সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা

0

সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা (Shitesh Babu’s Zoo) মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের রামকৃষ্ণ মিশন রোডে অবস্থিত একটি চিড়িয়াখানা যা ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছিলো। এটি আদতে এই চিড়িয়াখানার প্রতিষ্টাতা সিতেশ রঞ্জন দেবের বাসস্থান। রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমের পাশেই অবস্থিত এই বাড়িটিতেই সিতেশ বাবু গড়ে তুলেছেন তার মিনি চিড়িয়াখানাটি যেটি বর্তমানে বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। চিড়িয়াখানাটি বর্তমানে পরিচালনা করেন সিতেশ রঞ্জন দেবের সন্তান সজল দেব।

এক সময়কার দুর্দান্ত শিকারি সিতেশ রঞ্জন দেব। ৪৫ বছর আগে পশুপাখির সেবা আশ্রম হিসেবে গোড়াপত্তন করেছিলেন তার বাবা শ্রীশ চন্দ্র দেব। দুরন্ত বালক সিতেশ বাবার নেশা তথা পশুপাখির প্রতি ভালোবাসার অভ্যাস পেয়েছেন। বাবার সঙ্গে থাকতে থাকতে নিজেও যে কখন জীবজন্তুপ্রেমী হয়ে গেছেন, টেরই পাননি। শিকার করতে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন বহুবার। এর ছাপ আছে তার শরীরে। আছে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার দুঃসাহসিক রোমাঞ্চকর গল্পও। ১৯৯১ সালে কমলগঞ্জের পত্রখোলা চা বাগানে বন্য শূকরের উপদ্রব বেড়ে যায়। চা বাগান কর্তৃপক্ষ সিতেশ বাবুর শরণাপন্ন হন। বাগানে সারা রাত দোনলা বন্দুক দিয়ে শিকার করেন সিতেশ বাবু। শিকার চলাকালে প্রায় আট ফুট লম্বা একটি ভালুকের সামনে পড়েন। ভালুকের থাবায় তার ডান চোখসহ গালের অনেকটা হারিয়ে যায়। টানা দুই মাস চলে চিকিৎসা। সুস্থ হলেও চেহারায় সেই ভয়াল থাবার ছাপ রয়েই যায়।

কি আছে সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানায়

বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রবেশদ্বার পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই শুনতে পাবেন পাখির কিচিরমিচির আর তাতে তাকালেই চোখে পড়বে রঙের বর্ণচ্ছ্বটা আর কানে আসবে কিচিরমিচির শব্দ। বিরল প্রজাতির এই পাখিগুলো দেখে যে কেউই বিস্ময়াভূত হবেন। সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানাটিতে রয়েছে জংলী রাজহাঁস, চখা, সরলী, রাজ সরলী, চা পাখি, ধনেশ, হরিয়াল, সবুজ ঘুঘু, বনমোরগ, ডাহুক, জল কবুতর, নীল গলা বসন্ত বৌরি, তিলা ঘুঘু ও তিতির , ময়না, টিয়া, তোতা, পাহাড়ি বকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।

চোখে পড়বে বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমসংবলিত দেয়ালচিত্র। সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানাটিতে দেখা মিলবে বিরল প্রজাতির সোনালি হনুমানের। একে একে দেখতে পাবেন শকুন, সাদা বক, বিরল প্রজাতির সোনালি রঙের কচ্ছপ, বিষাক্ত শঙ্খিনী সাপ, মেছো বাঘ, গুঁইসাপ। সোনালি রঙের এই কচ্ছপের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এরা গাছে বাস করে যারা কখনো পানিতে নামতে চায় না, ডাঙায় বিচরণ করতে দেখা যায় মাঝেসাঝে। এরা শুকনো খাবার খেতেই পছন্দ করে বেশি।

সিতেশ বাবুর ছোট্ট এই চিড়িয়াখানার আরেক আকর্ষণ উড়ান্ত কাঠবিড়ালী। নিতান্তই নিরীহ গোছের এই প্রাণীটি এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ৩০০ থেকে ৪০০ ফুট দূরে ডানা মেলে উড়ে যেতে পারে। উড়ন্ত অবস্থায় এদের শরীরের চমড়া ছড়িয়ে পড়ে ডানার আকৃতি নিয়ে। এই চিড়িয়াখানার বিশেষ আকর্ষন হলো সাদা বাঘ এবং এই প্রজাতির বাঘ বাংলাদেশে আর কোথাও নেই। পুরু শরীরের দুধের মতো সাদা প্রশমে আবৃত বিরল এ বাঘটি নিমিশেই তার চোখের রং পাল্টাতে পারে। এছাড়া চিড়িয়াখানার আকের আকর্ষনের নাম মায়া হরিণের দল।

মায়া হরিণের পরেই রয়েছে ভাল্লুকের খাঁচা। চিড়িয়াখানার এক কোনে রয়েছে অজগরের অবস্থান যেখানে রয়েছে এক জোড়া অজগর। এই অজগর গুলো পাঁচ বছর আগে এখানেই ৩৮টি ডিম পেড়েছিল। সে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটেছিল যেগুলোকে পরবর্তীতে লাউয়াছড়ায় অবমুক্ত করা হয়।

