| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| অবস্থান | উত্তর ইলশা গ্রাম, বাহারছড়া ইউনিয়ন, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম |
| নির্মাণকাল | ১৫৬৮ খ্রি. (শিলালিপি অনুসারে) / ১৬৯২ খ্রি. (স্থাপত্যশৈলী অনুসারে) |
| স্থাপত্যরীতি | মুঘল ও সুলতানি রীতির মিশ্রণ |
| স্বীকৃতি | সংরক্ষিত পুরাকীর্তি (প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, ১৯৭৫) |
| সময় লাগবে | ৪৫ মিনিট – ১ ঘণ্টা |
| চট্টগ্রাম শহর থেকে | ~২.৫ – ৩ ঘণ্টা |
বখশি হামিদ মসজিদের বয়স নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দুটি ধারা প্রচলিত, আর সেটাই এর সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক দিক।
শিলালিপির সাক্ষ্য: মূল প্রবেশপথের ওপর বসানো আরবি-ফারসি শিলালিপি বলছে, মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল ৯ রমজান ৯৭৫ হিজরি — অর্থাৎ ৯ মার্চ, ১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে। তখন বাংলার শাসক ছিলেন কররানি বংশের সুলতান সুলাইমান খান কররানি। শিলালিপি অনুযায়ী, সুলতানের প্রধান উজির মুরাদ খানের পুত্র বখশী হামিদ এটি নির্মাণ করান।
স্থাপত্যের সাক্ষ্য: অনেক গবেষক আবার ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁদের যুক্তি — বর্তমান ইটের কাঠামোটির নকশা, গম্বুজের গড়ন ও অলংকরণ স্পষ্টভাবে মুঘল আমলের, সম্ভবত সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে ১৬৯২ সালের। তাঁদের ধারণা, ১৫৬৮ সালের পাথরের শিলালিপিটি আসলে একই এলাকার পুরোনো কোনো ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদের, যা পরে এই নতুন কাঠামোয় স্থাপন করা হয়।
নামের রহস্য: ‘বখশি’ একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ কর আদায়কারী বা হিসাবরক্ষক। মুঘল-সুলতানি আমলে রাজস্ব সংগ্রাহকদের এই উপাধি দেওয়া হতো। বখশি হামিদের পুরো নাম ছিল মুহাম্মদ আবদুল হামিদ, এবং তিনি ছিলেন ওই অঞ্চলের রাজস্ব কর্মকর্তা। পদবি থেকেই মসজিদের নাম।
মসজিদটি মাত্র ১১.৭৩ মি. × ৭.৬২ মি. আকারের, কিন্তু প্রতিটি ইঞ্চিতে কারুকাজের নিদর্শন। ঘোরার সময় এই বিবরণগুলো খুঁজে দেখুন:
তিন গম্বুজ ও চূড়া ছাদে তিনটি বুদবুদ-আকৃতির গম্বুজ — মাঝেরটি বড়, দুপাশের দুটি ছোট। মজার বিষয়, পাশের দুটি গম্বুজ বাইরে থেকে দেখতে গম্বুজ হলেও ভেতর থেকে আসলে অর্ধ-গম্বুজ ভল্ট। গম্বুজগুলো বসানো অষ্টভুজাকার ড্রামের ওপর, আর চূড়ায় রয়েছে পদ্মফুল ও কলস আকৃতির ফিনিয়াল — বিশুদ্ধ মুঘল ছোঁয়া।
দেয়ালের ভেতরে লুকানো বুরুজ চার কোণার অষ্টভুজাকৃতি বুরুজগুলো দেয়ালের পুরুত্বের ভেতরেই গাঁথা — এটি বাংলাদেশে অত্যন্ত বিরল একটি নির্মাণকৌশল। একই বৈশিষ্ট্য দেখা যায় শুধু ঢাকার শায়েস্তা খান মসজিদ ও নারায়ণগঞ্জের বিবি মরিয়ম মসজিদে। বুরুজগুলো ছাঁচকাটা ব্যান্ডে বিভক্ত এবং প্যারাপেটের ওপর উঠে কুপোলায় শেষ হয়েছে।
পাঁচ খিলান দরজা পূর্বদিকে তিনটি, উত্তরে ও দক্ষিণে একটি করে — মোট পাঁচটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। পূর্বের দরজাগুলো অর্ধ-গম্বুজ ভল্টের নিচে খোলে এবং বাইরের দিকে খাঁজকাটা (cusped) খিলান রয়েছে।
