ভারত এর সিএমসি, ভেলোর এ চিকিৎসার খুঁটিনাটি

যুক্ত করা হয়েছে

সিএমসি হাসপাতালটি ভারতের তামিলনাড়ু প্রদেশের ভেলোর শহরে অবস্থিত। প্রতি বছর প্রচুর বাংগালী চিকিৎসার জন্য ভিড় জমায় এই হাসপাতালে। সিএমসি এর বিশ্বমানের চিকিৎসা, উন্নত টেকনোলজি, যন্ত্রপাতি এবং অত্যাধুনিক প্যাথলজি সিস্টেম এর কারনেই ভারত এর বিভিন্ন প্রদেশ এর মানুষ ছাড়া বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, চীন থেকেও প্রচুর রোগী এসে থাকেন এখানে চিকিৎসা করাতে। তাই যারা সিএমসি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যাবেন বলে ভাবছেন, তাদের যাওয়ার আগে সবকিছু জেনে নিয়ে তারপর যাওয়া উচিত, নাহলে সেখানে গিয়ে ঝামেলায় পড়তে পারেন। তাই যারা ভাবছেন ওখানে গিয়ে চিকিৎসা করাবেন তাদের জন্যে ভেলোর এর সিএমসি হাসপাতাল (Christian Medical College & Hospital) এর খুটিনাটি বিস্তারিত এখানে তুলে ধরা হচ্ছে।

সিএমসি হাসপাতাল, ভেলোর

অ্যাপয়েন্টমেন্ট (Appointment)

এখানে ডাক্তার দেখাতে হলে সর্বপ্রথম আপনার যেটা দরকার হবে সেটা হলো এপয়েনমেন্ট। কারন মেডিকেল ভিসা নিতে হলেও এই এপয়েনমেন্ট এর দরকার হবে আর তাছাড়া এপয়েন্টমেন্ট ছাড়া এখানে আসলেও আপনাকে অ্যাপয়েনমেন্ট এর জন্যে এক্সট্রা কিছুদিন নষ্ট করতে হবে। সিএমসি হাসপাতাল থেকে অফলাইন এবং অনলাইন দুই ভাবেই এখানে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া সম্ভব। আপনি ওখানে যাওয়ার কিছুদিন আগে অনলাইনে CMC এর ওয়েবসাইটে গিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করাতে পারেন অথবা সরাসরি ভেলোরে গিয়েও অ্যাপয়েন্টমেন্ট করাতে পারেন। তবে যেহেতু অনেক দূর থেকে যাচ্ছেন তাই অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট করাই সবচেয়ে ভালো হবে। ওখানে গিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করালে অনেক বেশি দিন ওখানে থাকতে হবে। আর বেশিদিন থাকা মানে খরচ বেড়ে যাওয়া।

অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট (Online appointment)

অত্যন্ত ভীড় এর জন্য যে কোনো ডিপার্টমেন্টের প্রাইভেট appointment পেতে হলে কমপক্ষে ১৫ দিন থেকে ৩ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সেইজন্য ভেলোরে যাওয়ার ১৫ দিন থেকে ৩ মাস আগে অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে। অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে চাইলে আপনাকে আগে জানতে হবে আপনার এই রোগের জন্য কোন ডিপার্টমেন্টে চিকিৎসা করাতে হবে। সেই চিকিৎসার স্পেশালিষ্ট চিকিৎসক আপনাকে অনলাইনে বেছে নিতে হবে। অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে চাইলে আপনাকে সিএমসি, ভেলোর এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে – http://clin.cmcvellore.ac.in/webapt/

অফলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট (Offline appointment)

সিএমসি এর মেইন গেট দিয়ে ঢুকলেই দেখতে পাবেন “Silver Gate For New Appointment” বলে বড় করে লেখা রয়েছেন। সেখানে গিয়ে আপনি আপনার প্রবলেমটা জানালেই ওরা নির্দিষ্ট ডিপার্টমেন্টে এপয়েন্টমেন্ট দিয়ে দেবে। তবে এক্ষেত্রে আপনি ৩ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে প্রাইভেট এপয়েন্টমেন্ট পেয়ে যাবেন। সুতরাং অফলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলে আপনাকে অনেক দিন ভেলোরে থাকতে হতে পারে। তাই অফলাইনের ভরসায় না থেকে আগে থেকে অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করিয়ে তবেই ভেলোরের উদ্দেশ্যে রওনা হোন। এতে আপনার টাকা এবং সময় উভয়ই বাঁচবে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট এর তারিখ পরিবর্তন (Appointment date change)

অ্যাপয়েন্টমেন্ট এর তারিখ পরিবর্তন করতে চাইলে আপনাকে ISSCC বিল্ডিং এর হেল্পডেস্কে লাইন দিতে হবে আপনার পেমেন্ট স্লিপটা নিয়ে। ওখানে আপনার সমস্যার কথা বললেই ওরা ডেট পরিবর্তন করে দেবে।

