বাড়ির পাশে একটি গ্রাম, শ্নোনেংপেডেং তাহার নাম!

যুক্ত করা হয়েছে

২০১৬ সালে শিলং থেকে ফেরার সময় ডাউকি ব্রীজে নামার সুযোগ হয়েছিলো ট্র্যাফিক জ্যামের কারনে। তখন থেকেই সবুজ স্বচ্ছ পানির ডাউকি মনে ধরে যায়। এবার তাই ভিসা নেওয়ার সময় ডাউকি পোর্টেরই নিলাম। ভিসা পাওয়ার পর থেকেই মাথায় যেন ঘুরঞ্চি পোকা ভো ভো করে বেড়াচ্ছে সারাক্ষণ, কবে যাবো ডাউকি। তার চেয়ে বেশি ইচ্ছে জেগে আছে মনে শ্নোনেংপেডেং যাবার জন্য। কিন্তু পরিচিত কোন সাথী সঙ্গী কারোই ডাউকি বর্ডারে ভিসা নেই। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম এবার তাহলে প্রথমবারের মত সলো ট্যুরে বের হয়ে যাই আর একা একা ঘুরার মাঝে কোন ভিন্ন স্বাদ আছে খুজে দেখি।

শ্নোনেংপেডেং
শ্নোনেংপেডেং এর বেইলি ব্রীজ থেকে তোলা উমগট নদীর অপরুপ দৃশ্য।

যেই ভাবা সেই কাজ, ২০১৮ সালের ১২ ই জানুয়ারি ইউনিক বাসে করে রওয়ানা দিলাম রাত ১১ টায়। ভোর চারটায় বাস নামিয়ে দিলো সিলেটের কদমতলি। মোটামুটি বেশ কিছু চায়ের দোকান খোলা পেলাম। এক দোকানে বসে চা, নাস্তা আর পায়চারি করেই ঘন্টা দুয়েক কাটিয়ে ৬ টার বাসে উঠলাম তামাবিল বর্ডার যাবার জন্য। ৬০ টাকা ভাড়ার এই রাস্তা পাড়ি দিতে মোটামুটি আড়াই ঘন্টা লেগে গেলো। ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস অফিস এখনো তালাবদ্ধ । সাধারণত ৯/৯:৩০ এর আগে অফিস খুলে না। পাশের হোটেলে বসে নাস্তা করলাম। এখানে হোটেলগুলো থেকে চাইলে টাকাকে রুপিতে বানিয়ে নেওয়া যায়। আমি ঢাকা থেকেই রুপি নিয়ে গিয়েছিলাম বলে আর প্রয়োজন পড়েনি।

যথারীতি ৯ টার দিকে অফিস খুললেও স্যারদের এসে চা নাস্তা করে রেডি হতে আরো আধা ঘন্টা গেলো। ইমিগ্রেশন পুলিশ একটি ফর্ম ধরিয়ে দিল বড় হাতের ইংরেজি লেটারে পুরণ করে দিতে। নাম,ঠিকানা, ভিসা, পাসপোর্ট ইত্যাদির তথ্য এন্ট্রির জন্য। নিজে পুরন করতে না পারলে তাদের বললেও করে দেয়। পুরন করে জমা দিতেই কম্পিউটার এন্ট্রি দিয়ে ডাকলেন। ভ্রমণ ট্যাক্সের পেপার চাইলেন। ইহাও আমি ঢাকার সোনালি ব্যাংক থেকেই দিয়ে পেপার নিয়ে গিয়েছিলাম। কেউ যদি ভুলে দিয়ে না যায় তবে ৫০০ টাকার জায়গায় তারা ৬০০ টাকা নিয়ে ব্যবস্থা করে দেন। সব কিছু ঠিক্টহাক দেখে সিল মেরে দিয়ে বললো চা পানির কিছু দেন। ১০০ টাকা দিয়ে কাস্টমস অফিসে গিয়ে এন্ট্রি করে বর্ডার গার্ড কে দেখিয়ে চলে গেলাম নিজ দেশের সীমানা ছেড়ে ভারত সীমান্তে।