তিন মিহরাব পশ্চিম দেয়ালের ভেতরে তিনটি মিহরাব। কেন্দ্রীয় মিহরাবটি অর্ধ-অষ্টভুজাকৃতি, একটি সাহসীভাবে প্রক্ষিপ্ত আয়তাকার ফ্রেমের ভেতরে রাখা। পাশের দুটি আয়তাকার।
টেরাকোটার কারুকাজ এখানেই মসজিদটি বাংলার সুলতানি ঐতিহ্যকে উদযাপন করে। কেন্দ্রীয় দরজার ফ্রেম ও প্রধান মিহরাব জুড়ে পোড়ামাটির ফলকে আন্তঃসংযুক্ত জ্যামিতিক নকশা, জালি প্যাটার্ন এবং স্তরে স্তরে ফোটা ফুলের রোজেট। অষ্টভুজ ড্রাম ও প্যারাপেটে সারিবদ্ধ ব্লাইন্ড মার্লন।
প্রাচীন দীঘি মসজিদের সীমানায় শানবাঁধানো ঘাটওয়ালা একটি বিশাল দীঘি। ধারণা করা হয়, মুসল্লিদের অজুর সুবিধার্থে সেকালেই এটি খনন করা হয়েছিল।
ঢাকা থেকে বখশি হামিদ মসজিদ যেতে প্রথমে ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন বা বিমানে চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছাতে হবে। ট্রেনে গেলে চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে সিএনজি বা বাসে নতুন ব্রিজ (শাহ আমানত সেতু) এলাকায় যেতে পারেন। এরপর বাঁশখালীর পথে যাত্রা শুরু করতে হবে।
চট্টগ্রাম শহর থেকে নতুন ব্রিজ বা বহদ্দারহাট থেকে বাঁশখালীগামী এস আলম, বাঁশখালী স্পেশাল সার্ভিস কিংবা লোকাল বাসে গুনাগরি বাজার বা জলদীতে নামতে হবে। এস আলম বা স্পেশাল সার্ভিসে ভাড়া আনুমানিক ১৩০ টাকা, আর লোকাল বাসে কিছুটা কম। লোকাল সিএনজিতে জনপ্রতি প্রায় ৮০–১০০ টাকা লাগতে পারে এবং সময় লাগে প্রায় ২ ঘণ্টা। এরপর গুনাগরি থেকে সিএনজি নিয়ে বাহারছড়া ইউনিয়নের উত্তর ইলশা গ্রামে যেতে হবে। লোকাল সিএনজিতে জনপ্রতি প্রায় ২০–৪০ টাকা, আর রিজার্ভ সিএনজিতে ২০০–২৫০ টাকা লাগতে পারে; এই পথে সময় লাগে প্রায় ৩০–৪০ মিনিট।
বাহারছড়ায় সরাসরি বাস যায় না। গুনাগরিতে নেমে সিএনজি নেওয়া বাধ্যতামূলক। স্থানীয়দের “বখশি হামিদ মসজিদ” বা “পুরান মসজিদ” বললেই দেখিয়ে দেবেন।
Time needed: 15 hours
শুধু মসজিদ দেখতে এত দূর যাওয়া অপচয় — বাঁশখালীর অন্য আকর্ষণগুলোও একদিনেই ঘুরে ফেলা সম্ভব।
চট্টগ্রাম নতুন ব্রিজ থেকে যাত্রা শুরু
৩,৪৭২ একর জুড়ে বিস্তৃত, বাংলাদেশের শীর্ষ ক্লোন চা উৎপাদনকারী বাগানগুলোর একটি। সকালের আলোয় পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ আর সবুজ গালিচা — ছবি তোলার সেরা সময়। (চাঁদপুর বা পুকুরিয়া বাজারে নেমে সিএনজি)
২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত, প্রায় ১,০০০ হেক্টর বনভূমি নিয়ে গড়া। ডানেরছড়া ও বামেরছড়া লেক, বাংলাদেশের দীর্ঘতম ঝুলন্ত ব্রিজ, ওয়াচ টাওয়ার, হিলটপ কটেজ ও মিনি চিড়িয়াখানা। ৩১০ প্রজাতির উদ্ভিদ; ভাগ্য ভালো হলে মায়া হরিণ, চিত্রা হরিণ বা মেছো বাঘের দেখা মিলতে পারে।
গুনাগরি বা জলদীতে দুপুরের খাবার
বিকেলের নরম আলোয় টেরাকোটার কারুকাজ সবচেয়ে ভালো ফুটে ওঠে। নামাজের সময় হলে জোহর/আসর আদায় করে নিতে পারেন — ৪৫০+ বছরের ঐতিহ্যে এখনো নিয়মিত জামাত হয়।
কক্সবাজারের পর দেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সৈকত — বাহারছড়া, খানখানাবাদ, কদমরসুল ও গন্ডামারা উপকূল মিলিয়ে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার। পর্যটকশূন্য, নির্জন, একপাশে সমুদ্রের গর্জন অন্যপাশে ঝাউবন। ভাটার সময় হাজারো লাল কাঁকড়ার লুকোচুরি।
