সরকারি কাগজে-কলমে গ্রামটির নাম আছে। মৌজার নকশায় দাগ-খতিয়ান আছে। জমির মালিকদের নাম আছে। কিন্তু নেই কেবল মানুষ। বগুড়া জেলার শাজাহানপুর উপজেলার গোহাইল ইউনিয়নে অবস্থিত পিচুলগাড়ি নামের এই ছোট্ট গ্রামটি প্রায় চার দশক ধরে সম্পূর্ণ জনশূন্য। একসময় যেখানে শিশুদের কলহাস্য শোনা যেত, ধান মাড়াইয়ের শব্দ উঠত, সন্ধ্যায় কুপির আলো জ্বলত—সেখানে আজ কেবল লতাপাতা, আগাছা আর ঘন ঝোপঝাড়। মানুষের ফেলে যাওয়া বসতভিটাগুলো এখন ভাঙা ইটের স্তূপ, যার ফাঁক দিয়ে গজিয়ে উঠেছে বাঁশঝাড় আর বুনো গাছ।
স্থানীয়দের মুখে গ্রামটির পরিচয় এখন একটাই—‘ভুতুড়ে গ্রাম’।
গ্রামটি কোথায়, কেমন?
পিচুলগাড়ির অবস্থান বগুড়া শহর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, শাজাহানপুর উপজেলার গোহাইল ইউনিয়নের ভেতরে। স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী গ্রামটির আয়তন খুব বড় নয়—প্রায় ৯ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছিল এই বসতি। আশির দশকের শুরুর দিকে এখানে বসবাস করত প্রায় ২০টি পরিবার, মোট জনসংখ্যা ছিল শতাধিক।
গ্রামটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—এবং একইসঙ্গে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা—ছিল এর ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা। চারপাশে ফসলের মাঠ, মাঝখানে দ্বীপের মতো জেগে থাকা ছোট্ট একটি জনপদ। পাকা রাস্তা ছিল না, বিদ্যুৎ ছিল না, পাশের গ্রামে যেতে হতো আঁকাবাঁকা মেঠো পথ ধরে। এই নির্জনতাই একদিন গ্রামটির সর্বনাশ ডেকে আনে।
যে রাতে গ্রামটি মরে গেল
স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনা ও সাংবাদিকদের অনুসন্ধান অনুযায়ী, আশির দশকের শুরুতে পিচুলগাড়িতে ডাকাতের উপদ্রব ভয়াবহ রূপ নেয়। বিদ্যুৎ নেই, পুলিশ ফাঁড়ি দূরে, চিৎকার করলেও শোনার মানুষ নেই—ডাকাতদের জন্য এর চেয়ে সুবিধাজনক জায়গা আর কী হতে পারে? রাতের পর রাত ডাকাতদল হানা দিত, গরু-ছাগল খুলে নিয়ে যেত, ঘরে আগুন দিত, মারধর করত।
তবু মানুষ মাটি কামড়ে টিকে ছিল। ভিটেমাটি ছাড়া তো সহজ কথা নয়। শেষ আঘাতটি আসে ১৯৮১ সালের দিকে। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, এক রাতে ডাকাতদল গ্রামের সবচেয়ে সচ্ছল ও প্রভাবশালী গৃহস্থ মফিজ উদ্দিন মণ্ডল—যাঁকে স্থানীয়রা ‘হাজি সাহেব’ বলে ডাকতেন—তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে। যে মানুষটির ওপর ভরসা করে গোটা গ্রাম দাঁড়িয়ে ছিল, তিনিই আর রইলেন না।
এরপর যা হলো, তাকে বলা চলে সমষ্টিগত পলায়ন। এক-দুই পরিবার নয়, একে একে সব পরিবার বাপ-দাদার ভিটে ছেড়ে আশপাশের গ্রামে আশ্রয় নিল। জমিজমা রইল, ঘরবাড়ি রইল, কেবল মানুষ চলে গেল। আর কখনো স্থায়ীভাবে ফিরল না।
