ইট-কাঠের শহরে দমবন্ধ হয়ে আসা জীবনে মাঝে মাঝে দরকার হয় খোলা আকাশ, নদীর হাওয়া আর একটুখানি নিঃশব্দতা। কিন্তু সমস্যা একটাই—ঢাকা থেকে বেরোতে গেলেই যেন দীর্ঘ পথ, জ্যাম আর ক্লান্তি। ঠিক এই জায়গাটাতেই সুবর্ণভূমি রিসোর্ট (Subarna Bhumi Resort) একটা স্বস্তির নাম। মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার হোসেন্দী ইউনিয়নের ইসমানীর চরে, মেঘনা নদীর একেবারে কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে এই রিসোর্টটি—ঢাকা থেকে দূরত্ব মাত্র ৪৩ কিলোমিটার, সময় লাগে দেড় ঘণ্টার মতো।
প্রায় ১৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই রিসোর্টটি ডিজাইন করা হয়েছে “রিসোর্ট” শব্দের চিরায়ত অর্থকে মাথায় রেখেই—অর্থাৎ থাকার জায়গা নয়, বিশ্রামের জায়গা। চারদিকে সবুজ লন, মাঝখানে সুইমিং পুল, আর এক পাশে মেঘনার বিস্তীর্ণ জলরাশি। নদীর দিকে তাকালে দেখা যায় দূরের শিপইয়ার্ড, চলমান নৌযান, আর সন্ধ্যায় জলের ওপর ছড়িয়ে পড়া কমলা আলো।
গজারিয়া অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবেই মেঘনা-তীরবর্তী চর এলাকা—পলিমাটির উর্বরতা, ধানের খেত আর শীতকালে সরিষা ফুলের হলুদ চাদর এখানকার চেনা দৃশ্য। শরৎকালে আশপাশের চরগুলোতে কাশফুল ফোটে, যা রিসোর্টে আসা ফটোগ্রাফি-প্রেমীদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ।
ঢাকা থেকে যাওয়ার পথটি বেশ সোজা:
নিজস্ব গাড়ি বা মাইক্রোবাসে যাওয়াই সবচেয়ে আরামদায়ক। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে গেলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের বাসে মেঘনা ব্রিজের আগে নেমে সিএনজি/অটোরিকশা নিতে হবে। তবে একটি বিষয় মাথায় রাখা ভালো—মহাসড়ক থেকে রিসোর্ট পর্যন্ত শেষের প্রায় আধা কিলোমিটার রাস্তা কিছুটা অমসৃণ, বর্ষায় কোথাও কোথাও কাদাপানি জমে যেতে পারে। নিচু চেসিসের গাড়ি নিয়ে গেলে সাবধানে চালানো দরকার।
সুবর্ণভূমির সবচেয়ে মন কেড়ে নেওয়া দিকটি হলো এখানকার কটেজগুলোর নাম—গোধূলি বেলা, মেঘ বালিকা, দিগন্ত ছোঁয়া, রোদেলা সারাবেলা, সাঁঝবাতির রূপকথা। নামগুলোই যেন জায়গাটার মুড ঠিক করে দেয়।
প্রতিটি কটেজ দ্বিতল ও সম্পূর্ণ ফার্নিশড, সাধারণত তিনটি বেডরুম সহ। কটেজের সঙ্গে থাকে প্রশস্ত টেরেস আর বসার আয়োজন, যেখান থেকে মেঘনা নদী, খোলা আকাশ আর সূর্যাস্ত—তিনটিই একসঙ্গে দেখা যায়। বাথরুমগুলো আধুনিক, রেইন-শাওয়ার ও টয়লেট্রিজ সহ।
রুম ক্যাটাগরি মূলত দুই ভাগে ভাগ করা—
| ধরন | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| পুল ভিউ / শোভন | নিচতলা, সুইমিং পুলের দিকে মুখ করা |
