উলিপুর মুন্সিবাড়ী

জন
৪ মিনিটস
জন

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ধরনীবাড়ী ইউনিয়নে উলিপুর মুন্সিবাড়ীর (Ulipur Munshi Bari) অবস্থান। উলিপুর বাজার থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে প্রায় ৩৯ একর জায়গার উপর মুন্সিবাড়ীর বিশাল অট্টালিকাগুলো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আঠারো শতকে বিনোদী লালের পালক পুত্র শ্রী ব্রজেন্দ্র লাল মুন্সির তত্ত্বাবধানে চমৎকার স্থাপত্যের এই মুন্সিবাড়ী নির্মিত হয়। মূল ফটকের পাশে আছে কাঁঠালি চাপা ফুলের গাছ এবং শান বাঁধানো পুকুর ঘাট।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, কাশিম বাজার এস্টেটের সপ্তম জমিদার কৃষ্ণনাথ নন্দী একটি খুনের মামলায় আদালতের কক্ষে দাঁড়ানো অসম্মানজনক বিবেচনা করে ৩১ অক্টোবর ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে তার বাসভবনে আত্মহত্যা করেছিলেন। জমিদার কৃষ্ণনাথ নন্দীর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী মহারাণী স্বর্ণময়ী কাশিম বাজার এস্টেটের জমিদার হন। স্বর্ণময়ী একজন শিক্ষিত এবং জমিদারপন্থী ছিলেন।মহারাণী স্বর্ণময়ী দেবীর অধীনে হিসাব রক্ষকের কাজ করতো বিনোদী লাল নামের এক মুনসেফ বা মুন্সি।

কথিত আছে, একদিন বিনোদী লাল মুন্সি হাতির পিঠে চরে শিকার করতে গিয়ে একটি ব্যাঙের সাপ ধরে খাওয়ার দৃশ্য দেখতে পান। আগেকার দিনে মানুষেরা বিশ্বাস করতেন যেস্থানে ব্যাঙ সাপকে ধরে খায় সেই স্থানে বাড়ী করলে অনেক ধন সম্পত্তির মালিক হওয়া যায়। তাই বিনোদী লাল মহারাণী স্বর্ণময়ী কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এই স্থানে একটি বাড়ী নির্মাণ করেন। বাড়ীটি নিয়ে বিভিন্ন গুজব রয়েছে।অনেকে বাড়ীটিকে বনোয়ারি মুন্সিবাড়ি বলে থাকেন। এর কারণ হিসেবে বিশ্বাস করা হয় যে বনোয়ারি নামে এক কৃষক এই বাড়িতে থাকতেন।

মোঘল আমলের স্থাপনার সাথে বিট্রিশ আদলের সমন্বয়ে বিভিন্ন কারুকার্যের অপরুপ সৌন্দর্য বাড়ী নির্মাণ করা হয়। বাড়ীটি দেখলেই মনে হবে কোন শিল্পীর হাতে আঁকা এক চিলতে ছবি। সেই আট্রালিকার প্রথম তলায় তিনটি বড় কক্ষ রয়েছে। বাড়ীটির একটি কক্ষে রক্ষিত ব্রজেন্দ্র লাল মুন্সির প্রতিকৃতি ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল ভেবে বাড়ীটিতে আক্রমণ করে। আর পাক হানাদার বাহিনী এ কক্ষে রক্ষিত ছবিটি বেয়নেট দিয়ে নষ্ট করে। যা আজও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে দৃশ্যমান।

ব্রজেন্দ্র লাল মুন্সির স্ত্রী আশালতা মুন্সি দুই কন্যা সন্তান জন্ম দেন। বড় মেয়ে সুচি রাণী (টিটু) আর ছোট মেয়ে সুস্মান কান্তি (বুড়ি) ছিল। সুস্মান কান্তি (বুড়ি) কম বয়সেই মারা যান। টিটু বড় হওয়ার পরে মুন্সি ভাবলেন, আমি ধরণীবাড়ী, বেগমগঞ্জ, মুঘলবাসা, গাইবান্ধা ও মালিবাড়ীর বাড়ীওয়ালা তবে আমার বাড়ী ভালো না হলে আমি আমার মেয়েকে ভালো ঘরে বিয়ে করাতে পারব না।

এই কথা ভেবে যখন দ্বিতল অট্রালিকা তৈরি হয়েছিল, তিনি কলকাতায় তাঁর মেয়েকে দুর্দান্ত আড়ম্বরের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। তখন থেকে অনেক বছর কেটে গেছে। ব্রজেন্দ্র লাল মুন্সি ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান। তার কোনও ছেলে সন্তান ছিল না।তাঁর স্ত্রী আশালতা মুন্সি বিহরিলাল নামে একজন ছেলে সন্তানকে দত্যক নেন।

