বান্দরবান

পাও তং পাহাড়

বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার তিন্দু রিজে অবস্থিত পাও তং পাহাড় একটি আকর্ষণীয় এবং চ্যালেঞ্জিং ট্রেকিং গন্তব্য। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থানীয় খুমি সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি এবং আশেপাশের অন্যান্য দর্শনীয় স্থান এটিকে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

পরিচিতি ও অবস্থান

নামকরণ: ‘পাও’ একটি খুমি শব্দ, যার অর্থ ‘পদ বাঁকা’ এবং ‘তং’ অর্থ ‘পাহাড়’। এই পাহাড়ের কাছেই একটি খুমি সম্প্রদায়ের পাড়া রয়েছে, যার নাম ‘পাও পাড়া’। এখানকার পাড়াবাসীরা তাদের খুমি ভাষায় এই পাহাড়কে ‘পাও পাহাড়’ বলে ডাকে। খুমি ভাষায় এর আরেকটি পুরাতন নাম ‘তিন্দু হুং’, যার বাংলা অর্থ ‘ছোট রিজ লাইন’।

  • অবস্থান: বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার তিন্দু রিজে পাহাড়সারিতে এর অবস্থান। এটি সাংগু ভ্যালির পূর্ব পাশে রেমাএক্রি ইউনিয়ন তিন্দু রিজে অবস্থিত।
  • উচ্চতা: ২১০০ ফিট (৬০০ মিটার)।
  • জিপিএস কর্ডিনেট: 21°41’17” N92°28’36” E

আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থান: এই পাহাড়সারির উত্তরে রিজের প্রথম পিক ‘পাও তং’, এবং দক্ষিণে এই রিজের সর্বোচ্চ চূড়া হলো ‘কুয়া হুং’ ও ‘কুওয়াং সুতং’ পাহাড়।

পাও তং বা পাওউ তং পাহাড় যাওয়ার উপায়

তিনদিকে দিয়ে এই পাহাড়ে যাওয়া যায়৷

রুট (১): ঢাকা – আলিকদম – ২১ কিলো – তিন্দু – কুতলি পাড়া – পাও পাড়া – পাও তং পাহাড় সামিট।

  • এই রুটে প্রথমে ঢাকা থেকে আলিকদম যেতে হবে।
  • আলিকদম থেকে ২১ কিলো হয়ে তিন্দু পৌঁছাতে হবে।
  • তিন্দু থেকে কুতলি পাড়া এবং সেখান থেকে পাও পাড়া হয়ে পাও তং পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানো যাবে।

রুট (২): ঢাকা – বান্দরবান – থানচি – তিন্দু – রাজা পাথর – লাংলোক ঝর্ণা – পাও পাড়া – পাও তং পাহাড় সামিট।

  • এই রুটে প্রথমে ঢাকা থেকে বান্দরবান যেতে হবে।
  • বান্দরবান থেকে থানচি, তারপর তিন্দু।
  • তিন্দু থেকে রাজা পাথর এবং লাংলোক ঝর্ণা দেখে পাও পাড়ার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
  • পাও পাড়া থেকে পাও তং পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানো যাবে।

রুট (৩): ঢাকা – বান্দরবান – থানচি – তিন্দু ঝিরি – কুতলি পাড়া – পাও পাড়া – পাও তং পাহাড় সামিট।

  • এই রুটেও প্রথমে ঢাকা থেকে বান্দরবান এবং তারপর থানচি যেতে হবে।
  • থানচি থেকে তিন্দু ঝিরি ধরে কুতলি পাড়া পৌঁছাতে হবে।
  • কুতলি পাড়া থেকে পাও পাড়া হয়ে পাও তং পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করা যাবে।

আনুমানিক খরচ (১০ জনের টিমের জন্য)

পাও তং পাহাড় ভ্রমণ, লাংলোক ঝর্ণা, কুমারী ঝর্ণা, রাজা পাথর, তিন্দু, সাংগু ভ্যালি, ২১ কিলো রুট ভিউ পয়েন্ট সহ দুই রাত তিন দিনের একটি ভ্রমণের জন্য ১০ জনের টিমের জনপ্রতি আনুমানিক খরচ নিচে দেওয়া হলো:

  • ঢাকা-আলিকদম/বান্দরবান বাস ভাড়া (যাওয়া-আসা): ২২০০ টাকা (হানিফ বা শ্যামলী বাস)।
  • থানচি থেকে ২১ কিলো/চান্দের গাড়ি রিজার্ভ ভাড়া: ৩৫০০-৪০০০ টাকা (এটি গাড়ির ধারণক্ষমতা এবং দর কষাকষির উপর নির্ভর করে)।
  • পাড়ায় থাকা (জনপ্রতি): ২০০ টাকা (এক রাতের জন্য)।
  • নৌকা ভাড়া (থানচি থেকে তিন্দু/বাঘের বাজার পর্যন্ত, যাওয়া-আসা, ২ দিন ১ রাতের জন্য): ৪৫০০ টাকা।
  • পাও তং পাহাড় সামিট গাইড ফি: ১০০০ টাকা।

মোট আনুমানিক খরচ (২ রাত ৩ দিন, ১০ জনের টিমের জনপ্রতি): উপরিউক্ত খরচগুলো বিবেচনা করে, একটি ১০ জনের টিমের জন্য পাও তং পাহাড় ভ্রমণ এবং আশেপাশের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে আসতে জনপ্রতি ৫০০০-৫৫০০ টাকা এর মধ্যে খরচ হতে পারে। এই হিসাবে খাবার খরচ এবং ব্যক্তিগত অন্যান্য খরচ অন্তর্ভুক্ত নাও থাকতে পারে, যা ভ্রমণকারীদের নিজেদের বহন করতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ টিপস

  • এই রুটে ভ্রমণের জন্য স্থানীয় গাইড অপরিহার্য।
  • থানচি থেকে তিন্দু পর্যন্ত নৌকা ভাড়া করতে হয়।
  • পাও পাড়ায় স্থানীয়দের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা থাকে।

অতিরিক্ত টিপস ও বিবেচনা

  • দলবদ্ধ ভ্রমণ: খরচ কমানোর জন্য এবং নিরাপত্তার জন্য দলবদ্ধভাবে ভ্রমণ করা উত্তম।
  • গাইড: এই ধরনের দুর্গম এলাকায় ভ্রমণের জন্য স্থানীয় অভিজ্ঞ গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক এবং নিরাপদ।
  • স্থানীয় সংস্কৃতি: পাড়ায় থাকার সময় তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন।
  • প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র: ট্রেকিং উপযোগী জুতো, হালকা ব্যাগ, পর্যাপ্ত পানি, শুকনো খাবার, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, টর্চলাইট, পাওয়ার ব্যাংক, রেইনকোট (বর্ষাকালে) ইত্যাদি সাথে নিন।
  • অনুমতি: থানচি থেকে ভ্রমণের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও বিজিবি-এর অনুমতি নিতে হতে পারে। এই বিষয়ে গাইডের সাহায্য নিন।
  • পরিবেশ সংরক্ষণ: ভ্রমণের সময় পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন এবং কোনো প্রকার ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না।

পাও তং পাহাড়ের এই ভ্রমণ আপনার জন্য এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা বয়ে আনবে!

Leave a Comment
Share