সাজেক ভ্রমণ – খরচ ও দিক নির্দেশনাবলী

যুক্ত করা হয়েছে

গত বেশ কিছুদিন ধরেই প্ল্যান ছিল আমাদের মেঘের রাজ্য থেকে ঘুরে আসার, তাই ২৩ ই জুন পর্যন্ত অনেক সমস্যা থাকার পরও আমরা রওনা দেই সাজেক এর উদ্দেশে। আমাদের ট্যুরটি ছিল মুলত ৩ রাত ২ দিনের। গত ২৩ শে জুন শ্যামলীর কাউন্টার থেকে টিকেট কেটে ২৪ জুন রাতে আমরা রওনা দেই। ২৫ শে জুন সকাল ৬.৩০ এ আমরা খাগড়াছড়ি বাস স্ট্যান্ড এ নামি। বাস স্ট্যান্ড এ নেমেই সবাই ফ্রেশ হয়ে নাস্তাটা সেরে নেই। নাস্তা শেষ করেই আমরা চলে যাই চাদের গাড়ির কাউন্টার এ। এখন চাদের গাড়ির ভাড়া ৮২০০ টাকা যেহেতু আমরা ১ দিনের জন্য মানে ২৫ জুন সকাল ৯ টা থেকে পরদিন বিকাল ৩ টা পর্যন্ত ভাড়া নেই। দিন হিসেবে তাদের ভাড়া নির্ধারন করা থাকে। তাই আমরা ১ দিনের জন্য নিয়ে রওনা দেই হাজাছরা ঝর্ণার জন্য। যাবার সময় আপনাকে আপনার পরিচয় কোথা থেকে এসেছেন সব বিজিবির কেন্দ্রে দিয়ে যেতে হবে।

আমরা ৫৪ বিজিবি কেন্দ্রে কিছুখন থেমেছিলাম চা খাবার জন্য তখন চাদের গাড়ির মামার কথায় ৫৪ বিজিবি কেন্দ্রে খাবারের অডার্র দিয়ে যাই। তাদের কাছে খাবার অডার্র দিতে হয় ৩ ঘণ্টা আগে।পরে তারাই আপনাকে সাজেক বিজিবি কেন্দ্রে খাবার দিয়ে আসবে আপনাকে শুধু গিয়ে কালেক্ট করে নিতে হবে। তাই চা শেষ করে আমাদের নাম্বার দিয়ে আবার আমরা চাদের গাড়িতে উঠে বসি। মোটামুটি ১-১.৩০ ঘণ্টার মাঝেই আমরা চলে আসি হাজাছরা ঝরনায়। চাদের গাড়িতে ৯ জন থেকে একজনকে রেখে জামাকাপর হালকা চেঞ্জ করে চলে যাই ঝরনায়।হাজাছরা ঝরনা খুবই সন্দর একটি ঝর্ণা। আমরা এতে পানির পরিমান দেখে খুবই অবাক হয়ে যাই। আর তার থেকেও বড় কথা আমাদের আগে যারা গিয়েছিল তারা সবাই শুধু ঝরনার নিচ থেকে গোসল করে চলে আসছিল কিন্তু এর পাশ দিয়ে দড়ি দিয়ে ৩০ মিটার উঁচুতে এর আসল রুপটা দেখা যায় তাই দেরি না করে নিচ থেকে উপরে উঠা শুরু করে দেই। খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটা জায়গা কিন্তু উপরে উঠার পর হতবাক হয়ে এর রুপ দেখতে থাকি। উপরে উঠার পর ৬০০-৭০০ মিটার পর্যন্ত আমরা গিয়েছিলাম। অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ কেননা একটু ভুল হলেই আপনি পানির সাথে ছিটকে চলে যেতে থাকবেন তাই এক্সপার্ট না হলে সেখানে যাবার দরকার নেই। হাজাছরা থেকে গোসল শেষ করে আমরা ওখান থেকে পাহারি পেঁপে আর কলা রুটি খেয়ে আবার চাদের গাড়িতে চলে যাই আবার চেঞ্জ করে গাড়িতে চরে বসি এবার গন্তব্য সাজেক