বিখ্যাত ডাউকি ব্রীজ, জাফলং জিরো পয়েন্ট থেকে তোলা।

ভারত বি এস এফ কে পাসপোর্ট দেখিয়ে ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে দেখি দাদাদের বড় বাবু এখনো আসেননি। ১০ মিনিট অপেক্ষার পর তিনি এলেন। পাসপোর্ট জমা দিলাম, এন্ট্রি করে সিল দিয়ে ছেড়ে দিলেন। গেলাম কাস্টমস অফিসারের কাছে। প্রথমেই জিজ্ঞগাসা করলেন ডলার আছে? বললাম নেই। তাহলে কিভাবে?ডলার লাগবে তো!! বললাম ঠিক আছে আপনি এন্ট্রি করুন আমি দেখছি। এন্ট্রি করে দিলেন ১০০ টাকা তাহাকে ডলার না আনার অন্যায়ে তোহফা দিয়ে ইমিগ্রেশন ঝামেলা মিটিয়ে বের হলাম। আসলে ইচ্ছে করেই এই বর্ডারে ডলার নেইনি, কারণ এখানে ডলার ভাঙানোর ভালো ব্যবস্থা নেই। বের হয়ে কোন একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারকে রাজি করাতে পারলাম না ডাউকি বাজার যাবার জন্য। অবশেষে হতাশ হয়ে হেটেই ১০ মিনিটে পৌছে গেলাম ডাউকি বাজার। এখানেও পেলাম না লোকাল কোন ট্যাক্সি বা জিপ শ্নোনেংপেডেং যাবার জন্য। বাধ্য হয়ে ট্যাক্সি রিজার্ভ করলাম ৩০০ রুপি দিয়ে, যদিও ভাড়া ২০০ রুপির বেশি নয়, তবুও উপায় ছিলোনা। ১০-১৫ মিনিটেই দারাং গ্রাম ছেড়ে চলে এলাম কাংখিত সেই গ্রাম শ্নোনেংপেডেং।

মাছের চোখে দেখা নীল জলের মায়াভরা রুপ।

গাড়ি থেকে নেমেই সোজা চলে গেলাম পাহাড়ের কিছুটা নিচে নেমে ভিউ পয়েন্টে। প্রথমেই লাইন ধরে উঠলাম সেই বেইলি ব্রিজ, যার সেতুবন্ধন করেছে উমগট নদীর দুই গ্রামের যাতায়াতের অন্যতম এক সম্বল। আর পরযটকদের জন্য বাড়িয়েছে অসীম আকর্ষণ। লোহার এই ঝুলন্ত এই ব্রীজে একসাথে ৫/৭ জনের বেশি উঠা নিষেধ। আর লোকজনের চলাচল মেইনটেইন করার জন্য দুই পাশেই আছেন ভলান্টিয়ার। ব্রীজে উঠেই যেন মন আনন্দ চিত্তে বলে উঠলো ভুল করিনি তোর ধরায় একা একা এসে। বিশাল বিশাল পাহাড়ের ভাজে চলে গেছে স্বচ্ছ নীল জলের উমগট নদীর স্রোতধারা। পাথুরে এই নদীতে সকাল ১০ তা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত বোটিং, কায়াকিং, স্নোরক্যালিং,জাম্পিং আরো কত কি চলে। দুলছি আর হাটছি ঝুলন্ত ব্রিজে অন্য রকম এক শিহরন যেন জড়িয়ে আছে মনে। ব্রিজ থেকে নিচে তাকাতেই অবাক করা সেই ছবির মত দৃশ্য। থমকে গেলাম আসলেই কি নদীতে পানি আছে, জলের উপড়েই কি ভেসে চলছে নৌকাগুলো, নাকি এ আমার চোখের কোন ধা ধা । পরক্ষনেই দেখলাম না এতো বাস্তব। দিব্যি ছুটে চলছে নৌকাগুলো। অথচ মনে হলো যেন নৌকা জলে নেই, স্বচ্ছ পানির এক জিবন্ত একুরিয়াম মনে হলো, আসলে পুরোটাই প্রাকৃতিক। নদীর দুই পাশে রঙ বে রঙের তাবুগুলো এই গ্রামের সৌন্দর্য পৌছে দিয়েছে চরম সীমায়। এবার বুঝলাম কেন,কিসের মায়ায় ছুটে আসে ছোট এই গ্রামে এত লোকজন। চারিদিকে মানুষ আর মানুষ। কেউ দলবেধে এদিক সেদিক যাচ্ছে, কেউ আমার মত একা। কেউবা এসে এখানেই রান্না বান্না করে খাচ্ছে। পর্যটকে মুখরিত এই গ্রামে ভ্রমণ শুরু বেশিদিন আগের নয়। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানলাম ২০১০ সালের পর থেকেই পর্যটক এর ভীড় জমতে শুরু হয়েছে শ্নোনেংপেডেং (Shnongpdeng) গ্রামে।

