বাংলাদেশের বৃহত্তম দ্বীপজেলা ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার ২ নম্বর সাচড়া ইউনিয়নে দাঁড়িয়ে আছে একটি শতাধিক বছরের পুরনো জমিদার বাড়ি — বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বাড়ি। প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি শুধু একটি পরিত্যক্ত বাড়ি নয়, এটি দক্ষিণ বাংলার এক প্রভাবশালী জমিদারের কীর্তি এবং পুরো একটি উপজেলার নামকরণের পেছনের গল্পের জীবন্ত স্মারক। ইতিহাসপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এটি একটি অনন্য গন্তব্য।
বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বাড়ির গল্পে প্রবেশ করার আগে ভোলার পরিচয়টুকু জেনে নেওয়া দরকার। হিমালয় থেকে নেমে আসা পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের বাহিত পলিমাটি জমে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় যে বিশাল দ্বীপ গড়ে উঠেছে, সেটিই আজকের ভোলা। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, আনুমানিক ১২৩৫ সালের দিকে এই চরটি জেগে ওঠে এবং ১৩০০ সালের দিকে মানুষের বসতি শুরু হয়। ভোলার আদি নাম ছিল ‘শাহবাজপুর’। পরবর্তীতে ‘ভোলা গাজী’ নামের এক পরিচিত মাঝির নামানুসারে এই দ্বীপের নামকরণ হয় ‘ভোলা’। এক সময় পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের ঘাঁটি থেকে শুরু করে আজকের শান্তিময় দ্বীপ — ভোলার ইতিহাস বৈচিত্র্যে ভরা।
ভোলা সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত বোরহানউদ্দিন উপজেলা নিজেই একটি ইতিহাসের ধারক। পূর্বে এই এলাকার নাম ছিল ‘কালীগঞ্জ’, যা ফরিদপুরের জমিদার কালীপ্রসন্নের নামে রাখা হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় মানুষ এই নামকরণ মেনে নেননি। তারা আদালতে মামলা করেন এবং জয়ী হন। এরপর স্থানীয় প্রভাবশালী জমিদার বোরহানউদ্দিন চৌধুরীর নামে এই এলাকার নামকরণ করা হয় ‘বোরহানউদ্দিন’। ১৮৭৬ সালের এক প্রলয়ঙ্কারী বন্যার পর উপজেলার প্রাণকেন্দ্র স্থানান্তরিত হয় এবং ১৯২৮ সালে প্রথম থানা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৮৩ সালের ১৫ এপ্রিল এটি উপজেলায় উন্নীত হয়।
বোরহানউদ্দিন উপজেলার ২ নম্বর ইউনিয়ন হলো সাচড়া। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৬.৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই ইউনিয়নের পূর্বে দেউলা ইউনিয়ন, পশ্চিমে তেঁতুলিয়া নদী এবং উত্তরে বোরহানউদ্দিন উপজেলা সদর। সাচড়ার মাটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ — স্থানীয় তথ্যমতে এই ইউনিয়নের মাটির নিচে গ্যাস ও মূল্যবান খনিজ সম্পদের মজুদ রয়েছে। ১৯২৮ সালে এখানে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থানীয় শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন সমাজসেবী রজ্জব আলী মৃধা।
বোরহানউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন দক্ষিণ বাংলার অন্যতম প্রতাপশালী জমিদার। একসময় তাঁর জমিদারির আওতায় ছিল ২৭টি মৌজা এবং ভোলা ও বরিশালের বিভিন্ন অংশে তাঁর হাজার হাজার একর সম্পত্তি বিস্তৃত ছিল। শুধু সম্পদের অধিকারী হিসেবে নয়, তিনি পরিচিত ছিলেন তাঁর জনকল্যাণমূলক কাজের জন্যও। জীবদ্দশায় তিনি সমাজ উন্নয়ন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং জনসাধারণের সুবিধার্থে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি দান করে গেছেন। তাঁর প্রভাব এতটাই ছিল যে ব্রিটিশ শাসনামলে পুরো একটি উপজেলা তাঁর নামে পরিচিত হয়ে ওঠে — এই স্বীকৃতি আর সব জমিদারের ভাগ্যে জোটেনি।
বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বাড়ি মূলত তিনটি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত ছিল। বাড়িটি নির্মিত হয়েছিল তৎকালীন ঐতিহ্যবাহী চুন-সুরকি ও পোড়ামাটির ইটের গাঁথুনিতে, যা উনিশ শতকের অভিজাত বাংলার স্থাপত্যশৈলীর পরিচয় বহন করে।