হাজাছড়া ঝর্ণা
হাজাছড়া ঝর্ণা

আমরা ৮ জনের গ্রুপ ছিলাম আর চাদের গারিতে ১২-১৪ জন অনায়াসেই যাওয়া যায়। হাজাছরা থেকে সাজেক (Sajek) যেতে আর্মি স্কাউট এর সাথে যেতে হয় অনাদের গাড়ির পিছনে আমাদের সকল চাদের গাড়ি ছিল। সাজেক যাবার সময় আমরা ছাদে বসেছিলাম চাদের গাড়ির।যদিও ছাদে যাওয়া নিষেধ বিজিবিরা দেখলে বকা দেয়। আর তাছাড়া আপনারা নিজেরাই হয়ত ছাদে যেতে চাইবেন না কারন এত উঁচুতে যাবার সময় অনেক ঝুকি থাকে কেননা একটু ভুল হলে অনেক বিপদ ঘটে যেতে পারে। তাই ভেতরে বসেই শুধু উপভোগ করতে পারেন সেই আপরুপ পাহাড়ি আকাবাকা রাস্তাগুলোকে। আমরা যাবার পথে মেঘগুলো জমা হয়ে ঝরে পরতে শুরু করে যার ফলে আমাদের জার্নিটা আরও রোমাঞ্চকর হয়ে উঠে। বিকেলেই আমরা সাজেক চলে যাই। সেখানে গিয়ে শুরু করে দেই থাকার যায়গা খোজা। গিয়ে রীতিমত হতবাক হয়ে যাই সাজেক একেবারে ফাকা। চাদের গাড়ির মামা আমাদের বলল ফাকা সাজেক আর আর ভরা সাজেক এর মাঝে আকাশ পাতাল তফাৎ তাই আর কি ফাকা সাজেক এর মজা নিতে শুরু করি। যেহেতু সব থাকার জায়গাগুলো ফাকা ছিল তাই ঘুরে ঘুরে সবগুলো দেখে ফেলি এর মাঝে সবচেয়ে সুন্দর ছিল ‘Ruilui’s Queen’।

সাজেক এর রুইলুই পাড়া থেকে
সাজেক এর রুইলুই পাড়া থেকে

আপনার যদি ভাগ্য খুবই ভালো হয় তাহলেই এইটায় থাকার জায়গা পাবেন। কেননা এইটার বারান্দা থেকে যেই আপরুপ মেঘের রাজ্যটাকে দেখা জায় অন্যগুলোতে তা দেখা জায় না।আমরা ২ রুম নিয়েছিলাম মাত্র ২৫০০ দিয়ে। রুমে উঠার পর জিনিস গুছিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পরি আশেপাশের স্পট দেখতে এর মাঝে হেলিপ্যাড দেখে বসে পড়ি পাহাড়ের ধারে থাকা বেঞ্চগুলোতে মেঘ দেখার জন্য।একমাত্র নিজের চোখে না দেখলে হয়ত আপনি বুঝতেও পারবেন না কখনো এর রুপ।সাজেক এর থাকার জায়গা গুলোতে এখনো বিদ্যুৎ যায় নি যার ফলে জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ নিতে হয়। আমাদেরকে বিকাল রাত ও সকালে ৪-৫ ঘণ্টার মত সাপ্লাই দিয়েছিল। রাতের খাবার বিজিবি থেকে আনার পর আমরা বসে পরি বারান্দার আড্ডাতে। রাত ঘনিয়ে আসলে একটু শীত লাগতে শুরু করলে রুম থেকে কম্বল নিয়ে গায়ে দিয়ে বসে পরি। সারারাত গান গেয়ে আড্ডা দিয়ে সকালের অপেক্ষা করতে থাকি। সকাল ঘনিয়ে আসলে সকালের মেঘ গুলো দেখে জাস্ট আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি।হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে সেই মেঘগুলোর মাঝে।আরেকটু সকাল হলে আমরা চাদের গাড়িতে উঠে বসি কংলাক পাহাড়ের জন্য। কংলাক পাহাড়ে উঠার মনে হয়েছিল আমরা মেঘের উপরে বা মেঘের মাঝে দাড়িয়ে আছি। পাহাড় থেকে নেমে হাল্কা কিছু খেয়ে নিয়ে আবার চলে যাই নিজেদের রুমে। সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে বসে পরি চাদের গাড়িতে আমাদের থাকার কথা ছিল ৩ টা পর্যন্ত কিন্তু আগেই বের হয়ে যাই রিসাং ঝর্ণা দেখার জন্য। স্কাউট টাইম হলে আবার সেই আকাকাবাকা পথ ধরে চলে আসি খাগড়াছড়ি বাস কাউন্টারে চাদের গাড়ির মামাকে বললেই আপনাকে রিসাং যাবার জন্য বাসের কাউন্টারে নামিয়ে দিবে। বাসের ছাদে বসে রওনা দেই রিসাং এর পথে। যাবার পথে আলুটিলা ও ঝুলন্ত ব্রিজ পরে চাইলেই নেমে দেখে নিতে পারেন আমরা সোজা চলে যাই রিসাং যাবার কাউন্টারে। সেখান থেকে বাইকে করে চলে যাই রিসাং।রিসাং ঝর্ণায় যেতে আপনাকে খাড়া রাস্তা বেয়ে নামতে হবে। একটু সাবধান থাকবেন আমাদের মাঝে একজন পরে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছিল।

