মাত্র ১৫,০০০/- টাকায় ঘুরে আসলাম ভূস্বর্গ কাশ্মীর!!

যুক্ত করা হয়েছে

আলহামদুলিল্লাহ, সকল জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত ৪ মার্চ ২০১৭ দিল্লী থেকে কাশ্মীর এর উদ্দেশ্য রওনা দিয়ে ১৪ মার্চ দিল্লী ফিরলাম।

দিল্লী থেকে জম্মুঃ

শুরুতেই খেলাম ধাক্কা ৫ মিনিটের জন্য পুরানা দিল্লী থেকে জম্মু গামী শালিমার এক্সপ্রেস ট্রেন মিস। কী আর করার যেতে তো হবেই নেট ঘেটে জানতে পারলাম ১ ঘন্টা পর ট্রেন আছে নিউ দিল্লী থেকে। দ্রুত সিএনজি নিয়ে ছুটলাম কিন্তু কাজ হলনা আবারো মিস কিন্তু এবার আর ট্রেন না আধা ঘন্টা আগে টিকেট বন্ধ। হাল ছাড়লাম না নিউ দিল্লী ফরেন কাউন্টার এ গিয়ে জানলাম রাত ৪.৩০ মিনিটে ট্রেন আছে, ৩০৫ রুপিতে টিকেট কেটে নিলাম। আর ব্যাগপত্র রিজার্ভেশন এ দিয়ে রাতের খাওয়া সেরে নিলাম। তারপর ওয়েটিং রুমে বসে কিছুক্ষণ ফ্রী ওয়াইফাই ইউজ করে ঘন্টা ২ ঘুমালাম। এবার আর মিস নয় যথা সময়ে ট্রেনে উঠে ফযর নামাজ আদায় করে দিলাম ঘুম। ঘুম থেকে উঠে হালকা খাবার খেয়ে কিছুক্ষন নেট ইউজ করে ট্রেনের জানালা দিয়ে প্রকৃতির রুপ দেখতে দেখতে জম্মু চলে এলাম। জম্মু আসার ঘণ্টা দেরেক আগেই মোবাইল নেটওয়ার্ক চলে গেল। কিছুই করার নেই। আগেই জানতাম জম্মু কাশ্মীর অল ইন্ডিয়া প্রি-পেইড সিমে নেটওয়ার্ক থাকেনা। ওখানে নেমে যোহর নামায আদায় করে সঠিক তথ্যর জন্য চলে গেলাম জম্মু শালামার মারকায মসজিদে। ওখানে দুপুরের খাবার খেলাম বাসমতী চালের ভাত আর খাশির গোসত আর স্পেশাল সবজী ১৫০ রুপি এক্কেবারে বাঙালি খাবার। সেখানে গিয়ে খবর পেলাম জম্মু থেকে আজকে গাড়ি যাবে শ্রীনগর আর আগামীকাল শ্রীনগর থেকে জম্মু আসবে। তারমানে যদি জম্মু থাকি তাহলে ২ দিন থাকতে হবে। তাই গাড়ি ঠিক করার জন্য স্থানীয় ২ ভাইকে নিয়ে চলে গেলাম বাসস্টপেজ।

জম্মু থেকে শ্রীনগরঃ

তারপর মাগরিবের নামাযের পর সুমোতে করে ১০০০ রুপি ভাড়া দিয়ে উঠলাম। বলে রাখি ৭০০ রুপি ভাড়াতেও যেতে পারবেন ১৪ সিটের গাড়ি। আরেকটি উপায় হল ৫০০ রুপি দিয়ে বানিহাল গিয়ে ওখান থেকে ২০ রুপিতে সোজা শ্রীনগর। আমি সাজেস্ট করব এভাবেই যান। একসাথে ২ টি ভিউ পাবেন আর জুন জুলাইতে গেলেত কথাই নেই পাহাড়ের দুপাশে আপেল বাগান। আমাদের ড্রাইভার ছিল একটু পাগলা টাইপের প্রচুর স্পীডে পাহাড়ী রাস্তায় ড্রাইভ করল। উদামপুর পাড় হয়ে যখন চেন্নাই টানেল (পাহাড়ের ভিতরের রাস্তা) দিয়ে গাড়ি চলল তখন খুব ভালো লাগল। গাড়ি ডাবল রোড থেকে যখন সিংগেল রোডে উঠল আর পাহাড়ি রাস্তায় চলছিল তখন পাহাড়ের নিচের বাড়িঘরের লাইটের আলো মনে হত এক একটি তারা। তখনকার অনুভূতি লিখে বোঝাবার মত নয়। আর সেদিন ছিল চাঁদনী রাত তাই আরো বেশি ভালো লেগেছিল। মাঝপথে বিরতি গাড়ি থেকে নেমেই নামায আদায় করলাম। হঠাৎ প্রচুর ঠান্ডা আবহাওয়া এক্কেবারে মুগ্ধকর। তারপর নামাজ শেষে হালকা নাস্তা সেরে আবার গাড়িতে উঠলাম। পাটনিটপ পাহাড়ী রাস্তার সর্বোচ্চ চূড়া ওখান থেকে যখন নিচে নামছিল তখন খুব ভালো লাগছিল আবার কিছুটাও ভয় ছিল কেননা অনেক জোড়ে ড্রাইভ করছিল তাই। শ্রীনগর আসার ঘন্টা কয়েক আগে যখন কাশ্মীরে প্রবেশ করল তখনকার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশের মত নয় জিবনে প্রথম রাস্তার দুপাশে বরফ স্বাগতম জানাচ্ছে। তারপর কিছুক্ষণ পর পাহাড়ি রাস্তার সমাপ্ত সমতলে নেমে গেল। ফযরের প্রায় ঘন্টাখানেক আগেই শ্রীনগর পৌছে গেলাম। ওখানে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড মসজিদে ফযর নামাজ আদায় করে চলে গেলাম ডালগেট।