জমিদারির কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটি দ্বিতল বাসভবন, যেখানে বোরহানউদ্দিন চৌধুরীর পরিবার বসবাস করতেন। সংলগ্ন তিনটি কাচারি ঘরে পরিচালিত হতো জমিদারির সমস্ত প্রশাসনিক কাজ — প্রজাদের খাজনা আদায়, স্থানীয় বিচার-আচার এবং মুসাফির ও অতিথিদের আপ্যায়ন। বর্তমানে মূল ভবন ও কাচারি ঘরগুলো দীর্ঘ অবহেলায় প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
জমিদার বাড়ির প্রবেশমুখে নির্মিত এই মসজিদটি আজও সবচেয়ে ভালো অবস্থায় টিকে আছে। মসজিদের ভেতরে ও বাইরে রয়েছে সেকালের সূক্ষ্ম কারুকাজ। ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য একটি তথ্য হলো — একসময় এই মসজিদের প্রদীপগুলোতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতো সরিষার তেল। আজও এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় হয় এবং ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহায় দেউলা-সাচড়া অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত এখানেই অনুষ্ঠিত হয়।
মসজিদের পশ্চিম পাশে রয়েছে তালগাছে ঘেরা একটি শানবাঁধানো পুকুর এবং দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত সবুজ মাঠ। এই পুকুর ও মাঠ একসময় জমিদার বাড়ির সৌন্দর্যের অংশ ছিল, আজও প্রাকৃতিক পরিবেশের টানে পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
চৌধুরী বাড়ির কাছাকাছি সাচড়া ও দেউলা এলাকায় রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের এক গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতি। ১৯৭১ সালে সুবেদার সিদ্দিকুর রহমান তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে এই উপজেলার দেউলা দিঘির পাড়ে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর ওপর বীরত্বপূর্ণ আক্রমণ পরিচালনা করেছিলেন। ইতিহাসপ্রেমী দর্শনার্থীদের জন্য এই স্থানটিও পরিদর্শনযোগ্য।
কালের নির্মম বিবর্তনে বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বাড়ির বেশিরভাগ অংশ আজ ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে। মূল বাসভবন ও কাচারি ঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে, ছাদ ভেঙে গেছে এবং জঙ্গলে ঢেকে গেছে বিশাল প্রাঙ্গণ। তবে ঐতিহাসিক মসজিদটি স্থানীয় মানুষের সক্রিয় ব্যবহারের কারণে এখনও মোটামুটি ভালো অবস্থায় আছে। স্থানীয় প্রবীণরা এবং বোরহানউদ্দিন চৌধুরীর বংশধররা দীর্ঘদিন ধরে এই ঐতিহাসিক পুরাকীর্তিটি সংরক্ষণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে সরকারি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে এটি ভোলা জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বাড়ির পাশাপাশি সাচড়া ও বোরহানউদ্দিন এলাকায় আরও কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে।
সাচড়া ইউনিয়নেই রয়েছে আরেকটি প্রাচীন জমিদার বাড়ি — তালুকদার জমিদার বাড়ি। এটিও ভোলার দ্বীপজুড়ে জমিদারি ঐতিহ্যের একটি চমৎকার নিদর্শন এবং দূর থেকে পর্যটকরা এটি দেখতে আসেন।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই দিঘিটি স্থানীয়ভাবে কিংবদন্তি ও লোককথায় সমৃদ্ধ। শান্ত জলরাশি ও সবুজ পরিবেশে এটি প্রশান্তির এক আশ্রয়।
বোরহানউদ্দিন উপজেলায় অবস্থিত এই প্রাচীন মঠটি উপজেলার আরেকটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, যা হিন্দু স্থাপত্যের ঐতিহ্য বহন করে।
ভোলা একটি দ্বীপজেলা হওয়ায় সড়কপথে সরাসরি যাওয়ার সুযোগ নেই। যাত্রাটি মূলত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে ভোলার উদ্দেশে প্রতিদিন একাধিক লঞ্চ ছেড়ে যায়। এমভি ভোলা, এমভি কর্ণফুলী (৪, ৯, ১০, ১১), এমভি বালিয়া, ক্রিষ্টাল ক্রুজ, দোয়েল-১০ সহ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় লঞ্চ রয়েছে। দিনের বেলায় সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে এবং রাতের বেলায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে বিভিন্ন লঞ্চ ছেড়ে যায়। ভোলায় পৌঁছাতে সাধারণত ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। ডেক ভাড়া ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা এবং ডাবল কেবিন ২,০০০ থেকে ২,৬০০ টাকা।
