বাটারফ্লাই পার্ক, পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম
বাটারফ্লাই পার্ক, পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম

বাটারফ্লাই পার্ক

জন
Reading Time ৪ মিনিটস

সমুদ্রের গর্জন, বিমানের ডানার শব্দ আর প্রজাপতির নিঃশব্দ ওড়াউড়ি—এই তিনের অদ্ভুত মেলবন্ধন যদি একই জায়গায় খুঁজতে চান, তবে গন্তব্য একটাই: চট্টগ্রামের পতেঙ্গার বাটারফ্লাই পার্ক (Butterfly Park)। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একেবারে গা ঘেঁষে, নেভাল একাডেমি রোডের ধারে ছয় একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে দেশের প্রথম ও একমাত্র জীবন্ত প্রজাপতির ট্রপিক্যাল গার্ডেন।

বাটারফ্লাই পার্কে দেখার মতো কি কি আছে

বাটারফ্লাই পার্ক শুধু একটি বাগান নয়—এটি একটি সংরক্ষণকেন্দ্র, গবেষণাগার আর বিনোদনকেন্দ্রের সম্মিলিত রূপ। এখানে রয়েছে:

  • ট্রপিক্যাল গার্ডেন — প্রজাপতির খাদ্য ও বংশবিস্তারের উপযোগী নানা জাতের ফুল ও লতাগুল্মে সাজানো
  • বাটারফ্লাই জোন — তারের জালে ঘেরা বিশাল উন্মুক্ত ঘেরাটোপ, যেখানে নানা রঙের প্রজাপতি অবাধে উড়ে বেড়ায়
  • বাটারফ্লাই মিউজিয়াম — শত শত সংরক্ষিত মৃত প্রজাপতির প্রদর্শনী
  • বাটারফ্লাই রিয়ারিং রুম — ডিম থেকে শুঁয়োপোকা, পিউপা হয়ে প্রজাপতি হওয়ার পুরো জীবনচক্র দেখার সুযোগ
  • কৃত্রিম লেক ও ঝর্ণা — বোটিং ও ফটোগ্রাফির জন্য আদর্শ
  • ফিশ ফিডিং জোন ও বাটারফ্লাই ফিডিং জোন
  • শিশুদের খেলার জায়গা, ট্রেন রাইড ও রক ক্লাইম্বিং ওয়াল
  • পিকনিক স্পট — ৫০০-এর বেশি মানুষের ধারণক্ষমতা

ভেতরে ঢুকলে কী দেখবেন

মূল প্রবেশদ্বারের সামনে দাঁড়ালেই বোঝা যায় ভেতরে অন্য এক দুনিয়া অপেক্ষা করছে—দেয়ালজুড়ে আঁকা প্রজাপতির বিশাল বিশাল ছবি যেন আগাম বার্তা দেয়। গেট পেরিয়েই প্রথমে চোখে পড়ে কৃত্রিম ঝর্ণা। জলের শব্দ আর সবুজের ছায়া মিলিয়ে শহরের ক্লান্তি এক নিমেষে হালকা হয়ে যায়। ঝর্ণা পেরিয়ে সামনেই তারের জালে তৈরি বাটারফ্লাই জোন—এখানেই মূল আকর্ষণ। জালের ভেতরে ঢুকলে চারপাশে হলুদ, কালো, নীল, কমলা ডানার ঝাঁক। ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে থাকলে হাতের ওপরও এসে বসতে পারে কোনো সাহসী অতিথি।

বাটারফ্লাই জোন থেকে বেরিয়ে বাটারফ্লাই মিউজিয়াম। কাচের ফ্রেমে সাজানো শত শত সংরক্ষিত প্রজাপতি—প্রজাতি চেনার জন্য দুর্দান্ত জায়গা, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য। জাদুঘর থেকে বেরিয়ে শিশুদের খেলার জায়গা, আর পাশেই জলাশয়। এখানে ফাইবারের বোট চালানোর ব্যবস্থা আছে। যারা দলবেঁধে আসেন, তাদের জন্য রয়েছে প্রশস্ত পিকনিক স্পট।

বাটারফ্লাই পার্ক এর সময়সূচি এবং প্রবেশমূল্য

প্রজাপতি রোদ ভালোবাসে। সকাল ৯:৩০ থেকে দুপুর পর্যন্ত সময়টিই সবচেয়ে ভালো—তখনই সবচেয়ে বেশি প্রজাপতির দেখা মেলে। বিকেলের পর থেকে প্রজাপতির দল ঝোপঝাড়ে আশ্রয় নিতে শুরু করে, তাই দিনের আলো থাকতেই ঘুরে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ।

  • পার্ক: প্রতিদিন সকাল ৯:৩০ থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত (সপ্তাহের সাত দিন খোলা)
  • রেস্টুরেন্ট: সকাল ১০:০০ থেকে রাত ১১:০০ পর্যন্ত

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী প্রবেশমূল্য:

ক্যাটাগরিমূল্য
প্রাপ্তবয়স্ক১০০ টাকা
শিশু৫০ টাকা
সার্কভুক্ত দেশের নাগরিক১৫০ টাকা
অন্য বিদেশি পর্যটক২০০ টাকা
৩ বছরের কম বয়সী শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিনামূল্যে

পূর্বে সপ্তাহান্তে (বৃহস্পতি-শুক্র-শনি) ১০০ টাকা এবং বাকি দিনগুলোতে ৫০ টাকা হারে টিকিট নেওয়া হতো। মূল্য সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়, তাই যাওয়ার আগে ফোনে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভালো।

রাত্রিযাপন: বাটারফ্লাই রিসোর্ট

ভালো লেগে গেলে থেকেও যেতে পারেন। পার্কের ভেতরেই রয়েছে বাটারফ্লাই রিসোর্ট—আন্তর্জাতিক মানের ছিমছাম সাজানো কক্ষ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, উষ্ণ পানির ব্যবস্থা এবং আধুনিক সব সুবিধা।

কক্ষভাড়া (প্রতি রাত):

  • স্ট্যান্ডার্ড রুম — ৪,০০০ টাকা
  • সুপার ডিলাক্স রুম — ৫,০০০ টাকা
  • বাটারফ্লাই স্যুট — ৭,০০০ টাকা

রিসোর্টে থাকলে সাধারণত সারাদিনের পার্ক প্রবেশাধিকার, সকালের নাশতা, লাইভ বাটারফ্লাই কনজারভেটরির গাইডেড ট্যুর এবং রেস্টুরেন্টে ১০% ছাড় পাওয়া যায়। এছাড়া রয়েছে ২৪ ঘণ্টার ফ্রন্ট ডেস্ক, ফ্রি ওয়াই-ফাই, ফ্রি পার্কিং, কিডস জোন এবং বাঙালি-ভারতীয়-থাই-চাইনিজ খাবারের মাল্টি-কুইজিন রেস্টুরেন্ট। ফ্যামিলি ট্যুর, হানিমুন, উইকএন্ড, পিকনিক ও বার্থডে প্যাকেজও পাওয়া যায়।

যাওয়ার উপায়

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম—সড়কপথে: গ্রীন লাইন (০২-৯৩৪২৫৮০), সোহাগ পরিবহন (০২-৯৩৪৪৪৭৭), সৌদিয়া এস আলম (০১১৯৭-০১৫৬৩৬-৬৩৮) সহ বিভিন্ন পরিবহনের বিলাসবহুল এসি বাস চলাচল করে। গ্রীন লাইন, এস আলম, সৌদিয়া, ইউনিক, শ্যামলীর ভালো মানের নন-এসি বাসও রয়েছে এই পথে।

রেলপথে:

  • মহানগর প্রভাতী — ঢাকা ছাড়ে সকাল ৭:৪০
  • মহানগর গোধূলি — ঢাকা ছাড়ে বিকেল ৩:০০
  • সুবর্ণ এক্সপ্রেস — ঢাকা ছাড়ে বিকেল ৪:২০
  • তূর্ণা নিশীথা — ঢাকা ছাড়ে রাত ১১:০০

ভাড়া (আনুমানিক): এসি বার্থ ৭৫৬, এসি সিট ৪৫৫, প্রথম শ্রেণি বার্থ ৪৫৫, প্রথম শ্রেণি চেয়ার ২৯০, স্নিগ্ধা ৩৮০, শোভন চেয়ার ১৫০, শোভন ১২৫, সুলভ ১০০ টাকা।

আকাশপথে: ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে নিয়মিত ফ্লাইট চলাচল করে। বিমানে গেলে সবচেয়ে সুবিধা—শাহ আমানত বিমানবন্দরের একেবারে পাশেই প্রজাপতি পার্ক।

চট্টগ্রাম শহর থেকে: যেকোনো বাহনে শহরে পৌঁছে সেখান থেকে পতেঙ্গাগামী বাস, লেগুনা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সহজেই পার্কে পৌঁছে যাবেন।

ঠিকানা

১৫, নেভাল একাডেমি রোড (শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে), পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম।
ফোন – +8801975006074 অথবা +8801975006247
ওয়েবসাইট – https://bangladeshbutterflypark.com

বাটারফ্লাই পার্ক শুধু একটি বিনোদনকেন্দ্র নয়—প্রজাপতি সংরক্ষণ ও পরিবেশ-সচেতনতার একটি জীবন্ত পাঠশালা। শিশুদের জীববৈচিত্র্য চেনানোর জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা চট্টগ্রামে খুব কম আছে। এক সকালের নিরিবিলি হাঁটা, ঝর্ণার পাশে বসে থাকা আর ডানা মেলা রঙের ঝাঁক—শহুরে ক্লান্তি ভোলার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

গন্তব্য

Butterfly Park, Chittagong, Bangladesh., Patenga, Chittagong, বাংলাদেশ

পথ ও দিকনির্দেশ দেখতে ম্যাপ খুলুন।

গুগল ম্যাপে দেখুন