আলাদীন’স পার্ক, ময়মনসিংহ
আলাদীন’স পার্ক, ময়মনসিংহ

আলাদীন’স পার্ক

০
জন
অবস্থান ময়মনসিংহ
পড়ার সময় ৭ মিনিটস

ময়মনসিংহ শহরের কোলাহল ছেড়ে দক্ষিণে কিছুটা এগোলেই শুরু হয় লালমাটির জনপদ। উঁচু-নিচু আঁকাবাঁকা পথ, দুপাশে ঘন সবুজ গাছের সারি, মাঝেমধ্যে টিলার মতো ঢিবি — এই পথ ধরে ফুলবাড়িয়া উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের বেতবাড়ি গ্রামে পৌঁছালেই চোখে পড়বে শ্বেত ও মার্বেল পাথরে মোড়ানো এক বিশাল দৃষ্টিনন্দন ফটক। ফটকের সামনে ঝিরঝিরে ফোয়ারা, আর ভেতরে অপেক্ষা করছে ২৫ একর জমির উপর গড়ে তোলা আলাদীন’স পার্ক (Aladin’s Park) — ময়মনসিংহ জেলার সবচেয়ে পরিচিত ও পূর্ণাঙ্গ বিনোদনকেন্দ্র।

এক নজরে আলাদীন’স পার্ক

বিষয়তথ্য
অবস্থানমাঝিরঘাট, বেতবাড়ি, এনায়েতপুর ইউনিয়ন, ফুলবাড়িয়া, ময়মনসিংহ
আয়তনপ্রায় ২৫ একর (উন্নয়নকৃত এলাকা প্রায় ২০ একর)
ময়মনসিংহ শহর থেকে দূরত্বপ্রায় ৩০–৪৫ কিলোমিটার (রুট অনুযায়ী)
ফুলবাড়িয়া সদর থেকেপ্রায় ১০–২৫ কিলোমিটার (রুট অনুযায়ী)
খোলা থাকেপ্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা
প্রবেশ মূল্যজনপ্রতি ১০০ টাকা (রাইড আলাদা)
ধরনথিম পার্ক, ওয়াটার পার্ক, পিকনিক স্পট ও রিসোর্ট

প্রকৃতি আর কৃত্রিম সৌন্দর্যের অসাধারণ মেলবন্ধন

প্রধান ফটক পেরিয়ে একটি বিশাল কৃত্রিম গুহার ভেতর দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয় — এই প্রবেশপথটিই দর্শনার্থীদের প্রথম বিস্ময়। গুহা পার হলেই সামনে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি তালগাছ।

পরিকল্পিতভাবে কাটছাঁট করা সমতল লাল পাহাড়ের পুরো জায়গাটাই যেন কোনো শিল্পীর রঙিন তুলিতে আঁকা ছবি। এখানে আছে —

  • পাহাড়ের উপর পাহাড়, সমতল ভূমির উপর গড়ে তোলা কৃত্রিম টিলা
  • তাল, সুপারি ও পাম গাছের বৃক্ষরাজি
  • ঝর্ণাধারা ও স্বচ্ছ জলের কৃত্রিম লেক, যেখানে বক আর রাজহাঁসের পাল জলকেলিতে মাতোয়ারা
  • ন্যাচারাল বাঁশ বাগান আর ছায়াঘেরা শীতল আঁকাবাঁকা পথ
  • পথের ফাঁকে ফাঁকে শ্বেতপাথরের মনকাড়া ভাস্কর্য
  • হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের প্রতীক গরুর গাড়ি

লেকের উপর গড়ে তোলা “ছুঁ ছুঁ টিলা”য় উঠে চারপাশ দেখা, কিংবা প্যাডেল বোটে চেপে লেকের বুকে ভেসে হিমশীতল বাতাসের পরশ নেওয়া — এই অভিজ্ঞতাটাই অনেক দর্শনার্থীর কাছে পার্কের সেরা প্রাপ্তি।

রাইড ও আকর্ষণসমূহ

পার্কটিতে প্রায় ১০ ধরনের রাইড রয়েছে, যার মধ্যে শুকনো (ড্রাই) ও পানির (ওয়াটার) রাইড দুটোই আছে।

