অ্যাকুয়ারিয়াম পার্ক

অ্যাকুয়ারিয়াম পার্ক

০
জন
Location ঢাকা
Reading Time ৬ মিনিটস
Duration ১ দিন
Budget ৫০০ টাকা

ঢাকা শহরের অবিরাম কোলাহল, যানজট আর ইট-পাথরের জীবন থেকে একটু দম নেওয়ার সুযোগ খুঁজছেন? তাহলে আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘর কমপ্লেক্স হতে পারে আপনার পরবর্তী গন্তব্য। এখানে একই ছাদের নিচে মিলবে দুটি সম্পূর্ণ আলাদা অথচ সমান আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা — একদিকে বাংলাদেশের গৌরবময় বিমান বাহিনীর ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সংগ্রহশালা, আর অন্যদিকে সদ্য উদ্বোধন হওয়া অ্যাকুয়ারিয়াম পার্ক (Aquarium Park), যেখানে জলের গভীরে রঙিন মাছের দুনিয়া থেকে শুরু করে শত শত বিদেশি পাখির কলতান পর্যন্ত সবকিছুই আপনাকে মুগ্ধ করবে।

পরিবার নিয়ে হোক, বন্ধুদের সাথে হোক কিংবা একাই — এই জায়গাটি সব বয়সের মানুষের জন্য সমানভাবে উপভোগ্য। শিশুরা যেমন পাখির হাতে বসা আর মাছকে খাবার দেওয়ার আনন্দে মেতে উঠবে, তেমনি ইতিহাসপ্রেমীরাও মুগ্ধ হবেন দশকের পর দশক ধরে সংরক্ষিত বিমান ও যুদ্ধকালীন নিদর্শনগুলো দেখে।

অবস্থান

বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘরটি ঢাকার আগারগাঁও এলাকায়, বেগম রোকেয়া অ্যাভিনিউতে অবস্থিত। ঠিকানাটি আরও সহজে বলতে গেলে — আইডিবি ভবনের পাশে এবং তেজগাঁও পুরনো বিমানবন্দরের রানওয়ে-সংলগ্ন এলাকায়। শেরেবাংলা নগরের প্রাণকেন্দ্রে হওয়ায় জায়গাটি ঢাকার প্রায় সব প্রান্ত থেকেই সহজে পৌঁছানো যায়। আর সম্প্রতি মেট্রোরেলের আগারগাঁও স্টেশন চালু হওয়ার পর এই যাত্রা আরও অনেক সহজ হয়ে গেছে।

অ্যাকুয়ারিয়াম পার্ক যাওয়ার উপায়

মেট্রোরেলে: ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে MRT লাইন ৬-এ উঠে সরাসরি আগারগাঁও মেট্রো স্টেশনে নামুন। স্টেশন থেকে বের হলেই জাদুঘরের মূল ফটক চোখে পড়বে — হাঁটাপথে মাত্র এক থেকে দুই মিনিটের দূরত্ব। ট্র্যাফিক জ্যামের ভয় নেই, নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছানো যাবে — এই কারণেই মেট্রোরেল এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সুবিধাজনক বিকল্প।

রাইড শেয়ারে: Uber বা Pathao অ্যাপে “বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘর, আগারগাঁও” লিখে বুকিং দিলেই চালক সরাসরি ফটকের সামনে নামিয়ে দেবেন। দিনের বেলা বা সন্ধ্যায় যানজটের কথা মাথায় রেখে একটু বাড়তি সময় হাতে রাখুন।

বাসে: মতিঝিল, গুলিস্তান বা মিরপুরের দিক থেকে আসলে বেগম রোকেয়া অ্যাভিনিউমুখী যেকোনো বাসে উঠে আগারগাঁও বা আইডিবি ভবন সিগন্যালে নেমে যান। এরপর রিকশা বা হেঁটেই পৌঁছানো যাবে।

সিএনজি বা রিকশায়: আশেপাশের এলাকা — ফার্মগেট, মহাখালী, কারওয়ান বাজার বা বিজয় সরণি থেকে সরাসরি সিএনজিতে চলে আসুন।

খোলার সময় ও টিকিট

জাদুঘর এবং অ্যাকুয়ারিয়াম পার্ক রবিবার বন্ধ থাকে। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শুক্রবার, শনিবার ও সরকারি ছুটির দিনগুলোতে সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত উপভোগ করা যায়।

