আলতাদীঘি

Ratings
রেটিংস 0 (0 রিভিউ)

নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলা সদর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার উত্তর দিকে আলতাদীঘি এর অবস্থান। ধামইরহাট উপজেলা পার হয়ে পূর্ব দিকে একটি ব্রিজ সংলগ্ন রাস্তা পাকা, বাকিটা কাঁচা রাস্তা। রাস্তা দিয়ে হাঁটতেই দু’পাশে বাঁশঝাড় আর গাছগাছালি আপনাকে মুগ্ধ করবে। কিছুদূর গেলে দেখা যাবে রাস্তার দুই পাশে শালবন। এখানে দেখা যাবে বরেন্দ্রভূমির লালমাটির সৌন্দর্য। পাহাড়ি এলাকার মতো উঁচু-নিচু রাস্তা। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এ শালবন বর্তমানে সরকারিভাবে সংরক্ষিত। বনের মধ্যে হাঁটলে দেখা যাবে, সূর্যের আলো সরাসরি মাটিতে পড়তে না পেরে গাছের পাতা ভেদ করে বনের ভেতর চাঁদের আলোর মতো রূপ নিয়েছে। যা সত্যিই খুব আনন্দঘন। বনের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে কখনও যদি উইপোকার তৈরি বড় ঢিবি দেখা যায় তবেই বোঝা যাবে বাংলার রূপ সত্যিই কত সুন্দর। বাংলার রূপ কি বিচিত্র।

আলতাদীঘি এর নামেই গ্রামের নাম দেয়া হয়েছে আলতাদীঘি । গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি মাটির তৈরি। আবার অনেকে মাটি দিয়েই দোতলা বাড়ি তৈরি করেছেন। গ্রাম পার হয়ে আলতাদীঘি। এ যেন এক আশ্চর্য দীঘি। এত প্রাচীন আর এমন বিশাল দীঘি বাংলাদেশে আর কোথাও আছে কিনা সন্দেহ রয়েছে। উত্তর-দক্ষিণে লম্বা এ দীঘির দৈর্ঘ্য প্রায় এক কিলোমিটার, চওড়া প্রায় ৪০০ মিটারের মতো। গ্রামের লোকমুখে প্রচলিত আছে বৌদ্ধ যুগের কীর্তি এটি। দীঘির পাড় ঘেঁষে ভারত সীমান্ত। উত্তর পাড়ে দাঁড়িয়ে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া, বিএসএফের সীমান্ত টইল, পাশ্ববর্তী দেশ ভারতকে দেখা খুবই সহজ। আলতাদীঘির পাড়ে দাঁড়ালে মনে হবে অনেকটাই সুন্দরবনের মতো, শীতের সময় অতিথি পাখির আগমন ঘটে। দাঁড়টানা নৌকা আছে। ইচ্ছা হলে কিছুক্ষণের জন্য নৌভ্রমণও উপভোগ করা যাবে।

আলতাদীঘি প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক দিক থেকেও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এ বিশাল জলাশয়ে ৫৫ প্রজাতির দেশীয় মাছ ও প্রায় ১৪ হাজার প্রজাতির অন্যান্য জলজ প্রাণী রয়েছে। আলতাদীঘির অদূরেই রয়েছে পাল শাসনামলে নির্মিত জগদ্দল বৌদ্ধ বিহার। সেখানে বিষ্ণু, শিব ও কারুকার্যখচিত কষ্টিপাথরের নারীর মুখমণ্ডলের প্রতিকৃতি দেখতে পাওয়া যায়। দীঘির পাশেই রয়েছে কয়েকটি আদিবাসী গোষ্ঠীর বসবাস। দীঘির উত্তর পাড় সংলগ্ন ভারত-বাংলাদেশের সীমানা। সেখানে দাঁড়িয়ে ভারতের মানুষের কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ে।

