আল্পনা গ্রাম

ভালো লেগেছে
3
Ratings
রেটিংস ( রিভিউ)

টিকইল (Tikoil), চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর নাচোল (Nachole) উপজেলার ছোট্ট একটা গ্রামের নাম। টিকইল গ্রামের প্রতিটি দেয়ালই এক একটি ক্যানভাস আর মানুষগুলো আল্পনার কারিগর। আর এ কারনেই আল্পনা গ্রাম (A village of alpona) নামে এর পরিচিতি এখন সারা দেশ জুড়ে। মাটির ঘরের এখানকার বাসিন্দারা নিজের মতো সাজিয়ে তুলেছে নিজেদের শৈল্পিক রাজত্ব। এখানকার রঙের রাজত্বে সবাই রাজা। টিকইল গ্রামের আলপনার মূল কারিগর হচ্ছেন এ গ্রামের গৃহিণী আর মেয়েরা৷ বংশ পরম্পরায় বছরের পর বছর বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে এ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছেন তাঁরা৷ নাচোলের আলপনা গ্রামের প্রতিটি বাড়ির ভেতরের-বাইরের কোনো দেয়ালই বাদ পড়ে না তুলির আঁচর থেকে৷ রান্নাঘর থেকে শোবার ঘর, প্রতিটি দেয়ালই মেয়েরা ভরে ফেলেন হাতে আঁকা আলপনায়৷

টিকোইল এর মাটির ঘরগুলোকে সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করার জন্যে এবং নিজেদের শিল্পীস্বত্তার কারণেই গ্রামবাসী তাদের মাটির ঘরে আলপনা করেন। এই আল্পনা তারা আঁকেন তাদের নিজেদের তৈরি করা রঙ দিয়ে। এখানকার মাটির ঘরে আলপনা করার রঙয়ের উৎসও মাটি। গ্রামবাসীর ভাষ্যমতে আগে গৃহিণীরা আলপনা আঁকতে গিরিমাটি, চক (খড়িমাটি), রং, তারপিন তেল ব্যবহার করতো। তবে ওইসব উপকরণে আঁকা আল্পনা বেশিদিন স্থায়ী হতো না। তাই বর্তমানে শুকনা বরই চুর্ণ আঠা, গিরিমাটি, আমের পুরাতন আঁটির শাঁস চুর্ণ, চকগুঁড়া, বিভিন্ন রং, মানকচু ও কলাগাছের কস দিয়ে তৈরি রংয়ের মিশ্রণ অন্তত ৪/৫ দিন ভিজিয়ে রেখে আলপনা আঁকা হয়। ফলে ওই আলপনা প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় স্থায়ী হয়। তাদের মতে, এতে যেমন বাড়িঘরে পবিত্রতা আসে ঠিক তেমনি পরিবারের সবার মনে বাড়িঘরে আনন্দ লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

টিকইল গ্রামের প্রবীন মানুষরাও জানেননা এই ঐতিহ্যের গোড়াপত্তন কি করে হয়েছে, তবে পূর্বপুরুষের হাত ধরে তারাও আবহমানকাল ধরে এই শিল্প টিকিয়ে রাখছেন। বিভিন্ন পার্বণে, উৎসব, পূজা, আনন্দময় উপলক্ষ্যে তারা মহাসমারোহে এই কাজটি করেন। সৃষ্টি সুখের উল্লাস বলে যে বাক্য আছে তা বোধহয় স্বার্থক এই মানুষগুলোর নৈপুণ্যে। নিজেদের গ্রামীন জীবনে এই ছোট ছোট মুহুর্তে নিজেদের মতো করে বাঁচার আনন্দ নিয়ে তারা দিন যাপন করেন।

মজার বিষয় হলো, আগের দিনে বাড়িঘরের আলপনার মাধুর্য দেখে ওই বাড়ির বর-কনে পছন্দ করতেন বুড়া-বুড়িরা। আর হিন্দুপাড়ার টিকইল গ্রামের নারীরা (গৃহিণীরা) আজও আলপনা আঁকার চর্চাটি ধরে রেখেছেন। আগামী প্রজন্মেও এর ধারা অব্যাহত থাকবে বলে টিকইল গ্রামবাসী মনে করেন।টিকইল গ্রামের নারীরা বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে আল্পনা এঁকে বাড়ির সৌন্দর্যবর্ধনের সঙ্গে সঙ্গে দেবতার সুদৃষ্টি ও আশীর্বাদ কামনা করে থাকেন৷