নতুন অ্যাপয়েন্টমেন্ট (New appointment)

সাধারনত ISSCC বিল্ডিং এর ৪ থেকে ১০ নম্বর কাউন্টারে New appointment এর জন্য পেমেন্ট করা হয় নগদ টাকার মাধ্যমে।

পুনরায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট (Repeat appointment)

সাধারনত ISSCC বিল্ডিং এর ১০ থেকে ১১ নম্বর কাউন্টারে কোনো ডাক্তারের কাছে পুনরায় এপয়েন্টমেন্ট করানো যায়। এক্ষেত্রে কাউন্টারে বলতে হবে ডাক্তার কবে দেখতে চেয়েছেন। তারপর পেমেন্ট করতে হবে।

এপয়েন্টমেন্ট এর প্রকারভেদ

সিএমসি হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে- জেনারেল অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং প্রাইভেট অ্যাপয়েন্টমেন্ট।

জেনারেল অ্যাপয়েন্টমেন্ট (General appointment)

আপনি যদি জেনারেল অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে থাকেন তাহলে জুনিয়ার ডক্টররা রুগী দেখে। সেই কারনে জেনারেল অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়ে যাবেন অনেক কম সময়ে। জেনারেল অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনলাইন বা অফলাইনে করা যায়। মোটামুটিভাবে ১ থেকে ৩ দিনের মধ্যে এই জেনারেল এপয়েন্টমেন্ট পেয়ে যাবেন।

প্রাইভেট অ্যাপয়েন্টমেন্ট (Private appointment)

আপনি যদি প্রাইভেট অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেন তাহলে সিনিয়র ডক্টররা রুগী দেখেন এবং এই এপয়েন্টমেন্ট পাওয়াটা একটু সময় স্বাপেক্ষ।

জরুরীকালীন চিকিৎসা (Emergency treatment)

এমারজেন্সি কিছু হলে আপনাকে যেতে হবে এমারজেন্সি ডিপার্টমেন্টে। ওখানে গেলেই সব কিছু বুঝিয়ে বলে দেবে কি কি করতে হবে।

কোন রোগে কোন ডিপার্টমেন্টে বাছবেন?

আপনি অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে গেলে কোন ডিপার্টমেন্টে নেবেন সেটা জানা জরুরি। যদি ডিপার্টমেন্ট আপনি ঠিকটা সিলেক্ট না করেন তাহলে পয়সা এবং সময় দুটিই নষ্ট হবে। কারণ আপনাকে ওখানে গিয়ে ডিপার্টমেন্ট বদলাতে হবে। বিভিন্ন ধরনের ডিপার্টমেন্ট রয়েছে যেমন কানের সমস্যায় – ENT, ক্যন্সার এর জন্যে Oncology ইত্যাদি। বুঝতে না পারলে ওয়েবসাইটে দেওয়া ফোন নম্বরে ফোন করে আপনার রোগের বিবরণ দিয়ে ডিপার্টমেন্ট জেনে নিতে পারবেন। আপনার রোগের লক্ষণ অনুসারে একটি নির্দিষ্ট ডিপার্টমেন্টের আন্ডারে ক্লিনিক বাছতে হয়। তারপর বেছে নিতে হয় ডাক্তার।

CMC হাসপাতালের সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ন তথ্য

সিএমসি এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিল্ডিং সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক এবার।

OPD building (for Outdoor Patient)

আপনাকে ডাক্তার দেখবেন মূলত এই বিল্ডিং এর বিভিন্ন জায়গায়। এই বিল্ডিং এর মোট ৫ টি ফ্লোরে কাজ হয়।

Ground floor

এই ফ্লোরে প্রায় সমস্ত ধরনের টেস্ট হয়ে থাকে। Blood test, X-Ray, Urine test ইত্যাদি প্রায় সব ধরনের পরীক্ষা এখানে হয়। আপনার ডাক্তার যে টেস্ট দেবেন সেই টেস্টের স্লিপ নিয়ে এই ফ্লোরের ক্যাশ কাউন্টারে যেতে হবে। সেখানে টাকা পেমেন্ট করতে হবে। টাকা পেমেন্ট করতে পারেন ক্যাশ অথবা কার্ডের মাধ্যমে। পেমেণ্ট স্লিপে লেখা থাকবে আপনাকে কোথায় এবং কোন রুমে যেতে হবে। সেখানে গিয়ে আপনাকে টেস্ট গুলি করিয়ে নিতে হবে। ওখানে বলে দেবে আপনি কখন টেস্টের রিপোর্ট পাবেন।

Second floor (Report to MRO at 10:30)

