হিমালয় দেখার দিনে – পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা

যুক্ত করা হয়েছে

ঘুমটা ভেঙ্গে গেল ঠাণ্ডায়, মুঠো ফোনের বিকট এলার্মটাও বেজে চলেছে সমান তালে। ঘুমের সাথে যুদ্ধ জয় করে চোখ মেলে দেখি চারটা বাজতে কয়েকমিনিট, বিছানা ছেড়ে দেখি সঙ্গীরাও উঠে পড়েছে। সঙ্গী বলতে ছোট ভাই মিজান ও তূর্য্য আর বগুড়ার ভবঘুরে কয়েকজন বড়ভাই। তাদের আর ডাকলাম না তাদের লম্বা পথের ক্লান্তির কথা ভেবে। তিনজন মিলে রেডী হয়ে যখন বাইক নিয়ে তেতুলিয়া ডাকবাংলো থেকে বের হলাম তখন ঘড়িতে সময় সাড়ে চারটা, তখনও অন্ধকার হলেও সূর্য উঠতে তেমন দেরী নেই। বাংলোর কেয়ারটেকারকে ডেকে তুলতে কত কাঠখড় পোড়াতে হল তা আর বলে কাজ নেই ,ওদিকে দেরী হয়ে যাচ্ছে, নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌছাতে হবে ঠিক সূর্য ওঠার আগে। নাহলে দেখা হবে না হিমালয়কন্যা পঞ্চগড় এর আসল সৌন্দর্য, কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে ভোরের সোনালী আলো,ঘুমন্ত দার্জিলিং, কালিম্পং শহর সেই শহরের পাহাড়ি রাস্তায় ভোরের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে ছুটে চলা গাড়ির হেড লাইট।

আমরাও হেড লাইট জ্বালিয়ে এশিয়ান হাইওয়ে থেকে নেমে মেঠো রাস্তা ধরে গন্তব্ব্যের দিকে এগিয়ে চললাম ততক্ষনে পূর্বাকাশ লাল হতে শুরু করেছে। আমরাও আর বেশী দূরে নেই। বলে রাখি পঞ্চগড় এর যেকোন যায়গা থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় এমন কি ঠাকুরগাঁও থেকেও দেখা যায়। কিন্তু ছবি তুলতে গেলে বাধ সাধে ইলেকট্রিক পোল আর ইউক্যালিপ্টাস গাছ যেগুলো কম্পোজিশন এর ক্ষেত্রে খুব বিরক্তিকর তাই গত কালই পছন্দসই যায়গা খুজে নিয়েছিলাম আর আজ সেখাইনেই যাচ্ছি।

তেতুলিয়ায় অক্টোবর এর ঠাণ্ডাকে হেলাফেলা করা যে মোটেও বুদ্ধি মানের কাজ করিনি তা কাল রাতেও বুঝতে পারেছিলাম পঞ্চগড় থেকে তেতুলিয়ায় আসার সময়ই, আজ আবার বুঝতে পারলাম। চারদিকে সবুজ মাঠ তাতে সোনালী ছোয়া লেগেছে মাত্র তার উপরে কুয়াশার চাপ চাপ আস্তরণ সাথে ঠাণ্ডা বাতাস আর দিগন্তে লাল আভা। এসব উপভোগ করতে করতে আমরা চলে এলাম সেই ছোট নদীর তীরে , বাইক থেকে নেমেই মিজান আর তুর্য্য উত্তেজনায় গলা ছেড়ে গান ধরলো আমিও যোগ দিতে আর কুন্ঠা বোধ করলাম না! সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত!

দিগন্তে মাথা উচু করে নিজের অস্তিত্ত জানান দিচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর তাতে সূর্য একটু একটু করে সোনালী আভা দিতে মোটেও কার্পন্য করছে না। তার নিচেই দার্জিলিং আর কালিম্পং এর পাহাড়ে আলো জ্বলছে! ধুম্রশলাকায় হুতাশনের ছোয়া দিয়ে আমরা সেই অসাধারন দৃশ্য দেখছিলাম আর ক্যামেরা রেডি করছিলাম ঘড়িতে তখন সময় ৬ টা দশ।

দার্জিলিং এ গেলে হয়ত দার্জিলিং দেখা হবে কিন্তু দেশের মাটিতে দূর হতে কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে ভোরের দার্জিলিং দেখা হবে না। এই অভিজ্ঞতাই অন্যরকম আর পঞ্চগড় হল সেই যায়গা যেখান থেকে এভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর দার্জিলিং দেখা যায়। গর্বে যখন বুকটা ফুলে যাচ্ছিল তখন দেখি মাঠে কয়েকটা লোক নেমে গেছে কেও গরু বাধতে এসেছে আর কেও বা টেপাই ( বাশ দিয়ে তৈরী মাছধরার একধরনের উপকরন) থেকে মাছ ঝাড়ার জন্য এসেছে । সব মিলিয়ে যে অসাধারন একটুকরো সোনার বাংলার ভোরের দৃশ্য আমরা অবলোকন করছিলাম তার বনর্ণা দেয়া আমার কম্ম নয় জীবনানন্দের । ছবি তুলছি আর অবাক হয়ে দেখছি কিভাবে মুহূর্তেই বদলে যাচ্ছে সামনের দৃশ্যপট ধীরে ধীরে হিমালয়ের তৃতীয় চুড়োটি আরো দৃশ্যমান হচ্ছে ছবিও তুলছিলাম সমান তালে।