জঙ্গল যেভাবে গ্রাম গিলে খেল
প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। মানুষ সরে যাওয়ার পর পিচুলগাড়ি দখল করে নিল গাছপালা। চার দশকে উঠোন হয়ে গেছে ঝোপ, ঘরের মেঝে ফুঁড়ে বেরিয়েছে বটের চারা, পুকুরপাড় ঢেকেছে কচুরিপানা আর কাঁটাগাছে। ভাঙা দেয়ালে শিকড় নেমেছে, টিনের চাল কোথাও পড়ে আছে মরচে ধরা অবস্থায়। দিনের বেলাতেও গ্রামটিতে এক অদ্ভুত নীরবতা—কেবল পাখির ডাক আর পাতার শব্দ। যাঁরা গিয়েছেন, তাঁরা বলেন, দুপুরেও গা ছমছম করে। এই দৃশ্যপটই জন্ম দিয়েছে গল্পের।
মিথ, বিশ্বাস আর ‘অভিশাপ’
জনশূন্যতা আর নির্জনতা মিলে পিচুলগাড়িকে ঘিরে তৈরি হয়েছে একগুচ্ছ লোকবিশ্বাস। আশপাশের গ্রামের অনেকেই বিশ্বাস করেন, পরিত্যক্ত এই জনপদে এখন অশরীরীর বাস।
সবচেয়ে প্রচলিত বিশ্বাসটি হলো—পিচুলগাড়ি থেকে কোনো কিছু নিয়ে আসা যাবে না। এক টুকরো কাঠ, একটি ফল, এমনকি গাছের একটি পাতা ছিঁড়ে অন্য গ্রামে নিয়ে গেলে সেই ব্যক্তি বা তার পরিবারের বড় ক্ষতি হবে—এমন ধারণা এখানে গভীরভাবে গেড়ে বসেছে। ফলে গ্রামটিতে ফলের গাছ থাকলেও কেউ ফল পাড়ে না, বাঁশ থাকলেও কেউ বাঁশ কাটে না। সন্ধ্যা নামলে পুরো এলাকাটি এড়িয়ে চলেন সবাই।
তবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও ভ্লগারদের সরেজমিন অভিজ্ঞতা—কোনোটিতেই অতিপ্রাকৃত কিছুর প্রমাণ মেলেনি। বাস্তবতা অনেক বেশি সাদামাটা এবং অনেক বেশি করুণ: দীর্ঘ নির্জনতা, বন্য পরিবেশ এবং ডাকাত আতঙ্কের সেই পুরোনো সামষ্টিক ট্রমা—এই তিনটি মিলেই তৈরি হয়েছে ‘ভূতের গ্রাম’-এর মিথ। ভূত আসলে অতীতের ভয়, অন্য কিছু নয়।
যা এখনো টিকে আছে
পিচুলগাড়ি পুরোপুরি মৃত নয়। মানুষ চলে গেলেও কিছু বন্ধন ছিঁড়ে যায়নি।
পুরোনো মসজিদ: গ্রামের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে আজও দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন মসজিদ। আশ্চর্যের বিষয়, প্রতি শুক্রবার আশপাশের গ্রামে ছড়িয়ে পড়া সাবেক বাসিন্দারা এখানে এসে জুমার নামাজ আদায় করেন। সপ্তাহে একদিনের জন্য গ্রামটি যেন প্রাণ ফিরে পায়।
কবরস্থান: যাঁরা ভিটে ছেড়ে গিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁদের অনেককেই আজও এই পিচুলগাড়িতেই দাফন করা হয়। জীবিত অবস্থায় গ্রামে থাকা যায়নি, কিন্তু শেষ ঠিকানা হিসেবে বেছে নেওয়া হয় সেই পৈতৃক মাটিই।
দিনের কৃষিকাজ: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেউ কেউ দিনের বেলা এখানে হাঁস-মুরগির খামার করছেন, কেউ চাষাবাদ শুরু করেছেন। সূর্য ডোবার আগেই অবশ্য সবাই ফিরে যান।
ফেরার অপেক্ষা
আজ আর সেই ডাকাতের আতঙ্ক নেই। এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা বদলেছে, বগুড়া শহর কাছে এসেছে, মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক পৌঁছে গেছে সর্বত্র।
