নথখোলা স্মৃতিসৌধ

নথখোলা স্মৃতিসৌধ

০
জন
অবস্থান টাঙ্গাইল
পড়ার সময় ৬ মিনিটস

টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার কাশিল ইউনিয়নে ঝিনাই নদীর ওপর নথখোলা সেতুর পাদদেশে দাঁড়িয়ে আছে নথখোলা স্মৃতিসৌধ। কামুটিয়া গ্রামের পাশে নদীর এই অংশকে স্থানীয়রা নথখোলা নদী বলেন। ১৯৭১ সালে এই খেয়াঘাটেই কাদেরিয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা বাসাইলমুখী পাকিস্তানি সেনাদের রুখে দিয়েছিলেন, সেই কামুটিয়া–নথখোলা যুদ্ধের শহীদ ও যোদ্ধাদের স্মরণে সৌধটি নির্মিত।

সেতুতে উঠলেই খোলা আকাশের পটভূমিতে উঁচু সৌধটি চোখে পড়ে। নদীর পাড়, সবুজ গ্রাম আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মিলিয়ে টাঙ্গাইল ভ্রমণে কয়েক ঘণ্টার জন্য থামার মতো একটি জায়গা।

এক নজরে নথখোলা স্মৃতিসৌধ

অবস্থানকাশিল ইউনিয়ন, বাসাইল, টাঙ্গাইল; ঝিনাই নদীর নথখোলা সেতুর পাদদেশে
যে যুদ্ধের স্মরণেকামুটিয়া–নথখোলা যুদ্ধ (১৬ ও ১৮ জুন ১৯৭১)
নির্মাতাটাঙ্গাইল জেলা পরিষদ (১৯৯৮)
ভিত্তিপ্রস্তর১৬ নভেম্বর ১৯৯৮, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম
বাসাইল সদর থেকে দূরত্বপ্রায় ৫ কিলোমিটার
প্রবেশমূল্যলাগে না (উন্মুক্ত স্থান)
থাকার ব্যবস্থাসৌধ এলাকায় নেই; টাঙ্গাইল শহরে হোটেল আছে

নথখোলা স্মৃতিসৌধ: কি কি দেখবেন

স্মৃতিসৌধ

নদীর পাড়ে উঁচু হয়ে দাঁড়ানো সৌধটি দূর থেকেই দেখা যায়। সৌধের সামনে দাঁড়িয়ে নীরবে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোই এখানে আসার মূল উদ্দেশ্য।

নথখোলা সেতু

ঝিনাই নদীর ওপর নির্মিত সেতু থেকে নদী, চর আর দুই পাড়ের গ্রামের সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়। যে খেয়াঘাটকে ঘিরে যুদ্ধ হয়েছিল, তার অবস্থানও এখান থেকে আন্দাজ করা যায়।

ঝিনাই নদীর পাড়

শুকনো মৌসুমে নদীর পাড় ধরে হাঁটা যায়; বিকেলের নরম আলোয় নদী ও সৌধের ছবি তোলার জন্য সময়টা ভালো।

গ্রামীণ জীবন

আশপাশের কামুটিয়া ও নথখোলা গ্রামের ফসলের মাঠ, নৌকা আর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে।

কামুটিয়া–নথখোলা যুদ্ধের ইতিহাস

১৯৭১ সালের জুনে বাসাইল থানা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসার পর ১৬ জুন সকালে খবর আসে, করটিয়া থেকে একদল পাকিস্তানি সেনা বাসাইলের দিকে এগোচ্ছে। কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে প্রায় ৩০ জনের একটি দল কামুটিয়া–নথখোলা খেয়াঘাটের কাছে পৌঁছে নদীর পূর্ব পাড়ের উঁচু বাঁধকে আড়াল করে অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। প্রায় তিন ঘণ্টার যুদ্ধে ৯ জন পাকসেনা নিহত হয়; পালানোর সময় তারা কামুটিয়া গ্রামে আগুন দেয়। ১৮ জুন তারা আবার এলে আরেক দফা যুদ্ধে আরও ৫ জন পাকসেনা নিহত হয়।

বাসাইলে ঢোকার পথে এটিই ছিল হানাদারদের প্রথম বড় বাধা। কাদেরিয়া বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইল অঞ্চলে অসংখ্য সফল যুদ্ধ করে, আর ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১ টাঙ্গাইল হানাদারমুক্ত হয়। সেই শহীদ ও যোদ্ধাদের স্মরণে টাঙ্গাইল জেলা পরিষদ ১৯৯৮ সালে সৌধটি নির্মাণ করে; ১৬ নভেম্বর ১৯৯৮ কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