সোনালী আভায় মোড়ানো কাঞ্চনজঙ্ঘা বেলা বাড়ার সাথে সাথে ঝলমলে হয়ে উঠছিল, দার্জিলিং এর পাহাড় সারির গায়ে ঘরবাড়ি স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, পাহাড়ের চূড়ায় মোবাইল টাওয়ার ও যখন দেখা যাচ্ছিল তখন সকাল দশটা আমরা এক চায়ের দোকানে বসে চায়ে চুমুক দিচ্ছিলাম আর বাইনোকুলার দিয়ে নয়ন ভরে দেখছিলাম আমাদের পঞ্চগড় এর সৌন্দর্য্য । চা বাগানের পাশে ঘন সবুজ বনের উপড়ে দার্জিলিং পাহাড়ের সারি তার উপরে মেঘ , মেঘ ছাড়িয়ে সগর্বে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে কাঞ্চনজঙ্ঘা । হেমন্তের সকালের ঝলমলে আলোয় ঝলমল করছে হিমালয়ের তৃতীয় পর্বতশৃঙ্গটি ।

সেখান থেকে বসে বসে সাথে নেয়া সকালের নাস্তা ধ্বংস করে আমরা আরো মেঠো পথ ধরলাম এ ফাকে বলে দেই কাঞ্চনজঙ্ঘা হিমালয়ান পর্বতমালার তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ আর ভারতে সর্বোচ্চ যার অবস্থান ভারত নেপাল সীমান্তে । কাঞ্চনজঙ্ঘার নামটি স্থানীয় শব্দ “কাং চেং জেং গা” থেকে এসেছে, যার অর্থ তেনজিং নোরগে তাঁর বই, ম্যান অফ এভারেস্ট (Man of Everest)-এ লিখেছেন “তুষারের পাঁচ ধনদৌলত” । কাঞ্চনজঙ্ঘার উচ্চতা ৮,৫৮৬ মিটার (২৮,১৬৯ ফুট) মাউন্ট এভারেস্ট এর উচ্চতা ৮,৮৪৮ মিটার যা চীন ও নেপাল সীমান্তে অবস্থিত বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ।

ভিন্ন স্থান হতে ভিন্ন স্বাদে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে এভাবেই কেটে গেল সারাটা দুপুর , ততক্ষনে ঝলমলে হয়ে ঝিকমিক করছে কাঞ্চনজঙ্ঘা । পথে এক গ্রামের হোটেল থেকে দুপুরে উদরপুর্তি করলাম আলু ভাজি ডাল আর ছোট মাছে চচ্চরি দিয়ে যার কোন তুলনা হয়না । কেও যদি অলিতে গলিতে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে যান তবে ছোট কোন বাজারে কোন হোটেল খেয়ে নিবেন ! গ্রামের খাবারেও যে গ্রামের স্বাদ আর গন্ধ থাকে তা বোঝা যায় ।

এর পর বিকেলটা কাটল পঞ্চগড় এর আরেক দর্শনীয় সৌন্দর্যের আবাসস্থলের এলাকায়! মহাবিপন্ন শেখ ফরিদের এলাকায়। শেখ ফরিদ একটি পাখির নাম যদিও অনেকেই জানেন! বাংলাদেশে শুধু মাত্র তেতুলিয়ায় পাওয়া যাইয় এই মহাবিপন্ন পাখি। বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে এই অসাধারন সুন্দর পাখিটি। যার কেতাবী নাম কালো তিতির আর ইংলিশ নাম Black Frankolin. বছরের এ সময় পাওয়া যাবেনা জেনেও সেখানে বসে কিছু টা সময় আখ খেতে খেতে কাটিয়ে দিলাম। অবশ্য সঠিক সময়েও শেখ ফরিদ দেখতে বিস্তৃত ললাট লাগে নতুবা তার ডাক শোনা যাবে কিন্তু দেখা যাবেনা । কালো তিতির দেখার সবচেয়ে ভালো সময় হল মার্চ থেকে জুলাই।

সেখান থেকে আবার বাংলাবান্ধার উদ্দেশে রওনা দিলাম উদ্দেশ্য গোধুলির আলোয় আরেক কাঞ্চনজংঘা দেখা ও ঢাকা থেকে আসা সায়েম ভাই ও প্রিন্স ভাইদের সাথে দেখা করা। সব শেষ করে যখন ফিরছিলাম তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে পশ্চিমাকাশ গোধুলির লাল আবীরের রক্তিম আভায় ভরে গেছে। আর কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্যের কথা আরেকদিন আরেক ছবি সাথে হবে। কেউ যদি পঞ্চগড় এর এই অসাধারন সৌন্দর্য্য দেখতে চান তাহলে আর দেরি করবেন না চলে আসুন এক অন্য বাংলাদেশ কে দেখে যান। গ্যারান্টি দিতে পারি এ অভিজ্ঞতার রেশ সারা পৃথিবী ঘুরলেও মনের এক কোনায় জ্বলজ্বল করবে। আর কয়েকদিন পর আর এত দৃশ্যমান হবেনা কারন কুয়াশা বেড়ে যাচ্ছে।

যাওয়ার উপায়ঃ ঢাকা থেকে খুব সহজেই পঞ্চগড় আসা যায় শ্যামলী / কল্যাণপুর থেকে হানিফ ,নাবিল সহ সব কোচ আসে পঞ্চগড়। সেখান তেতুলিয়ার গাড়ীও পাবেন সরাসরি, এসে যদি সুর্য্যদোয় দেখতে চান তাহলে তেতুলিয়ায় উঠতে পারেন। সেখানে সীমান্তের পাড় হোটেল এ রাত্রীযাপন করতে পারবেন। খুব আরামসে ভোর এ উঠে মহানন্দার তীরে অবলোকন করতে পারেন কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য্য। মনে মনে অবশ্যই অনুভব করবেন হিমালয় কন্যা নামকরন এর যথার্ততা।

সকল ছবির কপিরাইট স্বত্ব লেখকের।