শিশু-কিশোরদের জন্য
  • দুরন্ত গতির ইলেকট্রনিক ট্রেন
  • ওয়ান্ডার হুইল (নাগরদোলা)
  • কিডি রাইডস
  • ভয়েজার বোট ও রকেট
  • বাম্পার কার, সুপার সুইং, ক্যাবল কার
  • ড্রাগন, ডাইনোসর, বাঘ, সিংহ, হাতি ও ঘোড়ার বিশাল মূর্তি — ছবি তোলার জন্য শিশুদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা
ওয়াটার পার্ক ও সুইমিং পুল

গরমের দিনে পার্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ। উন্নতমানের ওয়াটার রাইড আর সুইমিং পুলের ব্যবস্থা রয়েছে। সাঁতারের পোশাক ও অতিরিক্ত কাপড় সঙ্গে নিয়ে গেলে সময়টা অনেক বেশি উপভোগ্য হবে।

মিনি চিড়িয়াখানা

পার্কের ভেতরেই ছোট একটি চিড়িয়াখানা আছে। শিয়াল, মেছো বাঘ, হনুমান-বানরসহ নানা রকম পশুপাখির জীবন্ত সংগ্রহশালা — শিশুদের জন্য চমৎকার শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা।

অন্যান্য সুবিধা
  • থ্রিডি/টুয়েলভ-ডি মিনি সিনেমা হল — অল্প সময়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা
  • ৫০০ আসনের অডিটোরিয়াম — কর্পোরেট ইভেন্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা সেমিনারের জন্য
  • শুটিং স্পট — নাটক, বিজ্ঞাপন ও মিউজিক ভিডিওর জন্য জনপ্রিয় লোকেশন
  • মাছ শিকার — রিসোর্টে বসেই বড়শি দিয়ে মাছ ধরার সুযোগ

আলাদীন’স পার্কের প্রবেশ মূল্য ও প্যাকেজ

সাধারণ টিকিট
  • প্রবেশ মূল্য: জনপ্রতি ১০০ টাকা
  • রাইড ফি: প্রতিটি রাইডের জন্য আলাদাভাবে ৩০ থেকে ২০০ টাকা
  • শিশু ছাড়: ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ৭টি রাইড ফ্রি
কম্বো প্যাকেজ (সাশ্রয়ী)
প্যাকেজমূল্যযা যা অন্তর্ভুক্ত
রাইড অ্যান্ড প্লে২৫০ টাকাড্রাই পার্কে প্রবেশ + ৩টি রাইড
অল-ইন-ওয়ান অ্যাডভেঞ্চার৩৫০ টাকাড্রাই পার্ক + ওয়াটার পার্ক + সব রাইড

আলাদীন’স পার্কে পিকনিক ও গ্রুপ প্যাকেজ

  • কর্পোরেট বা ফ্যামিলি: জনপ্রতি ৫০০ টাকা (প্রবেশ + সকল রাইড + লাঞ্চ)
  • স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থী: জনপ্রতি ৪০০ টাকা
  • ১০ বছরের নিচে শিশু: জনপ্রতি ৩৫০ টাকা
  • ডিলাক্স ও সুপার ডিলাক্স গ্রুপ প্যাকেজ: ২,৫০০ ও ৩,৫০০ টাকা (উন্নত খাবারসহ)
  • অগ্রিম গ্রুপ/পিকনিক বুকিংয়ে ২০% পর্যন্ত ছাড়ের সুবিধা পাওয়া যায়

মনে রাখবেন: ঈদ, পূজা বা জাতীয় ছুটির দিনে কর্তৃপক্ষ প্রবেশমূল্য ও প্যাকেজ রেট কিছুটা পরিবর্তন করতে পারে। রওনা হওয়ার আগে হেল্পলাইনে একবার নিশ্চিত হয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা

দিনে ঘুরে ফিরে আসার পাশাপাশি রাত্রিযাপনের সুবিধাও আছে। পার্কের ভেতরেই রয়েছে রিসোর্ট ও কটেজ।

