চিকিৎসার জন্য চেন্নাই এর শ্রী রামাচন্দ্র মেডিকেল সেন্টার

যুক্ত করা হয়েছে
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, মাস্টার্স (শেষবর্ষ), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। দরকারে যোগাযোগ করতে পারেন এই নাম্বারে - ০১৭১৭-৪১২৩৭৮
লেখক পরিচিতি

গত ১৫-১৭ জুন, ২০১৭ পর্যন্ত আমরা আমাদের ছোট বোনের চিকিৎসার জন্ন্য চেন্নাই এর শ্রী রামাচন্দ্র মেডিকেল সেন্টারে গিয়েছিলাম। অনেকেই ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যান, তাই আমি আমাদের কিছু অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করলাম।

আমি এই মেডিকেল সেন্টারে যাওয়ার আগে জানতাম শুধু চেন্নাই এর আ্যপোলো বা ভেলরের সিএমসির কথা। আসলে রামাচন্দ্র মেডিকেল সেন্টারটি (Sri Ramachandra Medical Centre) ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা হয় চেন্নাই এর পোরুর নামক জায়গায়। তবে ওইরকম ভাবে এর পরিচিতি না হওয়ায় আমরা অনেকেই এই মেডিকেল সেন্টার সম্পর্কে জানি না। কিন্তু আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এদের চিকিৎসা দানের পদ্ধতি অনেক ভালো আর খরচও বেশ কম। বিশেষ করে মেডিকেল সেন্টারটির পরিবেশ আর চিকিৎসার ব্যবস্থাপনা চোখে পরার মত।

শ্রী রামাচন্দ্র মেডিকেল সেন্টার

আমরা ৪ জন গত ১০ জুন রাতে ঢাকা থেকে গ্রীনলাইন পরিবহন করে বেনাপোল হয়ে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। আপনি চাইলে শ্যামলী, দেশ, রয়েল কোচ, সোহাগ পরিবহন ইত্যাদির মাধ্যমে কলকাতায় যেতে পারেন। ভাড়া লাগবে ১৫০০ বেনাপোল পর্যন্ত আর বেনাপোল এর পর থেকে কলকাতা পর্যন্ত লাগবে ২৮০ রুপি। তবে শ্যামলী+বিআরটিসির যৌথ পরিচালনাধীন বাসে গেলে আপনাকে আর গাড়ি পরিবর্তন করতে হবেনা। এক গাড়িতেই আপনি কলকাতা পৌছে যাবেন।

বেনাপোলে পৌছে গাড়ির সুপারভাইজার ৫০০ টাকা ট্রাভেল চার্জ সহ পাসপোর্ট নিয়ে সেটা প্রসিসিং করে আমাদের ইমিগ্রেশন অফিসের মাঝে ঢুকিয়ে দিলেন। দুই দেশের ইমিগ্রেশন এর কাজ শেষে যথারীতি আমরা গ্রীনলাইন পরিবহন এর বাসে উঠলাম পেট্রাপোল থেকে। বিকাল ৪ টায় আমরা কলকাতার মারকিউস স্ট্রিট (নিউ মার্কেট এর পাশেই) এ পৌছালাম। হোটেল গুলশান প্যালেস এ চেক ইন করলাম। ভাড়া ছিল ৭৫০ রুপি/রুম (নন-এসি). এসি রুম ১৬০০ রুপি। মারকিউস স্ট্রিট এর আশেপাশে প্রায় ৪০-৫০ টি হোটেল আছে (মেজর ইন্টারন্যাশনাল, ডিয়ার হোটেল, প্যারাডাইস, হোটেল সুফিয়া ইত্যাদি)।

দুই দিন কলকাতাতে ঘোরার পর আমরা ১৩ জুন সন্ধ্যা ৭ টায় সাতরাগাছি স্টেশন থেকে চেন্নাই (Chennai) এর উদ্দেশ্যে রওনা দেই। আপনারা ট্রেন এর টিকেট অবশ্যই দেশে থাকতেই কেটে নিবেন। তা না হলে টিকেট পাওয়া অনেক মুশকিল। ভাড়া লাগবে ৩ টায়ার এ ১৮৫০, ২ টায়ার এ ৩১০০ আর ১ম শ্রেণীতে ৪৫০০-৫০০০ রুপির মত (প্রায়)। ট্রেনের মধ্যেই পেয়ে যাবেন খাবার সহ নানান ধরনের সুযোগ সুবিধা।