| রিভার ভিউ / বিলাস | ওপরতলা, মেঘনা নদীর সরাসরি ভিউ |
যাঁরা একান্তে সময় কাটাতে চান বা বড় পরিবার/বন্ধুদের দল নিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের জন্য পুরো কটেজ (৬ জন পর্যন্ত) বুক করার সুযোগও আছে।
রিসোর্টের অন্যতম সিগনেচার আকর্ষণ হলো নদীর ওপর ভাসমান ডেক ও রেস্তোরাঁ। জলের ওপর ভেসে থাকা এই প্ল্যাটফর্মে বসে বিকেলের চা বা সন্ধ্যার বারবিকিউ ডিনার—অভিজ্ঞতাটা রিসোর্টের বাকি সবকিছুর চেয়ে আলাদা করে মনে থেকে যায়।
খাবারের আয়োজনে রয়েছে বাংলা, চাইনিজ ও বারবিকিউ। বুফে ও সেট মেন্যু—দুই অপশনই পাওয়া যায়। রাত্রিযাপনের প্যাকেজে সাধারণত ওয়েলকাম ড্রিংকস, লাঞ্চ, বিকেলের স্ন্যাকস সহ চা/কফি, স্পেশাল বারবিকিউ ডিনার (চিকেন বারবিকিউ, নান, ডাল, রায়তা, সফট ড্রিংকস) এবং পরদিনের ব্রেকফাস্ট অন্তর্ভুক্ত থাকে।
খাবারের স্বাদ নিয়ে অতিথিদের মত মিশ্র—কারও কাছে দুর্দান্ত, কারও কাছে “ঠিকঠাক”। তবে দামের তুলনায় পরিমাণ ও পরিবেশনা নিয়ে অভিযোগ তুলনামূলক কম।
কর্পোরেট আউটিং, ট্রেনিং বা রিট্রিটের জন্য রয়েছে আধুনিক ইনডোর কনফারেন্স হল—‘সপ্তর্ষি হল’। পূর্ণ প্রাইভেসি সহ এখানে ৮০ জন পর্যন্ত অংশগ্রহণকারীর ব্যবস্থা করা যায়। পিকনিক, গায়ে হলুদ, জন্মদিন বা ছোট আকারের গেট-টুগেদারের জন্যও রিসোর্টটি জনপ্রিয়।
নিচের দামগুলো সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে আনুমানিক। সিজন, অকুপেন্সি ও চলমান অফার অনুযায়ী এগুলো পরিবর্তনশীল। বুকিংয়ের আগে অবশ্যই সরাসরি যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়ে নিন।
ডে-লং প্যাকেজ (চেক-ইন ১০:৩০, চেক-আউট ৬:৩০)
১ রাত্রিযাপন প্যাকেজ (২ জন, প্রধান খাবারসহ)
পুরো কটেজ (৬ জন পর্যন্ত, ১ রাত)
কর ও চার্জ: সাধারণত ১০% সার্ভিস চার্জ, রুম রেন্টে ১৫% ভ্যাট এবং খাবারে ৫% ভ্যাট যুক্ত হয়। উইকডে ও কর্পোরেট বুকিংয়ে বিশেষ ছাড় পাওয়া যায়।
সুবর্ণভূমি রিসোর্টের সবচেয়ে বড় শক্তি তার দূরত্ব আর দৃশ্য—ঢাকার এত কাছে থেকেও এমন খোলা নদী, এত সবুজ আর এমন নিস্তব্ধতা পাওয়া সহজ নয়। এক দিনের ডে-আউট, পরিবারের সঙ্গে ছোট ছুটি, কাপলদের নিরিবিলি সময়, কিংবা অফিস টিমের বার্ষিক আউটিং—চারটি উদ্দেশ্যেই এটি ভালোভাবে কাজ করে।
এটি পাঁচতারা হোটেল নয়, আর অ্যাডভেঞ্চার পার্কও নয়। এটি একটি রিভারসাইড রিট্রিট—যেখানে আপনি সকালে চা হাতে নদীর দিকে তাকিয়ে বসে থাকবেন, দুপুরে পুলে ভাসবেন, বিকেলে ভাসমান ডেকে গিয়ে সূর্য ডুবতে দেখবেন, আর রাতে বারবিকিউর ধোঁয়ার গন্ধে মেঘনার হাওয়া মিশে যেতে দেবেন। ঠিক এই জিনিসটাই যদি আপনি চান—তাহলে সুবর্ণভূমি হতাশ করবে না।
Leave a Comment