কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড

জন
৬ মিনিটস
জন

কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড (Karupannya Rangpur Ltd), রংপুর শহরের রবার্টসনগঞ্জে গড়ে ওঠা প্রায় তিন লাখ বর্গফুটের বিশাল এক শতরঞ্জির কারখানা। কারখানাটি সাততলা উঁচু যার ৪০ হাজার বর্গফুট ছড়ানো এক একটি ফ্লোর। দিনে-রাতে দুই শিফটে এখানে কাজ করেন প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক। পুরো কারখানায় একটি এসিও নেই, নেই কোনো বৈদ্যুতিক পাখা। অথচ অস্বস্তিকর গরমের দিনেও কোন শ্রমিক এখানে কাজ করার সময় ঘামেন না। কেননা বাইরের তাপমাত্রার চেয়ে কারখানার ভেতরটা কয়েক ডিগ্রি শীতল।

কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড কারখানাটি এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যে এখানে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের কখনও অভাব হয়না, সে সাথে সবুজায়নের কারনে কারখানাটিও শীতল থাকে বাহিরের থেকে। পুরো কারখানাটি জুরে যেন সবুজের সমারোহ। সবুজ বাগান, নানা প্রজাতির গাছগাছালিতে ছেয়ে আছে ইটপাথরের দালান। ঝুলছে লতাপাতা। সব মিলিয়ে নান্দনিক পরিবেশ। কারখানার বুক চিরে যেন সবুজ হৃদয়। ভবনের ছাদেও সবুজের বাগান। নাম দেওয়া হয়েছে – নন্দিনী পার্ক। ছাদের মধ্যে গাছের ফাঁকে ফাঁকে বসার জন্য ছোট ছোট বেঞ্চ। বেঞ্চগুলোতেও শিল্পীর রং–তুলিতে কারুকার্যময় নান্দনিকতার ছোঁয়া আছে। আছে পানির ফোয়ারা, সেখানে আছে পদ্মফুল। দুপুরের খাবার বিরতিতে প্রাকৃতিক পরিবেশে শ্রমিকদের আহার করতে দেখা যায় সেখানে। এই কারখানার ভবন শীতল রাখা হয়েছে এক বিশেষ ধরনের স্থাপত্যকৌশল প্রয়োগ করে। এতে কারখানাটির ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে। বিদ্যুতের ব্যবহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে এনে একটি সবুজ (গ্রিন) কারখানা গড়ে তোলাই ছিলো তাদের মূল লক্ষ্য।

কারুপণ্যের এই বিশাল কারখানায় যা তৈরি হয়, তার নাম শতরঞ্জি। এটি রংপুর অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহ্য। একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই শিল্প আবার জেগে উঠেছে। নব্বইয়ের দশকে হাতে গোনা কয়েকজন পুরোনো কারিগরকে সংগঠিত করে নতুন করে এর যাত্রা শুরু করা হয়। ২৮ বছরের দীর্ঘ সময়ে কাঁচামাল, বুনন ও নকশায় নানা পর্যায় পেরিয়ে রংপুরের শতরঞ্জি আজ রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়া মহাদেশের ৫৫টি দেশে। গত অর্থবছরে রপ্তানি ছিল ৩ কোটি ডলার। বর্তমানে বাংলাদেশে হস্তশিল্প রপ্তানি বাণিজ্যে শিল্প খাতে ৮০ শতাংশ রপ্তানি করে থাকে কারুপণ্য। সে জন্য প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সাল থেকে প্রতিবছরই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া জাতীয় রপ্তানি ট্রফির স্বর্ণপদক পেয়ে আসছে।

এই শতরঞ্জি তৈরির পেছনেও কারখানায় ব্যবহার করা হয় প্রাকৃতিক ও নবায়নকৃত কাঁচামাল। বছরে ৩ হাজার টন কটন মিলের তুলার বর্জ্য থেকে তৈরি হয় সুতা। তা ছাড়া ১ হাজার ২০০ টন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির বর্জ্য ঝুট কাপড় এবং সাড়ে ৪ হাজার টন পাটের আঁশ ব্যবহার করা হচ্ছে এই কারখানায়। বর্জ্য নবায়ন করে পণ্য প্রস্তুত করার ফলে দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে পরিবেশ ও প্রকৃতি।

কারখানার ভেতরে জলাধার

কারখানার স্থাপত্য নকশায় এমন বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে, যাতে কারখানার ভেতরে বাতাস প্রবাহিত হয়। নিচতলায় লবিতে পুকুরের মতো বড় বড় চারটি জলাধার। ১৫ হাজার বর্গফুট ব্যাসার্ধের এ জলাধারগুলো একসঙ্গে ধারণ করতে পারে ৫ লাখ লিটার পানি। আয়রনমুক্ত এই পানি কারখানায় শতরঞ্জি ডাইংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়ে এই জলাধারে আসে। সবুজ গাছপালা আর এই পানির ওপর দিয়ে উড়ে আসা বাতাস ৩৭ ফুট ব্যাসার্ধের চারটি চক্রাকার শূন্য স্তম্ভের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে কারখানার ভেতরে। তারপর বিভিন্ন তলায় উঠে যায়। ফলে এসি বা ফ্যান ছাড়াই কারখানার বাইরের চেয়ে ভেতরের তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যায়।

