হবিগঞ্জ জেলাটি ভ্রমণপ্রিয় মানুষদের কছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, বানিয়াচং ও সবুজ চা বাগানের জন্যে বেশ পরিচিত। কিন্তু এই নামগুলোর বাইরেও হবিগঞ্জে একটা ঐতিহ্যবাহী আকর্ষনীয় মসজিদ আছে যা কিনা পাঁচশো বছর ইতিহাসের ধারক ও বাহক। স্থাপত্য শিল্পের অন্যতম নিদর্শন হবিগঞ্জের শংকরপাশা শাহী মসজিদ (Shankarpasha Shahi Masjid)। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার উচাইল ও রাজিউড়া গ্রামের মধ্যবর্তী শংকরপাশা গ্রামে প্রায় ছয় একর জমি জুড়ে কালের সাক্ষী এ মসজিদ। সুলতানি আমলের স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। টিলার ওপর নির্মিত বলে অনেক দূর থেকে সহজেই দর্শনার্থীদের নজরে পড়ে এবং মসজিদের চমৎকার নির্মাণশৈলী সহজেই দৃষ্টি কাড়ে। উন্নত মানের পোড়া ইট কেটে ইমারতে সেঁটে দেওয়া। গায়ে কোনো প্রলেপ নেই। দেয়ালের বাইরের অংশে পোড়া ইটের ওপর বিভিন্ন নকশা। মসজিদের সঙ্গেই রয়েছে একটি শিলালিপি; যা প্রাচীনকালের সাক্ষ্য বহন করে। মসজিদটি লাল রঙের বলে অনেকে লাল মসজিদও বলে থাকেন। আবার টিলার ওপর বলে কেউ কেউ ‘টিলা মসজিদ’ বলেন। দুটি মিলিয়ে ‘লাল টিলা মসজিদ’ও বলা হয়। তবে যে নামেই ডাকা হোক, সবাই খুব সহজেই মসজিদটিকে চিনতে পারেন। তবে স্থানীয়রা এই মসজিদকে গায়েবি মসজিদ বলে ডাকে৷
উৎকীর্ণ শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, ১৫১৩ সালে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হওয়া এই মসজিদটি নির্মাণ করেন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মজলিশ আমিন; মসজিদের পাশেই আছে তার মাজার। কালের বিবর্তনে এক সময় মসজিদ সংলগ্ন এলাকা বিরান ভূমিতে পরিণত হয়ে জঙ্গলবেষ্টিত হয়ে পড়লেও পরবর্তীকালে এলাকায় জনবসতি গড়ে উঠলে জঙ্গলে আবাদ করতে গিয়ে বের হয়ে আসে মসজিদটি। (তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া)
উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, প্রায় সাড়ে ৫০০ বছর আগে ১৪৯৩ সালে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। তবে স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠরা জানালেন, মসজিদটি প্রায় ৭০০ বছর আগের। বিভিন্ন কারণে মসজিদটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলে পরবর্তীকালে পুনর্নির্মাণ করা হয়। পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন হয় ১৯১৩ সালে। মসজিদটির বর্তমান রূপই হচ্ছে পুনর্নির্মিত রূপ। জানা যায়, বিখ্যাত সুফি দরবেশ শাহ মজলিস আমিন (রহ.) মসজিদটি স্থাপন করেন। মতান্তরে তিনি এ মসজিদ পুনর্নির্মাণে হাত দেন। পরবর্তীকালে এই মসজিদের সুদৃশ্য ইমারত নির্মাণ করা হয় মুসলিম বাংলার শাসনকর্তা সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহর আমলে। ইমারতটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ একই মাপের, ২১ ফুট ৬ ইঞ্চি। বারান্দা ৩ ফুটের সামান্য বেশি। এটিকে চারগম্বুজ মসজিদও বলা হয়। মূল ভবনের ওপর একটি বড় গম্বুজ এবং বারান্দার ওপর তিনটি ছোট গম্বুজ। দরজা-জানালা আছে প্রায় ১৫টি। দরজা ও জানালা প্রায় একই আকৃতির। শত্রু আক্রমণে যাতে ধ্বংস না হয় সে জন্য খুব মজবুত করে নির্মাণকাজ করা হয়েছিল। মসজিদের তিন দিকের দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ৫ ফুট, আর পশ্চিম দিকের দেয়ালের পুরুত্ব এর প্রায় দ্বিগুণ। মসজিদটির প্রধান কক্ষের চার কোণে ও বারান্দার দুই কোণে মোট ছয়টি কারুকার্য শোভিত স্তম্ভ আছে। ওপরের ছাদ আর প্রধান প্রাচীরের কার্নিশ নির্মাণ করা হয়েছে বাঁকানোভাবে। মসজিদের দক্ষিণ পাশে রয়েছে বড় একটি দিঘি। এটি মসজিদটির সৌন্দর্য যেন আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। মসজিদের পাশেই একটি সুউচ্চ মিনার। এটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। বারান্দার বাইরে পর্যটকদের জন্য বসার ব্যবস্থা আছে। আছে ফ্যান, লাইট ও পানির ব্যবস্থাও।
সিলেটগামী যে কোন ট্রেন বা বাসে উঠে শায়েস্তাগঞ্জ নামবেন। শায়েস্তাগঞ্জ থেকে প্রাইভেট কার বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা রিজার্ভ করে সরাসরি শংকরপাশা শাহি মসজিদে যাওয়া যায়। এটিই সবচেয়ে সহজ রাস্তা। সিএনজি অটোরিকশা রিজার্ভ করে যেতে খরচ পড়বে সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। যাঁরা নৌকা ভ্রমণ করতে ইচ্ছুক, তাঁদের ঢাকা থেকে বাসে এলে শায়েস্তাগঞ্জের আগের স্টপেজ সুতাং বাজার নামতে হবে। সেখান থেকে নৌকায় করে সুতাং নদীর দুই পাশে গ্রামের অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে শংকরপাশা ঘাটে পৌঁছা যাবে। তবে বর্ষাকালেই সুতাং নদীতে সচরাচর নৌকা পাওয়া যায়। নৌকা ভ্রমণে খরচ আরো কম পড়বে।
যদি কেউ খরচ কমাতে চান, সেক্ষেত্রে শায়েস্তাগঞ্জ থেকে লোকাল লেগুনাতে ২০ টাকা ভাড়ায় অলিপুর গেটে নামবেন। অলিপুর গেট থেকে সিএনজি করে উচাইল বাজার যেতে হবে। ভাড়া ২০ টাকা। ড্রাইভারকে বলে রাখলে হবে গায়েবি মসজিদের সামনে নামবেন। তাহলে বাজারের একটু আগে মসজিদের রাস্তার সামনে নামিয়ে দেবে।
Leave a Comment