নেত্রকোণার ইতিহাসভিত্তিক ভ্রমণের জন্য রোয়াইলবাড়ি দুর্গ (Rowailbari Fort) বেশ আলাদা একটি গন্তব্য। এটি চকচকে সংস্কার করা রাজপ্রাসাদ নয়, বরং মাটির নিচ থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে বেরিয়ে আসা দুর্গপ্রাচীর, মসজিদের ধ্বংসাবশেষ, প্রবেশদ্বার, বুরুজ, পাথরের স্তম্ভ ও অন্যান্য স্থাপত্যের সমাহার। তাই ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বে আগ্রহ থাকলে জায়গাটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নাম | রোয়াইলবাড়ি দুর্গ |
| অন্য নাম | কোটবাড়ি দুর্গ |
| জেলা | নেত্রকোণা |
| উপজেলা | কেন্দুয়া |
| ইউনিয়ন | রোয়াইলবাড়ি আমতলা |
| অবস্থান | বেতাই নদীর তীরবর্তী এলাকা |
| কেন্দুয়া সদর থেকে | প্রায় ১২–১৩ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে |
| সংরক্ষিত পুরাকীর্তি | ১৯৮৭ সাল থেকে |
| মূল আকর্ষণ | দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, বারদুয়ারী ঢিবি, বুরুজ, মসজিদের ধ্বংসাবশেষ, পুরোনো ফটক |
| আদর্শ ভ্রমণ সময় | ১.৫–৩ ঘণ্টা |
দুর্গটি কেন্দুয়া সদর থেকে প্রায় ১২–১৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে রোয়াইলবাড়ি আমতলা ইউনিয়নে অবস্থিত।
রোয়াইলবাড়ি দুর্গটি ঠিক কে এবং কোন সালে নির্মাণ করেছিলেন, তা এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। বিভিন্ন গবেষক একে সুলতানি আমলের শেষভাগ অথবা পরবর্তী মুঘল যুগের শুরুর দিকের সামরিক স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করেন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য ও সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্যায়নও এই অঞ্চলের বহুস্তরীয় ইতিহাসের ইঙ্গিত দেয়।
একটি প্রচলিত ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের পুত্র নসরৎ শাহ এই অঞ্চলে অবস্থান করেছিলেন। পরবর্তীকালে বারো ভূঁইয়ার নেতা ঈশা খাঁর সঙ্গেও রোয়াইলবাড়ির সম্পর্কের কথা স্থানীয় ইতিহাসে পাওয়া যায়। তবে এগুলোর সবকটিকে সরাসরি প্রমাণিত নির্মাণ-ইতিহাস হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সরকারি তথ্যে রোয়াইলবাড়িতে একসময় দেওয়ান বংশের বসতি এবং মজলিশ জালাল নামে পরিচিত একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির সঙ্গে এলাকার সংযোগের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
রোয়াইলবাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার সম্ভবত এটাই যে, বর্তমানে আমরা যে স্থাপনাগুলো দেখি তার অনেকটাই একসময় মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল। ১৯৮৭ সালে এলাকাটিকে সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৯১–৯৪, ২০১৬–১৭ এবং পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন পর্যায়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এখানে খনন পরিচালনা করেছে। এসব খননে বেরিয়ে এসেছে দুর্গের প্রাচীর ও স্থাপত্যের অংশ, মসজিদের ধ্বংসাবশেষ, প্রবেশদ্বার, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, অলংকৃত পাথর, টাইলস, মৃৎপাত্র ও অন্যান্য প্রত্নবস্তু।