বিমান বাহিনী জাদুঘর (প্রবেশ মূল্য)
শ্রেণিমূল্য
দেশীয় দর্শনার্থী৳ ৫০
বিদেশী দর্শনার্থী৳ ১০০
২ বছরের নিচে শিশুবিনামূল্যে
বিমানে প্রবেশ (Boarding)৳ ৩০ (অতিরিক্ত)
স্কাই পার্ক রাইড৳ ৪০ (প্রতি রাইড)
অ্যাকুয়ারিয়াম পার্ক (অতিরিক্ত টিকিট)
শ্রেণিমূল্য
সাধারণ প্রবেশ৳ ২০০
২ বছরের নিচে শিশুবিনামূল্যে
স্কুল গ্রুপ৫০% পর্যন্ত ছাড়
ম্যাকাও পাখির সাথে ছবি (হাতে)৳ ২৫০ (অতিরিক্ত)
৩৬০° ফটো বুথ (ম্যাকাওসহ)৳ ৩০০ (অতিরিক্ত)

মনে রাখতে হবে: অ্যাকুয়ারিয়াম পার্কে ঢুকতে হলে প্রথমে জাদুঘরের ৳৫০ টিকিট কাটতেই হবে। মোট খরচ জনপ্রতি কমপক্ষে ৳ ২৫০।

কি আছে আগারগাঁওয়ের এই অ্যাকুয়ারিয়াম পার্কে

২০২৬ সালের আগস্টে উদ্বোধন হওয়া এই পার্কটি ইতোমধ্যে ঢাকার অন্যতম আলোচিত পারিবারিক গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। বিমান বাহিনী জাদুঘরের বিশাল কমপ্লেক্সের ভেতরেই গড়ে উঠেছে এই জলজ ও প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতার জগৎ।

গ্লাস টানেল ও অ্যাকুয়ারিয়াম

পার্কে প্রবেশ করতেই আপনাকে স্বাগত জানাবে একটি কাচের টানেল, যার দুপাশ ও উপরে রঙিন মাছের ঘেরা জলরাশি। মোট ৩৫টি স্বতন্ত্র অ্যাকুয়ারিয়ামে রাখা হয়েছে দেশীয় ও বিদেশি প্রজাতির মাছ। প্রতিটি ট্যাংকে তথ্যফলক রয়েছে যাতে মাছের নাম, আবাসস্থল ও বৈশিষ্ট্য বিস্তারিতভাবে লেখা। ক্রেস্টেড ফ্লাওয়ারহর্ন, অ্যালিগেটর গার, অ্যালবিনো শার্ক, রেইনবো শার্ক, জায়ান্ট ব্ল্যাক কার্পসহ দেশীয় শোল ও খলিশা মাছও আলাদা আলাদা ঘরে সাজানো আছে।

বিশাল পাখির অ্যাভিয়ারি

অ্যাকুয়ারিয়াম পেরিয়ে ঢুকলেই মনে হবে গভীর কোনো অরণ্যে পা দিলেন। এটি ঢাকার সবচেয়ে বড় পাখির অভয়ারণ্য, যেখানে তিনশোরও বেশি পোষা ও প্রশিক্ষিত পাখি রয়েছে। ম্যাকাও, ককাটিয়েল, কনুর, আমাজন প্যারট এবং আফ্রিকান গ্রে-সহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এখানে স্বাধীনভাবে বিচরণ করে। অনেক পাখি এতটাই বশ মানানো যে সরাসরি আপনার হাতে এসে বসবে, কেউ কেউ হয়তো আপনার কথাও নকল করার চেষ্টা করবে! বাড়তি ৳২৫০ দিলে ম্যাকাওকে হাতে নিয়ে ছবি তোলা যাবে, আর ৳৩০০-তে পাওয়া যাবে ৩৬০ ডিগ্রি ফটো বুথের অভিজ্ঞতা।

কৃত্রিম পাহাড় ও ঝরনা

পার্কের সবচেয়ে নাটকীয় আকর্ষণটি হলো ৩৬ থেকে ৪০ ফুট উঁচু একটি কৃত্রিম পাহাড় ও তার গা বেয়ে নামা ঝরনা। পাহাড়ের নিচ দিয়ে একটি টানেল পার হওয়ার সময় রঙ পরিবর্তনকারী কৃত্রিম কুয়াশা ও নানা রঙের আলো মিলিয়ে তৈরি হয় এক অলৌকিক জঙ্গলের পরিবেশ। শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই অনুভূতিটি সত্যিই অপ্রত্যাশিত।

কই পুকুর ও হাতে মাছ খাওয়ানো

ঝরনার পাদদেশে স্বচ্ছ পানির পুকুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে শত শত রঙিন কই ও কার্প মাছ। দর্শনার্থীরা নিজের হাতে এদের খাবার দিতে পারেন, যা বিশেষত শিশুদের জন্য দারুণ আনন্দের একটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে।