ছবি তুলতে তুলতে চলে গেলাম ওপাড়ে। এপাড় থেকে ওপাড়ের জল যেন আরো স্বচ্ছ আর নীল এর আভাও বেশি। আমার মন সব সময় পাহাড়েই টানে বেশি, কিন্তু এখানে এসে থমকে গেলো ভালোলাগা। পুরোটা ভালোলাগা যেন এই নীল সবুজের জল কেড়ে নিয়েছে, অথচ সামনেই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল পাহাড়। নদীর একপাশে এসে স্রোতের ধারা থমকে গেছে ছোট বড় বহু ঘন পাথরের খাজে। আর তার কারনে এখানে সৃস্টি হয়েছে নদীর আরেক ভয়াবহ সুন্দর রুপ। এক কথায় ঐ জায়গাটুকুকে শ্নোনেংপেডেং এর বিছনাকান্দি বলা চলে। দূরে দাঁড়িয়ে বেইলি ব্রীজ। পাহাড়ের ভাজে ভাজে, পাথরের খাজে খাজে বয়ে চলছে নদী তার আপন মনে। একের পর এক গাড়ি আসছে,থামছে আর মানুষের কোলাহোল বাড়ছে। এত মানুষের উপস্থিতি দেখে কিছুটা সংশয় হলো মনে। আগামি কয়েক বছরে এই প্রকৃতি তার আপন অবস্থানে থাকবে তো? নাকি ময়লা, আবর্জনার স্তুপে নিজের অস্তিত্ব হারাবে শ্নোনেংপেডেং?

শ্নোনেংপেডেং এর বিখ্যাত বেইলি ব্রীজ।

বেলা ১২ টার দিকে গ্রামে ফিরে একটা কটেজ ঠিক করলাম ৫০০ রুপি দিয়ে। ইচ্ছে ছিলো ক্যাম্প সাইটে তাবুতে থাকার, কিন্তু শীতের কথা চিন্তা করে কটেজেই উঠে পড়লাম। কাঠের কটেজ, সাথে বারান্দা। বারান্দায় বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতেই দেখছিলাম সেই মায়ামবতি উমগট নদীর অপরুপ সৌন্দর্য। তাবুতে ৫০০-৭০০ রুপি দিয়ে দুজন থাকা যায়। এবার ড্রেস চেঞ্জ করে চলে গেলাম ব্রাইট স্টার সিং এর হোটেল ব্রাইট স্টারে। এখানে সব ধরণের খাবার পাওয়া যায়। অর্ডার দিয়ে মাত্র ৮/১০ মিনিট উমগটের মায়া দেখতে দেখতেই খাবার এসে হাজির হয়ে যায়। ফ্রাইড রাইস খেয়ে নেমে গেলাম একেবারে নিচে, বোটিং করার জন্য।

