boroitoli-trail
boroitoli-trail-01
boroitoli-trail-02

বরইতলী ট্রেইল

জন
Reading Time ৭ মিনিটস

কক্সবাজার মানেই শুধু সমুদ্র নয়। একটু অ্যাডভেঞ্চারের নেশা থাকলে, সমুদ্রের গর্জনের পাশাপাশি উপভোগ করতে পারবেন পাহাড়ের নিস্তব্ধতা, ঝিরির কুলকুল শব্দ আর লুকানো ঝর্ণার মোহ। বরইতলী ট্রেইল (Boroitoli Trail) ঠিক সেটাই দেয়। কক্সবাজার থেকে মাত্র দুই ঘণ্টার পথে এই অফবিট ট্রেইলটি অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ভ্রমণকারীদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

ট্রেইলের পরিচয়

বরইতলী ট্রেইল মূলত বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের বরইতলী-মংজয় পাড়া গ্রাম থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। এটি “বরইতলী ফাত্রাঝিরি ঝর্ণা”, “ত্রিমুখী ঝর্ণা” বা “মুরং ঝর্ণা” নামেও পরিচিত।

প্রশাসনিকভাবে বান্দরবানের অংশ হলেও, কক্সবাজারের সাথে যোগাযোগ সহজ হওয়ায় কক্সবাজার হয়েই এখানে আসা সবচেয়ে সুবিধাজনক। গ্রামের পূর্বপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে ফৈরাঙধং পাহাড়, তুলাতুলী পাহাড় এবং জামতলী পাহাড়। এই পাহাড়গুলোর পাদদেশ থেকে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য ছরা ও ঝিরি। আঁকাবাঁকা ভালুকিয়া খাল, পাললিক শিলা, ঘন সবুজ বনানী আর উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ মিলিয়ে পুরো ট্রেইলটি দারুণ রোমাঞ্চকর।

এক নজরে বরইতলী ট্রেইল

বিষয়তথ্য
অবস্থানঘুমধুম, নাইক্ষ্যংছড়ি, বান্দরবান
কাছের শহরকক্সবাজার (প্রবেশপথ)
ট্রেকিং দূরত্বপ্রায় ৫ কিমি (একপথ)
ট্রেকিং সময়১.৫ – ২.৫ ঘণ্টা (একপথ)
কঠিনতার মাত্রামাঝারি থেকে কঠিন
প্রবেশ মূল্যবিনামূল্যে
সেরা মৌসুমজুলাই – সেপ্টেম্বর
প্রধান আকর্ষণত্রিমুখী ঝর্ণা, নিঝুম ঝর্ণা, ঝিরিপথ

বরইতলী ট্রেইলের বিশেষত্ব

এই ট্রেইলে মূলত তিনটি প্রধান ঝর্ণা রয়েছে:

  • নিঝুম ঝর্ণা (প্রথম ও দ্বিতীয়): ট্রেইলের ঝিরিপথে দুটি ছোট পৃথক ঝর্ণা পড়ে, যেগুলো স্থানীয়ভাবে “নিঝুম ঝর্ণা” নামে পরিচিত।
  • ফাত্রাঝিরি / ত্রিমুখী ঝর্ণা (তৃতীয়): পাহাড়ের গভীরে এই বড় ঝর্ণাটি সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এর বিশেষত্ব হলো, তিনটি দিক (বাম, ডান ও সামনে) থেকে একসাথে পানি নেমে আসে — তাই এটি “ত্রিমুখী ঝর্ণা” নামে পরিচিত।

এছাড়া ট্রেইলের আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আরও ১০ থেকে ১৭টির মতো ছোট-বড় ঝর্ণার অস্তিত্ব আছে বলে জানা যায়।

ভ্রমণ গাইড

কখন যাবেন — ভ্রমণের সেরা সময়

বরইতলী ট্রেইলটি সারা বছরই সুন্দর, তবে কিছু ঋতুতে প্রকৃতি আরও মনোরম হয়ে ওঠে।

গ্রীষ্মকাল

মার্চ – মে
  • গরম ও শুষ্ক
  • স্বচ্ছ আকাশ
  • হাইকিংয়ের উপযুক্ত
  • ঝর্ণা প্রায় শুকনো

শীতকাল

নভেম্বরফেব্রুয়ারি
  • ঠান্ডা আবহাওয়া
  • কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল
  • পাহাড়ের দৃশ্য সুন্দর
  • ঝর্ণায় পানি কমে যায়

বর্ষাকাল

জুন – সেপ্টেম্বর
  • সবুজ প্রকৃতি
  • ঝর্ণা পূর্ণ প্রাণবন্ত
  • রাস্তা পিচ্ছিল হতে পারে
  • অভিজ্ঞ ট্রেকারদের জন্য
পরামর্শ