নথখোলা স্মৃতিসৌধ কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল

ঢাকার মহাখালী, কল্যাণপুর ও গাবতলী থেকে টাঙ্গাইলগামী বিভিন্ন পরিবহনের বাস চলে। নথখোলা যেতে করটিয়া বা টাঙ্গাইল বাইপাসে নেমে পড়া সুবিধাজনক। যানজটভেদে ঢাকা থেকে সৌধ পর্যন্ত মোট ৩–৪ ঘণ্টা লাগতে পারে। বর্তমান ভাড়া কাউন্টার থেকে জেনে নিন।

টাঙ্গাইল/করটিয়া থেকে নথখোলা

টাঙ্গাইল–বাসাইল সড়কে বাসাইলগামী সিএনজি অটোরিকশায় উঠুন। বাসাইল সদরে পৌঁছানোর প্রায় ৫ কিলোমিটার আগে নথখোলা সেতুর কাছে নামতে হয়; চালককে আগেই “নথখোলা ব্রিজ” বলে রাখুন। বাসাইল সদর থেকেও অটোরিকশায় সহজে আসা যায়।

নিজস্ব গাড়িতে

একই সড়ক ধরে এসে সেতুর কাছে নিরাপদ জায়গা দেখে গাড়ি থামান; সেতুর ওপর গাড়ি দাঁড় করাবেন না।

এক দিনের টাঙ্গাইল ট্যুর প্ল্যান

সময় দরকার: 1 day

এক দিনে নথখোলা স্মৃতিসৌধসহ টাঙ্গাইলের কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে এই প্ল্যানটি অনুসরণ করতে পারেন।

  1. সকাল ৬টা

    ঢাকা থেকে রওনা:
    মহাখালী বা কল্যাণপুর থেকে টাঙ্গাইলগামী বাসে উঠে করটিয়ায় নামুন।

  2. সকাল

    করটিয়া জমিদার বাড়ি:
    ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশের করটিয়া জমিদার বাড়ি ঘুরে দেখুন।

  3. দুপুরের আগে

    নথখোলা স্মৃতিসৌধ:
    সিএনজিতে টাঙ্গাইল–বাসাইল সড়ক ধরে নথখোলা সেতুতে নামুন; সৌধে শ্রদ্ধা জানিয়ে নদীর পাড়ে কিছুটা সময় কাটান।

  4. দুপুর

    বাসাইল বা টাঙ্গাইল শহরে খাবার:
    দুপুরের খাবার সেরে নিন; টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম চেখে দেখতে ভুলবেন না।

  5. বিকেল

    আতিয়া জামে মসজিদ বা সন্তোষ:
    সময় থাকলে দেলদুয়ারের আতিয়া জামে মসজিদ অথবা সন্তোষে মাওলানা ভাসানীর মাজার ঘুরে আসুন।

  6. সন্ধ্যা

    ঢাকায় ফেরা:
    টাঙ্গাইল থেকে বাসে ঢাকায় রওনা দিন; যানজটভেদে রাত সাড়ে ৯টার মধ্যে পৌঁছানোর আশা করা যায়।

টাঙ্গাইল ভ্রমণ

কখন গেলে ঘুরতে ভালো লাগবে

স্মৃতিসৌধটি সারা বছর উন্মুক্ত, তবে নভেম্বর থেকে মার্চের শুষ্ক মৌসুমে যাতায়াত সবচেয়ে সুবিধাজনক। সকাল বা বিকেলের নরম আলোয় ঘুরতে আরাম।

  1. জানু — শীতকাল
  2. ফেব — শীতকাল
  3. মার্চ — গ্রীষ্মকাল
  4. এপ্রি — গ্রীষ্মকাল
  5. মে — গ্রীষ্মকাল
  6. জুন — গ্রীষ্মকাল
  7. জুল — বর্ষাকাল
  8. আগ — বর্ষাকাল
  9. সেপ্টে — বর্ষাকাল
  10. অক্টো — বর্ষাকাল
  11. নভে — শীতকাল
  12. ডিসে — শীতকাল
★ সেরা সময়

নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি

শীতকাল

  • শুকনো আবহাওয়া, যাতায়াত সহজ
  • নদীর পাড়ে হাঁটা যায়
  • মার্চ ও ডিসেম্বরে জাতীয় দিবসের শ্রদ্ধা নিবেদন

মার্চ–জুন

গ্রীষ্মকাল

  • দুপুরে রোদ ও গরম বেশি
  • সকাল বা বিকেলে ঘুরুন
  • পানি ও টুপি সঙ্গে রাখুন

জুলাই–অক্টোবর

বর্ষাকাল

  • ঝিনাই নদী ভরা ও চারপাশ সবুজ
  • নদীর পাড় পিচ্ছিল থাকে
  • বৃষ্টিতে খোলা জায়গায় ঘোরা কঠিন

কোথায় থাকবেন

সৌধ এলাকায় থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই, আর ঢাকা থেকে দিনে দিনেই ঘুরে আসা যায়। রাত থাকতে চাইলে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের টাঙ্গাইল শহরে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল আছে।