বাসে যেতে চাইলে ঢাকার সায়েদাবাদ বা গাবতলী থেকে লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর হাট হয়ে ফেরিতে ভোলার ইলিশা ঘাটে পৌঁছানো যায়। অথবা বরিশাল গিয়ে সেখান থেকে স্পিডবোটে বা লঞ্চে ভোলা আসা যায়। তবে লঞ্চে যাওয়াই সবচেয়ে আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী।
ভোলা শহরের বাসস্ট্যান্ড থেকে বোরহানউদ্দিনগামী লোকাল বাসে ওঠো। বর্তমানে এই পথের লোকাল বাস ভাড়া ৫০ টাকা। চাইলে সিএনজি অটোরিকশা বা মাহিন্দ্রাতেও বোরহানউদ্দিন সদরে আসা যায়।
বোরহানউদ্দিন বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা ইজিবাইকে করে সাচড়া ইউনিয়নে যেতে হবে। চালককে “বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বাড়ি” বা “সাচড়া চৌধুরী বাড়ি মসজিদ” বললেই সরাসরি পৌঁছে দেবে। বাড়িটি মূল সড়কের পাশেই অবস্থিত হওয়ায় চেনা সহজ।
বোরহানউদ্দিনে রাত কাটানোর জন্য উপজেলা সদরে কিছু সাধারণ মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। তবে ভোলা সদর শহরে তুলনামূলক ভালো মানের হোটেল পাওয়া যায়। বোরহানউদ্দিন ও সাচড়া একদিনে ঘুরে ভোলা শহরে রাত কাটানোর পরিকল্পনা করা সুবিধাজনক।
ভোলায় থকবার বিস্তারিত খোঁজ জানতে চাইলে আমাদের এই পোস্টটি দেখতে পারেন। এখানে ভোলার সকল হোটেল, রিসোর্ট, ডাকবাংলো থেকে ক্যাম্পিং পর্যন্ত সকল কিছুর বিস্তারিত দেয়া আছে।
ভোলায় এলে শুধু চৌধুরী বাড়ি নয়, পুরো জেলাজুড়ে আরও অনেক চমৎকার স্থান রয়েছে।
চরফ্যাশন উপজেলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার মোহনায় বঙ্গোপসাগর লাগোয়া এই ম্যানগ্রোভ বনটি ‘দ্বীপকন্যা’ নামে পরিচিত। চিত্রা হরিণ, শীতের পরিযায়ী পাখি, সবুজ ম্যানগ্রোভ আর সাগরের ঢেউ মিলিয়ে এটি ভোলার সেরা আকর্ষণগুলোর একটি।
তিন দিকে মেঘনা আর একদিকে বঙ্গোপসাগরে ঘেরা মনপুরা দ্বীপ থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত একসাথে উপভোগ করা যায়। সারি সারি নারকেল গাছ, হরিণের বিচরণ আর সাইক্লিংয়ের জন্য এটি অনন্য।
চরফ্যাশনে অবস্থিত ১৭ তলার এই ওয়াচ টাওয়ারটি উপমহাদেশের অন্যতম সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ মিনার। এর চূড়া থেকে বাইনোকুলারে প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
মুক্তিযুদ্ধের অমর শহিদ বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের স্মরণে নির্মিত এই জাদুঘরটি জাতির ইতিহাস ও গৌরবের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এক অনন্য স্থান।
ভোলায় গেলে কিছু বিশেষ খাবার না খেলে ভ্রমণ সত্যিই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মেঘনার টাটকা ইলিশ, কোরাল ও বোয়াল মাছ এখানকার অন্যতম সেরা আকর্ষণ। ভোলার বিখ্যাত মহিষের দুধের কাঁচা দই সারা দেশেই সমাদৃত। শীতকালে মনপুরার হাঁসের মাংস ভুনা এবং গলদা চিংড়ির স্বাদও নিতে ভুলবেন না।
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস ভোলা ভ্রমণের আদর্শ সময়। এই শীতকালে নদী ও সাগর শান্ত থাকে, আবহাওয়া সুন্দর থাকে এবং পরিযায়ী পাখিরাও ভিড় জমায়। বর্ষাকালে (জুন-সেপ্টেম্বর) নদীতে ঢেউ বেশি থাকে এবং লঞ্চ চলাচলে অনিশ্চয়তা থাকতে পারে, তাই এই সময়টি এড়িয়ে চলা ভালো।
লঞ্চের কেবিন আগে থেকে বুকিং করে যাওয়া সুবিধাজনক, বিশেষত ছুটির দিনে। চৌধুরী বাড়িটি পরিত্যক্ত হওয়ায় ভাঙা দেয়াল ও অসমতল মাটিতে চলাফেরায় সতর্ক থাকতে হবে। সঙ্গে পানি, সানস্ক্রিন ও মশা তাড়ানোর স্প্রে রাখা উচিত। ভোলায় মোবাইল নেটওয়ার্ক মোটামুটি ভালো তবে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে সংযোগ দুর্বল হতে পারে।
বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বাড়ি হয়তো এখন ধ্বংসাবশেষের প্রতীক, কিন্তু এর প্রতিটি ইটে লুকিয়ে আছে দক্ষিণ বাংলার এক গৌরবময় জমিদারি যুগের স্মৃতি। যে মানুষের নামে একটি উপজেলার নামকরণ হয়েছে, তাঁর বাড়িটি আজ যেন ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছে। ভোলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি এই ঐতিহাসিক স্থানটি পরিদর্শন করলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় যোগ হবে ইতিহাসের এক অনন্য মাত্রা।
Leave a Comment