কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের গাঙ্গাটিয়ায় অবস্থিত “মানব বাবুর বাড়ি” জমিদারবাড়িটি শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়—এ যেন বাংলার জমিদারি ঐতিহ্য, ইতিহাস আর স্থাপত্যের এক জীবন্ত স্মৃতিচিহ্ন। কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে এই প্রাচীন জমিদারবাড়ি।
সময়ের স্রোতে জমিদারি প্রথা বিলীন হয়েছে, বদলে গেছে চারপাশের অনেক কিছু; কিন্তু এই বাড়ির দেয়াল, কারুকাজ আর পুরোনো স্থাপত্যে যেন এখনও লুকিয়ে আছে এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের গল্প।
কিশোরগঞ্জ জেলা সদর থেকে দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। স্থানীয়দের কাছে এটি “মানব বাবুর বাড়ি” নামেই বেশি পরিচিত — রাস্তায় জিজ্ঞেস করলে এই নামটাই বলবেন, কাজ সহজ হবে।
ষোড়শ শতকে ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে আসা এক রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ পণ্ডিত এই এলাকায় প্রথম বসতি গড়েন এবং একটি শিব মন্দির নির্মাণ করেন। প্রকৃত জমিদারির সূচনা হয় অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে দীননাথ চক্রবর্তীর হাতে — তিনি ইংরেজদের কাছ থেকে হোসেনশাহী পরগনার এক-তৃতীয়াংশ কিনে নেন। পরে তাঁর ছেলে অতুলচন্দ্র চক্রবর্তী আঠারবাড়ির জমিদারানি জ্ঞানদা সুন্দরী চৌধুরানীর কাছ থেকে আরও দুই আনা অংশ কিনে জমিদারি বাড়ান।
মুক্তিযুদ্ধে এই বাড়িটি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ শিবির হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মে পাকিস্তানি বাহিনী হামলা চালিয়ে বাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বর্তমান জমিদার মানব বাবুর বাবা ভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরীসহ পরিবারের কয়েকজনকে হত্যা করে। হত্যার স্থানে এখন একটি স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।
প্রায় ১০ একর জমির উপর দাঁড়ানো বাড়িটি ১৮শ শতকের রোমান-গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে তৈরি। সামনের অংশে সারি সারি গ্রিক পিলার, বিশাল আঙিনা, চারপাশে সুউচ্চ প্রাচীর, আর কারুকার্যময় মূল ফটক “শ্রীধর ভবন”। ভেতরে কাচারি ঘর, নহবতখানা ও দরবার গৃহের চিহ্ন এখনও আছে, যদিও কাচারি ঘর বাদে বাকিগুলো অনেকটাই জরাজীর্ণ।
বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে সেই প্রাচীন শিব মন্দির আর পাশেই সাগরদিঘী নামের বিশাল পুকুর — শতবর্ষী আমগাছে ঘেরা, ছবি তোলার দুর্দান্ত জায়গা। বাড়ির প্রবেশপথের নারিকেল গাছে ছাওয়া ১২ ফুট চওড়া রাস্তাটিও বেশ দৃষ্টিনন্দন।
এই বংশের শেষ উত্তরাধিকারী মানবেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী চৌধুরী (মানব বাবু) এখনও এই বাড়িতেই থাকেন। ১৯৮৩ সালে তিনি হোসেনপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভাগ্য ভালো হলে তাঁর সঙ্গে কথা বলে ৪০০ বছরের ইতিহাস সরাসরি শুনতে পারবেন।
ঢাকা থেকে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি যেতে হলে মূলত আগে কিশোরগঞ্জ শহরে, এরপর সেখান থেকে হোসেনপুরের গাঙ্গাটিয়া যেতে হবে। জমিদার বাড়িটি কিশোরগঞ্জ সদর থেকে আনুমানিক ১১ কিলোমিটার দূরে।
ঢাকা থেকে মহাখালী, সায়েদাবাদ/যাত্রাবাড়ী বা গোলাপবাগ থেকে কিশোরগঞ্জগামী বাস পাওয়া যায়। কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী ঢাকা থেকে সরাসরি কিশোরগঞ্জের বাস সার্ভিস রয়েছে।
রুটটা হবে: ঢাকা → কিশোরগঞ্জ গাইটাল বাসস্ট্যান্ড → বটতলা মোড় → গাঙ্গাটিয়া বাজার → জমিদার বাড়ি
কিশোরগঞ্জের গাইটাল বাসস্ট্যান্ডে নেমে অটোরিকশা/ইজিবাইকে বটতলা মোড়ের দিকে যেতে পারেন। সেখান থেকে গাঙ্গাটিয়া যাওয়ার লোকাল সিএনজি/ইজিবাইক পাওয়া যায়।
বটতলা থেকে গাঙ্গাটিয়া পর্যন্ত লোকাল ইজিবাইক/সিএনজিতে জনপ্রতি আনুমানিক ২৫–৩০ টাকা লাগতে পারে। রিজার্ভ নিলে প্রায় ৩০০–৩৫০ টাকা পর্যন্ত চাইতে পারে—দরদাম করে নেওয়া ভালো। সময় লাগে আনুমানিক ৪০–৫০ মিনিট। গাঙ্গাটিয়া বাজারে নেমে হেঁটেই জমিদার বাড়িতে যেতে পারবেন।
ঢাকা থেকে কমলাপুর অথবা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে কিশোরগঞ্জগামী ট্রেনে যেতে পারেন। পুরোনো ভ্রমণ গাইডগুলোতে এগারোসিন্ধুর ট্রেনের সকালবেলার সার্ভিসের কথা উল্লেখ আছে, তবে ট্রেনের বর্তমান সময়সূচি ও সাপ্তাহিক বন্ধের দিন যাত্রার আগে অবশ্যই যাচাই করবেন, কারণ সময়সূচি পরিবর্তন হতে পারে।
রুট: ঢাকা → কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন → বটতলা/গাঙ্গাটিয়া → জমিদার বাড়ি
কিশোরগঞ্জ স্টেশনে নেমে ইজিবাইক/সিএনজি নিয়ে বটতলা হয়ে গাঙ্গাটিয়ার দিকে যেতে পারবেন।
গ্রামে ভালো খাবারের ব্যবস্থা নেই — চায়ের দোকান পাবেন, তবে মূল খাওয়াদাওয়া কিশোরগঞ্জ শহরেই সেরে নিন। রাতে থাকতে হলে শহরে হোটেল গাঙচিল বা ক্যাসেল সালাম-এর মতো আবাসিক হোটেল আছে। দিনে গিয়ে দিনে ফেরাই সবচেয়ে সহজ পরিকল্পনা।
বাসে গেলে মোটামুটি:
আমাদের মতে, ঢাকা থেকে একদিনের ট্রিপ হলে বাসে কিশোরগঞ্জ গিয়ে সেখান থেকে রিজার্ভ সিএনজি/ইজিবাইক নেওয়াই সবচেয়ে ঝামেলামুক্ত। চাইলে একই ট্রিপে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ, পাগলা মসজিদ বা মিঠামইনের হাওর ঘুরে আসার পরিকল্পনাও যোগ করতে পারেন।
গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষ নয় — একটি ব্যক্তিগত বাসস্থান, যেখানে মানব বাবুর পরিবার এখনও বসবাস করে। ছবি তোলা ও ঘোরাঘুরির সময় তাঁদের গোপনীয়তার প্রতি সম্মান রাখুন, অনুমতি নিয়ে ঢুকুন।
Leave a Comment