চাঁদপুর

কড়ৈতলী জমিদার বাড়ি

চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার কড়ৈতলী বাজারের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি প্রাচীন স্থাপনা হলো কড়ৈতলী জমিদার বাড়ি (Koraitoli Zomidar Bari) যা স্থানীয়ভাবে এটি “বাবুর বাড়ি” নামে পরিচিত। একসময় এটি ছিল জমিদারি প্রভাব-প্রতিপত্তির প্রতীক, কিন্তু এখন অবহেলা আর জরাজীর্ণতার চিহ্নই কেবল বহন করছে।

প্রতিষ্ঠা ও ইতিহাস

প্রায় ৮০০ বছর আগে (১২২০ বঙ্গাব্দে) বরিশাল জেলার অধিবাসী হরিশ চন্দ্র বসু নিলামের মাধ্যমে কড়ৈতলীর জমিদারি ক্রয় করেন। তিনি এই জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন করেন এবং প্রায় ৭০ বছর ধরে জমিদারি পরিচালনা করেন। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর ১২৯০ বঙ্গাব্দে শতবর্ষ বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

এরপর তার উত্তরসূরীরা দীর্ঘদিন এই জমিদারি চালিয়ে যান। তবে অধিকাংশ জমিদার ছিলেন অত্যাচারী ও নিষ্ঠুর। সাধারণ মানুষ তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে জুতা পায়ে বা মাথায় ছাতা নিয়ে চলাচল করতে পারত না। জমিদারদের এহেন অত্যাচার আজও লোকমুখে গল্প হয়ে আছে।

ভারতবর্ষ ভাগের পর ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে শেষ জমিদার গোবিন্দ বসুর হাতে এই জমিদার বাড়ির পতন ঘটে। এর পর থেকেই প্রভাবশালী জমিদারবাড়িটি ধীরে ধীরে হারাতে থাকে তার ঐতিহ্য ও জৌলুস।

স্থাপত্য ও বৈশিষ্ট্য

কড়ৈতলী জমিদার বাড়ি শুধু একটি প্রাসাদ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স। এর ভেতরে ছিল—

  • ৩টি ভবন
  • একটি দুর্গা মন্দির
  • বাবুর দীঘি নামে বিশাল একটি জলাশয়
  • দীঘির মধ্যে শান বাঁধানো ঘাট
  • একটি দরবার হল

এর বাইরে কড়ৈতলী বাজারের মাঝেই ছিল শ্মশানকালী মন্দির।

  • মূল ভবন (১নং ভবন): জমিদার পরিবারের আবাসস্থল। এটি ৩ তলা বিশিষ্ট।
  • ২নং ও ৩নং ভবন: ব্যবহার করা হতো মালামাল রাখার ঘর ও প্রজাদের সাজা দেওয়ার কারাগার হিসেবে। এগুলো ২ তলা বিশিষ্ট।

এছাড়া জমিদার বাড়িতে ছিল একটি সুড়ঙ্গপথ, যা আত্মগোপনের কাজে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে এটি বালু দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এখানে একটি “আঁধার মানিক” বা গুপ্তধনের কক্ষ ছিল।

বর্তমান অবস্থা

সময় ও অবহেলার কারণে জমিদার বাড়ির অতীতের সেই জৌলুস এখন আর নেই। চারপাশে লতা-পাতা, বন-জঙ্গলের দখলে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে প্রাসাদটি। ভবনের দেয়ালে ফাটল ধরেছে, অনেক অংশ ভেঙে পড়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে কেউ কেউ ভবনের ইট ও ভেতরের মাটি খুলে নিয়ে যাচ্ছেন।

যে স্থাপনা একসময় জমিদারদের ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের প্রতীক ছিল, আজ তা দাঁড়িয়ে আছে ভগ্নপ্রায় অবস্থায়।

সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

কড়ৈতলী জমিদার বাড়ি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, বরং এটি একটি সময়ের দলিল। জমিদারি প্রথার উত্থান-পতন, গ্রামীণ জীবনের পরিবর্তন এবং একসময়ের প্রভাবশালী সমাজব্যবস্থার স্মৃতি বহন করছে এই প্রাচীন স্থাপত্য। যথাযথ সংরক্ষণ করা গেলে এটি হয়ে উঠতে পারে চাঁদপুর জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র।

কড়ৈতলী জমিদার বাড়ি যাওয়ার উপায়

চাঁদপুর শহর থেকে কড়ৈতলীর দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন এবং রাতে চাঁদপুরগামী লঞ্চ ছেড়ে আসে। ঢাকা থেকে লঞ্চে আসতে চাইলে ডেক যাত্রীর ভাড়া ১০০ টাকা, প্রথম শ্রেণির ভাড়া ২৩০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ৪০০ টাকা এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ৮০০ টাকা। চাঁদপুর লঞ্চঘাটে পৌঁছে সিএনজি করে সহজেই কড়ৈতলী যাওয়া যায়, যার ভাড়া জনপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে।

কড়ৈতলী জমিদার বাড়ি এখন ধ্বংসস্তূপের মতো হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের অমূল্য গল্প। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এটি যদি যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, তবে শুধু চাঁদপুর নয়, সারা দেশের ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এটি হতে পারে এক আকর্ষণীয় গন্তব্য।

Leave a Comment
Share