এখানে বোটিং এর জন্য মাঝিসহ নৌকা আছে, আর আছে কায়াক। কায়াকের জন্য জনপ্রতি ২০০ রুপি, এক কায়াকে দুইজন। আর নৌকা ৫০০ রুপি ৫/৬ জনের জন্য। আমি তো একা বাধ্য হয়েই ৫০০ রুপি দিয়ে মাঝি ফ্রাঙ্ক লী কে সাথে করেই বোটিং শুরু করে দিলাম। লাইফ জ্যাকেট পড়া বাধ্যতামূলক এখানে বোটিং করতে হলে। ফ্রাঙ্কের সাথে কথা বলতে বলতে গ্রামের অনেক কিছু জানা হলো, সাথে চলছে মায়াময় সব দৃশ্য ক্যামেরায় বন্দীর কাজ। সামনে যতো আগাই ততই যেন মুগ্ধ হই।একটা নদীর পানি কি এতটাই স্বচ্ছ হতে পারে? উত্তর পেতে হলে অবশ্যই যেতে হবে উমগট নদীতে। বরশি ফেলে জেলেদের মাঝ ধরার দৃশ্য যেন আরো ফুটিয়ে তুলছে উমগটের রুপ। স্বচ্ছ নীল জলে ছবির মত ভেসে চলছি আমি ফ্রাঙ্ক আর তার ডিঙ্গি নাও। একটু এগুতেই চোখে পড়ল জীপ লাইনের ক্যাবল। ফ্রাঙ্ক কে বললাম আমি কিন্তু জীপ লাইনিং করবো। ফ্রাঙ্ক বললো ফিরে আসার পথে করি? আমিও বললাম হা ঠিক আছে সামনে চলো। সামনে এগিয়ে চলছি আর বিমুগ্ধ নয়নে রুপের সুধা পান করছি। মনে হলো এখানে কয়েকদিন থেকে গেলে বেশ ভালোই হতো । সামনে একটু বাক নিতেই অবাক নয়নে তাকিয়ে রইলাম বড় বড় পাথরের বুল্ডারের ফাকে দেখা যাচ্ছে দুধ সাদা এক জলপ্রপাত। ফ্রাঙ্ক জলদি আমায় তার কাছে নিয়ে চলো তর সইছে না। পাথরের ভাজ পাশ কাটিয়ে চলে এলাম জল প্রপাতের কাছে। বিমুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে শুধু দেখছি আর দেখছি আমি তাকে। পাশেই আছে বিশাল দানব আকৃতির অসংখ্য পাথর। হটাত মনে হলো আমি যেন বান্দরবানের তিন্দু চলে এসেছি। বেশ অনেকটা সময় এখানে কাটিয়ে দিলাম। ফিরে যেতে মন চাইছিলো না। সেখানের পানিগুলো যেন আরো স্বচ্ছ আর গভীরতাও খুব বেশি। এতদসত্তেও নদীর তলদেশের বড় ছোট সব পাথর আর মাছ খুব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

স্যার জীপ লাইনিং নেহি করেগা? ফ্রাঙ্কের কথায় আমার ধ্যান ভাঙ্গলো? হা ফ্রাঙ্ক চলো জীপ লাইনিং এ যাই। অসংখ্য নৌকা আর কায়াক নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই নদিতে মানুষজন বেশ মজার সাথে।দেখেত দেখতে চলে এলাম জীপ লাইনিং এর কাছে। আমি নেমে ফ্রাঙ্কের হাতে মোবাইল দিয়ে বললাম তুমি ওপারে যেয়ে আমার ভিডিও কর। প্রতিবার জীপ লাইনিং এর জন্য এখানে ৩০০ রুপি ব্যয় করতে হয়। ইংরেজিতে গাইড স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলো কিভাবে কি করতে হবে। সব বুঝে হার্নেস, গ্লাভস পড়ে রেডি হলাম। হটাত কোন এক ভয় মনে বাসা বাধলো। খুব নার্ভাস হয়ে গেলাম। গাইড কে বললাম আচ্ছা আমি সেকেন্ডে যাচ্ছি তুমি অন্য কাউকে আগে পাঠাও। এর মধ্যেই চারজনের এক গ্রুপ এসে হাজির। সেই গ্রুপের এক আপু প্রথম শুরু করলেন। তখন নিজের কাছেই লজ্জা লাগছিলো, একটা মেয়ে যা করছে আমি তা করতে ভয় পাচ্ছি? তার রাইড দেখে আরো সাহস বেড়ে গেলো, এবার আমাই পুরো রেডি। গাইড আবার সব রিপিট করে বুঝিয়ে ছেড়ে দিলো। ব্যস চারিদিকের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে নিমিষেই পৌছে গেলাম ওপাড়।ফিল নেওয়ার আগেই যেন ফুরিয়ে গেলো সময়। ৩০০ রুপি আমার কাছে বেশি মনে হলো। কিছুটা কম হলে হয়ত আরেকবার ট্রাই করতাম। আসলে যেরকম ভয় পেয়েছিলাম সেরকম কিছুই না, বরং খুব মজার। আবার চাইলে মাঝে চিনহিত জায়গার পর জাম্প ও দেওয়া যায় নদীতে এখান থেকে।। একেবারেই ইজি আর সেফলি একটা রাইড। এপাড়ে গাইডের সহযোগী অপেক্ষায় আছে রাইড স্টপ করার জন্য।