ধরনভাড়া (প্রতিদিন)
নন-এসি রুমপ্রায় ২,০০০ টাকা
এসি স্ট্যান্ডার্ড রুমপ্রায় ৩,০০০ টাকা
এসি ডিলাক্স রুমপ্রায় ৪,০০০ টাকা
হলিডে কটেজ (ডে-ইউজ, সকাল ৯টা–বিকেল ৫টা)৩,০০০ টাকা
হলিডে কটেজ (নাইট স্টে, বিকেল ৫টা–সকাল ৯টা)৩,৫০০ টাকা

খাবারের জন্য পার্কের নিজস্ব রেস্টুরেন্ট ও ক্যাফেটেরিয়া রয়েছে। গ্রুপ পিকনিকের ক্ষেত্রে আগে জানিয়ে দিলে কর্তৃপক্ষই খাবারের আয়োজন করে দেয়।

ময়মনসিংহ থেকে আলাদীন’স পার্ক যাওয়ার উপায়

আলাদীন’স পার্কে যাওয়ার জন্য ময়মনসিংহ শহর থেকে তিনটি সহজ বিকল্প আছে।

১. সিএনজি / অটোরিকশায় সরাসরি

ময়মনসিংহ শহরের মাসকান্দা বাস টার্মিনাল বা পাটগুদাম ব্রিজ মোড় থেকে ফুলবাড়িয়াগামী সিএনজি পাওয়া যায়। প্রথমে ফুলবাড়িয়া উপজেলা সদর (দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার), সেখান থেকে আরেকটি সিএনজি নিয়ে এনায়েতপুরের আলাদীন’স পার্ক। ফুলবাড়িয়া-সাগরদিঘি সড়ক ধরে এই পথটুকু যেতে হয়।

২. বাসে

ময়মনসিংহ থেকে ফুলবাড়িয়াগামী লোকাল বাসে উঠে ফুলবাড়িয়া সদরে নেমে সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা নিয়ে পার্কে পৌঁছানো যায়। খরচ সবচেয়ে কম, তবে সময় একটু বেশি লাগে।

৩. রিজার্ভ কার বা মাইক্রোবাস

পরিবার বা বড় দল নিয়ে গেলে এটাই সবচেয়ে আরামদায়ক। ময়মনসিংহ শহর থেকে সরাসরি পার্ক পর্যন্ত রিজার্ভ গাড়িতে যেতে সময় লাগে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। পার্কে পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

সময় ও দূরত্ব: ময়মনসিংহ শহর থেকে পার্কের দূরত্ব রুট অনুযায়ী ৩০ থেকে ৪৫ কিলোমিটারের মধ্যে। কোন পথ ধরে যাচ্ছেন তার উপর সময় নির্ভর করে — সাধারণভাবে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা হাতে রাখলেই যথেষ্ট।

কখন গেলে সবচেয়ে ভালো

পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলাউদ্দিনের ভাষ্যমতে, প্রতি বছর নভেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত মৌসুমী পিকনিক পার্টির ভিড় থাকে সবচেয়ে বেশি। এই সময় আবহাওয়া আরামদায়ক, লালমাটির পথ শুকনো, আর পার্কের সব রাইড সচল থাকে।

  • ভিড় এড়াতে চাইলে: কর্মদিবসের সকালবেলা
  • ওয়াটার পার্ক উপভোগ করতে চাইলে: মার্চ থেকে অক্টোবরের গরম সময়
  • ছবি তোলার সেরা আলো: সকাল ৯টা–১১টা এবং বিকেল ৩টা–৫টা
  • এড়িয়ে চলুন: ভরা বর্ষার দিন, কারণ প্রবেশপথের সড়ক তখন কষ্টকর হয়ে যায়
নিরাপত্তা ব্যবস্থা

পার্কের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। দর্শনার্থীদের সুরক্ষায় বেশ কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী সর্বক্ষণ দায়িত্ব পালন করেন। পার্কের ম্যানেজার আব্দুল আজিজের কথায়, “এখানে যারা বেড়াতে আসেন, তাদের নিরাপত্তার দায়দায়িত্ব এখানে কর্মরত সবার।” তবু ওয়াটার পার্ক ও লেক এলাকায় শিশুদের একা ছাড়বেন না — অভিভাবকের নজরদারি জরুরি।