যাওয়ার উপায়

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থেকে ২৪ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থান নাচোল উপজেলায় টিকইল গ্রামের। গ্রামটি তেভাগা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেত্রী ইলা মিত্রের স্মৃতিধন্য নেজামপুর ইউনিয়নের মধ্যে পড়েছে। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সরাসরি যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম সড়কপথ। ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সড়ক দূরত্ব ৩১৭ কিলোমিটার। ঢাকাস্থ গাবতলী বাস টার্মিনাল ও কল্যানপুরসহ বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন অনেকগুলো পরিবহন সংস্থার অসংখ্য বাস ছেড়ে আসে। পক্ষান্তরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেও ঐসব সংস্থার বাস নিয়মিত ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে চলাচলকারী উল্লেখযোগ্য পরিবহন সংস্থার নাম ও যোগাযোগের সূত্র নিচে দেওয়া হলঃ

ক্রমিক নংপরিবহন সংস্থার নামঢাকা কাউন্টারচাঁপাই কাউন্টারযাত্রী প্রতি ভাড়া
হানিফ এন্টারপ্রাইজ০১৮১৩-০৪৯৫৪৩(কল্যানপুর)০১৭১৩-২০১৭০১৫০০/-নন-এসি
মডার্ণ এন্টারপ্রাইজ০১৭১১-২২৮২১৭০৭৮১-৫৬০২৫৫০০/-নন-এসি
ন্যাশনাল ট্রাভেলস০১৭১১-২২৮২৮৬০১৭৩০-০৭৩২৬৮৫০০/-নন-এসি

প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু করে মধ্যরাত অবধি এ সমস্ত পরিবহন সংস্থার যাত্রীবাহী বাস একঘন্টা/আধাঘন্টা অন্তর ঢাকা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে চলাচল করে। এ সবের বাইরে লতা, নাহার, সাথী, দূরদূরান্ত ইত্যাদি পরিবহন সংস্থার বাসও প্রতিদিন নিয়মিতভাবে ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে চলাচল করে।

বিআরটিসি বাস কাউন্টার থেকে বিআরটিসিবাস ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে চলাচল না করলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নিয়মিতভাবে রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, কুষ্টিয়া, মাগুরা, ফরিদপুর ও বরিশাল শহরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।

রেলপথে ঢাকার সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সরাসরি যোগাযোগ নেই। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী হয়ে সিরাজগঞ্জ ও খুলনার উদ্দেশ্যে দুটি পৃথক ট্রেন নিয়মিত চলাচল করে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদরের সঙ্গে নাচোল উপজেলা সদরের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বাস, ট্যাক্সি ইত্যাদি যানবাহন মাধ্যমে নাচোল যাওয়া যায়।

কেউ ঘুরতে যেতে চাইলে কোন সমস্যা নেই, কেউ ছবি তুলতে কিংবা ভিডিও করতে গেলেও সমস্যা না যতক্ষণ না গ্রামের মানুষের সমস্যা না হয়, তাদের শান্তি, তাদের স্বাধীনতা, নিজস্বতায় কোনো হস্তক্ষেপ না হচ্ছে। যতক্ষণ না তারা আপনাকে উপদ্রব ভাবছেন, যতক্ষণ না আপনি গিয়ে গ্রামটাকে শহুরে ময়লা, শহুরে নোংরামো ত্যাগ করার ট্রানজিট পয়েন্ট বানাচ্ছেন গ্রামটাকে ততক্ষণ কোনো কিছুই সমস্যা না। 
  • 69
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    69
    Shares
দিক নির্দেশনা

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।

দেশের স্থানসমূহঃ

আপনার রিভিউ দিন

* বাধ্যতামূলক ভাবে পূরণ করতে হবে।

Sending