এপাড়ে বড় পাথরের উপড় থেকে জাম্পিং করা যায়। এছাড়াও বড় বড় পাথর আর গভীরতা দেখে যে কোন জায়গা থেকেই জাম্প দেওয়া যায়। এই জন্য মাঝির সহায়তা হলেই হয়। মাঝিকে বললেই জাম্পিং এর জন্য সেইফ জায়গা দেখিয়ে দিবে। এর একটু সামনেই আছে স্নোরক্যালিং এর স্থান। এখানে ৫০০ রুপির বিনিময়ে স্নোরক্যালিং এর সব ভাড়ায় মিলে। ভ্রমনে এডভেঞ্চারের স্বাদ বাড়াতে চাইলে অবশ্যই স্নোরক্যলিং আবশ্যক। স্বচ্ছ জলে নেমে তলদেশের সৌন্দর্য উপভোগ এ যেন অন্য রকম এক রোমাঞ্চ। কিন্তু জলে এতটাই ঠান্ডা ছিলো যে আমি সাহস পাইনি জাম্পিং আর স্নোরক্যালিং করার জন্য। পরে অবশ্য আফসোস হয়েছে অনেক। তবে আরো একটা গোপন ভয় ছিলো সেটা আমার দুর্বলতা সাতার না জানা। যদিও লাইফ জ্যাকেট আছে তবুও কিছুটা ভয় ছিলো। যার কারনে সব মিলিয়ে আর এই এডভেঞ্চার আর করা হলো না।

উমগট জলপ্রপাতের অপরুপ মায়া দেখছি, সেলফ টাইমারে তোলা ছবি।

দেড় ঘন্টা পর ফিরে এলাম। পাথরের এক বিশাল গোডাউন যেন নদীর ধার। যেদিকে তাকাই ছোট বড় পাথর আর পাথর। তার মাঝেই ছুটে চলছে স্রোতের ধারা। আটকে যাওয়া পাথরের জল যেন রুপ লাবন্য বাড়িয়ে তুলেছে। চারিদিকে ঘুরে ঘুরে ছবি তুলে ক্লান্ত হয়ে একটা পাথরের উপর বসলাম। ভাবছি দিনটি কেমন গেলো আজ একা একা। কেউ সাথে থাকলে হয়ত আড্ডা দেওয়া যেত, তবে একা ঘুরার মজাও তো লুফে নিলাম। এরই মাঝে কথা হলো কয়েকজন এর সাথে। কেউ গোহাটি থেকে এসেছে, কেউ শিলং থেকে। তবে আমার জরিপে মনে হলো শিলং এর লোকজনই বেশি। সুর্য মামার বিদায়ের সাথে সাথে কনকনে শীত বেড়েই চলছে,ওদিকে সন্ধ্যা ছুই ছুই। কটেজে ফিরে শীতের কাপড় নিয়ে আবার চলে গেলাম নদীর ধারে। অন্ধকারের মাঝে ক্যাম্প সাইট গুলিতে জ্বলছিল আগুন আর দুরের গ্রামে দেখা যাচ্ছিলো কিছু বাতির আলো। মানূষের কোলাহোল কমে গেছে। স্রোতের গর্জন এবার আরো স্পষ্ট হয়ে উঠলো। বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে চলে এলাম কটেজে। কেক আর জুস খেয়েই ঘুমিয়ে গেলাম খুব তাড়াতাড়ি। আগের দিনের জার্নি, আর আজ সারাদিনের দৌড় ঝাপের সকল ক্লান্তি এসে ভর করলো আমায়। এখানের সব দোকান পাট খুব দ্রুতই বন্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যা ৬/৭ টার ভিতর সব দোকান বন্ধ আর গ্রামে নেমে এলো নিরবতা। আমার চোখে চলে এলো ক্লান্তির ঘুম।