এই ফ্লোরের ২১০ নম্বর ঘরে গিয়ে আপনাকে MRO Counter এ আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট কপি জমা দিতে হবে সকাল ১০ টা ৩০ মিনিটে।

ISSCC building

এই বিল্ডিংটাও OPD building এর মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে New appointment,  Repeat appointment, Pharmacy, CRISS card, Cash payment সংক্রান্ত কাজ হয়ে থাকে। এই বিল্ডিং এর উপরের ফ্লোর গুলিতে ডাক্তারেরাও দেখেন।

PMR building

এটিকে সাধারনত ফিজিওথেরাপি ডিপার্টমেন্ট বলা যেতে পারে। এখানে বিভিন্ন ফিজিওথেরাপির যন্ত্রপাতি, জুতা, ডুপ্লিকেট ব্রেস্ট (সিলিকন) ইত্যাদি পাওয়া যায়। এইসব জিনিসের জন্য এই ডিপার্টমেন্টে আসতে হয়।

WARD building

রোগী অপারেশন বা সার্জারির জন্য সাধারণত এই বিল্ডিং এ ভর্তি হয়। সেইজন্য এখানকার ঘরগুলি খুবই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকে।

OPD Building

সাধারনত রোগীদের বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখানে করা হয়ে থাকে।

ক্রিশ কার্ড (CRISS Card)

সিএমসি হাসপাতাল (CMC Hospital) এ পেমেন্টের জন্য এক ধরনের কার্ড পাওয়া যায়। এই কার্ড একবার বানিয়ে নিলে সেই কার্ডের মাধমেই সব ধরনের পেমেন্ট করতে পারবেন। এই কার্ড বানালে আপনার ঝামেলা কিছুটা কমে যাবে। আপনার Hospital no (Patient ID) বললেই এই CRISS কার্ড বানিয়ে দেবে ISSCC বিল্ডিং এর ৪০২ নম্বর কাউন্টারে এবং পরবর্তীকালে এই কার্ড সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ এই ৪০২ নম্বর কাউন্টারে এসে করতে পারবেন। এই ক্রিস কার্ড এ আগে থেকে টাকা ভরে রাখতে হবে এই ৪০২ নম্বর কাউন্টার থেকে। টাকা ভরতে পারেন এটিএম বা মানি ট্রানফারের মাধমে। এই কার্ডের মজা হল এই কার্ডে পেমেন্ট করতে চাইলে আপনাকে বেশিক্ষন লাইনে দাঁড়াতে হবে না। কারণ এই কার্ডে পেমেন্ট কাউন্টার প্রায় সব জায়গায় আছে এবং এই কার্ডে পেমেন্ট কাউন্টারে লাইনও পড়ে কম।

ফার্মেসি (Pharmacy)

ISSCC বিল্ডিং এ ফার্মেসি পাবেন। এখানে সাধারনত রোগীদের তিন মাসের জন্য মেডিসিন দিয়ে থাকে। এখান থেকে ঔষধ কিনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কারণ বাইরে সব মেডিসিন নাও পেতে পারেন।

অনলাইন পেমেন্ট (Online payment)

সিএমসি হাসপাতালে অনলাইনে ট্রানজেকশন করতে গেলে আপনি ক্রিশ কার্ড, নেট ব্যাংকিং কিংবা ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে পারবেন।

কিভাবে যাবেন

কলকাতা থেকে ভেলোর এর দূরত্ব প্রায় ১৭১২ কিমি। ট্রেনে করে যেতে চাইলে আপনাকে কাটপাডি জংশনে (Katpadi Jn) নামতে হবে। হাওড়া থেকে কাটপাডি যাওয়ার অনেক ট্রেন পেয়ে যাবেন। সময় লাগবে ২৫ থেকে ২৯ ঘন্টার মতো। কাটপাডিতে নেমে অনেক গাড়ি পেয়ে যাবেন ভেলোর যাওয়ার জন্য। কাটপাডি থেকে ভেল্লোর এর দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটারের মতো। বাই এয়ার এ যেতে চাইলে আপনাকে নামতে হবে চেন্নাই এয়ারপোর্টে। চেন্নাই থেকে ভ্যালোর গাড়িতে লাগবে ২ ঘন্টার মতো।

খাওয়া দাওয়া

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরা তো আছেই এছাড়া বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ ভেলোরে চিকিৎসা করাতে যান। প্রচুর বাঙালী ভেলোর ডাক্তার দেখাতে যান বলে এখানে বাঙালী খাবারের অভাব নেই।

কোথায় থাকবেন

ভেলোরে থাকার জন্য অনেক লজ পেয়ে যাবেন। ডাবল বা ট্রীপল বেডের রুম পেয়ে যাবেন ৩০০-৪০০ টাকা থেকে ১৫০০-২০০০ টাকায়। তবে হাসপাতাল এর কাছাকাছি থাকা ভালো।