শিশুদের শিক্ষামূলক কার্যক্রম

পার্কটি কেবল বিনোদনের জায়গা নয়, এটি শিশুদের প্রকৃতি ও জীববিজ্ঞান সম্পর্কে কৌতূহলী করে তোলার একটি মাধ্যম। প্রবেশের সময় শিশুদের হাতে ইন্টারেক্টিভ কুইজ কার্ড দেওয়া হয়, যা পুরো সফরটাকে একটি মজার স্কেভেঞ্জার হান্টে পরিণত করে। সঠিক উত্তর দিলে শেষে পুরস্কার হিসেবে ব্যাজ ও স্টিকার পাওয়া যায়। এ ছাড়া প্রতি মাসে হোম অ্যাকুয়ারিয়াম রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে শিশু ও বড়দের জন্য আলাদা কর্মশালাও আয়োজন করা হয়।

খাবার ও অন্যান্য সুবিধা

পার্কের ভেতরে একটি ক্যাফে আছে যেখানে হালকা খাবার ও পানীয় পাওয়া যায়। জাদুঘরের বিশাল চত্বরে আরও কয়েকটি ফুড কোর্ট ও ক্যাফেটেরিয়া আছে, যেখানে স্ন্যাকস থেকে শুরু করে পূর্ণ দুপুরের খাবার সবই মেলে। বের হয়ে আগারগাঁওয়ের আশেপাশের রাস্তায় বিভিন্ন মানের রেস্টুরেন্ট ও খাবারের দোকান পাবেন। স্মৃতি হিসেবে কিছু নিতে চাইলে জাদুঘরের স্যুভেনির শপে বিমান বাহিনীর লোগো সংবলিত টি-শার্ট, মগ, পোস্টার ও মিনিয়েচার বিমানের মডেল পাওয়া যায়। প্রাইভেট গাড়ি বা মোটরসাইকেলের জন্য পেইড পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।

 ভ্রমণ টিপস ও পরামর্শ

সেরা সময়: বিকেল ৪-৫টায় আসুন। বাইরের বিমানগুলো রোদের তীব্রতা কম থাকলে আরামে ঘুরে দেখা যায় এবং সূর্যাস্তের আলোয় পুরনো ফাইটার জেটের সামনে ছবি অসাধারণ হয়!
  • সপ্তাহান্তে ভিড় বেশি: শুক্র-শনিবার সকাল ১০টায় গেলে ভিড় এড়ানো সহজ হয়
  • নগদ টাকা রাখুন: ছোট নোটে (৳৫০, ৳১০০) টাকা রাখা ভালো — মাছ ও পাখি খাওয়ানো, ফটো বুথে কাজে আসবে
  • পাখির সাথে সদয় আচরণ করুন: মাছের অ্যাকুয়ারিয়ামে টোকা দেবেন না
  • শিশু ও পরিবারের জন্য আদর্শ: স্কাই পার্কের রাইড, শিশুদের কুইজ কার্যক্রম সব বয়সের জন্য উপযুক্ত
  • পার্কিং: প্রাইভেট কার বা মোটরসাইকেলের জন্য পেইড পার্কিং আছে
  • মেট্রো ব্যবহার করুন: ঢাকার ট্র্যাফিক এড়িয়ে সবচেয়ে দ্রুত পৌঁছানোর সেরা উপায়

একদিনের ট্যুর প্ল্যান

সময়কার্যক্রম
সকাল ১০:০০প্রবেশ, টিকিট কাটুন এবং আউটডোর বিমান সংগ্রহ দেখুন
সকাল ১১:০০বিমানের ভেতরে প্রবেশ ও ইন্ডোর গ্যালারি ঘুরুন
দুপুর ১২:৩০মিউজিয়াম ফুড কোর্টে দুপুরের খাবার
বিকেল ১:৩০স্কাই পার্ক ও কিডস জোন
বিকেল ২:৩০অ্যাকুয়ারিয়াম পার্কে প্রবেশ — গ্লাস টানেল ও মাছ দেখা
বিকেল ৩:৩০পাখির অ্যাভিয়ারি ও ম্যাকাওর সাথে ফটোসেশন
বিকেল ৪:৩০কৃত্রিম ঝরনা ও কই পুকুরে মাছ খাওয়ানো
সন্ধ্যা ৫:৩০স্যুভেনির কেনাকাটা, অ্যাকুয়ারিয়াম ক্যাফেতে বিশ্রাম
সন্ধ্যা ৬:৩০মেট্রোরেলে বাড়ি ফেরার যাত্রা

যোগাযোগ

সফরে যাওয়ার আগে সময়সূচি নিশ্চিত করতে বা যেকোনো তথ্য জানতে অ্যাকুয়ারিয়াম পার্ক কর্তৃপক্ষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।

ঠিকানা: অ্যাকুয়ারিয়াম পার্ক, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘর, আগারগাও, ঢাকা
ফোন নম্বর: +8801894781992, +8801841352553
ইমেইল: [email protected]
ওয়েবসাইট: https://aquariumpark.com.bd

গন্তব্য

বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘর, ঢাকা, বাংলাদেশ

পথ ও দিকনির্দেশ দেখতে ম্যাপ খুলুন।

গুগল ম্যাপে দেখুন