সকাল ৮ টায় ঘুম ভাঙলো। ফ্রেশ হয়ে ক্যামেরাটা নিয়ে বের হলাম। পথেই পেলাম কটেজ মালিক কে। বললাম ক্রাংসুরি দেখতে যাবো কিভাবে? সে একটা ট্যাক্সি ঠিক করে দিলো। ক্রাংসুরি, ডাউকি ব্রিজ ঘুরিয়ে বর্ডারে নামিয়ে দিবে ১৫০০ রুপি দিতে হবে। অনেক জোরাজুরির পরেও ভাড়া কমালোনা, কি আর করার। সকাল ১০ টায় বেরুবো বলে চলে গেলাম সকালের উমগটের রুপ দেখতে। গত দিনের চেয়ে এখন বেশি ভালো লাগছে , এর বড় কারণ পুরো স্পট এখন মানুষশুন্য ফাকা। কিছুটা সময় ঘুরে ঘুরে বেড়ালাম আর ছবি উঠালাম ফাকা ময়দানে। টুরিস্ট স্পট গুলোতে বেশি মানুষের চাপ এমনিতেও আমার ভালো লাগেনা। যার জন্য আমি কোথাও গেলে চেষ্টা করি বন্ধের দিন গুলো এড়িয়ে যেতে। পৌনে দশটার দিকে ফিরে এসে রেডি হয়ে নিলাম ক্রাংসুরি যাবার জন্য। এরই মাঝে ড্রাইভার চলে এলো গাড়ি নিয়ে। মাত্র ২৪ ঘণ্টাও পার হয়নি এখনো এরই মাঝে খুব আপন লাগছে শ্নোনেংপেডেং গ্রাম তার রাস্তা ঘাট। বিশেষ করে নদীর মায়া যেন ছেড়ে যেতে মন চাচ্ছিলো না। তবুও যেতে যখন হবেই দেরি না করে গাড়িতে উঠে বসলাম।

ড্রাইভার গিল্বার্ট এস এস সি পাশ। ছোট বেলায় তার এক অসুখ হয়েছিলো সে কারনে বেশিদুর পড়াশুনা করতে পারেনি। কটেজের মালিক তারই সহোদর ছোট ভাই। সে শিলং থেকে মাষ্টার্স কমপ্লিট করেছে এখন নিজের ব্যবসা করছে। সে চিকিৎসার জন্য কেরেলা গিয়েছিলো আসার সময় এই গাড়ি কিনে আনে। আর এখন এটাই তার উপার্জনের একমাত্র সম্বল। অনেকরকম আলাপচারিতা করতে করতে আমরা ছুটে চলছি পাহাড়ের আকা বাকা পথ বেয়ে উপরের দিকে। মেঘালয়য়ের অন্যান্য সৌন্দর্য না থাকলেও যেন শুধু রাস্তার সৌন্দর্য দেখার জন্য হলেও মানুষ ছুটে আসতো এখানে। কখনো ঘন পাহাড়ের বুক চিরে ছুটে চলছে পথ, কখনো যেন দেখে বুঝার উপায় ই নেই আসলে কি পাহাড়ি রাস্তা না কোন মরুভুমিতে চলে এলাম। প্রায় ঘন্টাখানেক সময় লাগল শ্নোনেংপেডেং থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে ওয়েস্ট জৈন্তা হিলের আম্লারেম গ্রামের ক্রাংসুরি ঝর্নায় পৌঁছাতে।