সূর্যাস্তের পরপরই ফেরার পথ ধরুন
চট্টগ্রাম শহরে প্রত্যাবর্তন
মসজিদ ও বাশখালী সমুদ্র সৈকত দুটোই বাহারছড়ায়, তাই কাছাকাছি — একসঙ্গে ঘোরা সহজ।
বাঁশখালীতে বিলাসবহুল হোটেল বা রিসোর্টের সংখ্যা খুবই সীমিত। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চাইলে বাঁশখালী ইকোপার্ক রেস্ট হাউজ ভালো একটি বিকল্প। এছাড়া জলদীর উপজেলা পরিষদের কাছে সৌদিয়া আবাসিক হোটেল, দারোগা বাজারের জেলা পরিষদ ডাকবাংলো (আগাম অনুমতি/বুকিং প্রয়োজন), গুনাগরি বাজারের কাছে দিশারী রেস্ট হাউজ, উপজেলা সদরের ব্র্যাক ও প্রশিকা রেস্ট হাউজ এবং পুকুরিয়ার চানপুর বাংলো ও পুইছড়ির রিয়াদ আবাসিক বোর্ডিং-এ থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যেতে পারে। তবে যাওয়ার আগে রুমের প্রাপ্যতা ও বর্তমান ভাড়া নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো। তুলনামূলক উন্নত সুযোগ-সুবিধা চাইলে চট্টগ্রাম শহরের আগ্রাবাদ বা পতেঙ্গা এলাকায় থেকে দিনে বাঁশখালী ঘুরে ফিরে আসা বেশি সুবিধাজনক।
গুনাগরির শাহাব মিয়া সিটি সেন্টারে বীর বাঁশখালী রেস্টুরেন্টে চাইনিজ, ফাস্ট ফুড, চিকেন ও হালিমের মতো খাবার পাওয়া যায়। এছাড়া জলদী সদর, গুনাগরি ও মনছুড়িয়া বাজারে বেশ কিছু সাধারণ মানের বাঙালি খাবারের হোটেল রয়েছে। বাঁশখালী ভ্রমণে গেলে তাজা সামুদ্রিক মাছ এবং চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক খাবার অবশ্যই চেখে দেখতে পারেন।
সেরা সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। শীতকালে ইকোপার্কের লেকে অতিথি পাখির সমাগম ঘটে, আর আবহাওয়া ঘোরাঘুরির জন্য আদর্শ। বর্ষাকালে (জুন–সেপ্টেম্বর) গ্রামীণ রাস্তা কাদায় দুর্গম হয়ে পড়ে।
পোশাক ও শিষ্টাচার এটি সক্রিয় ইবাদতের স্থান — শালীন পোশাক পরুন। পুরুষরা লম্বা প্যান্ট, মহিলারা মাথা ঢেকে নিলে ভালো। প্রবেশের আগে জুতা খুলুন। নামাজের সময় ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন এবং মুসল্লিদের একান্ত সময়ে ব্যাঘাত ঘটাবেন না।
যা সঙ্গে নেবেন নগদ টাকা (এলাকায় এটিএম কম), পর্যাপ্ত পানি, ছাতা বা টুপি, পাওয়ার ব্যাংক, প্রাথমিক চিকিৎসার সামগ্রী।
নিরাপত্তা সৈকত এলাকা অত্যন্ত নির্জন — সন্ধ্যার পর অবস্থান করবেন না। ফেরার যান পাওয়া কঠিন হতে পারে, তাই সম্ভব হলে দিনের জন্য সিএনজি রিজার্ভ করে নিন। বাসে/সিএনজিতে ওঠার আগে ভাড়া নিশ্চিত করে নিন।
দায়িত্বশীল ভ্রমণ দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। টেরাকোটার ফলক বা শিলালিপি স্পর্শ করবেন না, দেয়ালে কিছু লিখবেন না, এবং কোনো ধরনের আবর্জনা ফেলবেন না। ৪৫০ বছরের এই সাক্ষীকে টিকিয়ে রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।
স্থানীয় সংযোগ গ্রামের প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলুন — মসজিদ ও বকশি হামিদ সম্পর্কে বংশপরম্পরায় চলে আসা এমন অনেক গল্প তাঁদের কাছে শুনবেন, যা কোনো বইয়ে লেখা নেই।
Leave a Comment