মাদারীপুর

আউলিয়াপুর নীলকুঠি

ইতিহাস আর ঐতিহ্যের খোঁজে যারা ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য মাদারীপুর জেলার এক অনন্য দর্শনীয় স্থান হতে পারে ‘ডানলপ সাহেবের নীলকুঠি’ যা আদতে আউলিয়াপুর নীলকুঠি নামে পরিচিত। ব্রিটিশ আমলের নীলকরদের নির্মম অত্যাচার এবং এর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক ফরায়েজী আন্দোলনের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে এই নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ।

ভ্রমণপিপাসু ও ইতিহাস সন্ধানী দর্শনার্থীদের জন্য ডানলপ নীলকুঠি ভ্রমণের বিস্তারিত তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:

অবস্থান

মাদারীপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে সদর উপজেলার ছিলারচর ইউনিয়নের আউলিয়াপুর গ্রামে এই ঐতিহাসিক নীলকুঠির অবস্থান।

আউলিয়াপুর নীলকুঠিতে যা যা দেখবেন

  • নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ ও চিমনি: প্রায় ১২ একর জমির ওপর নির্মিত ১২ কক্ষ বিশিষ্ট এই কুঠির বেশিরভাগই এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত। তবে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে কুঠির মাঝামাঝি অংশে থাকা চুল্লি এবং প্রায় ৪০ ফুট উঁচু একটি চিমনি আজও টিকে আছে।
  • রণখোলা: নীলকুঠি থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে রয়েছে ‘রণখোলা’। এখানেই ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা হাজী শরীয়তউল্লাহর পুত্র পীর মহসীনউদ্দিন দুদু মিয়ার লাঠিয়াল বাহিনীর সাথে অত্যাচারী নীলকর ডানলপের বাহিনীর প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ডানলপের বাহিনী চরম পরাজয় বরণ করে। ঐতিহাসিক সেই যুদ্ধক্ষেত্রটি আজও ঘুরে দেখতে পারেন।
  • আউলিয়াপুর দরগা শরীফ: নীলকুঠির ঠিক পাশেই (দক্ষিণে) রয়েছে খ্যাতিমান আউলিয়া হযরত শাহসুফি খাজা ইউসুফ শাহ আহসানের জরাজীর্ণ দরগা শরীফ। লোকশ্রুতি আছে, প্রাচীনকালে বিভিন্ন পীর-আউলিয়ার পদস্পর্শে ধন্য হওয়ায় এই গ্রামের নাম হয়েছিল আউলিয়াপুর।
  • আশেপাশের পরিবেশ: একসময় (প্রায় ৫০ বছর আগেও) এই এলাকা ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল, যেখানে বাঘের মতো হিংস্র প্রাণীর বাস ছিল। তবে এখন আর জঙ্গল নেই। নীলকুঠির পশ্চিমে আউলিয়াপুর বাজার এবং উত্তরে কালীতলা অবস্থিত।

ইতিহাসের পাতা থেকে

প্রায় দুশো বছর আগে ডানলপ নামের এক ইংরেজ রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার আশায় এই এলাকায় এসে নীলকুঠি স্থাপন করেন। মাদারীপুরের মাটি নীল চাষের উপযোগী হওয়ায় তৎকালীন কৃষকদের ধান, পাট, গম বাদ দিয়ে জোরপূর্বক নীল চাষে বাধ্য করা হতো। দাদনের ফাঁদে ফেলে চলত চরম অত্যাচার। এই অবিচারের বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন হাজী শরীয়তউল্লাহ ও তাঁর ছেলে দুদু মিয়া। তাঁদের ঐতিহাসিক প্রতিরোধের জীবন্ত প্রমাণ এই এলাকাটি।

কীভাবে যাবেন

দেশের যেকোনো স্থান থেকে বাস বা নিজস্ব পরিবহনে প্রথমে মাদারীপুর জেলা শহরে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে স্থানীয় যানবাহন (যেমন- ইজিবাইক, সিএনজি বা অটোরিকশা) ভাড়া করে সরাসরি সদর উপজেলার ছিলারচর ইউনিয়নের আউলিয়াপুর গ্রামে নীলকুঠিতে যাওয়া যায়।

দর্শনার্থীদের প্রতি অনুরোধ

ঐতিহাসিক এই স্থানটি বর্তমানে চরম অযত্ন ও অবহেলায় বিলুপ্তির পথে। কুঠির অনেক জমিই বেহাত হয়ে গেছে। ইতিহাসবিদ ও স্থানীয়দের দাবি, সরকার যেন দ্রুত এটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। তাই একজন দায়িত্বশীল পর্যটক হিসেবে স্থানটি পরিদর্শনের সময় এমন কিছু করবেন না, যাতে এই ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষের কোনো ক্ষতি হয়।

একদিন সময় বের করে ইতিহাসের এই জীবন্ত পাঠশালা থেকে ঘুরে আসতে পারেন। ইট-পাথরের এই জরাজীর্ণ দেয়ালগুলো হয়তো আপনাকে মনে করিয়ে দেবে আমাদের পূর্বপুরুষদের ওপর হওয়া ব্রিটিশদের অত্যাচার এবং সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের কথা।

Leave a Comment
Share
ট্যাগঃ auliapurdunlopmadaripurnilkuthi