পার্কিং এ গাড়ি রেখে ক্যামেরা নিয়ে পাহাড়ি পথ ধরে নিচে নামতে থাকলাম। দূর থেকেই কানে ভেসে এলো সেই চিরচেনা ঝর্নার গর্জন। পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নামতেই এক জায়গায় থমকে গেলাম। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে গাড় নীল রঙের এক ঝর্না। পুরোই অবাক!! গিল্বার্ট আমাকে বলেছিলো পানির রঙ নীল। তবে এতটা নীল সেটা কল্পনার বাইরে ছিলো। যেন কেউ রঙ মিশিয়ে দিয়েছে পানির সাথে। দ্রুত নেমে গেলাম। কিছুটা নেমেই আবার উপড়ে উঠতেই টিকেট কাউন্টার। জনপ্রতি ৪০ রুপি আর ক্যামেরার জন্য ২০ রুপি টিকেট কেটে ভিতরে প্রবেশ করলাম। প্রথমেই ঝর্নার উপড়ে চলে গেলাম যেখান থেকে তার উৎস। উপরে একটা কৃত্রিম বাধ দেওয়া হয়েছে ওপাড়ে বোটিং করার জন্য। বাধ উপচে পড়া পানিই নিচে যেয়ে ঝর্নার সৃষ্টি হয়েছে। এখানে ১০০ টাকার বিনিময়ে বোটিং করা যায়। পাশেই খাবারের রেস্টুরেন্ট আছে।

নিচের সাথে যেন তাল মিলিয়েই প্রকৃতি সাজিয়েছে তার উপড়ের অংশ। গাছের শিকর আর পাথরের কারুকার্য দেখলে মনে হবে কোন শিল্পির নিখুত যত্ন। এবার সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে ঝর্নার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। আসলেই কি এতটা নীল নাকি আমি ভুল দেখছি। বর্ননা করে ভাষায় বা ছবিতে সব সৌন্দর্য বুঝানো যায় না। ক্রাংসুরি তার জলন্ত প্রমাণ। ক্যান আই টেক ইউর ফটো? পাশেই বসে থাকা এক আংকেলের কথায় আমার ঘোর ভাঙ্গল। তিনি স্ব-ইচ্ছায় আমার কিছু ছবি তুলে দিলেন। তারপর নিজের মোবাইলের একটি ভিডিও দেখালেন বর্ষায় ক্রাংসুরির ভয়াবহ রুপ। এখন শীতের কারণে পানি একেবারেই কম, তবে নীল রঙ খুব বেশি। আর ভরা বর্ষায় পুরোটা জুড়ে পানি ঝড়ে তখন তার রুপ যেন আরো ভয়ংকর সুন্দর হয়ে যায়। মনে মনে লোভ লাগছে আর ঠিক করে ফেললাম আগামি বর্ষায় আবার আসবো। ঝর্নার পানি ছুটে চলছে এক বিশাল পাথুরে ঝিরি হয়ে, যার কারন ঝর্না হয়ে উঠেছে আরো লাবণ্যময়। অনেকটা সময় ঘুরে ঘুরে ছবি তুললাম। এখানে লাইফ জ্যাকেট নিয়ে অনেকেই ঝর্নার জলে ক্লান্তি জুড়াচ্ছে।