মেঘমালা, সাজেক হ্যালিপ্যাড থেকে
মেঘমালা, সাজেক হ্যালিপ্যাড থেকে

জামাকাপড় চেঞ্জ করে চলে যাই মুল ঝর্ণায় এইবার ও গিয়ে অবাক হয়ে যাই। ঝর্ণায় পানি খুব বেশি ছিল। আর এইটা ছিল অনেকটা ৪৫ ডিগ্রী খাড়া আর সেই খাড়া পাহাড়ের উপরে ঝর্ণার পানি পরছিল আর ৪৫ ডিগ্রী হয়ে পানি নিচে আসছিল। দেরি না করে ঝরনার পানিতে নেমে পড়ি পরে পাহাড়ের উপর উঠে ঝরনার পানিতে বসে। সব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে এই ঝর্ণা কেননা অনেক পানি পরছিল তার ফলে খাড়া পাহার বেয়ে নেমে যাচ্ছিল অনেক বেগে একটু ভুল করলেই আপনি স্রোতের সাথে একবারে ২০-২৫ ফুট নিচে আছরে পড়বেন। আমরা পানি যেখানে পড়ছিল তা থেকে একটুদূরে বসে উপভোগ করছিলাম চাইলে বা দিক দিয়ে পিছলিয়ে নিচেও নামতে পারবেন তবে এইটা না করাই ভালো আমাদের একজন এভাবেই পানির স্রোতের সাথে নিচে যেয়ে পড়ে। ভাগ্য ভালো থাকার কারনে সামান্য কেটে যাওয়া ছাড়া তেমন কিছু হয়নি। বিকেল গড়িয়ে এলে আমরারা রিসাং থেকে বের হয়ে আসি। আবার বাইকে করে চলে যাই মাটিরাঙা সেখানে এক আপুর বাসায় খাবার খেয়ে রেস্ট নিয়ে নেই। যাবার সময় বাসের টিকেটটা কেটে রাখি ৯ টার।

রিসাং ঝর্ণা, সাজেক
রিসাং ঝর্ণা

রাতে আবার সেই বাইকে করে এই চাদের আলোতে পাহাড়ি এলাকায় ঘুরে বেড়াই যা ছিল এই ট্যুরের সবথেকে উপভোগ্য রাইড। পরে খাবারের জন্য। কিছু কিনে নিয়ে আমরা বাসে উঠে বসি। এবার গন্তব্য বাড়ি।

খরচসমুহ

ভাড়া: যাওয়া+আসা=(৫২০ + ৫২০ টাকা) বাসে।
কটেজ ভাড়া ৩০০ টাকা (৪ জনের জন্য এক রুম)
চান্দের গাড়ি ৯০০ টাকা (৯ জনের জন্য)
খাগড়াছড়ি খাওয়া খরছ ৪০+১২০+১২০ টাকা
সাজেকে খাওয়া খরচ ৪৫০-৫০০ টাকা তিনবেলা।
প্রবেশ ফি -৭০ টাকা। এই খরচগুলো একজনের ভাগের।

খাবারের বেলায় সাজেকে প্যাকেজ

১. ভাত+ডাল+আলুভর্তা+সবজি+দেশি মুরগী দাম ২০০ টাকা
২. ভাত+ডাল+আলুভর্তা+সবজি+ফার্মের মুরগী দাম ১৫০ টাকা
৩.ভাত+ডাল+আলুভর্তা দাম ১০০ টাকা।
রাতে ব্যাম্বু চিকেন অথবা বারবিকিউ খেতে পারেন দাম পড়বে ২২০ থেকে ৩০০ টাকা পরবে।
আমরা ৮ জনের গ্রুপ গিয়েছিলাম আমাদের সব মিলিয়ে প্রতিজনের খরচ হয়েছিল ৩১৬০ টাকা।

বিশেষ টিপস

১.যাবার সময় আইডি কার্ড নিয়ে যাবেন ২.হেলিপ্যাড থেকে সূর্যাস্ত দেখবেন
৩.অবশ্যই সকাল ভোরে ঘুম থেকে উঠবেন
৪.পাওয়ার ব্যাংক সাথে নিবেন
৫.খাগড়াছড়ি থেকে পানি কিনে নিয়ে যাবেন পরিমানমত
৬.ঝরনায় সাবধান থাকবেন।

সাজেক খুব সুন্দর যায়গা। তাই দয়া করে কেউ যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করবেন না।