ইতিহাস ঃ

আলতাদীঘির নামকরণেও রয়েছে ঐতিহাসিক মজার ঘটনা। হাজার বছর আগে এ এলাকা ছিল বটু রাজার। জগদ্দলে ছিল সেই রাজার বাড়ি। রানী একদিন আবদার করলেন, তাকে বড় এক দীঘি খুঁড়ে দিতে হবে। রাজা বললেন, ঠিক আছে। তুমি হাঁটতে শুরু কর। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার পা ফেটে রক্ত বের না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত হাঁটতে হবে। এখান থেকে হাঁটা শুরু করে যেখানে গিয়ে পা থেকে রক্ত বের হবে সেই পর্যন্ত দীঘি কাটা হবে। রানী হাঁটতে থাকলেন। হাঁটা আর শেষ হয় না। রাজা পড়ে গেলেন চিন্তায়। শেষ পর্যন্ত পাশের দেশে গিয়ে দীঘি কাটতে না হয়। তাই কৌশলে তার সৈন্য দিয়ে রানীর পায়ে আলতা লাগিয়ে বললেন, রানীর পা ফেটে রক্ত বেরিয়েছে। দীঘি সে পর্যন্তই খোঁড়া হল। প্রায় হাজার বছরের স্মৃতি নিয়ে আজও সৌন্দর্য বিলিয়ে যাচ্ছে এ ঐতিহ্যবাহী আলতাদীঘি।

যাওয়ার উপায় ঃ

ঢাকা থেকে আপনি সহজেই নওগাঁতে আসতে পারেন। বাসে অথবা ট্রেনে আপনি আসবেন। সেক্ষেত্রে আপনি গাবতলী অথবা মহাখালী থেকে যে কোন বাসে আসবেন। সাধারণ বাসে আসতে আপনার খরচ হবে ২৫০-৩০০ আর এসি বাসে খরচ হবে ৪৫০-৫০০ টাকা। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকার কল্যাণপুর থেকে এই পথের বাসগুলো ছাড়ে। শ্যামলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, ডিপজল এন্টারপ্রাইজ, এসআর পরিবহন, কেয়া পরিবহন, টিআর এন্টারপ্রাইজ, মৌ এন্টারপ্রাইজ ইত্যাদি পরিবহন সংস্থার এসি-নন এসি বাস চলে।

ট্রেনে আপনি কমলাপুর রেল স্টেশনে আসবেন দ্রুতযান, লালমনি এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস আর ক্যান্টনমেন্ট রেল স্টেশন থেকে আপনি নীল সাগর এক্সপ্রেসে আসতে পারেন। তবে ট্রেনে আসলে সান্তাহার হয়ে আপনাকে নওগাঁ যেতে হবে। ট্রেনের ভাড়া সাধারণ সিট ১৫০-২০০ টাকার মধ্যে আর এসি ৩০০-৩৫০ টাকার মধ্যে। সান্তাহার থেকে রিকশা, অটোরিকশা ও সিএনজি করে নওগাঁয় আসা যায়।

এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে নওগাঁ আসে শ্যামলী পরিবহন।

নওগাঁ এসে বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে ৪০ কিমি. ভেতরে ধামইরহাটে যাওয়া বাসে উঠে ধামইরহাট যেতে হবে। ধামইরহাটে নেমে সেখান থেকে রিকশা অথবা ভ্যানে আপনি আলতাদীঘি যেতে পারেন। এতে আপনার ভাড়া লাগবে ১০-১৫ টাকা।

কোথায় থাকবেন ঃ

নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলায় ভালো আবাসিক হোটেল না থাকায় আপনাকে আবার নওগাঁতে ফিরে আসতে হবে। আর নওগাঁতে ফিরলে আপনি অনেক ভালো ভালো আবাসিক হোটেল পাবেন।  তবে ভিআইপিদের থাকার জন্য নিকটে রেস্টহাউস আছে। নওগাঁয় থাকার জন্যে কয়েকটি হোটেল হলো – সান্তাহার রোডে হোটেল ফারিয়াল (০৭৪১-৬২৭৬৫), সান্তাহার রোডে হোটেল অবকাশ (০৭৪১-৬২৩৫৬), হোটেল রাজ (০৭৪১-৬২৪৯২), শহীদ কাজী নূরুন্নবী মার্কেটে হোটেল যমুনা (০৭৪১-৬২৬৭৪), হোটেল প্লাবণ, মুক্তির মোড়ে হোটেল আগমনী (০৭৪১-৬৩৩৫১), পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে হোটেল সরণি (০৭৪১-৬১৬৮৫) ও মোটেল চিসতী।

View Direction

আপনার রিভিউ দিন

* বাধ্যতামূলক ভাবে পূরণ করতে হবে।

Sending