Krangsuri Waterfall
পাহাড়ের উপর থেকে দেখা নীল জলের ক্রাংসুরি জলপ্রপাত।

প্রায় দের ঘন্টা পরে ফিরে এলাম গিল্বার্টের কাছে। পাশেই রেস্টুরেন্ট আছে সেখানে সবজি, ডাল আর মাছ ভাজা দিয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম মাত্র ৬০ রুপি দিয়ে। আমি আসার আগেই গিল্বার্ট লাঞ্চ সেরে নিয়েছিলো। আবারো সেই পাহাড়ি মায়াময় পথ ধরে নেমে এলাম একেবার সমতলে ডাউকি ব্রিজ।। চলে গেলাম জাফলং জিরো পয়েন্টে। গায়ে ট্রাভেলার্স অফ বাংলাদেশের টি-শার্ট পড়া। বি এস এফ দেখেই ডাক দিলো তুম বাঙালি না ইন্ডিয়ান? বললাম বাঙালি, ভাবলো আমি বুঝি এখান দিয়েই এপাড়ে চলে এসেছি। বললাম মেরে সাথ পাসপোর্ট হ্যায়। তখন সে বুঝলো। একটি সীমানা দুই ভাগ করে রেখেছে দুই দেশের পর্যটকদের। বিদেশ থেকে দেখছি তখন নিজ দেশের পর্যটকদের, দেখছি পাশাপাশি আমার দেশের রুপ। এখানে বোটিং এর জন্য ৭০০ রুপি খরচ আমার কাছে অনেক বেশি মনে হলো। তাই বোটিং না করে হেটে হেটে চলে গেলাম ডাউকি ব্রীজ। কিছুটা সময় কাটিয়ে ছবি তুলে ফিরে এলাম গাড়িতে।

৫ মিনিটেই পৌছে গেলাম বর্ডারে।গিল্বার্ট কে বিদায় জানিয়ে চলে গেলাম ইমিগ্রেশন অফিসে। ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন শেষ করে ভারত কে বিদায় জানিয়ে চলে এলাম নিজ দেশে। এবার আমার দেশের ইমিগ্রেশন ও শেষ করলাম। ১০ মিনিট অপেক্ষা করে গাড়িতে উঠলাম সিলেটের। রিটার্ন টিকেট আগেই কাটা ছিলো রাত ১২:৩০ মিনিটের। সিলেট পৌছালাম সন্ধ্যা ৬ টায়। বাকীটা সময় কিভাবে কাটানো যায়। সিলেটের আবু সালেহ ভাই যাওয়ার দিন বলেছিলেন সিলেট আসলে নক দিয়েন। তাকেই ফোন দিলাম। উনার অফিসে গেলাম। কিছুক্ষন পর সিলেট সাইক্লিং এর নুরুল করিম মজলু ভাইও আসলেন। একসাথে বেরিয়ে গেলাম সিলেটের আরেক বিখ্যাত রেস্টুরেন্ট পালকি তে।একে একে সুমন ভাই সহ বেশ কয়েকজন এসে যুক্ত হলেন। প্রায় ১০ টা পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে পানসীতে গেলাম ডিনার করতে। খাওয়া দাওয়া সেরে বিদায় জানালাম সিলেট কে। পরদিন ভোর ছয়টার ভিতর পৌছে গেলাম আপন ঘরে।

আমি জীবনে যত জায়গাতেই ঘুরে বেড়িয়েছি প্রতিবারই কেউ না কেউ ছিলোই সাথে। একা বেড়ানোর অভ্যাস আমার নেই। এবারই সাহস করে বেড়িয়ে পড়েছিলাম। খারাপ লাগেনি, একা ঘুরার মাঝেও যে অন্যরকম এক অনুভূতি লুকায়িত আছে তা একা না গেলে বুঝতেই পারতাম না। তবে তুলনামুলক একজন সঙ্গী হলে হয়ত সময়টা আরো বেশ ভালো কেটে যেতো। অনেকদিন পর কোন ট্যুরের গল্প লিখলাম, গুছিয়ে লিখা আমার দ্বারা কখনই হয়না, এটা আমার দুর্বলতা। আর সে জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, যাদের মূল্যবান সময় নষ্ট হলো আমার এই হ-য-ব-র-ল পড়তে পড়তে। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

ভ্রমণে যেয়ে পরিবেশের ব্যাপারে নিজে সচেতন থাকুন পাশাপাশি অন্যকে ও সচেতন রাখুন। আমাদের পর্যটন রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। ভ্রমনে যেয়ে এমন কোন কাজ করা উচিত নয় যাতে দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর। হ্যাপি ট্রাভেলিং