শ্রীনগরঃ

শ্রীনগর ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে লোকাল পরিবহণে ১০ রুপিতে চলে এলাম ডালগেট। তার মধ্যো ঢাকার ২ ভাইয়ের সাথে দেখা ওখান থেকে ডাললেক ঘাট নং ২ এ গলির ভিতরে এক ভাইয়ের হোটেল এ উঠলাম কাশ্মীর মহল ভাড়া ৪৫০ ২ জনের রুম চাইলে ৩ জন থাকা যেত। যদিও গলির ভিতরে ডাললেক থেকে হাটার রাস্তা মাত্র ৫ মিনিট। আর হোটেলের পাশেই ছিল মসজিদ আর মালিক ছিল দ্বীনদার লোক তাই চিন্তা ভাবনা করে এটাতেই উঠলাম। ওই হোটেলের পাশেই মালিকের বাসা, ওনার এখানে খাবার প্রতিবেলা ১২০ রুপিতে বাসমতী চালের ভাত, মোষের গোশত, আর ডাল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম শ্রীনগর সিটি ট্যুরের জন্য সবগুলো স্পটের জন্য ৬০০ রুপিতে অটো নিলাম ছিলাম ৪ জন। সব ঘোরাঘুরি করলাম বেশিরভাগ বাগান ফুল ছিলনা তাই তেমন ভালো লাগেনি। তবে জামে মসজিদ আর হযরতবাল দরগাহ খুব ভালো লেগেছিল। সব ঘুরে রাতে ফিরলাম হোটেলে। পরেরদিন পহেলগাম যাবার প্ল্যানিং করলাম।

পহেলগামঃ

সকালের নাস্তা সেরে ডালগেটের পাশে লোকাল ট্রান্সপোর্ট এ জনপ্রতি ৭০ রুপি ভাড়াতে চলে গেলাম ইসলামাবাদ পহেলগামের আগে ওখান থেকে লোকালে ৮০ রুপি ভাড়ায় চলে এলাম পহেলগাম। এখানে আসার রাস্তাটা অনেক সুন্দর রাস্তার একপাশে পাহাড়ি নদী অপর পাশে পাহাড়। পহেলগামে ঘোড়াতে করে ঘুড়তে হয়, ১০০০ রুপিতে ঘোড়া, রেইনকোর্ট, সুজ ভাড়া করলাম। বেশ লম্বা সময় ঘোরাঘুরি করলাম খুব ভালো লাগল মিনি সুইজারল্যান্ড তার সাথে কটেজগুলো। আরো ভালো লাগল পুরো কটেজগুলি বরফে ঢাকা সত্যিই অসাধারান। ফিরিতে রাত হয়ে গেল। এবার প্ল্যানিং গুলমার্গ।

গুলমার্গঃ

ঘুম থেকে উঠেই দেখি বাহিরে অনেক বৃষ্টি রাতে শ্রীনগরে প্রচুর স্নো পড়েছে। তাই একটু বেড়ুতে সময় লাগল। গিয়েছি লোকাল পরিবহণে ১০ রুপিতে প্রথমে গেলাম বাটমালু ওখান থেকে টোনমার্গ ভাড়া ৭০ রুপি। টোনমার্গ গিয়েই পুরোই মুগ্ধ প্রচুর পরিমাণে স্নোফল হচ্ছে রাস্তার দুপাশে বরফের বিশাল স্তর। ওখান থেকে ছাতা কিনলাম আর ১৫০ রুপিতে, আর ১৫০ রুপিতে জ্যাকেট আর সুজ ভাড়া নিয়ে রওয়ানা হলাম গুলমার্গের দিকে গাড়ি ভাড়া ৫০ রুপি। গুলমার্গের পাহাড়ি রাস্তা দুপাশেই বরফের বিশাল স্তর তার উপর দিয়ে চলছে আমাদের গাড়ি। এ যেন এক স্বর্গরাজ্য। ওখানে নেমেই দেখি সব বরফ দোকানের বাহিরে যে চেয়ার টেবিল তাতেও বরফের বিশাল স্তর। গাড়িগুলো একেকটা বরফে ডুবে যাচ্ছে প্রকৃতি পুরোটাই বরফ গাছগুলো সব সাদা হয়ে গেছে। একটু পর পর গাছ থেকে বরফ ধ্বসে পড়ছে।