অর্থাৎ জায়গাটা মূলত “একটা পুরোনো দেয়াল দেখে ফিরে এলাম” পর্যায়ের নয়। একটু ইতিহাস জেনে গেলে মাটির প্রতিটি কাঠামো অনেক বেশি অর্থপূর্ণ লাগে। মানুষ আশ্চর্যজনকভাবে তথ্য জানার পর ইটকেও আকর্ষণীয় মনে করতে পারে।
প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে দুর্গটির উত্তর-দক্ষিণ দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৩৩.২৩ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৩২৭.৫৭ মিটার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পশ্চিম পাশে বেতাই নদী ছিল প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ এবং বিভিন্ন দিকে পরিখা ও মাটির প্রাচীর ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পুরো সংরক্ষিত এলাকাকে প্রায় ৪৬ একর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্গের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থাপনাগুলোর একটি বারদুয়ারী ঢিবি। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এখানে একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ উন্মোচিত হয়। নির্মাণকাল পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, তবে সুলতানি-মুঘল যুগের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
দুর্গের উত্তর অংশে অবস্থিত বুরুজ ঢিবি থেকে একটি প্রাচীন ইমারতের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়।
২০১৬–১৭ সালের খননের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দুর্গের দক্ষিণ দিকের মূল তোরণ বা প্রবেশদ্বার শনাক্ত করা। খননে এর চিহ্ন পাওয়া যায়।
২০১৬–১৭ সালের অনুসন্ধানে ১০ কিনারা/বাহুবিশিষ্ট চারটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের কাঠামো পাওয়ার কথা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এগুলো রোয়াইলবাড়ি দুর্গের অন্যতম ব্যতিক্রমী স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য।
দুর্গ এলাকায় খনন করে কারুকাজ করা ইট দিয়ে নির্মিত মসজিদের স্থাপত্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় এর সঙ্গে মজলিশ জালালের নামও যুক্ত করা হয়, যদিও পরিচয় ও নির্মাণকাল নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেই।
এলাকায় বিভিন্ন পাথরের স্তম্ভ, কারুকার্যখচিত ইট, টাইলস, মৃৎপাত্রের অংশ এবং স্থাপত্য উপকরণ পাওয়া গেছে।
দুর্গ এলাকার আরেকটি প্রত্নতাত্ত্বিক অংশ ডেঙ্গু মিয়া ও নিয়ামত বিবির মাজার নামে সরকারি নথিতে চিহ্নিত। ২০২২–২৩ অর্থবছরের খননেও এখানে বিভিন্ন স্থাপত্য কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।
দুর্গের পশ্চিম দিকের বেতাই নদী একসময় দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় উল্লেখ রয়েছে।
সবচেয়ে সহজভাবে রুট ধরুন: ঢাকা → কেন্দুয়া → সাহিতপুর বাজার → রোয়াইলবাড়ি → দুর্গ