সাবেক বাসিন্দাদের অনেকেই এখন বলছেন, তাঁরা ফিরতে চান। তাঁদের চাওয়া দুটি—চলাচলের উপযোগী রাস্তা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ। এই দুটি নিশ্চিত হলে তাঁরা আবার নিজেদের পৈতৃক ভিটেতে ঘর তুলতে প্রস্তুত। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আশ্বাস মিলেছে—বাসিন্দারা সত্যিই ফিরে যেতে চাইলে আইনি সীমার মধ্যে রাস্তা ও বিদ্যুতের ব্যাপারে সরকারি সহযোগিতা করা হবে।
পিচুলগাড়ি কেন গুরুত্বপূর্ণ
পিচুলগাড়ির গল্প নিছক একটি ভূতের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ নিরাপত্তাহীনতার একটি জীবন্ত দস্তাবেজ। আশির দশকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা কতটা প্রান্তিক এলাকায় পৌঁছাত না—তার নিদর্শন এই জঙ্গলে ঢাকা ভিটেগুলো। একটি হত্যাকাণ্ড কীভাবে একটি গোটা জনপদকে ইতিহাস থেকে মুছে দিতে পারে, পিচুলগাড়ি তার প্রমাণ।
একইসঙ্গে এটি লোকমনস্তত্ত্বের একটি চমৎকার কেস স্টাডি। বাস্তব ট্রমা কীভাবে দুই প্রজন্মের ব্যবধানে অতিপ্রাকৃত মিথে রূপান্তরিত হয়—’পাতা ছিঁড়লে ক্ষতি হবে’ জাতীয় নিষেধাজ্ঞা আসলে সেই পুরোনো ভয়েরই লোকজ ভাষা।
আর আছে একটি মায়ার গল্প। যে মানুষগুলো প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে গিয়েছিল, তারা আজও প্রতি শুক্রবার ফিরে আসে নামাজ পড়তে। মরার পর ফিরে আসে চিরকালের জন্য। ভিটে ছাড়া যায়, কিন্তু মাটির টান ছাড়া যায় না।
কিভাবে যাবেন?
বগুড়া শহর থেকে শাজাহানপুর উপজেলার দিকে গিয়ে গোহাইল ইউনিয়নে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে স্থানীয় কেউ পিচুলগাড়ির পথ দেখিয়ে দেবেন। কয়েকটি পরামর্শ:
- দিনের বেলা যান। রাস্তা অনুন্নত, সন্ধ্যার পর পথ হারানোর ঝুঁকি আছে।
- স্থানীয় গাইড নিন। পথ খুঁজে পাওয়া সহজ হবে, আর এলাকার ইতিহাসও জানা যাবে।
- সাপ ও কাঁটাগাছের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। ঘন ঝোপঝাড়, তাই পূর্ণ হাতা পোশাক ও শক্ত জুতো পরুন।
- স্থানীয় অনুভূতিকে সম্মান করুন। এটি অনেকের পৈতৃক ভিটে ও কবরস্থান। মসজিদ ও কবরস্থানে ঢোকার সময় শালীনতা বজায় রাখুন, কোনো কিছু নষ্ট করবেন না।
- কিছু নিয়ে আসবেন না। বিশ্বাস করুন বা না করুন—স্থানীয়দের কাছে এটি স্পর্শকাতর বিষয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখার তথ্য স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, তথ্যচিত্র ও এলাকাবাসীর মুখে প্রচলিত বিবরণের ভিত্তিতে সংকলিত। ব্যক্তির নাম, সাল ও পরিবারসংখ্যার মতো কিছু বিবরণ বিভিন্ন সূত্রে সামান্য ভিন্নভাবে পাওয়া যায়।
আমাদের সবার ভ্রমণ নিরাপদ হোক, এটাই হোক আমাদের সকলের চাওয়া।