বর্ষাকালে ভ্রমণ করলে আপনি সবচেয়ে ভালো অভিজ্ঞতা পাবেন।

বরইতলী ট্রেইল যাওয়ার উপায়

ধাপ ১: কক্সবাজার থেকে মরিচ্যা বাজার

ঢাকা থেকে সরাসরি বাস বা বিমানে কক্সবাজার পৌঁছানো যায়। চট্টগ্রাম থেকে বাসে কক্সবাজার আসতে ৩-৪ ঘণ্টা সময় লাগে। কক্সবাজার বাস টার্মিনাল থেকে উখিয়াগামী যেকোনো লোকাল মিনিবাসে উঠুন এবং উখিয়ার আগেই “মরিচ্যা বাজার” বা “মরিচ্যা স্টেশন”-এ নেমে যান।

পরিবহন মাধ্যমভাড়া (আনুমানিক)সময়
লোকাল বাসজনপ্রতি ৩০-৫০ টাকা১-১.৫ ঘণ্টা
সিএনজি রিজার্ভ৪০০-৫০০ টাকা৪৫ মিনিট-১ ঘণ্টা

টিপ: মরিচ্যা বাজারেই প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার, পানি, স্যালাইন এবং ফার্স্ট এইড (ডেটল, ব্যান্ডেজ) কিনে নিন। ট্রেইলের ভেতরে কোনো দোকান নেই।

ধাপ ২: মরিচ্যা থেকে বরইতলী ভাবনাকেন্দ্র

মরিচ্যা বাজারে নেমে বাম পাশে একটি বড় শিশুগাছ (“ঘুমগাছতলা”) দেখতে পাবেন। সেই পাশের পাকা সড়ক ধরে ইজিবাইক বা সিএনজিতে সরাসরি “বরইতলী বৌদ্ধ ভাবনাকেন্দ্র বিহার”-এর সামনে নামুন।

পরিবহন মাধ্যমভাড়া (আনুমানিক)
লোকাল সিএনজি/ইজিবাইকজনপ্রতি ৬০-৮০ টাকা
রিজার্ভ সিএনজি১৫০-২০০ টাকা
ধাপ ৩: ট্রেকিং শুরু

বৌদ্ধ বিহারের পাশ দিয়ে যাওয়া কাঁচা সড়ক থেকেই পায়ে হাঁটা শুরু। এটাই মূল ট্রেইলের প্রবেশমুখ।

প্রথম পার্ট: লেবু বাগানের পথ

ভাবনাকেন্দ্র থেকে হাঁটা শুরু করলেই দুপাশে চোখে পড়বে সবুজ লেবু বাগান। কাদামাটির পথ পেরিয়ে ধীরে ধীরে পাহাড়ের ভেতরে ঢুকতে থাকবেন। চলার পথে দেখা মিলবে জাম্বুরা, পেয়ারা, কলা ও আমের বাগান।

দ্বিতীয় পার্ট: ঝিরিপথে যাত্রা

পাহাড়ি পথ শেষে নেমে যাবেন ঝিরিতে। এরপর শুরু হয় আসল রোমাঞ্চ — স্রোতের বিপরীতে প্রায় ১.৫ থেকে ২ ঘণ্টার ঝিরিপথে হাঁটা। পাললিক শিলার উপর দিয়ে পানি মাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া, পাহাড়ি জনপদের জুম চাষ দেখা — সব মিলিয়ে এই অংশটাই ট্রেইলের সেরা অভিজ্ঞতা।

তৃতীয় পার্ট: পথের বিভাজন

প্রায় ২ ঘণ্টা হাঁটার পর ঝিরিপথটি দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়:

  1. ডানদিকে গেলে → প্রথম দুটি ছোট ঝর্ণা (নিঝুম ঝর্ণা)
  2. বাম বা সোজা গেলে → সবচেয়ে বড় ত্রিমুখী বা ফাত্রাঝিরি ঝর্ণা

সম্ভব হলে দুটি পথেই যান!

খরচের হিসাব (২০২৫-২০২৬ আপডেট)

খরচের খাতআনুমানিক পরিমাণ
প্রবেশ মূল্যবিনামূল্যে (০ টাকা)
গাইড ফি (প্রতি গ্রুপ)৪০০ – ৮০০ টাকা
বাঁশের লাঠি১০ – ২০ টাকা
কক্সবাজার → মরিচ্যা বাসজনপ্রতি ৩০–৫০ টাকা
মরিচ্যা → ভাবনাকেন্দ্রজনপ্রতি ৬০–৮০ টাকা
শুকনো খাবার ও পানি১৫০–৩০০ টাকা

বরইতলী ট্রেইলে কোনো সরকারি টিকিট বা প্রবেশ ফি নেই। তবে গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক না হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

খাওয়া ও থাকা

ট্রেইলের ভেতরে কোনো খাবার হোটেল বা দোকান নেই। রাত কাটানোর কোনো ব্যবস্থাও নেই। তাই:

  • মরিচ্যা বাজার থেকে প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার, পানি ও স্যালাইন কিনে নিন।
  • সকালে যাত্রা শুরু করুন এবং সন্ধ্যা ৬টার আগেই লোকালয়ে ফিরে আসুন।
  • রাতে কক্সবাজার শহরে বা উখিয়ায় ফিরে যান।

কক্সবাজারে থাকার জায়গা সব বাজেটেই পাওয়া যায় — কলাতলী ও সুগন্ধা বিচের আশপাশে শত শত হোটেল-গেস্টহাউস আছে।

ব্যাগে যা রাখবেন
  • পর্যাপ্ত খাবার পানি (কমপক্ষে ২ লিটার)
  • শুকনো খাবার (গ্লুকোজ বিস্কুট, খেজুর, চকলেট, শক্তি বার)
  • ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ বা জিপলক পলিব্যাগ (ফোন ও ইলেকট্রনিক্সের জন্য)
  • ফার্স্ট এইড কিট (ব্যান্ডেজ, ডেটল, পেইনকিলার, স্যালাইন)
  • লবণ (জোঁকের জন্য — বর্ষায় প্রচুর থাকে)
  • বাঁশের লাঠি (ট্রেইলের শুরুতে ১০-২০ টাকায় পাওয়া যায়)
  • পরিবর্তনের পোশাক (ভেজা কাপড়ের জন্য)
  • সানস্ক্রিন ও মশা/পোকা তাড়ানো ক্রিম
  • একটি আলাদা পলিব্যাগ (নিজের ময়লা বহন করতে)
জুতার বিষয়ে বিশেষ পরামর্শ

স্নিকার বা সাধারণ স্যান্ডেলে এই ট্রেইলে যাওয়া ঠিক হবে না। পিচ্ছিল পাথর ও কাদামাটিতে এগুলো একদমই কাজ করে না।

সেরা পছন্দ:

  • স্পাইকযুক্ত রাবার জুতো বা ট্রেকিং স্যান্ডেল
  • জেলি শু (পানিতে ভেজার জন্য উপযুক্ত)
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা ও নিরাপত্তা তথ্য
মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি (২০২৫ সতর্কতা)

বরইতলী ট্রেইল বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অত্যন্ত কাছাকাছি। ২০২৪ সালের শেষ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর মধ্যে সক্রিয় সংঘাত চলছে। ঘুমধুম সীমান্তে মর্টার শেল বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে।

যাওয়ার আগে অবশ্যই বান্দরবান জেলা প্রশাসন, নাইক্ষ্যংছড়ি থানা পুলিশ বা স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্প থেকে বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিশ্চিত করুন।

মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই

ট্রেইলে প্রবেশের পর থেকে সম্পূর্ণ নেটওয়ার্কবিহীন এলাকায় থাকবেন। তাই রওনা হওয়ার আগে পরিবার বা বিশ্বস্ত কাউকে গন্তব্য ও ফেরার সময় জানিয়ে যান।

বন্য হাতি ও অন্যান্য প্রাণী

নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায় বন্য হাতির আনাগোনা আছে। গাইডের নির্দেশিত পথের বাইরে যাবেন না।

জোঁক

বর্ষাকালে ঝিরিপথে জোঁকের ব্যাপক উপদ্রব থাকে। মোজা ও লম্বা প্যান্ট পরুন এবং লবণ সাথে রাখুন।

স্থানীয় গাইড — কেন জরুরি?

পথটি দুর্গম ও অপরিচিত হওয়ায় গাইড ছাড়া যাওয়া মোটেও উচিত নয়। বিশেষ করে ঝিরিপথে একাধিক শাখা থাকায় বিপথে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

গাইড কোথায় পাবেন:

  • মরিচ্যা বাজারে (স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করুন)
  • বরইতলী ভাবনাকেন্দ্র বিহারের আশপাশে
  • মংজয় পাড়া গ্রামে

গাইড ফি: প্রতি গ্রুপে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা (দরদাম করুন)

পরিবেশ সচেতনতা

বরইতলী ট্রেইলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষার দায়িত্ব প্রতিটি ভ্রমণকারীর। সাথে নেওয়া প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট বা যেকোনো ময়লা পাহাড়ে ফেলবেন না। আলাদা ব্যাগে নিয়ে এসে শহরে ডাস্টবিনে ফেলুন।

বরইতলী ট্রেইল রোমাঞ্চকর, কিন্তু সেটি ঝুঁকিমুক্ত নয়। বর্তমান সীমান্ত পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে যাত্রার আগে স্থানীয় প্রশাসন বা ট্যুরিস্ট পুলিশের কাছ থেকে সর্বশেষ আপডেট নিয়ে তারপর রওনা দিন। নিরাপদ ভ্রমণই সেরা ভ্রমণ।

গন্তব্য

বড়ইতলী হোটেল, Unnamed Road, বাংলাদেশ

পথ ও দিকনির্দেশ দেখতে ম্যাপ খুলুন।

গুগল ম্যাপে দেখুন