ওখানে একটা মসজিদ আছে বেশ সুন্দর ভিতরে সম্পূর্ণ হিটারের ব্যবস্থা যোহরের নামাজ আদায় করে সবগুলো পয়েন্ট ঘুরলাম। অফসিজন ছিল তাই মাত্র ১০০ রুপিতে স্কি করলাম। আর সেদিন প্রচুর স্নোফল হওয়ার কারনে গন্ডোলা বন্ধ ছিল। আপনি চাইলে ৭০০ রুপিতে গন্ডোলাতে চড়তে পারবেন। ফেরার পথে ৫০ রুপিতে টোনমার্গ ফীরে ১০০ রুপিতে গরুর মাংশ দিয়ে ডাল ভাত খেলাম। তারপর আসর নামায আদায় করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মাগরিব নামাজ পড়ে বের হলাম। কিন্তু এবার আর কোনভাবেই শ্রীনগরের গাড়ি পাওয়া যাচ্ছেনা তারপর ২০ রুপির ভাড়ায় একটু আগালাম তারপর ১০ রুপি দিয়ে আরেকটু কিন্তু এবার আর আগায়াতে পারছিনা তাই সূরা ইয়াছিন এর আমল করলাম একটু পরেই চলে মালবাহী ট্রাক হাত উঠানোর সাথে সাথেই থামাল তারপর উনাকে বলার পর উনি বলল যে এখনতো অনেক রাত পুলিশ দেখলেই সমস্যা হতে পারে তারপরেও যাই হোক আপনারা উঠেন পড়েন ইনশাল্লাহ। ওনি আমাদেরকে বারামুলা নামিয়ে দিল তারপর ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে চলে এলাম হোটেলে।

শ্রীনগর ডাললেকঃ

আজকে যাবার পালা কিন্তু জানতে পারলাম পাহাড় ধ্বসের কারনে রাস্তা বন্ধ, তাই ডাললেক এ গেলাম ঘোরাঘুরির জন্য শিকারা ভাড়া করলাম মাত্র ১০০ রুপিতে ডাললেক রাউন্ড ভাড়াটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই বাস্তবতা। কেননা কোন পর্যটিক নেই। দীর্ঘ সময় ঘোরাফেরা ও ডাললেকের ভাসমান দোকান থেকে কেনাকাটা করার পর যখন ফীরলাম তখন তাকে ৫০ রুপি বাড়িয়ে ১৫০ রুপি ভাড়া দিলাম এতে বেশ খুশি ছিল। রাস্তা বন্ধ থাকার কারনে আমরা আরো তিন দিন কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী মাদরাসাগুলো ভ্রমণ করলাম এবং ফেরার পথে বিমানযোগে দিল্লী আসলাম। বিমানে উঠার পর আকাশ থেকে কাশ্মীরের ভিউ দেখার পর মনে হল পয়সা উসূল পুরো দেশটাই যেন একটুকরো বরফ।

আসলে কাশ্মীর (Kashmir) ট্যুরে এত টাকা লাগেনা বাংলাদেশী টাকায় ১৫ হাজার হলে মোটামুটি মানের ট্যুর দিয়ে আসা যায়। মিনিমাম ৬ জনের গ্রুপ হলে খরচ লোকাল ট্রান্সপোর্ট থেকে ট্যাক্সিতে আরো কম লাগবে। শ্রীনগর থেকে ৭-৯ জন বসার মত ট্যাক্সি ভাড়া সারাদিনের জন্য ২-২.৫ হাজার রুপি।

বিঃদ্রঃ আমি তেমন লেখালেখি করতে করিনা, আর এত গুছিয়ো লিখতে পারিনা ভূল থাকলে জানাবেন সংশোধন করে দিব ইনশাআল্লাহ। আর কাশ্মীর নিয়ে কিছু জানার থাকলে বলবেন যতটুকু জানি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব যেকোনো তথ্য দিয়ে সাহায্য করার।

বিশেষ কৃতজ্ঞতায়ঃ Md Zawed Hossain, Sheikh Sajeeb, Lubna Rahman Mukti