পরে আশালতা মুন্সি মারা গেলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুন্সিলালের বংশধররা কলকাতায় চলে গেলে বিভিন্ন লোভের মহে মামলা মোকদ্দমার কারণে বেশ কয়েকবার বাড়ীর মালিকানা বদল হয়। বর্তমানে উলিপুর মুন্সিবাড়ী বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে নিবন্ধিত আছে। আর মূল ভবনের দুইটি কক্ষ বিগত বহু বছর ধরনীবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এখনও মূল ভবনের দরজার উপরে ধরণীবাড়ী ভূমি অফিসের সাইনবোর্ড দেয়া আছে। পরবর্তীতে ভূমি অফিসটি মুুন্সিবাড়ীর উঠানে সদ্য নির্মিত নতুন ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে।

মূল অট্রালিকা ছাড়াও এখানে বেশকটি মন্দির রয়েছে। মন্দিরের পশ্চিমে একটি উন্মুক্ত মঞ্চ, তুলসী পাঠ, মন্দিরের উত্তর-পশ্চিমে স্নান।বাথরুমের ভিতরে একটি কূপ আর অট্রালিকার সামনে একটি বিশাল সূর্য-জলাশয় পুকুর। সংরক্ষণের অভাবে বাড়ীটির নাট মন্দির, দূর্গা মন্দির, বিষ্ণ মন্দির, গোবিন্দ মন্দির, শিব মন্দির, বিছানা ঘর, ডাইনিং ঘর, রান্না ঘর, অঙ্কন ঘর, উপরের তলার বিশ্রাম ঘর ও বাথ রুম অনেকটা নষ্ট হয়ে গেছে।

নির্মিত ভবনের একটি শীলা খন্ডে ১৮৮০ খ্রীষ্টাব্দ উল্লেখ আছে। এ থেকে ধারনা করা হয় মুন্সিবাড়ী ১৮৮০ খ্রীষ্টাব্দেই তৈরী।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সরাসরি কুড়িগ্রাম বাসে গেলে শ্যামলি অথবা কল্যান পুর থেকে এস-বি, নাবিল,হানিফ এবং শ্যামলীতে যেতে পারেন, ভালো বাস। এছাড়া কুড়িগ্রাম (০১৯২৪-৪৬৯৪৩৭, ০১৯১৪-৮৫৬৮২৬) পরিবহন এর বাসেও কুড়িগ্রাম যেতে পারবেন। দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে কুড়িগ্রাম জেলা বাস টার্মিনালে পৌঁছার পর অটো (ইজি বাইক) যোগে উলিপুর উপজেলা পৌছে জিরো পয়েন্ট থেকে উলিপুর এম এস স্কুল এন্ড কলেজের পাশ দিয়ে ০২ কিলোমিটার পূর্ব দিকে পাকা রাস্তা ধরে এগুতে হবে। উলিপুর থেকে সাইকেল, মটর সাইকেল, জীপ গাড়ীসহ যে কোন ধরনের যানবাহনে উলিপুর মুন্সিবাড়ী যাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন

কুড়িগ্রাম থাকার জন্যে বেশ কিছু হোটেল আছে। নিম্নে তাদের নাম, ঠিকানা এবং ফোন নাম্বার দেয়া হলোঃ

  • হোটেল আকাশ
  • মেসার্স হোটেল ডিকে (আবাসিক)
    পরিচালনাকারী/মালিকের নামঃ আলহাজ্ব জহুরম্নল হক দুলাল,ঘোষপাড়া,কুড়িগ্রাম
    মোবাইলঃ ০১৭১২১২৩১৭১
  • মেসার্স হোটেল স্মৃতি (আবাসিক)
    পরিচালনাকারী/মালিকের নামঃ সেলিনা মাহাবুব, কেন্দ্রীয় বাসটর্মিনাল, কুড়িগ্রাম।
    মোবাইলঃ ০১৭১৯-০২৮৪১১
  • মেসার্স হোটেল মেহেদী (আবাসিক)
    পরিচালনাকারী/মালিকের নামঃ নিলুফার দ্দৌলা, ঘোষপাড়া,কুড়িগ্রাম।
    মোবাইলঃ ০১৭১১-৩৪৮৯১০
  • মেসার্স হোটেল আরজি (আবাসিক)
    পরিচালনাকারী/মালিকের নামঃ মোঃ খায়রম্নল আমিনুল ইসলাম, ঘোষপাড়া, কুড়িগ্রাম।
  • মেসার্স হোটেল নিবেদিকা (আবাসিক)
    পরিচালনাকারী/মালিকের নামঃ সুবোধ বণিক, আদর্শ পৌরবাজার, কুড়িগ্রাম
    মোবাইলঃ ০১৭১৭০৫৮২৯৫
  • মেসার্স হোটেল অর্ণব প্যালেস (আবাসিক)
    কফিল উদ্দিন আহমেদ (খোকন), কেন্দ্রীয় বাসটর্মিনাল, কুড়িগ্রাম।
    মোবাইলঃ ০১৭৪০৫৭১০০৬
  • মেসার্স হোটেল বসুন্ধরা (আবাসিক )
    মোবাইলঃ ০৫৮১-৬১৫০৭
  • মেসার্স মিতা রেস্ট হাউস (আবাসিক)
    পরিচালনাকারী/মালিকের নামঃ সৈয়দ সাজ্জাদ আলী, সবুজপাড়া, কুড়িগ্রাম।

আপনার মতামত দিন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এখনও কেউ মন্তব্য করেনি।