কোথায় খাবেন

সেতুর আশপাশে ছোট চায়ের দোকান পাবেন; দুপুরের খাবার বাসাইল সদর বা টাঙ্গাইল শহরে সেরে নিন। টাঙ্গাইলে গেলে বিখ্যাত পোড়াবাড়ির চমচম খেয়ে দেখুন।

ভ্রমণের আগে জরুরি টিপস
  • সম্মান বজায় রাখুন: এটি শহীদদের স্মরণে নির্মিত সৌধ; বেদিতে জুতা পায়ে ওঠা, বসা বা খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
  • রাস্তায় সতর্কতা: সেতুর ওপর গাড়ি চলে, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার সময় সতর্ক থাকুন।
  • নদীর পাড়: বর্ষায় পাড় পিচ্ছিল থাকে; শিশুদের কাছে রাখুন।
  • পরিচ্ছন্নতা: আশপাশে ময়লা ফেলবেন না।
কাছাকাছি গন্তব্য

নথখোলা স্মৃতিসৌধ: আশেপাশে যা দেখবেন

নথখোলা ঘুরে টাঙ্গাইলের এই দর্শনীয় স্থানগুলো একই ট্রিপে দেখে আসতে পারেন।

করটিয়া জমিদার বাড়ি

ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে পন্নী জমিদারদের ঐতিহাসিক বাড়ি

দূরত্ব একই দিনে ঘোরা যায়

(নথখোলা স্মৃতিসৌধ থেকে)

আতিয়া জামে মসজিদ

দেলদুয়ারে সুলতানি-মুঘল স্থাপত্যরীতির প্রাচীন মসজিদ, পুরোনো ১০ টাকার নোটে যার ছবি ছিল

দূরত্ব একই দিনে ঘোরা যায়

(নথখোলা স্মৃতিসৌধ থেকে)

মাওলানা ভাসানীর মাজার, সন্তোষ

টাঙ্গাইল শহরের সন্তোষে মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর সমাধি ও জাদুঘর

দূরত্ব একই দিনে ঘোরা যায়

(নথখোলা স্মৃতিসৌধ থেকে)

মহেড়া জমিদার বাড়ি

মির্জাপুরের মহেড়ায় সুন্দর স্থাপত্যের জমিদার বাড়ি, বর্তমানে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার

দূরত্ব একই দিনে ঘোরা যায়

(নথখোলা স্মৃতিসৌধ থেকে)

টাঙ্গাইল শহর

পোড়াবাড়ির চমচম, তাঁতের শাড়ি ও জেলার প্রধান শহর

দূরত্ব প্রায় ২৫ কিমি

(নথখোলা স্মৃতিসৌধ থেকে)

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

নথখোলা স্মৃতিসৌধ কোথায় অবস্থিত?

টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার কাশিল ইউনিয়নে, ঝিনাই নদীর ওপর নথখোলা সেতুর পাদদেশে, কামুটিয়া গ্রামের কাছে; বাসাইল সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার।

স্মৃতিসৌধটি কেন নির্মিত হয়েছে?

১৯৭১ সালের ১৬ ও ১৮ জুন কামুটিয়া–নথখোলা খেয়াঘাটে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনীর সফল প্রতিরোধযুদ্ধের শহীদ ও যোদ্ধাদের স্মরণে।

কে ও কবে এটি নির্মাণ করে?

টাঙ্গাইল জেলা পরিষদ ১৯৯৮ সালে নির্মাণ করে; ১৬ নভেম্বর ১৯৯৮ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

প্রবেশমূল্য লাগে কি?

না, সৌধটি উন্মুক্ত স্থানে; প্রবেশে কোনো টিকিট লাগে না।

ঢাকা থেকে কিভাবে যাব?

মহাখালী, কল্যাণপুর বা গাবতলী থেকে টাঙ্গাইলগামী বাসে করটিয়া/টাঙ্গাইলে নেমে বাসাইলগামী সিএনজিতে নথখোলা সেতুতে নামুন। মোট ৩–৪ ঘণ্টা লাগতে পারে।

আশপাশে কি থাকার ব্যবস্থা আছে?

সৌধ এলাকায় নেই; প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের টাঙ্গাইল শহরে আবাসিক হোটেল আছে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আর নদীঘেরা গ্রামের সৌন্দর্য একসঙ্গে দেখতে চাইলে টাঙ্গাইল ভ্রমণে নথখোলা স্মৃতিসৌধ তালিকায় রাখুন।

গন্তব্য

Smrity Shoudh, Road, Tangail, বাংলাদেশ

পথ ও দিকনির্দেশ দেখতে ম্যাপ খুলুন।

গুগল ম্যাপে দেখুন

ADAR BEPARI / TRAVEL WEAR

ভ্রমণের গল্প থাকুক পোশাকেও।

সব টি-শার্ট দেখুন