এছাড়াও সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানায় রয়েছে পুরু শরীর জোড়া কাঁটা আবৃত সজারু,  হিমালয়ান পাম্প সিভিট ও লম্বা লেজওয়ালা হনুমান।

সময়সূচী এবং টিকেট মূল্য

সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা এবং বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকে। এসময় ২০ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করতে হয়।

সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা যাওয়ার উপায়

ঢাকা থেকে রেল কিংবা সড়ক পথে সরাসরি শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। ঢাকার ফকিরাপুল ও সায়দাবাদ থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, সিলেট এক্সপ্রেস ইত্যাদি পরিবহনের নন এসি বাস যায় শ্রীমঙ্গল। ভাড়া সাড়ে ৩শ’ থেকে ৪শ’ টাকা।

ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে সপ্তাহের মঙ্গলবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেস, প্রতিদিন দুপুর ১২টায় জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন বিকাল ৪টায় কালনী এক্সপ্রেস, বুধবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ৯টা ৫০ মিনিটে উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল অথবা কুলাউড়া নামা যায়।

ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গলের ভাড়া শোভন ২শ’ টাকা। শোভন চেয়ার ২৪০ টাকা, প্রথম চেয়ার ৩২০ টাকা, প্রথম শ্রেণি বার্থ ৪৮০ টাকা, স্নিগ্ধা ৪৬০ টাকা, এসি সিট ৫৫২ টাকা, এসি বার্থ ৮২৮ টাকা।

এছাড়া চট্টগ্রাম থেকেও সরাসরি ট্রেনে যাওয়া যায় মৌলভী বাজারের শ্রীমঙ্গল কিংবা কুলাউড়া। চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে সিলেটগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেস এবং শনিবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেন স্টেশন দুটিতে নামা যায়।

শ্রীমঙ্গল থেকে থেকে শনিবার ছাড়া প্রতিদিন দুপুর ১২টা ৫৮ মিনিটে পাহাড়িকা এক্সপ্রেস এবং রোববার ছাড়া প্রতিদিন রাত ১১টা ২৪ মিনিটে উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেন দুটি চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।

ঢাকার ফকিরাপুল ও সায়দাবাদ থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, সিলেট এক্সপ্রেস, সৌদিয়া পরিবহনের নন এসি বাস শ্রীমঙ্গল হয়ে মৌলভী বাজার। ভাড়া নন এসি বাসে সাড়ে ৩শ’ থেকে ৩৮০ টাকা।

শ্রীমঙ্গল থেকে অটোরিকশায় যেতে পারবেন সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানায়।

কোথায় থাকবেন

শ্রীমঙ্গল চা জাদুঘর এর সাথেই রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন টি রিসোর্ট। আর যদি টি-রিসোর্ট ছাড়া শ্রীমঙ্গলে অন্য কোথাও থাকতে চান, সেক্ষেত্রে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো মানের জায়গা ভানুগাছ সড়কে টি-রিসোর্ট (ফোনঃ ০১৭১২৯১৬০০১ )। অন্যান্য থাকার জায়গার মধ্যে আছে —

  • হোটেল গ্র্যান্ড সুলতান (পাঁচ তারকা) – ০১৫৫২-৬৮৩৪৫৪
  • রেইন ফরেস্ট রিসোর্ট (০১৯৩৮-৩০৫৭০৬)
  • টি টাউন রেস্ট হাউস, হোটেল প্লাজা (৮৬২৬৫২৫, ০১৭১১-৩৩২৬০৫)
  • বি.টি.আর.আই – ০৮৬২৬-৭১২২৫ ইত্যাদি।

এসব হোটেল ও রিসোর্টের ভাড়া ৫শ’ টাকা থেকে ৫ হাজার ৫শ’ টাকা। এছাড়া শ্রীমঙ্গলের রাধানগরে চমৎকার দুটি রিসোর্ট হল নিসর্গ নিরব ইকো রিসোর্ট (০১৭১৫০৪১২০৭) এবং নিসর্গ লিচিবাড়ি ইকো রির্সোট (০১৭১৬৯৩৯৫৪০)

এছাড়া কম খরচে রাত্রি যাপনের জন্য শ্রীমঙ্গলে হোটেল মেরিনা, টি হাউজ রেস্ট হাউজ, প্যারাডাইস লজ, হোটেল মহসিন প্লাজা, হোটেল আল রহমানের মতো বেশকিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে।

শ্রীমঙ্গল এর খাবার হোটেল

শ্রীমঙ্গল শহরের গ্র্যান্ড তাজ, হাবিব হোটেল, কুটুম বাড়ী ও শ্রীমঙ্গল ইনের খাবার বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া এখানের প্রায় সকল রিসোর্টে খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। তবে মনে রাখবেন, শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে গেলে এখানকার নীলকণ্ঠ টি কেবিনের সাতরঙের চা এর স্বাদ নিতে ভুলবেন না।

×

করোনার প্রাদুর্ভাব বেরে যাওয়ায় অনেক ট্যুরিষ্ট প্লেস গুলোতে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই সেখানে ভ্রমণের প্ল্যান করলে আগে থেকে ভালো ভাবে খোঁজ খবর নিয়ে যাবেন।

দিক নির্দেশনা

আপনার রিভিউ দিন

* বাধ্যতামূলক ভাবে পূরণ করতে হবে।