ঝিনাইদহ

শৈলকুপা শাহী মসজিদ

ঝিনাইদহ জেলার কুমার নদের উত্তর তীরে অবস্থিত শৈলকুপা শাহী মসজিদ (Shailkupa Shahi Mosque) বাংলাদেশের মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। শৈলকুপা উপজেলা সদরের দরগাপাড়ায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদটি শুধু একটি ইমারত নয়, এটি সুলতানী স্থাপত্যের শিল্পকলার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। ঐতিহাসিক এবং স্থাপত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

শৈলকুপা শাহী মসজিদ সুলতানী আমলে নির্মিত স্থাপত্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি দক্ষিণবঙ্গে মুসলিম শাসনের বিস্তার এবং স্থাপত্যকলার বিকাশের সাক্ষ্য বহন করে। মসজিদটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, এটি তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

মসজিদটি কবে নির্মিত হয়েছিল, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। তবে সাধারণভাবে মনে করা হয়, ১৫২৩-২৪ সালের মধ্যে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র নাসির উদ্দিন নুসরাত শাহের শাসনামলে এটি নির্মিত হয়েছিল। কারো কারো মতে, নুসরাত শাহ গৌড় থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে কিছুদিনের জন্য শৈলকুপায় অবস্থানকালে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন।

কথিত আছে, নুসরাত শাহের সফরসঙ্গী দরবেশ আরব শাহ এখানে কিছুদিন থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করলে, সুলতান তার দুই শিষ্যসহ দরবেশকে এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। মসজিদটি সংস্কার, সংরক্ষণ ও পরিচালনার জন্য সুলতান কয়েকশ বিঘা জমি ওয়াকফ করে দেন। পরবর্তীতে এই ওয়াকফকৃত জমির আয় থেকেই মসজিদের বিভিন্ন সংস্কার কাজ করা হয়।

শৈলকুপা শাহী মসজিদ এর স্থাপত্যশৈলী

শৈলকুপা শাহী মসজিদ মধ্যযুগের মুসলিম স্থাপত্যের এক চমৎকার উদাহরণ। এটি মূলত লাল রঙের ছোট ছোট ইট দিয়ে তৈরি। উত্তর-দক্ষিণে মসজিদের দৈর্ঘ্য ৩১.৫ ফুট এবং প্রস্থ ২১ ফুট। দেয়ালগুলো প্রায় ৫.৫ ফুট প্রশস্ত। পুরো কাঠামোটি ছয়টি গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত, যা এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। মসজিদের চার কোণে চারটি অলংকৃত গোলাকার মিনার রয়েছে। মিনারগুলোতে বলয়াকৃতির নকশা বিদ্যমান।

মসজিদের পূর্ব দেয়ালে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে দুটি করে প্রবেশপথ রয়েছে। পূর্ব দিকের প্রধান প্রবেশপথের দুই পাশে দুটি ছোট মিনার রয়েছে, যা কোণের মিনারগুলোর চেয়ে কিছুটা নিচু। ভেতরের পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মেহরাব আছে, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় মেহরাবটি আকারে বড়। মসজিদের অভ্যন্তরে প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু দুটি স্তম্ভ রয়েছে, যেগুলোর ওপর নির্মিত খিলানগুলো গম্বুজগুলোকে ধরে রেখেছে।

শৈলকুপা শাহী মসজিদে যাতায়াত, থাকা ও খাওয়ার ঠিকানা

যাওয়ার উপায়

ঝিনাইদহ জেলা সদর থেকে শৈলকুপা শাহী মসজিদে যেতে সড়কপথে বাস অথবা সিএনজিচালিত অটো রিকশা ব্যবহার করতে পারেন। ঝিনাইদহ শহর থেকে মসজিদের দূরত্ব প্রায় ২৮ কিলোমিটার। ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে ঝিনাইদহের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বাস ছেড়ে যায়। রয়েল, সোনার তরী, এসবি পরিবহণ, জেআর পরিবহণ, চুয়াডাঙ্গা, হানিফ, দর্শনা অথবা পূর্বাশা ডিলাক্স-এর মতো বাসগুলোতে সরাসরি ঝিনাইদহ যাওয়া যায়। এসি বাসের ভাড়া ৬৫০ থেকে ১৩০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। ঝিনাইদহ শহর থেকে বাস অথবা সিএনজি নিয়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই পৌঁছে যাবেন শৈলকুপা শাহী মসজিদে।

ঝিনাইদহে কোথায় থাকবেন

ঝিনাইদহ শহরে রাত্রিযাপনের জন্য বিভিন্ন মানের হোটেল ও রেস্ট হাউজ রয়েছে। এদের মধ্যে হোটেল রাতুল, হোটেল রেডিয়েশন, হোটেল জামান, নয়ন হোটেল, হোটেল ড্রিম ইন এবং ক্ষণিকা রেস্ট হাউজ উল্লেখযোগ্য। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন।

কোথায় খাবেন

ঝিনাইদহে খাবারের জন্য বেশ কয়েকটি ভালো মানের রেস্টুরেন্ট রয়েছে। শহরের পায়রা চত্বরের আশেপাশে ক্যাফে কাশফুল, কস্তুরি হোটেল, অজয় কিচেন, লিজা ফাস্ট ফুড, ইং কিং চাইনিজ, রূপসী বাংলা রেস্তোরাঁ, সুইট হোটেল ও আহার রেস্টুরেন্টের মতো বিভিন্ন খাবারের দোকানে আপনার পছন্দের খাবার উপভোগ করতে পারেন। এখানে বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক খাবার পাওয়া যায়।

শৈলকুপা শাহী মসজিদ শুধু একটি প্রাচীন স্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক। এর স্থাপত্যশৈলী, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং আধ্যাত্মিক তাৎপর্য এটিকে বিশেষ করে তুলেছে। এই মসজিদটি আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা জরুরি।

Leave a Comment
Share