চেন্নাই (মাদ্রাজ) সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশনে পোঁছালাম ১৪ জুন রাত ১ টায় (মানে ১৫ জুন)। সেখান থেকে ট্যাক্সি ক্যাবে পৌছে গেলাম রামাচন্দ্র মেডিকেলে রাত ২ টার দিকে। ভাড়া নিয়েছিল ৫০০ রুপি। তবে আপনি যদি শুধু ট্যাক্সিতে যান তাহলে ৩০০ রুপি দিয়ে আসতে পারেন। আমি বাংলাদেশ থেকে আসার আগেই এই মেডিকেল সেন্টারের International Patient Care Unit এর বাংলাদেশ Facilitator নাম Mr. J. Balachandar (+৯১ ৮৪২৮৯৭৯৭২৭ ভাইয়ের ফোন নম্বর) ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। উনি আমাকে ১৩-২০ জুন এর মধ্যে আসতে বলেছিলেন এবং ডাক্তার এর অ্যপয়নমেন্ট নিয়ে রেখেছিলেন। আর উনি বাংলায় কথা বলতে পারেন। তাই আমাদের থাকার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে, যাবতীয় সকল কাজে উনি প্রত্যেক্ষ ভাবে হেল্প করেছেন, যেটা কিনা বাংলাদেশে প্রায় বিরল ঘটনা। আপনারা যে কেউ এখানে আসার আগে এই ইউনিট এ মেইল করে আসতে পারেন। বালা ভাই এই মেডিকেল সেন্টার এর Hotel Annex (মেডিকেল আর হোটেল এক সাথে- ২/৩ মিনিট) এ আমাদের জন্ন্য রুম আগে থেকেই বুক করে রেখেছিলেন। হোটেলটি পুরোপুরি ৩ স্টার মানের কাছাকাছি। ভাড়া নন-এসি ১০০০ আর এসি ১৬৫০ রুপি। চেন্নাই এ খুব গরম হওয়ায় আমরা ৪ জন এসি রুমে ছিলাম ২০০০ রুপি দিয়ে। আপনি চাইলে হাসপাতাল এর আশেপাশে রুম ভাড়া নিয়ে থাকতে পারেন। ভাড়া পড়বে ৪০০-৫০০ রুপি ৪ জন।

১৫ জুন সকাল ৮:৩০ মিনিটে আমরা ওদের International Patient Care Unit এ গেলাম। ১০০ রুপি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে আমরা চিকিৎসা শুরু করলাম। বালা ভাই সেদিন না থাকার কারনে ওখানকার Ms. Jetty P. Thampi ম্যাম আমাদের সব কথা শুনে প্রথমে General Medical Surgeon ড: রামাইয়া (ভিজিট ৩০০ রুপি) এর কাছে পাঠান। থাইরয়েড গ্ল্যান্ড এর প্রব্লেম থাকার কারনে উনি আমদের কে Endocrinology বিভাগের অধ্যাপক ড: শ্রীরাম মাহাধাবান (ভিজিট ৩৫০ রুপি) স্যারের কাছে পাঠান। দুই ডাক্তারের ব্যবহার আর কথা বলা দেখে সত্যি অবাক হলাম। তখন ভাবলাম শুধু দেশের চিকিৎসার কথা, যেখানে আমাদের ডাক্তারদের সময় ই হয়না রোগীর সাথে কথা বলার। সংশ্লিষ্ট রোগের ৪ টি টেস্ট করালাম ১৫ জুন আর scanning টেস্ট করালাম ১৬ জুন। খরচ হল ৮০০০ রুপি। তারপর সব টেস্টের রেজাল্ট নিয়ে ১৭ জুন ডাক্তারকে দেখালাম।

ডাক্তার শ্রীরাম স্যার প্রায় ২০ মিনিট ধরে রোগী আর আমাদের সাথে কথা বললেন। প্রায় সব টেস্টের রেজাল্ট ছিল নরমাল। উনি বেশ কিছু টিপস দিলেন যে কি কি করতে হবে। অনেক্ষন গল্পও করলেন। প্রেস্ক্রিপশনে তিনি ২ টি মেডিসিন দিলেন, ২ বছর এর জন্য যেখানে এর আগে দিনে ২৪ টা মেডিসিন খেত আমার বোন। উনি বললেন যদি কোন প্রবলেম হয় তাহলে যেন ৪-৬ মাসের মধ্যে আবার আসি। তাদের সকল প্রসিডিউর আর রোগীর সাথে কথা বলার ভঙ্গি ছিল সত্যি অবাক করার মত। মেডিসিন কিনলাম ৫ মাসের যার দাম ছিল ১৭০০ রুপি। এরপর বালা ভাইয়ের সহায়তায় ততকাল দিয়ে ট্রেনের টিকেট কাটলাম। বিকালে সবাই মিলে ঘুরতে গেলাম চেন্নাই এর মেরিনা বিচ, অশোক নগর, টিনগর। ১৮ জুন সকাল ৮:১০ মিনিটে সাতরাগাছি ট্রেনের মাধ্যমে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ১৯ জুন দুপুর ১২ টার দিকে কলকাতায় পৌছে ওই দিন মার্কেট করলাম। তারপর ২০ জুন বাংলাদেশ এর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

এই ছিল লাইফের প্রথম ইন্ডিয়াতে যাওয়া। বেশ মজার মজার অভিজ্ঞতা ছিল। ছোট বোনের ট্রিটমেন্ট এর পাশাপাশি কলকাতা, চেন্নাই এর বিভিন্ন জায়গা ঘোরাঘুরি, নাম করা রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়া, কেনাকাটা করা ইত্যাদি। তবে চেন্নাইয়ের মেডিকেল এর কথা যেমন শুনেছিলাম তারচেয়েও অনেক ভালো ব্যবস্থা দেখে আসলাম। রামাচন্দ্র মেডিকেল এর কথা হয়ত আপনারা অনেকেই জানেন না। কিন্তু এখানকার সকল প্রোটকল সত্যি অনেক সিস্টেমেটিক। তাই আপনাদের কারো কোন সমস্যা থাকলে এখানে গিয়ে দেখাতে পারেন। খরচও অনেক কম আর চেন্নাইয়ের বেশ কাছাকাছি। আর রামাচন্দ্র মেডিকেলে কেউ যেতে চাইলে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।