যা মনে রাখা ভালো

ভ্রমণের আগে দুটো বিষয় জেনে রাখা দরকার —

প্রবেশপথের সড়ক: ফুলবাড়িয়া-সাগরদিঘি সড়ক থেকে পার্ক পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিটার দীর্ঘ সংযোগ সড়কটির অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ। বৃষ্টিতে ইট-সুরকি উঠে গিয়ে গর্ত তৈরি হয়। ১৫ ফুট চওড়া এই সড়কে দুটি গাড়ি পাশাপাশি চলতে বেশ সমস্যা হয়।

বিদ্যুৎ: পার্কে নিরবচ্ছিন্ন গ্রিড বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই; জেনারেটরের বিদ্যুৎই মূল ভরসা। ফলে কখনো কখনো রাইড বা এসি সুবিধায় বিঘ্ন ঘটতে পারে।

ভ্রমণ টিপস
  • অগ্রিম বুকিং করুন — পিকনিক বা গ্রুপ ট্যুর হলে অন্তত এক সপ্তাহ আগে ফোন করুন; ছাড়ও পাবেন
  • কম্বো প্যাকেজ নিন — আলাদা আলাদা রাইড টিকিট কাটার চেয়ে ৩৫০ টাকার অল-ইন-ওয়ান প্যাকেজ অনেক সাশ্রয়ী
  • সঙ্গে রাখুন — অতিরিক্ত কাপড়, তোয়ালে, সানস্ক্রিন, পানির বোতল, ক্যাশ টাকা (সব জায়গায় কার্ড চলে না)
  • আরামদায়ক জুতা পরুন — ২৫ একর ঘুরে দেখতে অনেকটা হাঁটতে হয়
  • আগেভাগে পৌঁছান — পার্ক বিকেল ৫টায় বন্ধ হয়ে যায়, তাই সকাল ১০টার মধ্যে ঢুকলে পুরোটা দেখার সময় পাবেন
  • কাছাকাছি আরও ঘোরার জায়গা — ভালুকা উপজেলার উথুরা ইউনিয়নের হাতিবেড় গ্রামের কুমির চাষ প্রকল্প এবং ফুলবাড়িয়ার কাহালগাঁও গ্রামের অর্কিড ফুলচাষ কেন্দ্র পার্কের কয়েক মাইলের মধ্যেই; একদিনে দুটোই ঘুরে আসা যায়

যোগাযোগ

ফোন: ০২-৮৯৫৮৬১২
মোবাইল: 01610555055, 01610555066
ওয়েবসাইট: www.aladinsparkltd.com

ময়মনসিংহের লালমাটির জনপদে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের সঙ্গে দৃষ্টিনন্দন কৃত্রিম বাহারি সৌন্দর্যের এক অসাধারণ সমন্বয়ের নাম আলাদীন’স পার্ক। পরিবারের সঙ্গে একটা পুরো দিন, বন্ধুদের নিয়ে শীতের পিকনিক, কিংবা শহুরে ক্লান্তি ভুলতে এক রাতের কটেজ-বাস — যে উদ্দেশ্যেই যান, ফেরার পথে চোখে লেগে থাকবে সেই সারি সারি তালগাছ, স্বচ্ছ লেকের রাজহাঁস আর পাথরে মোড়ানো ফটকের ফোয়ারার ছবি। বছর জুড়েই প্রকৃতিপ্রেমী আর সৌন্দর্যপিপাসুদের ভিড় জমার পেছনে কারণটা এটাই।

গন্তব্য

আলাদিন পার্ক, Betbari, ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ

পথ ও দিকনির্দেশ দেখতে ম্যাপ খুলুন।

গুগল ম্যাপে দেখুন

ADAR BEPARI / TRAVEL WEAR

ভ্রমণের গল্প থাকুক পোশাকেও।

সব টি-শার্ট দেখুন