বাগানবাড়ির মতো কারখানা

গেট দিয়ে ঢুকলে আট লাখ বর্গফুটের বিশাল কারখানার চৌহদ্দি। মাঝখানে সাততলা কারখানা ভবন দেখলে একটা বিশাল সবুজ বাগান বললে ভুল হবে না। নানা প্রজাতির গাছে ছেয়ে আছে ইট-পাথরের দালান। সাততলা ভবনের ওপর থেকে দেয়ালজুড়ে ঝুলছে লতাপাতার গাছ। ভবনের সামনেও গাছগাছালি। দক্ষিণের বাতাস এসে গাছে দোল খায়।

এভাবে দেয়ালগুলো গাছে ছেয়ে ফেলাও ভবন শীতল রাখার কৌশলের অংশ। কারখানার কর্মকর্তারা বলেন, ভবনের দক্ষিণ দিকের দেয়ালে সূর্যের আলো এসে পড়ে। সূর্যের তাপ কারখানার দেয়ালে পড়ে এর প্রভাব যেন ভেতরে না যায় এ জন্য ভবনের প্রতি তলায় সাড়ে চার ফুট দূরত্ব রেখে বারান্দা ও জানালা রয়েছে। সেই সঙ্গে বাইরে দেয়ালজুড়ে লাগানো হয়েছে সবুজ লতাপাতা গাছ। এ কারণে রোদের তাপ ভেতরে ঢুকতে পারে না।

এ ছাড়া কারখানার দক্ষিণে সবুজ গাছগাছালি লাগানো রয়েছে। এই গাছে এসে দক্ষিণের গরম বাতাস বাধা পায়। ঘুরপাক খেতে খেতে কারখানার দেয়ালে গিয়ে গরম হাওয়া আরও শীতল হয়ে যায়।

মেঝে ফুটো ও উচ্চতা

প্রতিটি তলার মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতা রয়েছে ১২ ফুট। এতে গরম কিছুটা কম অনুভুত হয়। এ ছাড়া কারখানার প্রতি তলায় মেঝের মধ্যে যন্ত্র চালানোর ফলে গরম বাতাস বের হয়, সেই বাতাসও যেন ঘরের ভেতর ঘুরপাক না খায় এ জন্য মেঝের মধ্যে প্রতিটি যন্ত্রের নিচে ফুটো রয়েছে। মেঝের মধ্যে এসব ফুটো দিয়ে গরম বাতাস একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জানালার ওপরের ভেন্টিলেটর দিয়ে বের হয়ে যায়। দশ তলা ভবনের তিনতলা আছে আন্ডারগ্রাউন্ডে আর বাকি সাততলা ওপরে।

এই কারখানার অধিকাংশ (৯০ শতাংশ) শ্রমিক নারী। কারখানার সামনে নারীর প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি শুভ্র ভাস্কর্য, যেটির নাম বনলতা সেন। যার উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট। এছাড়াও আছে উন্মুক্ত মঞ্চ। বিশেষ দিনে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলো এখানে বসেই উপভোগ করেন শ্রমিকরা। রয়েছে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা, ব্যাংকিং সুবিধা, এটিএম বুথ। মনোরম পরিবেশে খাবারের ক্যান্টিন, নারী শ্রমিকদের জন্য চাইল্ড কেয়ার সেন্টার, যেখানে বিনামূল্যে শ্রমিকদের শিশুদের দুধ ও খাবার দেওয়া হয়। রয়েছে নামাজের বিশেষ ব্যবস্থা।

শতভাগ ইকো ফ্রেন্ডলি এই কারখানা। শুধু দেখতেই সুন্দর না, কর্মীদের চিকিৎসা, দুপুর ও রাতের খাবার, শিশুদের দেখাশোনা, তাদের বাজার থেকে শুরু করে সবকিছুর সুবিধা আছে এখানে। এটি দেশে আয়ের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনেরও বড় উৎস। একইসাথে বড় সংখ্যাক মানুষের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এই কারখানা। হারিয়ে যাওয়া শতরঞ্জি শিল্পকে আবার পুনরুজ্জীবিত করে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে নতুন রূপে সংরক্ষণ করছে কারখানাটি। পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ুর ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে যেখানে বাংলাদেশ তথা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরও এর বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে এধরনের পরিবেশবান্ধব কারখানা সত্যিই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি দৃষ্টান্ত।

কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড কারখানা যাওয়ার উপায়

ঢাকার গাবতলী, কল্যাণপুর ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস রংপুরের বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। গাবতলী, কল্যাণপুর ও মহাখালী সকল টার্মিনালের বাসগুলো সাভার হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে রংপুর যাতায়াত করে। ভাড়া পড়বে ৫৫০-৯০০ টাকা।

কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড কারখানাটি রংপুর স্টেশন থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে অবস্থিত। তাই ভ্যান কিংবা রিক্সাযোগে শহরের যেকোন স্থান থেকে আপনি খুব সহজেই এখানে পৌঁছাতে পারবেন।

রংপুরে কোথায় থাকবেন

রংপুর (Rangpur) শহরে থাকার জন্য বেশকিছু হোটেল (Hotel) / মোটেল (Motel) রয়েছে।

  • পর্যটন মোটেলঃ ০৫২১-৬২১১১
  • হোটেল নর্থভিউ : ০৫২১-৫৫৪০৫, ৫৫৪০৬
  • হোটেল কাশপিয়াঃ +৮৮০৫২১-৬১১১১, +৮৮০১৯৭৭-২২৭৭৪২
  • হোটেল গোল্ডেন টাওয়ারঃ +৮৮০৫২১-৬৫৯২০
  • দি পার্ক হোটেলঃ +৮৮০৫২১-৬৫৯২০
  • হোটেল তিলোত্তমাঃ +৮৮০৫২১-৬৩৪৮২, ০১৭১৮৯৩৮৪২৪