসংখ্য পুণ্যার্থী রাসপূর্ণিমাকে উপলক্ষ করে এখানে সমুদ্রস্নান করতে আসেন। দুবলার চরে সূর্যোদয় দেখে ভক্তরা সমুদ্রের জলে ফল ভাসিয়ে দেন। কেউবা আবার বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ভজন-কীর্তন গেয়ে মুখরিত করেন চারপাশ। দুবলার চর (Dublar Chor) এর রাসমেলায় স্থানীয় লোকজন ছাড়াও দূর-দূরান্তের শহরবাসী এমনকি বিদেশি পর্যটকেরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে থাকেন। তিনদিনব্যাপী এ মেলায় অনেক বিদেশী পর্যটকেরও সমাগম হয়।

দুবলার চরে লাল বুক মাছরাঙা, মদনটাক পাখির দেখা পাওয়া যায়। পশুদের মধ্যে আছে হরিণ।

দুবলার চরে কী কী দেখবেন?

রাসমেলা ছাড়াও দুবলার চরে অনেক কিছু উপভোগ করার আছে:

বিশাল শুঁটকি পল্লী

দুবলার চর দেশের অন্যতম বৃহৎ শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে লইট্যা, ছুরি, রূপচাঁদা, চিংড়িসহ নানা প্রজাতির মাছ রোদে শুকানোর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়। শুঁটকি তৈরির পুরো প্রক্রিয়া কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি হাজার হাজার জেলের কর্মব্যস্ত জীবন ও তাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড দেখার সুযোগ মেলে। বিশেষ করে অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত শুঁটকি পল্লী সবচেয়ে প্রাণবন্ত থাকে, কারণ এ সময়ই শুঁটকি উৎপাদন ও বাণিজ্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।

বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য

দুবলার চর ও এর আশপাশের সুন্দরবন অঞ্চল সমৃদ্ধ বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। বনের কিনারায় দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানো চিত্রা হরিণ সহজেই নজরে পড়ে, যা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। ভাগ্য অনুকূলে থাকলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের পায়ের ছাপ কিংবা দূর থেকে তার দুর্লভ উপস্থিতিও দেখা যেতে পারে। নদীর মোহনায় ইরাবতী ডলফিনের পানির ওপর লাফিয়ে ওঠার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। এছাড়া মাছরাঙা, মদনটাক এবং শীতকালে আগত বিভিন্ন অতিথি পাখির সমাহারে এ অঞ্চল পাখিপ্রেমীদের জন্যও একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য

দুবলার চর প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য গন্তব্য। এখানে সুন্দরী ও কেওড়া গাছের ঘন সবুজ বন প্রকৃতিকে করেছে আরও মনোমুগ্ধকর ও জীবন্ত। সাগর ও নদীর মোহনায় সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে এবং ফটোগ্রাফিপ্রেমীদের জন্য সৃষ্টি করে অসাধারণ মুহূর্ত। শহরের কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এই নিরিবিলি পরিবেশে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর সুযোগ মেলে, যেখানে শান্ত ও নিস্তব্ধ পরিবেশে নিজেকে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম করে নেওয়া যায়।

যাওয়ার উপায়

ঢাকা থেকে প্রথমে বাগেরহাটের মংলা পোর্টে যেতে হবে। সেখান থেকে ট্রলার কিংবা লঞ্চ ভাড়া করে যেতে হবে দুবলার চরে। সময় লাগবে ৬/৭ ঘন্টা। খুলনা শহরের লঞ্চঘাট থেকেও লঞ্চ ভাড়া করে যেতে পারেন।

কোথায় থাকবেন

ট্যুরিস্ট ভেসেল বা নৌযান ছাড়াও সুন্দরবনের অভয়ারণ্যে হিরণপয়েন্টের নীলকমল এবং টাইগার পয়েন্টের কচিখালী ও কাটকায় বন বিভাগের রেস্টহাউজে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। যার ফি নীলকমলে দেশি পর্যটকদের জন্য প্রতি কক্ষ তিন হাজার টাকা,চার কক্ষ ১২ হাজার টাকা। কচিখালী প্রতি কক্ষ তিন হাজার টাকা, চার কক্ষ ১০ হাজার টাকা। কটকা প্রতি কক্ষ দুই হাজার টাকা, দুই কক্ষ চার হাজার টাকা। বিদেশিদের ক্ষেত্রে নীলকমলে পাঁচ হাজার ও ২০ হাজার টাকা, কচিখালীতে পাঁচ হাজার ও ১৫ হাজার টাকা এবং কাটকায়  পাঁচ হাজার ও ১০ হাজার টাকা।

এছাড়া সুন্দরবন (Sundarbans) এর পাশে সাতক্ষীরা শহরে সাধারণ মানের হোটেল ও শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জে এনজিও সুশীলনের রেস্টহাউস ও ডরমেটরিতে একক,পরিবার ও গ্রুপ নিয়ে থাকার সুবিধা রয়েছে।

থাকার জন্যে মংলায় আছে পর্যটন কর্পোরেশনের হোটেল, পশুর বন্দরে সাধারণ হোটেল আছে পর্যটকদের জন্য। খুলনা মহানগরে হোটেল রয়েল, ক্যাসেল সালাম, হোটেল টাইগার গার্ডেন, হোটেল ওয়েস্ট ইন্, হোটেল সিটি ইন, হোটেল মিলিনিয়াম ইত্যাদি মানসম্পন্ন হোটেল ছাড়াও সাধারণ মানের হোটেল রয়েছে।

গন্তব্য

Dublar Char, Mongla Upazila, Bagerhat, Khulna Division, Bangladesh

পথ ও দিকনির্দেশ দেখতে ম্যাপ খুলুন।

গুগল ম্যাপে দেখুন