কেন্দুয়া সদর থেকে রোয়াইলবাড়ি দুর্গের দূরত্ব আনুমানিক ১২–১৩ কিলোমিটার। কেন্দুয়া পৌরসভা থেকে বাস/রিকশা/সিএনজিতে সাহিতপুর বাজার, এরপর স্থানীয় যানবাহনে রোয়াইলবাড়ি দুর্গে যাওয়া যায়। স্থানীয় চালককে “রোয়াইলবাড়ি দুর্গ”, “রোয়াইলবাড়ি কোটবাড়ি” বললে জায়গাটি চিনতে সহজ হওয়ার কথা, কারণ এটি স্থানীয়ভাবে পরিচিত ঐতিহাসিক স্থান।
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি: ইতিহাসভিত্তিক হাঁটাহাঁটির জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক সময়। রোদ ও গরম তুলনামূলক কম থাকে।
অক্টোবর–মার্চ: সামগ্রিকভাবে ভালো সময় বলা যায়, বিশেষ করে খোলা প্রত্নস্থানে দীর্ঘ সময় ঘুরতে চাইলে।
বর্ষাকালে: চারপাশ সবুজ পাওয়া গেলেও কাঁচা বা গ্রামীণ পথ কাদাময় হতে পারে। দুর্গের মাটি ও খননকৃত কাঠামোর আশপাশেও তখন সাবধানে চলা দরকার।
দিনের হিসেবে সকাল ৮টা–১১টা অথবা বিকেল ৩টা–৫টা ছবি ও আরাম করে ঘোরার জন্য সুবিধাজনক। দুর্গটি ভালোভাবে দেখতে ১.৫ থেকে ৩ ঘণ্টা রাখলে স্বস্তিতে ঘোরা যাবে। দ্রুত ছবি তুলে ফিরে আসতে চাইলে এক ঘণ্টায় সম্ভব, কিন্তু ঐতিহাসিক জায়গায় গিয়ে শুধু নিজের ছবি তুলে ফিরে আসা মানবসভ্যতার আরেকটি ক্ষুদ্র রহস্য। সম্ভব হলে আগে দুর্গের ইতিহাস একটু পড়ে নিয়ে তারপর প্রতিটি স্থাপনা দেখুন।
দুর্গ এলাকায় পর্যাপ্ত রেস্টুরেন্ট ও পর্যটক সুবিধা নেই। জেলা পরিষদের তৈরি দুটি ছাতাকৃতির বিশ্রামাগার থাকলেও আধুনিক পর্যটন সুবিধা সীমিত। তাই মূল খাবার কেন্দুয়া বাজারে খেয়ে নেওয়া বেশি সুবিধাজনক। সঙ্গে রাখুন পানি, হালকা শুকনো খাবার, ছাতা/ক্যাপ এবং পাওয়ার ব্যাংক।
শুধু রোয়াইলবাড়ি দুর্গ দেখতে গেলে সেখানে রাত থাকার প্রয়োজন সাধারণত নেই। দুর্গ এলাকায় পূর্ণাঙ্গ পর্যটন আবাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। দূর থেকে এলে কেন্দুয়া অথবা নেত্রকোণা শহরে থাকার পরিকল্পনা করতে হবে আপনাকে।
ভোরে ঢাকা থেকে রওনা
↓
সকাল: কেন্দুয়া পৌঁছানো
↓
নাস্তা
↓
সাহিতপুর বাজার
↓
রোয়াইলবাড়ি দুর্গ
↓
বারদুয়ারী ঢিবি
↓
বুরুজ ও পুরোনো দুর্গপ্রাচীর
↓
মসজিদের ধ্বংসাবশেষ
↓
পুরোনো প্রবেশদ্বার ও প্রত্নতাত্ত্বিক অংশ
↓
বেতাই নদীর আশপাশ
↓
বিকেলে কেন্দুয়া ফিরে খাবার
↓
ঢাকার পথে রওনা
এই পরিকল্পনায় দিনের আলোতেই দুর্গ ভালোভাবে দেখা যায়।
ইতিহাসপ্রেমী, প্রত্নতত্ত্বে আগ্রহী, স্থাপত্যপ্রেমী, ফটোগ্রাফার এবং একটু নিরিবিলি অফবিট জায়গা পছন্দ করেন এমন ভ্রমণকারীদের রোয়াইলবাড়ি দুর্গ ভালো লাগার সম্ভাবনা বেশি। যারা রিসোর্ট, ক্যাফে, সাজানো পর্যটনকেন্দ্র আর এক সারি সেলফি স্পট চান, তাঁদের জন্য জায়গাটি কম উপযোগী।
রোয়াইলবাড়িকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে শুধু বয়স নয়। এখানে সুলতানি-মুঘল সময়ের সম্ভাব্য সামরিক স্থাপত্য, দুর্গপ্রাচীর, মসজিদ, ফটক, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও বিভিন্ন যুগের প্রত্নবস্তু একই প্রত্নক্ষেত্রে পাওয়া গেছে। পূর্ণাঙ্গ খনন হলে বাংলার মধ্যযুগীয় ইতিহাস সম্পর্কে আরও অজানা তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তাই নেত্রকোণায় ইতিহাসভিত্তিক ভ্রমণ করলে রোয়াইলবাড়ি দুর্গ অবশ্যই তালিকায় রাখার মতো একটি জায়গা।
Leave a Comment